কৃষ্ণ গহ্বরের ভোজ নিউট্রন তারা দিয়ে

পাঠসংখ্যা: 👁️ 192

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দুটি কৃষ্ণ গহ্বরকে একে অপরের সাথে মিশে যেতে দেখেছেন। দুটি নিউট্রন তারার মধ্যে সংঘর্ষ হতে দেখেছেন। কিন্তু সর্বগ্রাসী রাক্ষুসে কৃষ্ণ গহ্বর যে একটা আস্ত নিউট্রন তারা দিয়ে ভোজ সাড়তে পারে তা সম্প্রতিই বিজ্ঞানীরা ধরতে পেরেছেন। গত ২৯ জুন তারিখে দি নিউইইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় কেনেথ চাং লিখেছেন কৃষ্ণ গহ্বরের নিউট্রন তারা গিলে ফেলার ঘটনা নিয়ে। লেখাটার ভাবানুবাদ লেখার চেষ্টা করেছি। আশা করি উপভোগ করবেন।

গত ২০২০ জানুয়ারিতে, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সর্বপ্রথম নিশ্চিত ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন একটা রাক্ষুসে কৃষ্ণ গহ্বর একটা মৃত তারা কে গিলে ফেলছে। তার দশ দিন বাদে মহাকাশের ভিন্ন জায়গায় তারা একই রকম ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেন। তারা এই বিজয়ের গল্প একটা জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান জার্নালে প্রকাশ করেন যা এখনো মহাকর্ষীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানে একটা জমজমাট বিষয়। লাইগো কোলাবোরেশনের মুখপাত্র উইসকনসিন-মিলওয়াকি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক প্যাট্রিক ব্র্যাডি বলেন, “আমরা এই প্রথম মহাবিশ্বের কোন এক জায়গায় একটা কৃষ্ণ গহ্বর এবং নিউট্রন তারার মধ্যে ঘটা সংঘর্ষের ঘটনা ধরতে পেরেছি”। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এইরকম ঘটনা ঘটার ব্যপারে জানতেন। কিন্তু পর্যবেক্ষণের আগ পর্যন্ত তা অনিশ্চিত ছিল। এই আবিষ্কার মহাবিশ্বে থাকা বাইনারি তারাদের জগত সম্পর্কে আরো জানতে সহায়তা করেছে। এবং সেই সাথে আরেকটা প্রশ্ন তৈরি করেছে যে কেন আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথ এ এরকম ঘটনা এখনও দেখা গেল না?

অধ্যাপক প্যাট্রিক ব্র্যাডি

জগদ্বিখ্যাত পদার্থবিদ আইনস্টাইন এর সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব এরকম কৃষ্ণ গহ্বর এবং নিউট্রন তারার সংঘর্ষ সম্পর্কে প্রথম ভবিষ্যৎবানী করেছিল। বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে লাইগো (LIGO — Laser Interferometer Gravitational-Wave Observatory) এইরকম ঘটনা পর্যবেক্ষণ করার জন্যে খোঁজ করছিল। লাইগোর একটা লেজার বীম হ্যানফোরড এবং আরেকটা লিভিংস্টোন থেকে বছরের পর বছর ধরে মহাকাশে এই রোমহর্ষক ঘটনা পর্যবেক্ষণ এর অপেক্ষা করছিল। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে লাইগোর এই দুইটা স্থানে বহুপ্রতীক্ষিত মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ধরা পড়ে। এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সৃষ্টি হয়েছিল মূলত দুইটা নাক্ষত্রিক আকৃতির কৃষ্ণ গহ্বরের পরস্পরের সাথে সংঘর্ষের কারণে। এই দুটো কৃষ্ণ গহ্বরের জন্ম হয়েছিল দুটো বিশাল আকৃতির নক্ষত্রে সুপারনোভা বিস্ফোরণ থেকে। কৃষ্ণ গহ্বর গুলো পরস্পরের চার পাশে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ একে অপরের সাথে মিশে যায়। দুটো মিলে একটা হয়ে যায়। যেসব তারা সূর্যের চাইতে বড় কিন্তু কৃষ্ণ গহ্বরে পরিণত হবার মতো যথেষ্ট না সেগুলোর মৃত্যু হয় নিউট্রন তারায় রূপান্তরের মাধ্যমে। প্রথম মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত হবার দুই বছর পর এরকম দুটো নিউট্রন তারার সংঘর্ষ হতে সৃষ্ট মহাকর্ষ তরঙ্গ ধরা পড়ে লাইগো ডিটেক্টর যন্ত্রে। মহাবিশ্বের অধিকাংশ স্বর্ণ এবং রুপো তৈরি হয় এরকম নিউট্রন তারাদের সংঘর্ষ থেকে। আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথে প্রায় অর্ধশতক ধরেও খোঁজাখোঁজি করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কৃষ্ণ গহ্বরের চারপাশে ঘূর্ণনরত কোন নিউট্রন তারা খোঁজে পান নি। ড. ব্র্যাডি বলেন, কেন এমনটা হচ্ছে? এই রহস্যের পেছনে কারণ কি?

কৃষ্ণ গহ্বর এবং নিউট্রন নক্ষত্রের পরস্পরের সাথে মিশে যাওয়া। সুত্রঃ দি নিউইয়র্ক টাইমস।

২০১৯ সালে দুটো মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত হবার ঘটনা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মনে এই আশার সঞ্চার করেছিল যে সম্ভবত জ্যোতির্বিদ্যার এই রহস্যের সমাধান হতে যাচ্ছে। এর একটি শনাক্ত হয় সেই বছর এপ্রিলে এবং অন্যটি আগস্টে। কিন্তু তখন এদের মধ্যে একটি(এপ্রিল এ শনাক্ত হওয়া তরঙ্গটি) তরঙ্গকে গবেষণা প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয় নি। হতে পারে সেই তরঙ্গের সৃষ্টি হয়েছিল দীর্ঘদিনের অপেক্ষার সেই কৃষ্ণ গহ্বর এবং নিউট্রন তারার সংঘর্ষের ঘটনার ফলেই। কিংবা হতে পারে এটা কোন অর্থহীন কিছু। ড. ব্র্যাডি বলেন, আমাদের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ বা তথ্য নেই যে আসলেই এটি কোন কৃষ্ণ গহ্বর-নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট নাকি।

আগস্টে শনাক্ত হওয়া তরঙ্গটিও রহস্য থেকে যায়। এটি যাদের সংঘর্ষ থেকে তৈরি হয়েছে এর মধ্যে বড় বস্তুটি ছিল নিঃসন্দেহে একটি কৃষ্ণ গহ্বর। কিন্তু ছোট বস্তুটি আকারে নিউট্রন নক্ষত্রের চেয়ে বড় কিন্তু কৃষ্ণ গহ্বর থেকে ছোট। এর ভর সূর্যের চাইতে ২.৬ গুণ বেশি ছিল। বিজ্ঞানীরা অনিশ্চিত যে এটি আসলে কোন কৃষ্ণ গহ্বর ছিল নাকি নিউট্রন তারা। তবে নতুন শনাক্ত হওয়া তরঙ্গ থেকে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত যে মিল্কিওয়ে থেকে অনেক দূরে একটা নিউট্রন নক্ষত্র এবং কৃষ্ণ গহ্বর এর পরস্পরের সাথে মিশে গেছে। গতবছর জানুয়ারির ৫ তারিখে প্রথম এই ধারার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেন বিজ্ঞানীরা। লিভিংস্টোন এ রাখা লাইগো ডিটেক্টর যন্ত্রে প্রথম এই সিগন্যাল ধরা পড়ে। মহাকর্ষ তরঙ্গের কম্পাংকের পরিবর্তন লক্ষ্য করে বিজ্ঞানীরা মহাকাশে যেসকল বস্তুর মধ্যে সংঘর্ষ থেকে তরঙ্গের সৃষ্টি তাদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানতে পারেন। কৃষ্ণ গহ্বরটি ছিল সূর্য থেকে নয় গুণ ভারী আর নিউট্রন তারাটি দুই গুণ ভারী। এই লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে পৃথিবী থেকে প্রায় নয়শ আলোকবর্ষ (এক আলোকবর্ষ মানে হল আলো তার নিজের গতিতে এক বছরে যে পরিমাণ দুরত্ব অতিক্রম করে) দূরে।

পরবর্তীতে ১৫ জানুয়ারি তারিখে হেনফোরডে রাখা ডিটেক্টর যন্ত্রে দ্বিতীয়বার আরেকটি মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত হয় যা কিনা একই রকম ঘটনা অর্থাৎ একটি কৃষ্ণ গহ্বর এবং নিউট্রন তারার পরস্পরের সাথে মিশে যাওয়া থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। এবারের নিউট্রন তারাটি সূর্যের চাইতে দেড় গুণ ভারী ছিল এবং কৃষ্ণ গহ্বরটি ছিল ছয় গুণ ভারী। তবে এক্ষেত্রে তারা কোন রকম আলোক বিকিরণ শনাক্ত করতে পারেন নি বিজ্ঞানীরা। সাধারণত একটা কৃষ্ণ গহ্বর একটা নিউট্রন তারা কে গিলে ফেলতে যথেষ্ট বড় হয় এবং কোন রকম স্পষ্ট বিকিরণ তৈরি হবার আগেই কৃষ্ণ গহ্বর তার গলাধকরণ সম্পন্ন করে। তবে ড. ব্র্যাডির প্রশ্নের জবাব এখনো পাওয়া যায় নি। কেন আমাদের ছায়া পথে আমরা এখনো এইরকম ঘটনার স্বাক্ষি হতে পারছি না? হয়ত আমাদের খোঁজার পদ্ধতি সঠিক নয় অথবা এরা আমরা কিছু বোঝে উঠার আগেই পরস্পরের সাথে মিশে যায়।

তথ্যসুত্রঃ

A Black Hole Feasted on a Neutron Star. 10 Days Later, It Happened Again. — দি নিউইয়র্ক টাইমস।       

বিজ্ঞাপন

Sujoy Kumar Das
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগে ২য় বর্ষে অধ্যয়নরত।