নিয়ানডার্থাল জিন প্রকারণ কোভিড-১৯ ঝুঁকি বাড়ায়

পাঠসংখ্যা: 👁️ 328

এ বছরের শুরুতে চীনের উহাং প্রদেশে প্রথম আবির্ভাব ঘটে করোনা ভাইরাসের। সেই থেকে এ পর্যন্ত ভাইরাসটি কেড়ে নিয়েছে ১,৭৭৮,৩২১ জনের প্রাণ। বছরের শেষ হতে চলল কিন্তু করোনা ভাইরাস আমাদের ছেড়ে যেতে চাচ্ছে না। সেই সাথে প্রতিনিয়তই এ নিয়ে চলছে গবেষকদের নানা গবেষণা আর বেড়িয়ে আসছে নানান তথ্য। বিজ্ঞানীরা ভ্যাকসিন ডেভেলাপের আশায় করে যাচ্ছেন অক্লান্ত পরিশ্রম। গত সপ্তাহে বায়োআর্কাইভ প্রিপ্রিন্টে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র জানান দিচ্ছে করোনা ভাইরাসের ঝুঁকিতে নিয়ানডার্থাল জিন প্রকরণের প্রভাব সম্পর্কে।

আপনি যদি করোনায় আক্রান্ত হন তাহলে আপনার পূর্বপুরুষ নিয়ানডার্থাল ছিল কিনা তা বোঝার সুযোগ আছে। কিছু সংখ্যক মানুষের ক্রোমোজোমে নিয়ানডার্থাল মানুষের জিনপ্রকরণ এর সন্ধান মেলে এবং এর ফলে তাদের শরীরে করোনা ভাইরাসের সংক্রমনের ঝুঁকির মাত্রা অন্যদের তুলনায় দ্বিগুন কিংবা চারগুন বেড়ে যায়।এমনটাই বলছে একটি নতুন গবেষণা। গবেষণাটি মূলত ডাইপেপটাইডেজ পলিপেপটাইড (ডিপিপি৪) নামের একটি এনজাইম কে নিয়ে। বিজ্ঞানীরা বলছেন এই এনজাইমটি করোনা ভাইরাসকে কোষে প্রবেশ করতে সহায়তা করে। এর আগে জানা যায় এনজিওটেনসিন কনভার্টিং এনজাইম২ (এসিই২) করোনা ভাইরাসের রিসেপ্টর প্রোটিন হিসেবে কাজ করে। নতুন গবেষণা বলছে ডিপিপি৪ এনজাইমও এসিই২ এর মতোই করোনা ভাইরাসের রিসেপ্টর প্রোটিন হিসেবে কাজ করে। করোনা ভাইরাস পোষক কোষের কাছে এলে এর স্পাইক প্রোটিন এর সাথে ডিপিপি৪ এনজাইমটি বাইন্ড করে। তারপর ভাইরাসটি তার জ্যেনেটিক মেটেরিয়াল (আরএনএ) পোষক কোষের ভেতর প্রবেশ করিয়ে বংশবিস্তার শুরু করে।ডিপিপি৪ প্রোটিনটি মিডল ইষ্ট রেসপিরেটরি সিনড্রম এর জন্য দায়ী ভাইরাসের সংক্রমনেও রিসেপ্টর হিসেবে কাজ করে। বর্তমানে নতুন গবেষণা বলছে এটি সারস-কোভিড-২ ভাইরাসের সংক্রমণেও রিসেপ্টর প্রোটিন হিসবে কাজ। চীনের সেন্ট্রাল সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজিস্ট জিয়ানহোং লো বলেন ডিপিপি৪ প্রোটিনটি কোষে করোনা ভাইরাসের প্রবেশে একটা ভালো উপায় হিসেবে কাজ করে। জুন মাসে নেচারে তারা এ সংক্রান্ত একটি গবেষণা প্রকাশ করেন। তারা ডিপিপি৪ এনজাইমের অ্যামিনো এসিডের সিকোয়েন্সের সাথে এনজিওটেনসিন কনভার্রটিং এনজাইম২ এর অ্যামিনো এসিড সিকোয়েন্সের তুলনা করে এই তথ্য দেন।

নিয়ান্ডারটাল ডিপিপি৪ লোকাস।
ক) 1000 জেনোমস ডেটাতে ইউরোপীয়দের সূচক-প্রকরণ RSS117460501 এর সাথে লিঙ্কেজ ডিসিসিলিব্রিয়াম। খ) COVID-19 তীব্রতার উপর তিনটি নিয়ান্ডার্টাল হ্যাপ্লোটাইপগুলির ফেনোটাইপিক প্রভাব। ডিপিপি ৪ হ্যাপ্লোটাইপ ক্রোমোজোম ২ এ অবস্থিত, যেখানে পূর্বে বর্ণিত ঝুঁকি এবং প্রতিরক্ষামূলক হ্যাপ্লোটাইপগুলি যথাক্রমে ক্রোমোজোম ৩ এবং ১২ এ অবস্থিত। গুরুতর রোগগুলির সংক্রমণ হিসাবে সংস্থার জন্য হাসপাতালে ভর্তি প্রয়োজন হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, যখন খুব গুরুতর রোগের পরিপূরক অক্সিজেন থেরাপির বাইরে সক্রিয় শ্বাসযন্ত্রের সমর্থন প্রয়োজন। গ) মহাদেশীয় জনসংখ্যার ডিপিপি৪ ঝুঁকির হ্যাপ্লোটাইপের ক্যারিয়ার ফ্রিকোয়েন্সি। 1000 জিনোমস প্রকল্পের ডেটা।

বিজ্ঞানীদের মতে ইউরোপ,এশিয়া এবং স্থানীয় আমেরিকানদের অধিকাংশের ডিএনএ এর ১.৮-২.৬% জিন বিলুপ্ত নিয়ানডার্থাল মানুষদের থেকে এসেছে।এদের কিছু প্রকরণ আরএনএ ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা তৈরিতে সহায়তা করে আবার কিছু প্রকরণ যেমন ক্রোমোজোম ৩ এ অবস্থিত প্রকরণটি ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুন পর্যন্ত। নিয়ানডার্থাল ফসিলের ডিএনএ পরীক্ষা করে জানা যায় এদের শরীর এর ডিপিপি৪ প্রোটিনটির জন্যে দায়ী জিন আধুনিক হোমো স্যাপিয়ন্সদের থেকে আলাদা।

যেসব মানুষদের ক্রোমোজোম এ ডিপিপি৪ প্রোটিনটির জন্য দায়ী জিন নিয়ানডার্থালদের অনুরূপ তাদের কোষে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। কারণ এই প্রকরণটি থেকে উৎপন্ন ডিপিপি৪ প্রোটিনটির গঠন আলাদা যেটি সার্স-কোভিড২ ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের সাথে বাইন্ড করতে পারে। এমনটাই দাবী করেন জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাংক ইনস্টিটিউটের জিনতাত্ত্বিক পাবো এবংতার সহকারী হোগো জেবার্গ। তারা করোনায় আক্রান্ত যেসব রোগীর অবস্থা খুবই বিপদজনক তাদের কোষে ডিপিপি৪ এর নিয়ানডারথাল প্রকরণটির খোঁজ করেন। এবং লক্ষ্য করেন যাদের কোষে এ নিয়ানডার্থাল প্রকরণটির একটি একক কপিও রয়েছে তারা অন্যদের তুলনায় দ্বিগুন কিংবা চারগুন ঝুঁকিতে রয়েছেন।

গবেষকদলটি জানায় ইউরোপিয়ানদের মধ্যে ১-৪% লোকের জিনোমে নিয়ানডার্থাল জিন প্রকরণটি পাওয়া যায়। প্রশ্ন হচ্ছে নিয়ানডার্থাল জিন প্রকারণটি কীভাবে ডিপিপি৪ প্রোটিনটির কার্যক্ষমতা পরিবর্তন করে ফেলে? এটিই এখন গবেষণার বিষয়। অন্য আরেকটা গবেষণা জানায় ডিপিপি৪ এনজাইমটি কোষের ভেতরে গ্লুকোজ অথবা অন্যান্য শর্করা ভেঙ্গে ফেলে।এজন্যেই এটিকে ডায়াবেটিস ঔষধের টার্গেট হিসবে কাজ করে। এটি গবেষণাটির আরেকটি গুরত্বপূর্ণ দিক।

তবে হোমো স্যাপিয়েন্সদের ক্রোমোজোম এ থাকা নিয়ানডার্থাল জিন প্রকরণগুলোর কিছু কিছু আরএনএ ভাইরাসের(উদাহরনস্বরূপ করোনা ভাইরাস) বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলতে সহায়তা করে। ২০১৮ সালে এরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন জিনত্ত্ববিদ ডেভিড এনরাড এর করা একটি গবেষণা মতে,নিয়ানডার্থাল জিন প্রকরণ গুলো আরএনএ ভাইরাসের প্রতি শক্ত প্রতিরক্ষা তৈরি করতে পারে। এর কারণ সম্ভবত নিয়ানডার্থালরা প্রায়সই আরএনএ ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হতো।আর বিবর্তনের ধারায় যৌন জননের মাধ্যমে আধুনিক হোমো স্যাপিয়েন্সরাও এসব জিন পেয়েছে। পাবো এবং তার সহকারীদের করা এই গবেষণাটি বৈপ্লবিক কারণ এতে জানা যায় কীভাবে নিয়ানডার্থাল জিন প্রকরণবিশিষ্ট কোষে করোনা ভাইরাস দ্রুত প্রবেশ করতে পারে। তবে করোনা সংক্রমনের ক্ষেত্রে অসতর্কতা, দারিদ্র্য ই বেশী দায়ী। তাই সংক্রমণ কমিয়ে আনতে স্বাস্থ্যবিধি মানার বিকল্প নেই।

তথ্যসূত্র: সায়েন্স ম্যাগাজিন।
প্রচ্ছদ ছবি কৃতজ্ঞতা Crawford Jolly on Unsplash

Sujoy Kumar Das
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগে ২য় বর্ষে অধ্যয়নরত।