দূরের নক্ষত্রে অতীতের খোঁজে

এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি অবস্থান প্রায় ২.৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে। সেখান থেকে কোনো এলিয়েন যদি ঠিক এই মুহূর্তে টেলিস্কোপ দিয়ে পৃথিবীর দিকে তাকায়, তাহলে সে দেখতে পাবে মানব-বসতিহীন ডাইনোসর যুগের পৃথিবী!
Image Credit: pizabay.com

রাতের আকাশে তাকিয়ে আমরা কত সুন্দর সুন্দর অগণিত তারা দেখতে পাই। কোনোটি একটু স্পষ্ট দেখা যায় কোনোটি আবার ঝাপসা। তারাগুলো দেখে আমাদের সবারই মনে হয় আমাদের চোখের সামনে এগুলো যেন প্রাণবন্ত হয়ে আছে। যেন জীবন্ত প্রদীপ রয়েছে চোখের সামনে। তারাগুলো যেন আমাদের সাথেই বর্তমান রয়েছে। এই তারাগুলো কিন্তু আমরা যখন দেখি আসলে ঠিক সেই মুহূর্তের তারা নয়। তারাগুলো থেকে আলো আসতে কতক্ষণ সময় লাগে তার ওপর নির্ভর করে আমরা ঠিক কোন সময়ের তারা দেখছি। আমরা যত বেশি দূরের তারা দেখি, তত বেশি অতীতের তারা দেখি!

যেকোনো বস্তু থেকে আলো প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে পৌঁছালে তবেই কেবল আমরা বস্তুটিকে দেখতে পাই। আলো প্রতি সেকেন্ডে ৩০০০০০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলে। আর মহাবিশ্বে আলোর গতির চেয়ে বেশি গতিসম্পন্ন কিছু নেই। আমাদের চারপাশের দূরত্বে যা রয়েছে, সেগুলো মহাকাশের যেকোনো বস্তুর দূরত্বের চেয়ে নগণ্য বলে এগুলো আমরা একই সময়ে দেখতে পাই। কিন্তু সুদূর মহাকাশের যেসব বস্তু রয়েছে, সেগুলো থেকে আলো আসতে কয়েক সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা থেকে শুরু করে কয়েক শত, সহস্র, লাখ আলোকবর্ষও লাগতে পারে। ফলে আপনি তত সময় আগের ওই বস্তুটিকে দেখতে পাবেন। এমনও হতে পারে আপনি যখন লেখাটি পড়ছেন, এই মুহূর্তে কোনো তারার আলো পৃথিবীতে এসে পৌঁছালো এই প্রথমবার!

দূরের মহাবিশ্বের গ্যালাক্সিসমূহ। ছবিসূত্র: NASA, ESA, P. Oesch and M. Montes.

যেমন চাঁদ পৃথিবী থেকে ৩৮০০০০ কিলোমিটার দূরে এবং চাঁদ থেকে আলো আসতে সময় লাগে ১.৩ সেকেন্ড। তাই আপনি যখনই চাঁদ দেখেন, তখনই ১.৩ সেকেন্ড আগের চাঁদ দেখেন। আবার সূর্যের কথাই ধরুন। সূর্য পৃথিবী থেকে ১৫০ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে এবং সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে ৮ মিনিট সময় লাগে। আপনি সকাল ৮ টার সময় যে সূর্যটি দেখছেন সেটি আসলে ৭:৫২ মিনিটের সূর্য। সকাল ৮টার সূর্য আপনি দেখতে পাবেন ৮:০৮ মিনিটে। চাঁদ-সূর্যের এই ১.৩ সেকেন্ড ও ৮ মিনিটের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হয় না বলে আমরা চাঁদ- সূর্যকে সহজেই আমাদের সময়ের হিসাবের মধ্যে রাখতে পারি। মঙ্গল গ্রহ যখন পৃথিবীর খুব কাছাকাছি থাকে তখন আমরা সবসময় ৩ মিনিট আগের মঙ্গলকে দেখি কিন্তু অন্য সময়ে মঙ্গল থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে প্রায় ২০ মিনিট সময় লাগে। এখন, কয়েক বিলিয়ন বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে যে তারাটি অবস্থিত, তার পর্যবেক্ষণ কীভাবে সম্ভব? সহজ উত্তর হল, সম্ভব না। কারণ যে তারা থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময়ই লাগে কয়েক মিলিয়ন/ বিলিয়ন বছর, সেই তারাটির বর্তমান অবস্থা নির্ণয় করতে হলে আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে আরও মিলিয়ন/বিলিয়ন বছর!

কালপুরুষ নক্ষত্রমন্ডলভুক্ত তারা আর্দ্রা (Betelgeuse)। ছবিসূত্র: eso.org

সৌরজগতের নিকটবর্তী নক্ষত্র আলফা সেন্টুরি, যা খালি চোখে দেখা যায় তার দূরত্ব প্রায় পৃথিবী ও সূর্যের দূরত্বের ২৭০০০০ গুণ। আলোকবর্ষের হিসাবে ৪ আলোকবর্ষ দূরে। তাই যখন আমরা আলফা সেন্টুরিকে দেখি, তখন আসলে ৪ বছর আগের আলফা সেন্টুরি দেখি। এছাড়াও আরও কিছু উজ্জ্বল তারা, যেমনঃ কালপুরুষ (অরিয়ন) নক্ষত্রপুঞ্জের তারা আর্দ্রা (Betelgeuse) ৬৪০ আলোকবর্ষ দূরে। এটি যদি আজকে ধ্বংস হয়ে যায়, আমরা সেটা পরবর্তী কয়েক শতাব্দীর (৬৪০ বছর) আগে জানতে পারব না। ইগল নেবুলাটি এখান থেকে ৭০০০ আলোকবর্ষ দূরে। কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এই অঞ্চলে একটি সুপারনোভার মাধ্যমে সব কিছু ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। টেলিস্কোপের সাহায্যে আপনি নেবুলাটি দেখতে পাবেন, অথচ এর অস্তিত্ব হয়ত কয়েক হাজার বছর আগেই বিলুপ্ত হয়েছে। আবার ধরুন, এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির কথা। এটি প্রায় ২.৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে। সেখান থেকে কোনো এলিয়েন যদি ঠিক এই মুহূর্তে টেলিস্কোপ দিয়ে পৃথিবী দেখতে চায়, তাহলে সে নিশ্চয় মানব বসতিহীন ডাইনোসর যুগের পৃথিবী দেখছে!

এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি। ছবিসূত্র: earthsky.org

তাই অধিক দূরের মহাজাগতিক বস্তুগুলোকে আমরা কখনই বর্তমান অবস্থায় দেখতে পাই না। আর এগুলোর বর্তমান অবস্থা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নির্ণয় করতে পারি না। আপনি আজকে রাতে যে তারাটি দেখছেন হতে পারে সেটির আর অস্তিত্বই নেই। তাই রাতের আকাশে যে তারা দেখছেন, সেটি আসলে অতীতের তারা দেখছেন। আলো আসতে ঠিক যতটুকু সময় লাগে, ততটুকু অতীতের তারা। তাই তারাগুলোর বর্তমান অবস্থা নির্ণয় করতে মানবজাতিকে আরও অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। বিস্ময়কর মহাবিশ্বে তারাগুলোকে দেখার অর্থ ফেলে আসা সময়ের দিকে তাকানো, অতীত দেখার এক বিরাট সুযোগ!

তথ্যসূত্র:

  1. When you look up, how far back in time do you see? – theconversation.com
  2. Since a star’s light takes so long to reach us, how do we know that the star is still there? – wtamu.edu

ক্যুইজ!

বিজ্ঞান সম্পর্কে আপনি কতোটা জানেন?

নিজেকে বিজ্ঞানপ্রেমী মনে করেন? তাহলে চলুন পরীক্ষা করে দেখা যাক! মাত্র ৫টি প্রশ্নের এই কুইজ দিয়ে মেপে দেখি আপনি কতোটা বিজ্ঞান ভক্ত?

জারিন তাহসিন আনজুম
শিক্ষার্থী, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ছোটবেলা থেকেই জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ। জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার সম্পর্কে জানতে ভালোবাসি এবং জ্যোতিবিজ্ঞানের চকমকপ্রদ সব তথ্য আগ্রহী শিশু-কিশোরদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চাই।