জাতীয় পাখি দোয়েল

পাঠসংখ্যা: 👁️ 127

বাংলাদেশ থাকেন অথচ দোয়েল পাখির নাম শুনেননি এরকম বললে মহাপাপ হবে। দোয়েল বাংলাদেশের জাতীয় পাখি, দুই টাকার নোটেও রয়েছে দোয়েল পাখির ছবি, বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ”সাউথ এশিয়ান গেমস ” এর মাসকটও ছিল দোয়েল, রাজধানী ঢাকাতে রয়েছে দোয়েল চত্বর, প্রকৃতিপ্রেমী কবি জীবনানন্দ দাশ তার বিখ্যাত “বাংলার মুখ” কবিতায় তুলে এনেছেন দোয়েলের কথা  

অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে
চেয়ে দেখি ছাতার মতো ব্ড় পাতাটির নিচে বসে আছে ভোরের দোয়েলপাখি –",

এমনকি লোকগাথার মধ্যেও দোয়েল আছে। চারিদিকে দোয়েলের যেন সমাচার।

দোয়েল নিয়ে বাংলাদেশের যশোরে প্রচলিত একটি গল্প আছে- এক দেশে কুচকুচে কালো এক দধিয়াল বাস করত। তার মতো সাদা দই আর কেউ বানাতে পারত না। দেশটির বুড়ো রাজা একদিন অল্প বয়েসী এক সুন্দরীকে বিয়ে করতে করলেন । সমস্যা হলো নতুন রাণী নাকি দই ছাড়া ভাতই খাবে না। রাজা জানতে পারলেন ঐ দধিয়ালের কথা এবং তাকে প্রতিদিন দই পৌঁছে দিতে বললেন।  তার জাদুকরি দই খেয়ে রাণী অমৃতের স্বাদ পেলেন আর তাদের মধ্যে হল প্রেম।  একদিন এ খবর রাজা জেনে গেলে রানীর কাছে দধিয়ালের যাওয়া বন্ধ করে দেন। অনেকদিন পর একরাতে দধিয়াল দুটি কালো হাঁড়িতে দই নিয়ে রানীর পুরীর সামনে এসে ব্যাকুলভাবে ডাকতে লাগলেন। রানী তার ডাকে সাড়া না দিয়ে পারল না তাই প্রার্থনা করলো।  তাতেই সে একটি পাখি হয়ে পিক করে ডেকে গাছে গিয়ে বসলেন। দধিয়ালও তখন পাখি হয়ে তার পাশে গিয়ে বসলেন। এরপর দু’জনেই উড়ে অন্য রাজ্যে চলে গেলেন। এরাই দোয়েল, দধিয়াল বা দয়েল পাখি। সেই দইয়ের সাদা আর হাঁড়ির কালো রং এখনও দোয়েলের বুকে দেখা যায়।

দোয়েল পাখির নামকরণ হয়ত এভাবেই হয়েছে কিন্তু  সেটা বিষয় নয়। কথা হচ্ছে এতে একটা বিষয় স্পষ্ট হয় যে আগেও মানুষ দোয়েল পাখি নিয়ে আলোচনা করত এবং সেকারণেই এরকম গল্পের উৎপত্তি।

দোয়েলকে ইংরেজিতে বলা হয় Oriental Magpie Robin’, গ্রামের দিকে দই নাচুনি পাখিও বলে অনেকে। যাহোক এর বৈজ্ঞানিক নাম হলো Copsychus saularis. পুরো ক্লাসিফিকেশন বলতে গেলে

Kingdom: Animalia
Phylum: Chordata
Class: Aves
Order: Passeriformes
Family: Muscicapidae
Genus: Copsychus
Species: C. saularis

বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ইত্যাদি অঞ্চলে দোয়েল ছড়িয়ে রয়েছে।  আজকে মূলত বাংলাদেশে পাওয়া যায় সেই সাবস্পিসিজের দোয়েল নিয়েই  আলোচনা করা হবে।

বাংলাদেশের দোয়েল অন্যদেশের দোয়েলের চেয়ে লেজের দিকে একটু বেশি কালো । মোটামুটি দেশের সবস্থানেই কমবেশি দোয়েল পাখি দেখা যায়৷ অট্টালিকায় ভরপুর রাজধানী থেকে শুরু করে গাছগাছালিযুক্ত সুন্দরবন, সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায়।একটু চোখকান খোলা রাখলে গবাদি  লোম,খড়কুটো,সাপের খোলস, গাছগাছালির শুকনা মূল দিয়ে তৈরি ঘর দেখতে পারবেন। দোয়েল লোকচলাচল করছে এমন স্থানে বাসা বাঁধতেই বেশি পছন্দ করে। বাসা তৈরির পর সবাইকে জানানোর জন্য গান করতে থাকে। দোয়েলের সব ডাক শুনে আপনার একইরকম মনে হতেই পারে  কিন্তু পরিস্থিতি অনুযায়ী তারা বিভিন্ন সুরে ডাকে যেমন বাসা তৈরির কথা জানানোর সময় একরকম সুর, ব্রিডিং সিজনে স্ত্রী দোয়েলকে আকর্ষিত করতে আরেক সুর আবার বিপদে পড়লে সাহায্য চেতে অন্যরকম সুরে ডাক দেয় । এমনকি তারা অন্য পাখির সুর পর্যন্ত নকল করতে পারে। অনেক পক্ষীবিশারদগণ আবার ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন ডায়ালেক্ট থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। এরা একাধারে  ৭-৩০ মিনিট পর্যন্ত সুর করতে পারে। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ সবঝতুতেই দোয়েলের ডাক শোনা যায়।

দোয়েল পাখি আকারে খুব বড় না মোটামুটি ১৫-২০ সেন্টিমিটারের মতে। ধরা চলে সাধারণ আন্ড্রোয়েড ফোনের সমান বা একটু বড়।  পোকামাকড়, কীটপতঙ্গ, কেঁচো, খেজুরের রস এগুলো দোয়েল খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। মাঝে মাঝে নিজেও বিড়াল বা শিয়ালের খাদ্যে পরিণত হয়।

কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যেগুলো দিয়ে স্ত্রী এবং পুরুষ দোয়েলকে আলাদা করা হয় যেমনঃ পুরুষ দোয়েলের ঘাড়ের নিচে পেটের অংশটুকু সাদা আর স্ত্রী দেয়েলের ঘাড়ের নিচের দিকের অংশ ঘিয়ে কালারের। স্ত্রী দোয়েল ঘর তৈরিতে এবং বাচ্চা লালনপালনে  আর পুরুষ দোয়েল ঘর রক্ষা করতে বেশি অংশগ্রহণ করে।

বামে পুরুষ  দোয়েল ডানে স্ত্রী দোয়েল

বাসা বানানোর সপ্তাহখানেক পরেই স্ত্রী দোয়েল ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে চার পাঁচটা ডিম পাড়ে এবং তাতে ৮ থেকে ১৪ দিন তা দিলে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়।

পূর্বেই তুলনায় দোয়েল পাখির পরিমাণ কমে গেলেও বিলুপ্ত হওয়া নিয়ে চিন্তিত হবার তেমন কারণ নেই। International Union for Conservation of Nature (IUCN) এর তৈরিকৃত লাল তালিকাতে দোয়েলকে নূন্যতম বিপদগ্রস্থ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে পাখি সংরক্ষণের দিক থেকে আমাদের সচেতনতা নেই বললেই চলে। সাম্প্রতিক সময়ে পিরোজপুরের এক গ্রামে মাঠের ধান খেয়ে ফেলায় তালগাছে বাবুই পাখির ঝুলন্ত বাসা পুড়িয়ে, পিটিয়ে ধ্বংস করেছে গ্রামবাসী।  এ নির্মম ঘটনার শিকার হয় দেড় শতাধিক বাবুই পাখির ছানা ও ডিম। পরে তিন জনকে আটক করা হয়েছে।  ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী রক্ষা আইন ও ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী পাখি নিধন দণ্ডনীয় ফৌজদারি অপরাধ যার জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি এক বছর জেল, এক লাখ টাকা দণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যেতে পারে। একই অপরাধ ফের করলে শাস্তি ও জরিমানা দ্বিগুণের বিধানও রয়েছে।

যাহোক খুবই দুঃখজনক একটা ঘটনা। এধরণের ঘটনা যেন না ঘটে সেজন্য আমাদের সচেতন থাকতে হবে পাখি ফসলের জন্য ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে আমাদেরই সাহায্য করে আর আমরা যদি এবারে তাদের ধ্বংস করতে থাকি তাহলে ইকোসিস্টেম বিরাট বড় প্রভাব ফেলবে।

আলোচনা হলো তো বাংলার দোয়েল নিয়ে কিন্তু শ্রীলঙ্কাতে নীল দোয়েল নামে আরেক রকমের দোয়েল আছে যেটার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ছবিটা না দিয়ে পারলাম না।

নীল দোয়েল

সূত্র: