তথাকথিত “জাঙ্ক-ডিএনএ” অনুকল্প কি বাতিলের পথে?

আগে ধরা হতো মানব জিনোমের অধিকাংশই 'জাঙ্ক', বাতিল ডিএনএ। কিন্তু নতুন অনেকগুলো গবেষণায় এসব ডিএনএ-র জরুরী কাজের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। হয়তো, এসব 'বাতিল' ডিএনএ-ই আমাদের অন্য প্রজাতি থেকে আলাদা করে গড়ে তোলে।
Credit Jennifer Cook-Chrysos/Whitehead Institute / MIT
পাঠসংখ্যা: 👁️ 191

মানব জিনোম সিকোয়েন্সিং এর পর, ২০০০’র দশকে, আমাদের ডিএনএ-র অর্ধেকেরও বেশিকে ধরে নেয়া হতো অপ্রয়োজনীয়। বলা হতো এগুলো বিবর্তনের “বাতিল মাল”, নষ্ট হয়ে যাওয়া “ভাঙা-জিন”, জিনোমের কারাগারে আটকে পড়া ভাইরাসের ডিএনএ-ফসিল যেগুলোর প্রকাশ “চুপ” করে দেয়া হয়েছে। ভাবা হতো, এসব বাতিল ডিএনএ জীবের কোন প্রয়োজনে আসে না, বিবর্তনের সাথে সম্পর্কহীন।

তব গত দশকে অনেকগুলো গবেষণা একে একে দেখাচ্ছে যে এসব “বাতিল ডিএনএ”-র একটি অংশ একদম অকেজো নয়। আমাদের সম্পুর্ণ জিনোমের তুলনায় জিনের পরিমাণ খুবই কম, মাত্র ২ শতাংশ, যারা বিভিন্ন প্রোটিন তৈরি করতে পারে। কিছু তথাকথিত ‘অকেজো’ ডিএনএ বিভিন্ন জিনের প্রকাশ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে বলে জানা যাচ্ছে। তবে এসব ডিএনএ নিয়ন্ত্রক-অনুক্রম দেহের জরুরী নাকি ক্ষতিকর ভূমিকা পালন করে; নাকি আকস্মিকভাবে এগুলো জিনোমের অংশ হিসেবে যুক্ত হয়েছে, যে বিভিন্ন জীব এদের বাদ দিয়ে বেঁচে থাকতে পারে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক এখনো চলমান। 

সেই ২০১৩ সালে ENCODE প্রজেক্টের গবেষণা থেকে নন-কোডিং ডিএনএ যে অকেজো নয় বরং গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে তা নিয়ে আলোড়ন ও বিতর্ক তৈরি হয় (পড়ুন: নন-কোডিং ডিএনএ রহস্য / খান ওসমান)। এর পরে নন-কোডিং ডিএনএ নিয়ে আরো গবেষণা হয়েছে। আজকের এই লেখাতে আমরা “জাঙ্ক ডিএনএ” অনুকল্প সমর্থন করে না এমন বেশ কিছু নতুন গবেষণার কথা জানবো।

জাঙ্ক-ডিএনএ যখন স্তন্যপায়ী-বিকাশের জন্য অপরিহার্য

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কেলি ও ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক জাঙ্ক ডিএনএ-র একটি অন্যতম উপাদান ট্রান্সপোজন নিয়ে কাজ করেছেন। ট্রান্সপোজন মূলত “স্বার্থপর” ডিএনএ অনুক্রম যারা জিনোমের বিভিন্ন অংশে নিজেদের সংযুক্ত করে। ট্রান্সপোজনের একটা নির্দিষ্ট পরিবারই রয়েছে বিভিন্ন প্রাচীন ভাইরাসের ডিএনএ থেকে উৎপত্তি হওয়া। এইসব ভাইরাস যখন পোষককে আক্রমণ করেছিলো, তখন তাদের কারো কারো ডিএনএ পোষকের জিনোমে সংযুক্ত হয়ে যায়। পোষক ও ভাইরাস জিনোমের দীর্ঘ টানাপোড়নে একসময় এই “বিদেশী” অনুক্রমগুলো ট্রান্সপোজনে পরিণত হয়। এই গবেষণা বলছে, ভাইরাস থেকে উৎপত্তি হওয়া এইসব ট্রান্সপোজন ইঁদুরের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। যখন গবেষকরা ইঁদুরের জিনোম থেকে এই ট্রান্সপোজনগুলো মুছে ফেলেন, তখন তাদের অর্ধেকেরও বেশি ছানা জন্মের আগেই মারা যায়।

স্তন্যপায়ী প্রাণীদের জন্যেও “বাতিল” ডিএনএ-র উপস্থিতি জীবন-মৃত্যুর বিষয় হতে পারে, তার সর্বপ্রথম এই গবেষণাতে দেখা যায়।

মানুষের জিনোমে প্রোটিন কোডিং জিনের পরিমাণ মাত্র ১.৫-২% এর মতো। বাকি সবই নন-কোডিং ডিএনএ।

এই গবেষণার অন্যতম বিজ্ঞানী লিন হে-র মতে, বিভিন্ন সময়ে ভাইরাস ডিএনএ আমাদের জিনোমে সংযুক্ত হয়ে পোষক জিনের নিয়ন্ত্রক হিসেবে অভিযোজিত হয়ে নতুন ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে এসব অনুক্রমের ভূমিকা প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়। তিনি বলেন:

ইঁদুরের নিষিক্ত ভ্রুণের বেড়ে ওঠার প্রথম দিকে বিভিন্ন কোষের বিস্তার ও মায়ের জরায়ুতে ভ্রুণের রোপন ঠিক কখন হবে, তা নিয়ন্ত্রণ করে এই ট্রান্সপোজনটি।  গবেষকদল মানুষ সহ  অন্য সাতটি স্তন্যপায়ীর মধ্যেও দেখেছেন ভাইরাস থেকে আসা এই নিয়ন্ত্রক-অনুক্রম একই ধরনের কাজের সাথে যুক্ত। ধারণা করা হচ্ছে, আদিম ভাইরাসের “বুনো” অনুক্রমকে সকল স্তন্যপায়ীর ভ্রুণের বেড়ে ওঠার একটা খুব-গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের জন্য অনেক আগেই জিনোমে “পোষ মানানো” হয়েছে।

ট্রান্সপোজন মুছে ফেললে ইঁদুর-ভ্রুণের বিকাশে দেরি হয়। একই জরায়ুতে স্বাভাবিক ভ্রুণের (WT বা ওয়াইল্ড টাইপ) চেয়ে ট্রান্সপোজন মিউট্যান্ট (Cdk2ap1ΔMT2B2/ ΔMT2B2) ছোট আকার দেখা যাচ্ছে। সূত্র মূল গবেষণাপত্র।

ইঁদুর ও মানুষের জিনোমের মাঝে প্রোটিন-লেখা জিনের ৯৯% মিল — মানুষ ও ইঁদুর খুবই সাদৃশ্যপূর্ণ। তাহলে মানুষ ও ইঁদুরের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? অন্যতম বড় পার্থক্য হলো জিনের নিয়ন্ত্রণে। মানুষ ও ইঁদুরে একই জিন থাকলেও সেগুলো ভিন্ন ভিন্ন ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। জিন নিয়ন্ত্রণের এসব বৈচিত্র্য তৈরির ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে ট্রান্সপোজন, যা আমাদের বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে পার্থক্য কোন জায়গায় তা বোঝার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে।

এ গবেষণার আরেক বিজ্ঞানী, ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের প্রফেসর টিং ওয়াঙ সহমত প্রকাশ করে বলেন,

“এই গবেষণা দেখায় যে বিবর্তন কতোটা অপ্রত্যাশিত পথে কাজ করতে পারে। বহুদিন ধরে ভাবা হতো ট্রান্সপোজন মূলত অপ্রয়োজনীয় জেনেটিক বস্তু, কিন্তু এগুলো তো স্তন্যপায়ীদের জিনোমের একটা বড় অংশ ধরে আছে। অনেকগুলো গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে ট্রান্সপোজন মানব জিনোম বিবর্তনের একটা চালিকাশক্তি। তবে আমার জানামতে আমাদের গবেষণাতেই প্রথম দেখা গেল যে জাঙ্ক-ডিএনএর এক অংশ মুছে ফেলার কারণে প্রাণঘাতী ফেনোটাইপ তৈরি হয়, যা দেখায় যে নির্দিষ্ট ট্রান্সপোজন অপরিহার্য হতে পারে।”

উল্লেখ্য যে, মানুষের প্রায় ৫০% গর্ভপাত নির্ণয় করা হয় না বা কোন জেনেটিক কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। এই গবেষণার সাথে যুক্ত পোস্টডক্টোরাল ফেলো এন্ড্রু মডজেলেস্কি মনে করেন, এসব গর্ভপাতের সাথে ট্রান্সপোজনের কোন সম্পর্ক আছে কি না তা খুঁজে দেখা যেতে পারে।

প্রজাতির উদ্ভব: জাঙ্ক-ডিএনএ সংস্করণ

দ্বিতীয় যে গবেষণার কথা উল্লেখ করবো, সেটা একটি মাত্র গবেষণাপত্রের ভিত্তিতে নয়। ম্যাসাচুসেটেস ইউনিভার্সিটির হোয়াইটহেড ইন্সটিটিউটের ইউকিকো ইয়ামাশাইতার নের্তৃত্বে এক গবেষকদল বেশ কয়েকবছর ধরেই ধারাবাহিক গবেষণাতপত্র প্রকাশ করে যাচ্ছেন এই বিষয়ে। তারা গবেষণা করেন স্যাটেলাইট ডিএনএ নিয়ে। তাদের ধারাবাহিক গবেষণায় উঠে এসেছে যে স্যাটেলাইট ডিএনএ-ও জাঙ্ক বা বাতিল ডিএনএ নয়, বরং তারা কোষে জরুরী ভূমিকা পালন করে। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে স্যাটেলাইট ডিএনএ কোষীয় প্রোটিনের সাথে যুগ্মভাবে কাজ করে কোষের সব ক্রোমোজমকে একটি নিউক্লিয়াসের মধ্যে একসাথে রাখার জন্য।

আমি স্যাটেলাইট ডিএনএ-কে মজা করে “তোতলা-ডিএনএ” বলি। কারণ স্যাটেলাইট ডিএনএ হলো ছোট ডিএনএ অনুক্রম যাদের ধারাবাহিকভাবে পুনরাবৃত্তি হতে থাকে। ইয়ামাশিতার দল সাত-আট বছর আগে যখন স্যাটেলাইট ডিএনএ নিয়ে গবেষণা করা শুরু করেন, তখন তাদের বিবর্তন নিয়ে কোন আগ্রহই ছিলো না। কিন্তু বিজ্ঞানে গবেষণার প্রকৃতিই এমন, যে একটা বিষয় নিয়ে গবেষণা কোন পূর্বধারণা ছাড়া শুরু করলেও এমন একটা সূত্র পাওয়া যায় যা একদমই অপ্রত্যাশিত। সম্প্রতি প্রকাশিত গবেষণাপত্রে তার গবেষকদল প্রস্তাব করেছেন যে, স্যাটেলাইট ডিএনএ সম্ভবত এমনভাবে ক্রোমোজম সংগঠিত করে যে আলাদা প্রজাতির মধ্যে প্রজননের ফলে টেকসই সন্তান অসম্ভব।

চিত্র: স্যাটেলাইট ডিএনএ হলো একই অনুক্রমের বারবার ও পরপর পুনরাবৃত্তি।

বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে স্যাটেলাইট ডিএনএ-র পরিমাণ অসম। এমনকি প্রোটিন কোডিং জিনের মাঝে ৯৮-৯৯% মিল থাকলেও জাংক ডিএনএ-র অংশ ভীষণ আলাদা হতে পারে। জিনোমের সবচেয়ে দ্রুত বিবর্তিত হওয়া অংশ হলো “জাংক”-ডিএনএ। কিন্তু কিছু দিন আগেও ভাবা হতো, “যেহেতু এগুলো জাঙ্ক, তোমার-আমার জাঙ্ক আলাদা হলে কী এমন এসে যায়?” কিন্তু গবেষনা অগ্রগতির সাথে সাথে ইয়ামাশিতা ও তার গবেষকদল সূত্র পেতে শুরু করেন যে এসব পুন‍ঃক্রম হওয়া “বাতিল” ডিএনএ সম্ভবত নতুন প্রজাতী উদ্ভবে (speciation) ভূমিকা রাখতে পারে।

ফলের মাছি ড্রসোফিলা মেলানোগেস্টার একটা নির্দিষ্ট স্যাটেলাইট ডিএনএ যুক্ত হয় এমন একটা প্রোটিন হলো Prod। বিজ্ঞানীরা যখন এই Prod প্রোটিনটা মুছে ফেললেন, দেখা গেল মাছির ক্রোমোজম নিউক্লিয়াসের বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মাইক্রোনিউক্লি নামের ছোট ফুটকির মতো একটা গঠনে। আরো দেখা গেল যে এর ফলে মাছিও মারা পড়ছে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে দেখলেন যে এই নির্দিষ্ট স্যাটেলাইট অনুক্রমটি ড্রসোফিলা মেলানোগেস্টারের নিকটতম আত্মীয়-প্রজাতীর মধ্যে অনুপস্থিত। এই পর্যবেক্ষণ তাদেরকে প্রথম রহস্যের সূত্র দিলো।

যদি স্যাটেলাইট ডিএনএ-র একটা ক্ষুদ্র অংশ মাছির এক প্রজাতীর বেঁচে থাকার জন্য জন্য প্রয়োজনীয় হলেও অন্য প্রজাতীতে অনুপস্থিত হয়ে থাকে, তাহলে হয়তো এই দুই প্রজাতি একই কাজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন স্যাটেলাইট ডিএনএ নিয়ৈ বিবর্তিত হয়েছে। তখন ইয়অমাশিতা ও গবেষকদলের সন্দেহ হলো যে দুইটি প্রজাতির মধ্যে প্রজননের অক্ষমতার পেছনে হয়তো স্যাটেলাইট ডিএনএ-র এই পার্থক্য একটা কারণ। 

স্যাটেলাইট ডিএনএ স্বাভাবিক মাছির ক্রোমোজম একত্রিত রাখে। কিন্তু এটা না থাকলে ক্রোমোজম ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায় ও মাইক্রোনিউক্লিয়াস নামক গঠন দেখা যায়। ছবিসূত্র: মূল গবেষণাপত্র।

মাছির দুই প্রজাতির ডিএনএ স্যাটেলাইট অনুক্রমে পার্থক্য ঠিকমতো বোঝার জন্য প্রথমেই গবেষকরা ফলের মাছির জাতিজনিক বৃক্ষের (ফাইলোজেনেটিক ট্রি) শরণাপন্ন হলেন। তারা ফলের মাছি দুইটি ঘনিষ্ঠ-আত্মীয় বের করলেন, ড্রসোফিলা মেলানোগেস্টার এবং ড্রসোফিলা সিমুলানস। এই দুইটি প্রজাতি দুই থেকে তিন মিলিয়ন বছর পূর্বে আলাদা হয়ে গিয়েছিলো।

এই দুইটি প্রজাতির মধ্যে কৃত্রিমভাবে প্রজনন করা যায়। কিন্তু সাধারণত সে বংশধররা হয় মারা যায় অথবা তারা নতুন প্রজননে অক্ষম হয়ে থাকে। যখন তারা এই দুই প্রজাতির সংকর (হাইব্রিড) বংশধরের দেহকলা পরীক্ষা করলেন, তখন খেয়াল করলেন এদের ফেনোটাইপ একদম ঐ আগে উল্লিখিত স্যাটেলাইট সিকোয়েন্স মুছে ফেলা মাছির কোষের মতো। এদের ক্রোমোজমও নিউক্লিয়াসের বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

মজার ব্যপার হলো, বিজ্ঞানীরা দুই প্রজাতী মাছি-পিতামাতার নির্দিষ্ট কিছু জিনে মিউটেশন ঘটিয়ে স্বাস্থ্যবান হাইব্রিড মাছির বংশধর তৈরি করতে পারলেন। এসব জিনের নাম দেয়া হলো হাইব্রিড ইনকম্প্যাটিবিলিটি জিন। দেখা গেল এই জিনগুলো স্যাটেলাইট ডিএনএ-র ওখানেই অবস্থিত। আরো গবেষণায় দেখা গেলো এই জিনগুলো হাইব্রিডদের ক্রোমোজম প্যাকেজ করার প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত। 

তাদের গবেষণা থেকে বোঝা গেল, যেহেতু স্যাটেলাইট ডিএনএ-তে বেশ দ্রুত মিউটেশন হয়, স্যাটেলাইট ডিএনএতে যেসব প্রোটিন যুক্ত হয়ে ক্রোমোজমকে একত্রিত রাখবে সে প্রোটিনগুলোকেও দ্রুত বিবর্তিত হতে হবে। ফলশ্রুতিতে, উভয় প্রজাতীই নিজস্ব “কৌশল” তৈরি করে স্যাটেলাইট ডিএনএ-র সাথে কাজ করার জন্য। যখন দুইটি প্রজাতির একই কাজের কৌশল ভিন্ন হয়ে যায়, তখন উদ্ভব হয় সংঘাত, যা কি না ক্রোমোজমকে নিউক্লিয়াসের বাইরে ছড়িয়ে ফেলে।

জাঙ্ক ডিএনএ কি মানব মস্তিষ্ককে অনন্য বানায়?

শিম্পাঞ্জী বিবর্তনীয় দিক দিয়ে মানুষের সবচেয়ে কাছের আত্মীয় (পড়ুন আত্মীয়তার প্রমাণাদি / মাহাথির তুষার) । মানুষ ও শিম্পাঞ্জীর ডিএনএ-র মাঝে মিল ৯৮.৮%। এত মিল থাকা সত্ত্বেও মানুষ ও শিম্পাঞ্জির মস্তিষ্কে পার্থক্য দৃষ্টকটু। আমাদের মস্তিষ্ক শরীরের তুলনায় যতটুকু প্রয়োজন তার চাইতে সাতগুণ বেশি বড়, যেখানে শিম্পাঞ্জীর মস্তিষ্ক শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র দুইগুণ বড় (পড়ুন আমরা কীভাবে অন্যদের থেকে বড় মস্তিষ্ক পেলাম / সুজয় কুমার দাস)।

তৃতীয় গবেষণাটা হয়েছে সুইডেনে। লান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ঠিক কোন ডিএনএ মানুষ আর শিম্পাঞ্জির মস্তিষ্ককে আলাদা বানায় তা খুঁজতে দেখেন উত্তর নিহিত আছে ডিএনএ-র জিন-বিহীন অংশে।

তবে তারা জ্যান্ত মানুষ বা শিম্পাঞ্জী নিয়ে কাজ করেন না। বরং তারা  গবেষণা করেন স্টেম সেল নিয়ে। স্টেম কোষ হলো বিশেষ ধরনের কোষ যেখান থেকে শরীরে অন্য সকল বিশেষায়িত কোষ তৈরি হয় (পড়ুন আগামীর চিকিৎসার অস্ত্র: স্টেম সেল / এফ, এম, আশিক মাহমুদ )। এই স্টেমকোষগুলো মূলত ত্বকের কোষ থেকে রিপ্রোগ্রাম করে বানানো। তারপর এদেরকে ব্রেন কোষ হিসেবে বিকশিত করা হয় এবং এই প্রক্রিয়াটা পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই গবেষকদলের নেতৃত্বে আছেন প্রফেসর জ্যাকবসন। তিনি অন্যান্য সহকর্মীদের নিয়ে স্টেম কোষ থেকে মানুষ ও শিম্পাঞ্জি মস্তিষ্কের কোষ তৈরি করে এদের মধ্যে পার্থক্য খোঁজা শুরু করেন।

দেখা গেল, মানুষ ও শিম্পাঞ্জী তাদের ডিএনএ-র একটা নির্দিষ্ট অংশ আলাদা প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করে। এই অংশটা আবার মস্তিষ্কের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই অংশটা হলো ডিএনএ-র গাঠনিক প্রকরণ (স্ট্রাকচারাল ভ্যারিয়েন্ট) যা মূলত বেশ লম্বা পুনরাবৃত্তিমূলক ডিএনএ। এটাকে পূর্বে “বাতিল ডিএনএ” বলে গণ্য করা হতো, ভাবা হতো এর কোন কাজ নেই। 

“আগে গবেষকরা ডিএনএর প্রোটিন তৈরি করা জিন অংশ নিয়ে গবেষণা করতেন যেটা আমাদের মোট ডিএনএ-র মাত্র ২%। তারা প্রোটিনের মাঝে পার্থক্য খুঁজে বের করার চেষ্টা চালাতেন। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে যে পার্থক্য নিহিত আছে প্রোটিন কোডিং করে না এমন জিনের মধ্যে”।

প্রফেসর জ্যাকবসন, লান্ড বিশ্ববিদ্যালয়, সুইডেন

এই গবেষণা অনুসারে বোঝা যাচ্ছে যে মানুষের মস্তিষ্কের বিবর্তন ও জেনেটিক প্রক্রিয়া সম্ভবত আগে যা ভাবা হয়েছিলো তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। এই গবেষণা বলছে মস্তিষ্ক গঠন প্রক্রিয়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ৯৮% “বাতিল” ডিএনএ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়। 

উপসংহার

জিনোম বায়োলজির (জিনোমের জীববিজ্ঞান) জন্য বর্তমান সময়টা খুবই উত্তেজনাময়। নতুন সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন দীর্ঘ রিড সিকোয়েন্সিং করে পূর্ণাঙ্গ জিনোম অনুক্রম সহজেই তৈরি করা যাচ্ছে। পাশাপাশি সিকোয়েন্সিং এর খরচ কমার সাথে সাথে অনেকগুলো জিনোম সিকোয়েন্সিং করে তুলনা করা তেমন কঠিন কিছু না। এসব প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে আমরা জিনোমের জীববিজ্ঞান নিয়ে এমন সব প্রশ্ন করতে পারছি, যেটা আগে কখনো সম্ভব ছিলো না (পড়ুন: পৃথিবীর সব জিনোম-তথ্য নিয়ে আমরা যা করতে পারি / আরাফাত রহমান)। জিনোম জীববিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণায় তথাকথিত “জাঙ্ক ডিএনএ” এর কাজ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। আগামীর গবেষণা থেকে আরো তথ্যপ্রমাণ পেলে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে। 

গবেষণাপ্রবন্ধের তালিকা:

আরাফাত রহমান
অণুজীববিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড-এ পিএইচডি গবেষক। যুক্ত আছি বায়ো-বায়ো-১ ও অনুসন্ধিৎসু চক্র বিজ্ঞান সংগঠনের সঙ্গে। আমার প্রকাশিত বই "মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৫) ও "প্রাণের বিজ্ঞান" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৭)।