কেন পড়বেন? কারণ “এটাই সায়েন্স”

"কোথাও বৈজ্ঞানিক গবেষণা চলছে, কিন্তু সেখানে রহস্য সমাধানের অ্যাডভেঞ্চার নেই- এরকমটা কখনও দেখিনি।" এটাই সায়েন্স বইটি কেন পড়বেন?

রিভিউটা এক শব্দে- ‘জোস’ লিখেই শেষ করে ফেলব বলে একটা ফাঁকিবাজি চিন্তা মাথায় এসেছিল। কারণ এক হচ্ছে রিভিউ লিখতে আমি পারি না, দুই অলসতা। কিন্তু পরে আবার ভাবলাম লেখকমশাই কষ্ট করে এত সুন্দর একটা বই লিখেছেন, এটুকু কষ্ট করাই যায়।

বইটির সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হচ্ছে এর বিষয়- গল্প, গবেষণার গল্প। তো এটাতে চমকপ্রদতার কী হলো? সেটা হচ্ছে যে, এ পৃথিবীতে হারিয়ে যাওয়া গল্পের পরিমাণ অনেক বেশি, যে গল্পগুলো বলা বা শোনার মানুষ বা ব্যবস্থা বলতে গেলে নেই।

ঠিকমতো খুঁজলে এ গল্পগুলো শোনার মানুষের বা বলার মানুষের অভাব হয়তো হবে না, কিন্তু কোনো এক কারণে ব্যাটে-বলে ঠিক মেলে না।  তবে কিছু উদ্যোগ- যেমন রাস্তায় প্ল্যাকার্ড দিয়ে দাড়ানো আর গল্প শোনার বিনিময়ে কিছু একটা দেয়া-  আমরা দেখতে পাই:

তো সেরকম একটা উদ্যোগই ‘এটাই সায়েন্স’ বইটি। বইটিতে লেখক মূলত আইসিডিডিআরবিতে কর্মরত সময়ে দেখা ও শোনা বিভিন্ন গবেষণার ‘বিহাইন্ড দ্যা সিন’ নিয়ে গল্প শুনিয়েছেন, সরি বলেছেন_ অবশ্য ফ্রন্ট সিন নিয়েও, কেননা এ বই না থাকলে দেশের এ গবেষণাগুলো সম্পর্কেও পাঠকবৃন্দ জানতে পারতেন না। গল্পগুলোর বিষয়বস্তু মূলত কলেরা হাসপাতালের পানিতে জীবাণু(লেখকের গবেষণার বিষয়) নিয়ে গবেষণা, অর্থাৎ দেশের গবেষণাই বেশিরভাগ। এককথায় আপনার যদি এই হারিয়ে যাওয়া গল্পের কথা ভেবে একটু একটু কষ্ট হতে থাকে আর যদি গল্প শুনতে ভালোবাসেন তাহলে বইটি আপনার জন্য  খাঁটি সোনা! 

বইটিকে লেখক তথ্যসূত্রসহ মোট ১১টা ভাগে বা অধ্যায়ে ভাগ করেছেন। এর মাঝে ৬ টি অধ্যায়ে আছে গবেষণা ও গবেষণার গল্প। সে ছয়টি অধ্যায়ের নাম হচ্ছে- মানুষের বিজ্ঞান, ওলাইচন্ডীর বিপদসংকেত পাতালের দানব, শাড়ি বনাম ওলাইচন্ডী, শৌচ সমাচার, রোহিঙ্গাদের পানি। কী বলা হয়েছে বলব না, স্পয়লার হয়ে যাবে!  ট্যাবলয়েডে বিজ্ঞান নামক ভাগটিতেও যদিও গবেষণা নিয়ে কথা হয়েছে তবে সেটা গবেষণার গল্প বলা হয়নি, সেখানে যা বলা হয়েছে তার ধারণা এর শিরোনাম দেখেই পাওয়া যায়। তাহলে বাকি চারটা ভাগে কী আছে? শুরুর কথা, শেষের কথা এবং বিজ্ঞান নিয়ে কিছু আনুষঙ্গিক কথাবার্তা আছে যেগুলোতে বিজ্ঞানের কর্মপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, গবেষকদের প্রতি রয়েছে কিছু আহ্বান। আরেকটা জিনিস হচ্ছে বইয়ে রেফারেন্সের সংখ্যা অসংখ্য- স্বাভাবিক, যেহেতু গবেষণা নিয়ে লেখা বই। তবে রেফারেন্সগুলো বেশ নির্দিষ্ট করেও দেয়া। তথ্যসূত্র অংশে যেমন একসাথে পাওয়া যাবে তেমনি প্রত্যেক অধ্যায়ের শেষে কোন কাহিনির জন্য কোন গবেষণা তা বলা আছে।

এখন আসি ‘কন্টেন্টে’। প্রথমত, লেখকের বলার ভংগিমা বা যাকে বলে স্টোরিটেলিং ক্ষমতা অসাধারণ। যার ফলে পুরো বই জুড়ে অসম্ভব সুন্দর একটা ফ্লো ছিল। বইয়ের মূল অংশের শুরু “মানুষের বিজ্ঞান” অধ্যায়টা দিয়ে যেখানে লেখক মূলত জনস্বাস্থ্যের গুরুত্ব, কাজ ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেছেন, বইয়ের দ্বিতীয় ইন্ট্রো বা ভূমিকা বলা যায়। এর সাথে কিছু গল্প, মাস্ক পড়ার মতো জিনিসেও কত রকমের জটিলতা থাকতে পারে তা দিয়ে দেখানো হয়েছে ‘জিনিসপাতি’ দেখতে সরল মনে হলেও এর জটিলতা কত বেশি হতে পারে। এমনকি এ অধ্যায়ে ফেলুদার গল্প-ও আছে! তাছাড়া লেখক জনমানুষের বিজ্ঞান জিনিসটাকে একেবারে জনমানুষের জন্য রিলেটেবল এমন করেই উপস্থাপন করেছেন। যে জায়গায় প্রয়োজন হয়েছে কোনো টার্মকে ভেঙে বুঝিয়ে দিয়েছেন। আর গোয়েন্দা থ্রিলার এর ব্যাপারটা হচ্ছে গবেষনার সমস্যা সমাধান করার সময় লেখকের ভাষাও খানিকটা ওরকম ছিলো- রহস্যই তো। পুরো বইও আসলে গবেষকদের গোয়েন্দাগিরি করার কাহিনিই। এ প্রসঙ্গে লেখকের একটি কথাই পুরোটা বলে দেয় সম্ভবত-“কোথাও বৈজ্ঞানিক গবেষণা চলছে, কিন্তু সেখানে রহস্য সমাধানের অ্যাডভেঞ্চার নেই- এরকমটা কখনও দেখিনি।”

যাইহোক আপনি যদি বিজ্ঞান অনুরাগী না হন তাহলে এ বই আপনার জন্য একেবারে উপযুক্ত। দাঁড়ান, কী!? হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন। লেখকের টার্গেট অডিয়েন্সও মূলত তারাই যাদের হয়তো বিজ্ঞানের সাথে তেমন সংশ্লিষ্টতা নেই কিন্তু বিজ্ঞান নিয়ে জানত বা পড়তে ‘খুশিতে, ঘুরতে, ঠ্যালায়’ আগ্রহী। তাই বলে বিজ্ঞান অনুরাগী হলে যেন ভাববেন না এ বই আপনার জন্য না, বরং তাহলে তো আরো ভালো। কারণ বইটা আমার কাছে অত্যন্ত পরিমিত মনে হয়েছে; জার্গনের (কোনো বিষয়ে এক্সপার্টদের মধ্যকার উচ্চমার্গীয় কথাবার্তা যেগুলো শুনলে মন হয়- কী করলাম এ জীবনে!) অপ্রয়োজনীয় প্রতুলতা যেমন নেই তেমনি অতিরিক্ত সিম্পলিফিকেশনও- যা একজন সাধারণ পাঠককেই বিরক্তি ধরিয়ে দিতে পারে- নেই। তাই রিভিউ পড়া রেখে বইটি পড়া শুরু করে দিন। কারণ ‘এটাই সায়েন্স’।

সব্যসাচী দাশ নির্ঝর
বর্তমানে ঢাকা কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে, দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছি। আগ্রহ প্রায় সবকিছুতেই!