ওলবার প্যারাডক্স এবং কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন

পৃথিবীর রাতের আকাশ অন্ধকার থাকে কেন? মহাবিশ্বের বিলিয়ন ট্রিলিয়ন নক্ষত্র ছড়িয়ে আছে পৃথিবীর সবদিকে। সেগুলো থেকে আসা আলোতে দিনে ও রাতে পৃথিবী সব সময় আলোকিত থাকার কথা। তাহলে রাতের আকাশ অন্ধকার থাকার রহস্যটা কী?

ওলবার প্যারাডক্সের সূত্রপাত জার্মান বিজ্ঞানী হেনরিক উইলহেম ওলবারের হাত ধরে ১৮২৩ সালে। এটি আসলে খুব সাধারণ নিরীহ একটি প্রশ্ন। আর সেটি হল যে,

রাতের আকাশ অন্ধকার কেন?

অত্যন্ত সরল এই প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানীদের অনেক আগে থেকেই জানা ছিল। ঘূর্ণনশীল পৃথিবীর যে পৃষ্ঠ দিনের বেলায় সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে, সেটাই রাতের বেলাতে বিপরীত দিকে চলে যায়। সূর্যের আলোর অনুপস্থিতে আকাশ অন্ধকার দেখায়। আর দিনের বেলায় সূর্যের তীব্রতার দরুন দেখতে না পাওয়া নক্ষত্রগুলো রাতের বেলাতে দৃশ্যমান হয়।

এরপর দৃশ্যপটে এলেন ওলবার। গোটা বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করলেন একটু ভিন্নভাবে। তার সময়ে সমগ্র মহাবিশ্বকে অসীম হিসেবে বিবেচনা করা হত। অসীম মহাবিশ্বে নক্ষত্রের সংখ্যাও অসীম। ওলবার যুক্তি দেখালেন যে, যদি সত্যিই মহাবিশ্বে অসীম সংখ্যক নক্ষত্র থাকে, তাহলে পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে রাতের আকাশের দিকে তাকালে এর প্রতিটি বিন্দুতে অবশ্যই একটি নক্ষত্রের অস্তিত্ব থাকবে। সেই নক্ষত্রগুলোর দূরত্ব পৃথিবী থেকে কম বেশি হতে পারে। কোনটি পৃথিবীর কাছে, আবার কোনটি অনেক অনেক দূরে। তবে দূরত্ব যাই হোক না কেন, আকাশের যে কোন দিকে তাকালেই প্রতি বিন্দুতে অবশ্যই একটি করে নক্ষত্রের অস্তিত্ব থাকার কথা। আর এইসব অগনিত নক্ষত্র থেকে আসা আলোতে পৃথিবীর রাতের আকাশ কখনই অন্ধকার হওয়ার কথা নয়।

পৃথিবী থেকে রাতের আকাশ যেমন দেখতে পাওয়ার কথা (ডানে)

ওলবার প্যারাডক্স

স্বাভাবিকভাবেই অনেক জ্যোতির্বিদই ওলবারের যুক্তি মানতে চাইলেন না। তারা পাল্টা যুক্তি দিলেন যে, হয়ত নক্ষত্রগুলো অনেক বেশি দূরত্বে অবস্থান করার কারণে তাদের থেকে আসা আলোর তীব্রতা অনেক কমে যায়। কারণ আলোর তীব্রতা ($I$) দূরত্বের ($R$) বর্গের ব্যস্তানুপাতে পরিবর্তিত হয় ($I \propto 1/R^2$) । আর এই কারনেই রাতের আকাশের প্রতিটি বিন্দুতে নক্ষত্রের অস্তিত্ব থাকার পরও আকাশ অন্ধকার দেখায়।

আপাতদৃষ্টিতে অকাট্য যুক্তি। কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্র নন ওলবার। তিনি রীতিমত অঙ্ক কষে প্রমাণ করলেন যে, তাদের যুক্তি ভুল। কি অবাক হচ্ছেন? আসুন ব্যাখ্যা করে দেখাই।

ওলবারের গাণিতিক ব্যাখ্যা

উপরের চিত্রের মাঝের বিন্দুতে পৃথিবীর অবস্থান। এবার পৃথিবীকে কেন্দ্রে রেখে মহাশূন্যতে একটি সুবিশাল কল্পনা করা যাক। ধরি, সেই গোলকের অভ্যন্তরে অসংখ্য গ্যালাক্সির অবস্থান। গোলকটির ব্যাসার্ধ $R$ এবং পুরত্ব $ΔR$। এখানে, $ΔR$ এর মান $R$ এর তুলনায় অত্যন্ত ক্ষুদ্র। গোলকের পৃষ্ঠে অবস্থিত গ্যালাক্সিগুলোর দূরত্ব পৃথিবী থেকে সবচেয়ে বেশি (শুধুমাত্র গোলকের অভ্যন্তরের গ্যালাক্সিগুলোকে বিবেচনায় এনে) ।

এবার খুব সাধারণ সূত্র ব্যবহার করে গোলকের আয়তন বের করা সম্ভব। আর তা হল গোলকের পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল এবং এর পুরত্বের গুনফলের সমান। অর্থাৎ,

$V = 4 \pi R^2 ΔR$

যদি গোলকের প্রতি একক আয়তনে $N$ সংখ্যক গ্যালাক্সি থাকে, তাহলে $V$ আয়তনে মোট গ্যালাক্সির সংখ্যা হবে,

$V\times N = 4 \pi N R^2 ΔR$

এখন গোলকের অভ্যন্তরে অবস্থিত সকল গ্যালাক্সির সম্মিলিত তীব্রতার সাথে দূরত্বের সম্পর্ক হবে নিম্নরূপঃ

$I \propto \frac{4 \pi NR^2 ΔR}{R^2}$

বা, $I \propto 4 \pi N ΔR$

উপরের সম্পর্কটির দিকে মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করুন। এখনে দূরত্ব $R$ এর কোন অস্তিত্ব নেই। অস্তিত্ব আছে $ΔR$ এর। যা দিয়ে গোলকের পুরত্ব বোঝায়, দূরত্ব নয়। অর্থাৎ, সামগ্রিকভাবে ঐ গোলকের অভ্যন্তরে থাকা গ্যালাক্সিগুলোর সম্মিলিত তীব্রতা দূরত্বের উপর নির্ভর করে না। বরং নির্ভর করে গ্যালাক্সির সংখার উপর। কি এখন বুঝতে পারেন নি? এবার উপরের ডান পাশের ছবিটি দেখুন।

এই ছবিতে আগের গোলকের সাথে ছোট নতুন একটি গোলক আঁকা হয়েছে যার ব্যাসার্ধ পূর্বের চেয়ে কম। স্বাভাবিকভাবেই ছোট গোলকে গ্যালাক্সির সংখ্যা কম হবে বড় গোলকের তুলনায়। কিন্তু পৃথিবী থেকে এদের গড় দূরত্ব কম হবে। তাই ছোট গোলকের ক্ষেত্রে গ্যালাক্সির সংখ্যা কম হলেও এদের সম্মিলিত তীব্রতা হবে বড় গোলকের মতই। আবার, বড় গোলকের গ্যালাক্সি সংখ্যা বেশি হলেও পৃথিবী থেকে এদের গড় দূরত্ব বেশি হওয়ায় তীব্রতার কোন তারতম্য হবে না। গড় দূরত্ব এবং গ্যালাক্সির সংখ্যা একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। এভাবেই ওলবারের পাল্টা যুক্তি গাণিতিকভাবে সঠিক প্রমাণিত হয়। অমিমাংসিতই থেকে যায় রাতের আকাশ অন্ধকার হবার রহস্য।

প্রিয় পাঠক, আশা করি বুঝতে পারছেন যে, শুনতে অতি সাধারণ প্রশ্নটি মোটেই সাধারণ নয়।


স্যার আইজ্যাক নিউটনের কাছে মহাবিশ্ব ছিল স্থির। সেই মহাবিশ্ব সবদিকেই একই রকম। অর্থাৎ, মহাবিশ্বের সমগ্র ভর সুষমভাবে বন্টিত রয়েছে। উনিশ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত অন্যান্য বিজ্ঞানীরাও তাই বিশ্বাস করতেন। এমনকি আলবার্ট আইনস্টাইনও। ১৯১৫ সালে আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের মাধ্যমে বড় পরিসরে গ্র্যাভিটিকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হন। তিনি বুঝতে পারেন যে, এই তত্ত্ব ব্যবহার করে নিউটনের মহাবিশ্বের মডেলের সঠিকটা যাচাই করা সম্ভব। পাশাপাশি কেমন ধরণের মহাবিশ্বের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব হতে পারে, সেটাও গাণিতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে। আইনস্টাইন ভর, স্থান এবং সময়ের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনকারী দশটি জটিল সমীকরণ আবিষ্কার করেন। এদেরকে এক সাথে ফিল্ড সমীকরণ নামে ডাকা হয়। আইনস্টাইন প্রথমে এই সমীকরণগুলোর একটি সমাধান বের করেন। সেটি নির্দেশ করে যে, আমাদের মহাবিশ্ব ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। তবে এই সমাধানটিকে মানতে পারেন নি তিনি। তাই নতুন একটি রাশির উদ্ভাবন করেন তিনি। এর নাম কসমোলজিক্যাল কন্সট্যান্ট। যা কিনা সংকোচনশীল মহাবিশ্বকে স্থির মহাবিশ্বে পরিণত করে।

পরবর্তীতে ১৯২২ সালে রাশিয়ান গণিতবিদ আলেকজেন্ডার ফ্রাইডম্যান ভিন্নভাবে ফিল্ড সমীকরণগুলো সমাধানের চেষ্টা চালান। তার গবেষণায় সমীকরণগুলো কয়েকটি সমাধান বের হয়ে আসে। যেগুলো নির্দেশ করে যে, মহাবিশ্ব সংকোচনশীল, প্রসারণশীল বা স্থির – এই তিন ধরণেরই হতে পারে। ফ্রাইডম্যানই হলেন প্রথম ব্যক্তি যে কিনা সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের ধারণা গাণিতিকভাবে সামনে আনেন। প্রথমদিকে আইনস্টাইন ফ্রাইডম্যানের সমাধান নিয়ে বেশ সন্ধিহান ছিলেন। তবে ছয় মাস ধরে যাচাই করে তিনি নিশ্চিত হন যে, ফ্রাইডম্যানের হিসাব নিকাশে কোন ভুল নেই। এর দুই বছর পরে দুর্ভাগ্যজনকভাবে মৃত্যু এসে ফ্রাইডম্যানের গবেষণা থামিয়ে দেয়। তবে এরপরই দৃশ্যপটে এসে হাজির হন জর্জ লেমিটার।

রাতের আকাশ অন্ধকার কেন?

লেমিটারের জন্ম ১৮৯৪ সালে বেলজিয়ামে। তার আগ্রহের মূলে ছিল বিজ্ঞান ও গনিত। ১৯২০ সালে অনুষ্ঠিত “দ্যা গ্রেট ডিবেট” তাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। সে সময়ে তিনি কর্মরত ছিলেরন আমেরিকার একটি প্রতিষ্ঠানে। সেখানেই তিনি ভেস্টো স্লাইফার এবং এডুইন হাবলের গবেষণা সম্পর্কে জানতে পারেন। পরবর্তীতে আইনস্টাইনের ফিল্ড ইকুয়েশনগুলো সম্পর্কে জানতে পারেন এবং সেগুলোর সমাধানের চেষ্টা শুরু করেন। তিনি সম্ভাব্য একটি সমাধান খুঁজে পান যা কিনা কেবলমাত্র মহাবিশ্বের সম্প্রসারণশীলতাকেই নির্দেশ করে।

১৯২৭ সালে লেমিটার তার আইডিয়াগুলো নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। যাতে তিনি প্রস্তাব করেন যে, সমগ্র মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। গ্যালাক্সিগুলো প্রতিনিয়ত দূরে সরে যাচ্ছে। যেই গ্যালাক্সির অবস্থান পৃথিবী থেকে যত দুরে, সেটির দূরে সরে যাওয়ার হার তত বেশি। লেমিটারের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছিল বেলজিয়ামের একটি অখ্যাত জার্নালে। স্বাভাবিকভাবেই সেটি খুব একটা সাড়া ফেলতে পারে নি। তবে হাল ছাড়লেন না লেমিটার। যোগাযোগ করলেন আইনস্টাইনের সাথে। তুলে ধরলেন প্রসারণশীল মহাবিশ্বের ধারণা। 

আইনস্টাইন বেশ আগ্রহ নিয়ে শুনলেন তার তত্ত্ব। পাশাপাশি তাকে ফ্রাইডম্যানের গবেষণার সাথেও পরিচয় করিয়ে দেন। পরবর্তীকালে বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ আর্থার এডিংটন ভূয়সী প্রশংসা করেন লেমিটারের তত্ত্বের। ১৯২৯ সালে এডুইন হাবল ডপলার ইফেক্টের মাধ্যমে গ্যালাক্সিগুলোর দূরে সরে যাওয়াকে নিশ্চিত করেন। যা কিনা প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন করে সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বকে। বহু বছর ধরে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণশীলতা আবিষ্কারের কৃতিত্ব শুধুমাত্র হাবলকেই দেয়া হত। কিন্তু আসলে ফ্রাইডম্যান এবং লেমিটার উভয়েই এই আবিষ্কারের কৃতিত্বের সমান অংশীদার।

জর্জ লেমিটারের তত্ত্বের আরেকটি উল্লেখযোগ্য তাৎপর্য রয়েছে। মহাবিশ্বের শুরু কিভাবে হয়েছে সে ব্যাপারেও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় এর মাধ্যমে। প্রতিনিয়ত যদি মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হয়, তাহলে আমরা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি যে, মহাবিশ্বের সকল উপাদানগুলো (যেমনঃ গ্যালাক্সি) এক সময় পরস্পরের বেশ কাছাকাছি ছিল। যতই অতীতে যাওয়া যাবে, গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যকার দূরত্ব ততই কমে আসবে। ১৯৩১ সালে লেমিটার প্রস্তাব করেন যে, একদম শুরুতে মহাবিশ্বের সকল ভর ও শক্তি একটি বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত ছিল। তিনি এর নাম দেন “Primeval atom” । এর সম্ভাব্য আকার ছিল সূর্যের আকারের ৩০ গুণ। এই বৃহৎ পরমাণুতে একটি বিস্ফোরণের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হয় মহাবিশ্বের। সৃষ্টি হয় স্থান এবং সময়।

মহাবিশ্বের সূচনার লেমিটারের মডেল

জর্জ লেমিটারের প্রস্তাবনাটি কেউই প্রথমে ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারেন নি। স্বয়ং আইনস্টাইন এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তবে তিনি একে পুরোপুরি বাতিল করে দেন নি। ১৯৩৩ সালে জানুয়ারিতে তিনি লেমিটারের সাথে একসাথে ক্যালিফোর্নিয়াতে যান সেমিনারে অংশ নিতে। সেখানে তাদের মাঝে দীর্ঘ আলোচনা হয় তত্ত্বটি নিয়ে। পরিশেষে আইনস্টাইন লেমিটারের তত্ত্বের সাথে একমত প্রকাশ করেন। আইনস্টাইন একে আখ্যা দেন তার শোনা সৃষ্টি তত্ত্বের সবচেয়ে সুন্দর এবং ভারসাম্যপুর্ণ ব্যাখ্যা হিসেবে।  

১৯৪০ সালে রাশিয়ান বংশোদ্ভুত আমেরিকান পদার্থবিদ জর্জ গ্যামাও এবং তার সহকর্মীরা লেমিটারের তত্ত্বের খুঁটিনাটি নিয়ে গবেষণা করা শুরু করেন। তারা দেখান যে, বিস্ফোরণ পরবর্তী অত্যন্ত উত্তপ্ত মহাবিশ্ব বিবর্তনের মাধ্যমে আজকের অবস্থায় রূপান্তর হওয়া সম্ভব। এভাবেই শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে যায় লেমিটারের তত্ত্ব। পরবর্তীতে এই তত্ত্বটি পরিচিতি পায় “Big Bang Theory” নামে। নামকরণটি করেন ব্রিটিশ জ্যোতির্বিদ ফ্রেড হোয়েল ১৯৪৯ সালে।


প্রিয় পাঠক, শুরুতেই আমরা ওলবার প্যারাডক্স নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলাম। দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাটি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ভুগিয়েছে। লেমিটারের তত্ত্বের মাধ্যমে সমাধান পাওয়া সম্ভব হয়। চলুন দেখে আসি কীভাবে।

দৃশ্যমান আলোর কম্পাঙ্কের পাল্লা $৪\times ১০^{১৪}$ থেকে $৭.৫ \times ১০^{১৪}$ হার্জ। এই পাল্লার মধ্যে অবস্থিত তড়িৎ চৌম্বক বিকিরণগুলোকে আমরা বিভিন্ন রঙের আলো হিসেবে দেখতে পাই। বিকিরণের কম্পাঙ্ক এই পাল্লার চেয়ে কম হলে সেটি হয় অবলোহিত রশ্মি (ইনফ্রারেড) । আর বেড়ে গেলে তা হয় অতি বেগুনি রশ্মি। এদের উভয়েই খালি চোখে অদৃশ্য।

লেমিটারের তত্ত্ব অনুসারে মহাবিশ্ব সম্প্রসারণশীল। এর মধ্যে থাকা গতিশীল গ্যালাক্সিগুলো রেড শিফট বা ব্লু শিফট প্রদর্শন করে। অর্থাৎ, ডপলার ইফেক্টের কারণে এদের থেকে নির্গত হওয়া বিকিরণের কম্পাঙ্কের পরিবর্তন হয়। তাই প্রাথমিকভাবে গ্যালাক্সিগুলো থেকে আসা বিকিরণ দৃশ্যমান আলোর কপাঙ্কের পাল্লার মধ্যে থাকলেও, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীতে আসতে আসতে পরিবর্তিত হয়ে অন্য তড়িৎ চৌম্বক তরঙ্গের কম্পাঙ্কের পাল্লাতে চলে যেতে পারে। তখন আর এই বিকিরণগুলোকে খালি চোখে দেখা যাবে না। তাই অগনিত গ্যালাক্সির অগণিত নক্ষত্র থেকে প্রতিনিয়ত আলো আসার পরও রাতের আকাশ অন্ধকার দেখায়। আর এভাবেই সমাধান পাওয়া যায় ওলবার প্যারাডক্সের।

ওলবার প্যারাডক্সের আরেকটি সমাধান রয়েছে। সেটিও লেমিটারের তত্ত্ব থেকেই আসে। আমরা জানি যে, মহাবিশ্বের কোন কিছুই আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলতে পারে না।তবে এর একটি ব্যতিক্রম আছে। যা কিনা আমাদের অনেকেরই জানা নেই। সেটি হল যে, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের গতিবেগ এই সীমার আওতামুক্ত। অর্থাৎ, মহাবিশ্ব আলোর চেয়ে বেশি বেগে সম্প্রসারিত হতে পারে। এতে করে যেসব গ্যালাক্সি আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলমান, সেগুলো থেকে বিকিরিত আলো কখনই আমাদের পৃথিবীতে এসে পৌঁছাবে না। তাই সেগুলোও আমাদের কাছে দৃশ্যমান হবে না। এটাও রাতের আকাশ অন্ধকার হবার আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। এক অর্থে, রাতের অন্ধকার আকাশ মহাবিশ্ব সম্প্রসারণের প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।

এবার আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করা যাক। মহাবিশ্বের শুরু হয়েছিল খুব সম্ভবত ১৩.৭ বিলিয়ন বছর আগে। লেমিটারের তত্ত্ব অনুসারে বিস্ফোরণের আগে মহাবিশ্বের আকার ছিল সূর্যের প্রায় ৩০ গুণ। বর্তমানে এই তথ্য ভুল প্রমাণিত হয়েছে। সমগ্র মহাবিশ্বের ভর ও শক্তি কেন্দ্রীভূত ছিল একটি অতি ক্ষুদ্র বিন্দুতে। যার নাম সিঙ্গুলারিটি। এর ঘনত্ব ছিল অকল্পনীয়। বিস্ফোরণের পর মহাবিশ্বর আকার ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। ৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে সৃষ্টি হয় আমাদের সৌরজগত। কাছাকাছি সময়ে তৈরি হয় পৃথিবী। প্রথমদিকে যখন মহাবিশ্বর আকার তুলনামূলক ছোট ছিল তখন কিন্তু রাতের আকাশ অন্ধকার ছিল না। রাতের আকাশ সম্পূর্ণ আলোকিত ছিল। গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যে দূরত্ব কম থাকার কারণে এদের থেকে আসা বিকিরণগুলো বিচরন করত সমগ্র মহাবিশ্বে।  তাহলে সেই বিকিরণগুলো এখন কোথায় গেল? মহাবিশ্বের বাইরে তো আর যাওয়ার সুযোগ নেই।

না, সেগুলো হারিয়ে যায় নি। শুরুতে এই সব বিকিরণের কম্পাঙ্ক ছিল দৃশ্যমান আলোর সীমার মধ্যে। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে ততই বিকিরণগুলোর কম্পাঙ্কের পরিবর্তন হয়েছে। কম্পাঙ্ক কমতে কমতে ইনফ্রারেড সীমা ছাড়িয়ে বর্তমানে অবস্থান করছে মাইক্রোওয়েভ অঞ্চলে। এরা বর্তমানে কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন (CMB) নামে পরিচিত। মহাবিশ্বের সর্বত্র এদের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। পৃথিবী থেকে যে দিকেই তাকানো যাক না কেন, সবদিকেই এদের পাওয়া যায়। বিকিরণগুলোর শক্তি খুবই কম। তাই মানবদেহের উপরে সরাসরি কোন প্রভাব ফেলে না এরা। বিগ ব্যাং থিওরীর পক্ষে অত্যন্ত শক্ত প্রমাণ এই বিকিরণগুলো। 

সূত্রঃ
দ্য অ্যাস্ট্রোনমি বুক; বিগ আইডিয়াস সিম্পলি এক্সপ্লেইন্ড

ইশতিয়াক হোসেন চৌধুরী
ইশতিয়াক হোসেন চৌধুরীর জন্ম ৭ মে, ১৯৯২, ঢাকায়। গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরে। বাবা হোসাইন আহমেদ চৌধুরী ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা এবং মা তাসলিমা বেগম গৃহিণী। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট। মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশুনা করেছে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে এবং উচ্চ মাধ্যমিকে ঢাকা কলেজে। স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে। পরবর্তীতে রাশিয়ার রোসাটম টেকনিক্যাল একাডেমি থেকে সম্পন্ন করেছেন রেডিয়েশন সেফটির উপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ। বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন রাষ্ট্রয়ত্ত্ব নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডে (রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিচালনাকারী প্রতিস্থান) সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে। কর্মসূত্রে বাস করছেন ঈশ্বরদীতে। তবে সুযোগ পেলেই চলে আসেন প্রাণের শহর ঢাকাতে। যেখানে কেটেছে জীবনের অধিকাংশ সময়। লেখকের ভালো লাগার অনেকটা জুড়েই রয়েছে বই পড়া, লেখালেখি করা এবং ফুটবল খেলা। তবে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পান নতুন নতুন জিনিস শিখতে এবং অন্যকে শোখাতে। স্বপ্ন দেখেন বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান বইয়ের স্বয়ংসম্পূর্ণতার। পাঠকের যে কোন পরামর্শ তার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাকে ইমেইল করতে পারেন এই ঠিকানায়ঃ ishtiak1075@gmail.com