বিজ্ঞানীরা কিভাবে পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব খোঁজেন?

মহাবিশ্বে প্রাণের সন্ধান করতে হলে জীবনের জন্য অপরিহার্য রাসায়নিক জৈবযৌগের সন্ধান করতে হবে।

অনেক সময় আমরা পেপার-পত্রিকায়  দেখি যে নাসার বিজ্ঞানীরা বা অমুক বিজ্ঞানীরা মহাকাশের তমুক জায়গায় প্রাণের অস্তিত্ব পেয়েছেন অথবা প্রাণের অস্তিত্ব আশা করছেন। আমরা কি ভেবে দেখেছি বিজ্ঞানী কিভাবে বলেন প্রাণের অস্তিত্ব পাওয়া যেতে পারে। অনেকেই ভেবেছিলেন কিন্তু জানতে পারেন নি। এবার জেনে নিন কিভাবে প্রাণের অস্তিত্বের খোঁজ করা হয়। 

কখনো কখনো আমরা সাধারণ মানুষেরা মনে করে থাকি, এমনও হতে পারে পৃথিবীর বাইরের প্রাণীরা অক্সিজেন গ্রহণ করে না, ওরা অন্য কোনো গ্যাস গ্রহণ করে হয়তো। বা এমন কি কোনো বাধ্য বাধকতা আছে যে পৃথিবীসহ বিশ্বের সকল প্রাণীর বাঁচতেবাচতে হলে অক্সিজেন গ্রহণ করতে হবে ? কিন্তু সত্যি কথা হলো বিজ্ঞানীরাও এরকম চিন্তা-ভাবনা করেছেন। অনেক বিজ্ঞানী  মনে করেন  যেভাবে পৃথিবীতে প্রাণের সৃষ্টি হয়েছে, পৃথিবীর বাইরে কোথাও যদি প্রাণের সৃষ্টি হয় তাহলেও একই ভাবেই হবে।

 তবে বিজ্ঞানীরা কিভাবে পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব খোঁজ করেন তা জানতে হলে আগে  জানতে হবে প্রাণীদেহ কি দিয়ে তৈরী হয়। একেক প্রাণীদেহ একেক রকম হলেও এদের মৌলিক গাঠনিক উপাদান হলো কোষ। তাহলে এবারের প্রশ্ন কোষ কি দিয়ে তৈরী? এর উত্তর সকল বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরাই জানেন যে একটি কোষের মধ্যে অনেক উপাদান রয়েছে যেমন নিউক্লিয়াস, মাইটোকন্ড্রিয়া, বিভিন্ন তন্তু ইত্যাদি। অবশেষে জানতে হবে প্রোটিন সম্পর্কে। কারণ প্রোটিনই প্রাণীদেহ গঠনের কারণ। 

 সুতরাং এবার জানতে হবে প্রোটিন কি দিয়ে তৈরী?  

প্রোটিন হল এক প্রকারের বৃহৎ জৈব অণু কিংবা বৃহদাণু, যা এক বা একাধিক দীর্ঘ অ্যামিনো অ্যাসিড উদ্বৃত্তের শৃঙ্খল নিয়ে গঠিত।  অর্থাৎ অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে প্রোটিন তৈরি হয়। 

তাহলে এবার আমাদের জানতে হবে অ্যামিনো অ্যাসিড কি এবং কি দিয়ে তৈরি হয়। 

অ্যামিনো এসিডের গঠন

অ্যামিনো অ্যাসিড এক ধরণের জৈব অ্যাসিড যা একটি কারবক্সিল ফাংশনাল গ্রুপ (-COOH) এবং একটি অ্যামাইন ফাংশনাল গ্রুপ (-NH) ধারণ করে2) পাশাপাশি একটি পার্শ্ব চেইন (আর হিসাবে মনোনীত) যা পৃথক অ্যামিনো অ্যাসিডের সাথে নির্দিষ্ট। সমস্ত অ্যামিনো অ্যাসিডে পাওয়া উপাদানগুলি হ’ল কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন এবং নাইট্রোজেন তবে তাদের পাশের চেইনগুলিতে অন্যান্য উপাদানও থাকতে পারে। 

অর্থাৎ বুঝাই যাচ্ছে মহাকাশের কোথাও যদি কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন এবং নাইট্রোজেন পাওয়া যায় তাহলে সেখানে প্রোটিন পাওয়া যেতে পারে। আবার প্রোটিন থেকে একটি কোষ বা এককোষী প্রাণী পাওয়া যেতে পারে। এভাবেই বিজ্ঞানীরা হিসাব কষেন। তবে হিসাবটা দ্রুত করার জন্য বিজ্ঞানীরা শুধু নাইট্রোজেন (N) আর অক্সিজেন (O) এর খোঁজ করেন। কারণ মহাকাশে যেখানে বস্তু আছে সেখানে কার্বন পাওয়া যাবে আর হাইড্রোজেন হলো মহাবিশ্বে সবচেয়ে সুলভ উপাদান কারণ পর্যায় সারণী অনুযায়ী যে মৌলের ভর যত সেটি তত সুলভ এবং যত ভর বাড়বে সেটি তত দুর্লভ হতে থাকবে। বিজ্ঞানীরা নাইট্রোজেন (N) আর অক্সিজেন (O) এর খোঁজ করার সময় একটা সুবিধা হলো এদের পারমাণবিক সংখ্যা ও ভর একেবারে কাছাকাছি। নাইট্রোজেন (N) এর পারমাণবিক সংখ্যা ৭ আর অক্সিজেন (O) এর পারমাণবিক সংখ্যা ৮। তাই পৃথিবীর বাইরে কোথাও নাইট্রোজেন পাওয়া গেলে অক্সিজেন অথবা অক্সিজেন পাওয়া গেলে নাইট্রোজেন পাওয়ার খুব সম্ভাবনা থাকে। তাই বিজ্ঞানীরা মূলত মহাবিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এই দুটো মৌলের খোঁজ করেন।

NASA - NASA Identifies Carbon-rich Molecules in Meteors as the 'Origin of  Life'
মহাবিশ্বের অন্যান্য অংশে জৈবযৌগের উপস্থিতি হয়তো প্রাণের সন্ধান দিতে পারে। ছবি NASA

পৃথিবীতে প্রাণের সৃষ্টি ও বিবর্তন সম্পর্কে আমরা অনেক কিছুই জানি না। তবে আমরা অনেক কিছুই জানি। আমরা জানি যে সকল প্রজাতিই বিবর্তিত হয়েছে কোন পূর্বপুরুষ থেকে। তবে বিবর্তনের যতই পিছনের দিকে যাবো তখন দেখা যায় একসময় আমরা জলজ প্রাণী ছিলাম, এবং আরো গভীরে গেলে দেখা যাবে সর্বপ্রথম প্রাণীটি ছিল একটি এক কোষী প্রাণী। যেটি সম্ভবত সমুদ্রে থাকতো।

আমরা বেশিরভাগ মানুষ এ পর্যন্তই জানি যে সর্বপ্রথম প্রাণীটি একটি এক কোষী প্রাণী ছিল। কিন্তু তার আগে কি ছিলো তা জানতাম না। আরো গভীরে যদি যাই তাহলে দেখা যাবে এককোষী প্রাণীটি মধ্যে অনেক উপাদান রয়েছে যেমন নিউক্লিয়াস, মাইটোকন্ড্রিয়া, বিভিন্ন তন্তু ইত্যাদি। আরো গভীরে গেলে দেখা যাবে এগুলো সব প্রোটিন দিয়ে তৈরী। আবার প্রোটিন তৈরী হয় অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে। আর অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরী হয়  কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন এবং নাইট্রোজেন দিয়ে। এভাবেই অবশেষে বিজ্ঞানীরা কিছু মৌল পান। 

এভাবেই বিজ্ঞানীরা মহাকাশে কখনো কোনো ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া খোঁজেন না। তারা এই চারটি(কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন এবং নাইট্রোজেন) মৌলের খোঁজ করেন।

 এবার পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব থাকার কারণ দেখুন। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ৮০% নাইট্রোজেন (N) এবং অক্সিজেন (O) ও কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2) সহ অন্যান্য গ্যাস। আবার তিন-চতুর্থাংশ জল (H2O), যেখানে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন পাওয়া যায়। 

একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দেই – বিভিন্ন বিজ্ঞানীদের গবেষণা বলে পৃথিবীর প্রথম জীব ছিলো এককোষী এবং এটি সর্বপ্রথম সমুদ্রেই হয়েছিলো । এর কারণ হলো বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেন (N) আর কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2) থেকে কার্বন (C)  পানিতে (H2O) থাকা অক্সিজেন (O) ও হাইড্রোজেন (H) এরা সবাই বিক্রিয়া করে অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরী করে।

এই হিসেবে থেকেই বিজ্ঞানীরা প্রাণের অস্তিত্ব খোজার জন্য মহাবিশ্বে এই চারটি(কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন এবং নাইট্রোজেন) মৌলের খোঁজ করেন। বিশেষ করে নাইট্রোজেন আর অক্সিজেন এর খোঁজ করেন।

এভাবেই বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব খোঁজেন।

তথ্যসূত্র: 

  1. অ্যামিনো অ্যাসিড
  2. অ্যামিনো অ্যাসিড কী? সংজ্ঞা এবং উদাহরণ
  3. Earliest known life
  4. What are chemical signs of life beyond Earth?

ক্যুইজ!

বিজ্ঞান সম্পর্কে আপনি কতোটা জানেন?

নিজেকে বিজ্ঞানপ্রেমী মনে করেন? তাহলে চলুন পরীক্ষা করে দেখা যাক! মাত্র ৫টি প্রশ্নের এই কুইজ দিয়ে মেপে দেখি আপনি কতোটা বিজ্ঞান ভক্ত?

অন্তর চন্দ্র
আমি অন্তর চন্দ্র, বিজ্ঞানের ছাত্র। বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় আমাকে অনেক আকৃষ্ট করে। তাই জানতে ও জানাতে পছন্দ করি। আমি গবেষণা করতে পছন্দ করি।