ভেনেরা মিশন: সোভিয়েত ইউনিয়নের শুক্রগ্রহ জয় করার প্রচেষ্টা

ভেনেরা মিশন হল শুক্র গ্রহে পাঠানো সিরিজ মিশন। এখন আমরা যেমন মঙ্গলগ্রহ নিয়ে লাফালাফি করি, প্রথম দিকে মানুষের মাতামাতি ছিল শুক্রগ্রহ নিয়ে।

মহাকাশ বিজয় নিয়ে যুদ্ধ কম হয়নি। এখনও হচ্ছে তবে এই যুদ্ধের শুরু হয় স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন। তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন আর আমেরিকার মধ্যে চলছিল কে কত আগে মহাকাশে নিজের আধিপত্য বিস্তার করবে। এতে অবশ্য দিনশেষে লাভ হয়েছে বিজ্ঞানেরই। 

মহাকাশ বিজয়ের প্রথম দিকে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন কারণ মহাকাশে প্রথম উপগ্রহ পাঠানো বা মানুষ পাঠানোর কাজগুলো তারাই প্রথম করেছিল। তারাই প্রথম পৃথিবীর বাইরে কোনো গ্রহে মিশন পরিচালনা করে এবং তারাই প্রথম পৃথিবী ব্যতিত অন্য কোন গ্রহের বায়ুমন্ডল স্পর্শ করে।  ভেনেরা মিশন সেই সময়ে চলা সিরিজ মিশন। ভেনেরা একটি রাশিয়ান শব্দ যার অর্থ Venus যাকে আমরা বলি শুক্রগ্রহ।

ভেনেরা মিশন হলো শুধু শুক্র গ্রহে পাঠানো সিরিজ মিশন। কারন এখন আমরা যেমন মঙ্গল বা Mars নিয়ে লাফালাফি করি, কিন্তু প্রথম দিকে মানুষের মাতামাতি ছিল শুক্রগ্রহ নিয়ে। 

শুক্রগ্রহে এখন পর্যন্ত যতগুলো মহাকাশযান পাঠানো হয়েছে তার মধ্যে এক তৃতীয়াংশ সোভিয়েত ইউনিয়নের পাঠানো। ভেনেরা মিশন চলেছিল ১৯৬১ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত। সে মিশনে মোট ২৮ টি রকেট উৎক্ষেপণ করা হয়, যার মধ্যে ১৩ টি শুক্রগ্রহের বায়ুমন্ডলে ঢুকতে পারে এবং ৮ টি শুক্রগ্রহের মাটি স্পর্শও করেছিল।

প্রথম দিকের এই সকল মিশন ছিল আসলে দুঃসাহসী মিশন। কারন সেই সময় একটা গ্রহতে আকাশযান পাঠানো কম কঠিন ছিল না। কিন্তু এর বেশির ভাগই আমরা আজ ভুলে গিয়েছি। 

এই লেখায় আমি পাঠককে সবগুলো মিশন সম্পর্কেই ধারনা দেব।

ভেনেরা-১ ও ভেনেরা-২ 

ভেনেরা-১ উৎক্ষেপণ করা হয় ১২ ফেব্রুয়ারী ১৯৬১ সালে। কিন্তু শুক্রগ্রহের যাত্রাপথেই এটির সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

ভেনেরা-২ কে উৎক্ষেপণ করা হয় ১২ নভেম্বর ১৯৬৫ সালে। এটি সফল ভাবে শুক্রগ্রহকে প্রদক্ষিণ করলেও কোনো তথ্য পৃথিবীতে পাঠাতে ব্যর্থ হয়। 

চিত্রঃ ভেনেরা -২। সূত্রঃ নাসা

ভেনেরা-৩

ভেনেরা-৩ কে উৎক্ষেপণ করা হয় ভেনেরা-২ উৎক্ষেপণের মাত্র ৪ দিন পর ১৬ই নভেম্বর ১৯৬৫। এটি পাঠানোর লক্ষ্য ছিলো শুক্রগ্রহের বায়ুমন্ডলে প্রবেশ করানো কিন্তু এটি ব্যর্থ হয়৷ এটি ১লা মার্চ ১৯৬৬ সালে শুক্রের পৃষ্ঠে ধ্বংস হয় এবং এটিই প্রথম কোনো মহাকাশযান যা অন্য গ্রহের পৃষ্ঠে ধ্বংস হয়।

চিত্রঃ ভেনেরা-৩ সূত্রঃ Bonhams

ভেনেরা-৪ 

এটি উৎক্ষেপণ করা হয় ১২ই জুন ১৯৬৭ সালে। এটি ১৮ অক্টোবর ১৯৬৭ সালে প্রথম কোনো মহাকাশযান, যা শুক্রের বায়ুমন্ডল থেকে তথ্য পাঠাতে সক্ষম হয়। এর থেকে পাওয়া তথ্যেই প্রথম বোঝা যায় শুক্রগ্রহের বায়ুমন্ডলের অধিকাংশই কার্বন-ডাই-অক্সাইড এবং এতে সামান্য পরিমাণ নাইট্রোজেন, অক্সিজেন ও জলীয় বাষ্প বিদ্যমান।

চিত্রঃ শিল্পীর চোখে ভেনেরা-৪

ভেনেরা-৫ ও ভেনেরা-৬

ভেনেরা-৫ ও ভেনেরা-৬, ১৯৬৯ সালের জানুয়ারীতে ৬ দিনের ব্যবধানে উৎক্ষেপণ করা হয়। মহাকাশযান দুটিতে একটি করে ক্যাপসুল ছিল, যাতে শুক্রগ্রহের বায়ুমন্ডল পরীক্ষা করার নানা যন্ত্রপাতি ছিল। কিন্তু মহাকাশযান দুটি শুক্রের বায়ুমন্ডলের চাপে ধ্বংস হওয়ার আগে মাত্র ৫০ মিনিট কাজ করতে পেরেছিল।

ভেনেরা-৭ 

ভেনেরা- ৭ কে উৎক্ষেপণ করা হয় ১৫ই ডিসেম্বর ১৯৭০ সালে। এটিই প্রথম কোনো মহাকাশযান যা অন্য গ্রহের মাটি সফলভাবে স্পর্শ করে এবং সেখান থেকে তথ্যও প্রেরণ করে। ভেনেরা-৭ শুক্রগ্রহের তাপমাত্রা পরিমাপ করে যা ছিলো ৪৭৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৮৮৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট)। এটি মাত্র ২৮ মিনিট চালু ছিলো পরে শুক্রগ্রহের চাপে ও তাপে ধ্বংস হয়ে যায়।

চিত্রঃ শিল্পীর চোখে শুক্রের মাটিতে ভেনেরা-৭

ভেনেরা-৮ 

২২ জুলাই ১৯৭২ সালে ভেনেরা-৮ উৎক্ষেপিত হয় এবং সফলভাবে শুক্রের মাটি স্পর্শ করে এবং সম্পূর্ণ ৫০ মিনিট কাজ করে৷ এটি শুক্রের মাটিতে কতোখানি সূর্যের আলো পরে সেটি পরিমাপ করে এবং ভেনেরা-৭ এর দেয়া তথ্যগুলো পুনরায় যাচাই করে।

ভেনেরা-৯ 

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মিশন৷ কারণ এটিই প্রথম কোনো মানব মিশন যে মিশনে অন্যকোনো গ্রহের পৃষ্ঠের ছবি তোলা সম্ভব হয়। ভেনেরা-৯ উৎক্ষেপিত হয় ২০ অক্টোবর ১৯৭৫ সালে। এটিই প্রথম শুক্রগ্রহের পৃষ্ঠে নেমে তার সাদাকালো ছবি প্রেরণ করতে পারে। ছবিটিতে দেখা যায় শুক্রের পৃষ্ঠ মসৃণ তবে পাথরে পরিপূর্ণ।

ভেনেরা-১০

ভেনেরা-১০ শুক্রগ্রহের কক্ষপথে প্রবেশ করে ২৩শে অক্টোবর ১৯৭৫ সালে এবং এর ২ দিন পর এটি শুক্রের পৃষ্ঠে অবতরণ করে। এটিও শুক্রের পৃষ্ঠ থেকে ছবি পাঠায় এবং শুক্রগ্রহের বায়ুমন্ডলে বায়ুর গতিবেগ নির্ণয় করে।

চিত্রঃ ভেনেরা-১০ থেকে তোলা শুক্রগ্রহের পৃষ্ঠের ছবি সূত্রঃ রসকসমস

ভেনেরা-১১ ও ভেনেরা-১২

এই মহাকশযান দুটোই শুক্রের পৃষ্ঠ অবতরণ করে। মহাকাশযান দুটোতে প্রথমবারের মতো কালার ক্যামেরা পাঠানো হয়। তবে তা ছবি তুলতে পারেনি, কারণ ক্যামেরা নষ্ট হয়ে যায় পৃষ্ঠ স্পর্শ করার সময়। তবে ভেনেরা-১১ বজ্রপাত শনাক্ত করতে পেরেছিল এবং কার্বন মনোক্সাইডের পরিমাণও নির্ণয় করতে পেরেছিল।

ভেনেরা-১৩ 

এটি একটি অত্যন্ত সফল মিশন ছিল। কারণ এটি এর সাথে নিয়ে গিয়েছিলো মাইক্রোফোন যা প্রথমবারের মত শুক্রগ্রহের বায়ুচলাচলের শব্দ রেকর্ড করেছিল। যা ছিলো প্রথম কোনো মহাকাশযানের বাইরের কোনো গ্রহের বায়ুর শব্দ ধারণ। এটি শুক্রের পৃষ্ঠে ১২৭ মিনিট স্থায়ী ছিল, যা ছিল হিসেবের চেয়ে অধিক।এছাড়া এটি কালারফটোগ্রাফ পাঠাতেও সক্ষম হয়েছিল এবং এটি শুক্রের মাটি পরীক্ষা করেছিল।

চিত্রঃ ভেনেরা-১৩ থেকে তোলা শুক্রগ্রহের পৃষ্ঠের প্রথমবারের মতো রঙিন ছবি সূত্রঃ রসকসমস

ভেনেরা-১৪

এটা ভেনেরা-১৩ এর যমজ মিশন। এটা ভেনেরা-১৩ এর মাত্র চারদিন পর এটি উৎক্ষেপিত হয়। এটিও শুক্রগ্রহের বায়ুর শব্দ রেকর্ড করে এবং রঙ্গিন ছবি প্রেরণ করে। তাছাড়া এটি শুক্রের মাটির উপর পরীক্ষাও চালিয়েছিল। 

ভেনেরা-১৫ ও ভেনেরা-১৬

ভেনেরা- ১৫ ও ১৬ কে শুক্রগ্রহের ম্যাপ তৈরী জরার জন্য পাঠানো হয়েছিল।

চিত্রঃ ভেনেরা-১৫ সূত্রঃ রসকসমস

এর পর আর ভেনেরা মিশন চালানো হয়নি নানা কারনে। এই সিরিজ মিশনগুলো থেকে বাইরের গ্রহে মানুষ মহাকাশযান পাঠানোর বিষয়ে অনেক কিছু শিখেছে ও বুঝেছে, যা পরবর্তীতে অন্যগ্রহে যান পাঠানোয় মানুষকে অনেক সাহায্য করেছে। ভেনেরা মহাকাশযানগুলো এখনকার মহাকাশযান গুলোর মতো আধুনিক নয়। এগুলো ছিলো ছোট ক্যাপসুলের মতো, এখনকার চাকাওয়ালা পারসিভারেন্স বা কিউরিওসিটির মতো না। এখনকার যান গুলোর মতো না হলেও এই মিশন গুলোই পরবর্তীতে মানুষকে পথ দেখিয়েছে। আমাদের এই মিশন গুলো ভুলে যাওয়া ঠিক নয়। 

তথ্যসূত্র:

The Soviet Union’s Venera Venus missions (slideshow) | Space

ক্যুইজ!

বিজ্ঞান সম্পর্কে আপনি কতোটা জানেন?

নিজেকে বিজ্ঞানপ্রেমী মনে করেন? তাহলে চলুন পরীক্ষা করে দেখা যাক! মাত্র ৫টি প্রশ্নের এই কুইজ দিয়ে মেপে দেখি আপনি কতোটা বিজ্ঞান ভক্ত?

অনিক কুমার সাহা
শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ। একজন শৌখিন জ্যোতির্বিদ