বিজ্ঞান কল্পগল্প: গ্রহাণু

এক.

কাজ শেষে বাসায় ফেরা মাত্রই লরা বিছানায় গা এলিয়ে  দিলো।নরম তুলতুলে বিছানা শোয়া মাত্র দু-চোখে রাজ্যের ঘুম নেমে এলো তার। নতুন প্রজেক্টটা নিয়ে প্রচুর খাটাখাটুনি যাচ্ছে তার উপর। শরীরে এক দন্ড বিশ্রাম পাওয়ারও জো নেই। খাটুনি যাবেই বা না কেন, মানুষের বসবাস উপযোগী গ্রহগুলের সন্ধান করা কি মুখের কথা!!! মাঝে মাঝ লরার মেজাজ খারাপ হয়।  পৃথিবীর মানুষগুলোর উপর চরম রাগ নেমে আসে। রাগ হবে না কেন কি সুন্দর ছিল এই পৃথিবী। সবুজ গাছে ভরপুর, জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতো কত বৈচিত্র্যের প্রাণী, বিশাল নীল সমুদ্র। সমুদ্রে ছিল কত রকমের প্ল্যাংকটন, মাছের বাস। ইয়া বড় বড় তিমি। অথচ আজ!!  আজ কিছুই নেই। সবুজ গাছে ভরে থাকা পৃথিবীটা আজ ইট পাথরের বিল্ডিং এ ভরা। পৃথিবীটা এখন বসবাসের অনুপযোগী। হিসাব করে দেখা গিয়েছে আর মাত্র ১০ বছর এই পৃথিবীতে বাস করতে পারবে মানুষ। এই সুন্দর পৃথিবীটাকে মানুষ নিজ হাতে ধবংস করে এখন তুমুল  গবেষণা চালাচ্ছে নতুন গ্রহের। যেটাতে গিয়ে এই বদমাশ মানুষগুলো বাস করতে পারে।

হঠাৎ মানুষের আওয়াজ কানে ভেসে আসতেই জেগে উঠলো  লরা। চোখ মেলতেই ঘরের মাঝখানে রোবট সুহানের থ্রিডি চিত্র দেখতো পেলো সে। লরার মেজাজ প্রচুর খারাপ হলো সুহানকে দেখে। এই  রোবটটিকে তার কেন জানি পছন্দ হয় না।

কি এমন হয়েছে যে এত রাতে তোমার উপস্থিত হতে হলো??  বিরক্তিমাখা কন্ঠ নিয়ে জিজ্ঞেস করলে লরা।

মহামতি কেমি আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছে। এক্ষুনি যেতে হবে- যান্ত্রিক কন্ঠে বলে উঠলো রোবটটি। 

সুহান যতই মানুষের মতো করে কথা বলুক না কেন লরার কাছে বরাবরই সেটা যান্ত্রিক শুনায়। 

কেন ডেকেছে সে ব্যাপারে কি তুমি কিছু জানো??   

না-  জবাবে বললো রোবট সুহান।

আচ্ছা এবার তুমি যেতে পারো – লরা বলল

সাথে সাথে রোবট সুহানের থ্রিডি চিত্রটি মিলিয়ে গেল।

দরজার নব ঘুরিয়ে ভেতরে ডুকতেই একদল মানুষকে দেখতে পেল লরা। ঘুম ঘুম চোখে সকলে তার দিকে তাকিয়ে আছে। লরা আস্তে আস্তে তার জন্য রাখা নিদিষ্ট আসনে গিয়ে বসে পড়লো।

প্রায় দুঘন্টা হতে চলল মহামতি কেমির দেখা নেই। প্রচন্ড রকমের বিরক্ততা সৃষ্টি হলো লরার মাঝে।

ব্যাটা কেমি আমার ঘুম ভাঙ্গিয়ে এখন তোর খবর নাই। নিজেকে তুই কি মনে করিস??  আমার সময়ের ও তো দাম আছে – মনে মনে বলে উঠলো লরা। এমন সময় মহামতি কেমি রুমটায় ঢুকলো। ধীরপায়ে হেঁটে নিজের আসন গ্রহন করলো।

প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি আপনাদের এতক্ষণ বসিয়ে রাখার কারণে। এত রাতে আপনাদের ডেকে পাঠানোর কারণটা হলো – আজ আমাদের মহাকাশ পর্যবেক্ষনকারী রোবট বিচিত্র এক গ্রহাণুর সন্ধান পেয়েছে। যেটি পৃথিবীতে আঘাত হানতে চলছে। প্রায় ১৫০০ ফুট প্রশস্ত এই গ্রহাণুর আঘাতে পৃথিবীর অর্ধেকটা অংশ ধবংস হয় যাবে। ১০০০ কোটি মানুষের একজনও বেঁচে থাকবে না – বলল কেমি

১০ বছর পর তো এমনিতেই সব মানুষ মারা যাবে তবে এখন গ্রহাণুর আঘাতে মারা যাওয়াটা ভালো নয় কি??  বিরক্ত মুখে বলল – লরা

হলরুমের সকলেই ঘুরে থাকলো লরার দিকে।

এসব কথা বল বন্ধ করো লরা। এখন এসব বলার সময় না। আর ১০ বছর সকলে মারা যাবে এমনটা না ও হতে পারে। তুমি নিজেও জানো আমরা মানুষের বসবাস উপযোগী ২ টা গ্রহের সন্ধান পেয়েছি, বলল- কেমি। 

কেমির কথা শুনে চুপ মেরে গেল লরা। 

গ্রহাণুটির গতিপথ বিশ্লেষণ করা হয়ছে। এই গ্রহাণুর গতিপথ বিচিত্র রকমের। এটি পৃথিবীর কোন জায়গায় আঘাত হানতে পারে তা নিদিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। ধারণা করা হয়ছে আজ থেকে সাত দিন পর এটি পৃথিবীতে আঘাত হানতে পারে, বলল- কেমি। 

কিন্তু কিভাবে এর আঘাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করবেন??  বলল – তরুন বিজ্ঞানী জন।

কিভাবে রক্ষা করবো সেই উপায়টা আমাদের বের করতে হবে। পৃথিবীর ১০০০ কোটি নিরীহ মানুষের দায়িত্ব আমাদের উপর। ওদের বাঁচাতে হবে। তাই আমি চাই আপনারা সকলে এই ব্যাপরটা নিয়ে কাজ করুন।

আগামীকাল আবারো কথা হবে-  বলেই বেড়িয়ে গেল মহামতি কেমি।

দুই.

পরদিন সন্ধ্যাবেলা আবার সকলে হলরুমটায় মিলিত হলো। 

প্রায় পাঁচটির মতো উপায়ের কথা এবং কিভাবে এই উপায় গুলো কাজ করবে সবই উপস্থাপন করা হলো এক এক করে।

মহামতি কেমি এতক্ষণ একটাও কথা বলেন নি। মনোযোগ সহকারে সকলের ব্যাখা শুনে গেলেন।

অবশেষে তিনি বলে উঠলেন- ওয়েল!! সকলের উপায়ের কথা শুনলাম। ব্যাপার গুলো বেশ ইন্টেরেস্টিং।  তবে আমাদের পক্ষে সবগুলো উপায় এখন ব্যবহার করা সম্ভব না। তাছাড়া এগুলোর উপর প্রাথমিক কোনো পরীক্ষাও করা হয়নি। আমি এগুলোর মধ্যে দুটো উপায় বেছে নিয়েছি যদিও উপায় দুটি আগে কখনো পরীক্ষা করে দেখা হয়নি। তবে এগুলো কাজ করার সম্ভাবনা অনেকাংশে বেশি।  

কোন দুটোর কথা বলছেন??  বলল – বিজ্ঞানী লিম। 

একটি হচ্ছে কাইনেটিক ইম্প্যাক্ট টেকনিক যেটি বিজ্ঞানী লরা প্রস্তাব করেছেন। এখানে মহাকাশে স্পেসশিপ পাঠিয়ে গ্রহাণুর গতিপথে পরিবর্তন করা হবে, গম্ভীর কন্ঠে কেমি বলল। 

আর  ২য় উপায়??? বলল- লিম। 

২য় উপায়টা একটু বেশি ঝুঁকিপূর্ণ তবে আশা করি এটি ভালোভাবেই কাজ করবে বলল- কেমি

সেটা কি তাড়াতাড়ি বলুন। বিরক্ত হয়ে বলল – লরা

মহামতি কেমির শান্ত দুচোখ লরার উপর কিছুক্ষণ স্থির রেখে আবার বলতে শুরু করলো।

হ্যাঁ দ্বিতীয় উপায়টা হলো আমরা গ্রহাণুর মধ্যে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে গ্রহানুটাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলবো। ব্যাপারটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ তবে কাজের বটে। 

তাছাড়া আমাদের সম্ভাবনার ব্যাপারটা ও দেখতে হবে। যে গণিতের উপর এই পুরো মহাবিশ্ব প্রতিষ্ঠিত সেই গণিতই বলে দিচ্ছে এই উপায় দুটো কাজ করার সম্ভাবনার হার অন্য উপায়গুলোর থেকেও বেশি, বলল – কেমি।  

হলরুম জুড়ে নিস্তব্ধতা নেমে গেল। কেউ কোনো কথা বলছে না।

এই নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে মহামতি কেমি বলে উঠল- এই বিষয়ে কারো কোনো কিছু আর বলার আছে??

সকলেই চুপ। যেন আজ চুপ থাকা আন্দোলনে নেমেছে সকলে। কারো মুখে কোনো কথা নাই।

আপনারা যেহেতু কেউ কিছু বলছেন না সেহেতু আমি ধরে নিচ্ছি উপায় দুইটা নিয়ে আপনাদের কারো কোনো আপত্তি নেই। যাক ব্যাপার বেশ ভালোই হলো। আমি চাই উপস্তিত আপনারা সকলে যার যার চলমান প্রজেক্টের গবেষণা এখন বন্ধ রেখে পৃথিবীকে ঐ গ্রহাণুর হাত থেকে বাঁচাতে কাজ করুন। মানব সভ্যতা ধবংস হয়ে যাওটাকে ঠেকান, বলল – মহামতি কেমি। 

পরবর্তী তিন দিন বেশ খাটুনি গেল লরা এবং তার টিমের উপর। বিশাল ঐ গ্রহাণুর আঘাত ঠেকাতে মোটামুটি সকল প্রস্তুতি গ্রহন করা শেষ। এখন অপেক্ষার পালা। দুইদিন পর গ্রহাণুটা নাগালের মাঝে আসবে আর তখনই প্রয়োগ করা হবে ঐটার দফারফা করা উপায় গুলো।  

বিজ্ঞানী লিমের টিম প্রতিনিয়ত তীক্ষ্ণভাবে নজর রাখছে গ্রহাণুটির উপর। 

তিন.

লরার মাথা ধপ ধপ করছে সাথে চোখে জ্বালা হচ্ছে। টানা তিনদিন না ঘুমানোর উপর্সগ জানান দিচ্ছে মস্তিষ্ক।

মানুষের মস্তিষ্ক বড়ই আশ্চর্যের জিনিস। কোটি কোটি নিউরনের মাধ্যমে কত সুশৃঙ্খলভাবে শরীরটাকে পরিচালনা করছে। বাহ্যিক, অভ্যন্তরীণ উদ্দীপনার প্রতি কত তীক্ষ্ণভাবে সাড়া দেয়। উদ্দীপনা পেলেই হলো কাজ শুরু করে দিবে। এইসব ভাবতে ভাবতে গভীর ঘুমে ডুবে গেল লরা।  

গভীর রাত। ঘুমের ঘোরে  দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠছে লরা। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে চৌচির।

বিছানার পাশে রাখা গ্লাসে লম্বা একটু চুমুক দিলো সে। 

আহা শান্তি!!!

বাতি নিভিয়ে আবারো ঘুমের আয়োজন করলো। এতদিনের চাপা টেনশনে উদ্দিপ্ত মস্তিষ্কটাকে বিশ্রাম দিতে হবে। বিশ্রাম চাই তার।

বিশ্রাম অনেক বিশ্রাম!!! 

চোখ দুটো বুজে আসতেই মোবাইলের রিং বেজে উঠলো।

রাত বাজে ৩ টা। বিরক্ত হয়ে কি যেন একটা বির বির করে উঠলো- লরা। 

মোবাইলের স্কিনে ভেসে উঠা ড. লিমের নাম দেখে হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলে। জরুরি প্রযোজন না হলে এত রাতে তার ফোন দেওয়ার কথা না। কিছুতো একটা হয়ছে – এইসব চিন্তা করতে করতে কল রিসিভ করলো।

হ্যালো বলতেই ফোনের ওপাশ থেকে লিমের আতঙ্কিত কন্ঠ ভেসে আসলো।

হ্যালো মিস লরা। দুঃখিত, আপনাকে এত রাতে ফোন দিয়ে বিরক্ত করার জন্য। আপনি এই মূহুর্তে যেখানে যেভাবে আছেন সেভাবেই চলে আসুন বিজ্ঞান  একাডেমিতে।  একনাগাড়ে  বলে ফোন কেটে দিল – লিম।    

লিমের কথা শুনে কোনো কিছুই আঁচ করা গেল না। তবে কিছু তো একটা দুর্ঘটনা হয়েছে এতটুকু আঁচ করতে পারলো লরা।

চার

হলরুমের সকলেই চুপ মেরে গেল। লিমের মুখে দুঃশ্চিন্তার  ছাপ দেখা যাচ্ছে। অনেক ঘাবড়ে গেছে সে। ঘাবড়ানোটাই স্বাভাবিক। একটা গ্রহাণুটা যেটা পৃথিবীর দিকে ছুটে আসছে পৃথিবী ধবংস করে দেওয়ার জন্য। পৃথিবীটাকে জনমানবহীন মৃত গ্রহে পরিণত করার জন্য সেই গ্রহাণুটা হঠাৎ করে বিলীন হয়ে যাওয়াটা পুরোই এক ভূতুড়ে ব্যাপার।    

হলরুমের নিরবতা ছেদ ঘটিয়ে বিজ্ঞানী টমাস বলে উঠলেন- আমাদের এভাবে চুপচাপ বসে থাকলে তো হবে না। হঠাৎ করে একটা গ্রহাণু তো আর  আপনাআপনি বিলীন হয়ে যেতে পারে না। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো রহস্য আছে। এই রহস্যটা তো বের করা প্রয়োজন।    

ঠিক বলেছেন আপনি, একটা গ্রহাণু আপনাআপনি বিলীন হয়ে যেতে পারে না। 

কিন্তু আজতো হয়ছে। হয়েছে না??? এভাবে বিলীন হয়ে যাওটাকে আপনাদের কাছে মনে হচ্ছে না কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর কাজ??  কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীই এর পেছনে দায়ী – লরা বলল। 

কিন্তু মিস লরা আপনি কিভাবে নিশ্চিত হচ্ছেন এটা কোনো বুদ্ধি প্রাণীর কাজ?  আর একটা গ্রহাণুকে হঠাৎ করে নাই করে দিয়ে ওদের লাভটা কি??  বলল – টমাস

মিস্টার টমাস আপনি ভুল বলছেন। আমি পুরোপুরি নিশ্চিত হয় বলি নাই। আমি সম্ভাবনার কথা বলেছি।  

আর লাভ ক্ষতির ব্যাপারে আপনিও যেমন কিছু জানেন না আমিও তেমনি কিছু জানি না। বিরক্ততার সুরে বলল- লরা

টমাস ও লরার তর্কবিতর্কের মাঝখানে হঠাৎ মহামতি কেমি উঠে দাঁড়ালো। মহামতি কেমি দাঁড়িয়ে পড়াতে শুরুতেই শেষ হয়ে যায় এই তর্কবিতর্ক।

হলরুমের সকলে ঘাড় ঘুরিয়ে মহামতি কেমির দিকে দৃষ্টি সংযোজন করলো।

কিছুক্ষণ আগে মহাবিশ্বের সবথেকে আশ্চর্যজনক ঘটনাটা ঘটে গিয়েছে। আর এই ঘটনার সাক্ষি  আমি আপনি এখানে উপস্থিত সকলেই। বলল – মহামতি কেমি

আশ্চর্যজনক নয় বরং বলুন ভৌতিক ব্যাপারটা ঘটেছে  বলল-  টমাস

টমাসের কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে গেল মহামতি কেমির।

হঠাৎ ঐ অট্টহাসি শব্দ ছড়িয়ে পড়লো পুরো রুম জুড়ে। উপস্থিত সকলেই হাসির উৎসের দিকে দৃষ্টি নিবেদন করলো। মহামতি কেমিও লরার দিকে থাকিয়ে রইলো। তার চোখে মুখে বিরক্তির চাপ। 

মিস্টার টমাস আপনি নাকি বিজ্ঞানের মানুষ। আর আপনিই ভৌতিক ব্যাপারে বিশ্বাস টানছেন হাসি থামিয়ে বলল লরা। 

লরার কথাগুলো নিরবে মুখ বুঝে সহ্য করে নিলো বিজ্ঞানী টমাস।  নিবেই না কেন বিজ্ঞান মহলে জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ লরা। তার সাথে তর্কে যাওয়াটা টমাসের পক্ষে বড্ড বেমানান।

লরা ও টমাসের তর্ক বিতর্ক মাঠেই মারা যাওয়াতে মহামান্য কেমি স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লেন। পৃথিবীর এমন দুঃসময়ের মাঝে এইসব তর্ক বিতর্ক মস্তিষ্ক নিতে পারে না। 

মহামান্য কেমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আস্তে আস্তে বলা শুরু করলেন।

শুনুন সকলে এভাবে আস্ত একটি গ্রহাণু বিলীন হয়ে যাওয়াটা মোটেও স্বাভাবিক কথা না। এই অস্বাভাবিক ব্যাপারটাকে সকলকে সিরিয়াসভাবে নিতে হবে। এর পেছনে কারণটাকে খুঁজে বের করতে হবে। আর তাই আমি ঠিক করেছি ঘটনা স্থলটা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এই কারণে আমরা একটি ক্যামেরা টেলিপোর্টেশন এর মাধ্যমে ঘটনা স্থলটার মানে যেখান হতে গ্রহাণুটা বিলীন হয়ে গিয়েছে তার কিছু ছবি সংগ্রহ করবো।

এই বলে মহামান্য কেমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। কেমির বয়স হয়েছে। পৃথিবীর মতো তার ও আয়ু ফুরিয়ে আসছে। অল্পতে আজকাল তিনি হাঁপিয়ে উঠেন। একনাগাড়ে বেশিক্ষণ কথা বললে দম আটকে আসে। এইসব শারীরিক লক্ষণ তাঁকে জানান দিচ্ছে তাঁর সময় ফুরিয়ে আসছে। তিনি আর এই পৃথিবীর বুকে বেশিদিন থাকবেন না। অবশ্য এই নিয়ে তাঁর কোনো চিন্তা বা ভয় কাজ করে না। করবেই বা কেন?? যখানে পৃথিবীতে কিছুদিন পর প্রাণের অস্তিত্ব থাকবে না সেখানে আরো কিছুদিন বেঁচে থাকার ইচ্ছে প্রকাশ করাটা অযৌক্তিক। 

পাঁচ

হলরুমের সকলের মুখে দুশ্চিন্তার চাপ। কারো মুখে কোনো কথা নেই। দরজা খুলে মহামান্য কেমি প্রবেশ করলো। একদিনে ভেতর সে অনেকটা বুড়িয়ে গিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে এখুনি বুঝি চোখ ফেঁড়ে রক্তের বন্যা বেড়িয়ে আসবে।

মহামান্য কেমি ঝিম মেরে অনেকক্ষণ বসে থাকার পর মুখ খুললেন।

উপস্থিত সকলে আপনাদের আর নতুন করে কিছু বলার নেই। আপনারা সকলেই সংবাদটা জানেন এবং কেউ কেউ এটা হতেও দেখেছেন ও। আমি জানি না কেন ঐ স্থানে গিয়ে আমাদের ক্যামেরাটা হারিয়ে গেল??  কেন সেখান থেকে একে একে গ্রহাণু, ক্যামেরা সব হারিয়ে গেল। এভাবে সবকিছু নাই হয়ে যাওয়াটা পদার্থবিজ্ঞানের সকল “ল” কে ভেঙ্গে দিচ্ছে। আপনাদের ব্যাপারটা খতিয়ে দেখতে হবে। আমাদের ঐ স্থানটায় সরাসরি গিয়ে পর্যবেক্ষেণ করতে হবে। আমি চাই আপনাদের মধ্য থেকে একটা টিম ঐ স্থানটায় যাবে। যারা স্বচক্ষে স্থানটা পর্যবেক্ষণ করবে।

কিন্তু মহামান্য কেমি ঐ স্থানে পৌছালে সবকিছু হারিয়ে যাচ্ছে। আর যে জিনিসগুলো হারিয়ে যাচ্ছে তাদের হদিস ও মিলছে না। তাহলে আমাদের টিমের যারা ঐখানটায় যাবে তাদের ভবিষ্যৎ কি আপনি বলতে পারবেন??? তাঁরা আর সবকিছুর মতো করে হারিয়ে যাবে নাকি পুনরায় ফিরে আসবে পৃথিবীতে আপনি বলতে পারবেন মহামান্য কেমি???  উচ্চস্বরে বললো টমাস।

টমাসের কথাগুলো শুনে চুপ করে রইলো কেমি। কি বা বলবেন তিনি??  তিনি নিজেই তো জানেন না টিমের ভবিষ্যৎ কি?  কি হবে তাদের যখন সেখানে পৌঁছাবে।

মিস্টার টমাস আমি আপনি আমরা কেউই এখনো বলতে পারছি না টিমটির কি হবে কিংবা তাদের ভবিষ্যৎ কি!!!!  তাই বলে তো আমরা হাত পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারবো না। আপনি ভালো করে জানেন এভাবে আপনা আপনি হারিয়ে যেতে পারে না। এর পেছনে অবশ্যই কোনো না কোনো কারণ রয়েছে। কারণটা কি তা আমাদের বের করতে হবে। আপনি জানেন বিজ্ঞান রহস্য তৈরী করতে নয় বরং রহস্যের পেছনের কলকাঠিগুলো উন্মোচন করতে পছন্দ করে।

তারপর আবার সকলের উদ্দেশ্য মহমান্য কেমি বললো – আমাদের এই টিমের বেঁচে ফিরে আসার সম্ভাবনা কতটুকু তা আমার জানা নেই। হয়তো টিমের কেউ বেঁচে ফিরে আসবে না আবার সকলেই ফিরে আসবে। তাই আমি চাই খুব কম সংখ্যক মানুষ ও রোবট নিয়ে একটা টিম গঠন হবে যারা ঐখানটায় যাবে। 

আপনাদের মধ্য থেকে একজনকে যেতে হবে ঐখানটায়। যারা যেতে আগ্রহী আমাকে জানান। আমি কারো ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে তাঁকে সেখানে পাঠবো না। আর যদি কেউই আগ্রহী না হয় তবে আমি নিজেই যাবো সেখানে।

কেমির কথা শুনে সকলে নিরবে বসে রইলো। সকলের মাথায় আকাশ পাতাল চিন্তা। কেউই সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না যে সে যাবে কি যাবে না।

সকলে যখন গভীর চিন্তায় মগ্ন তখন বিজ্ঞানী লরা কথা বলে উঠলো – মহামান্য কেমি আমি যেতে ইচ্ছুক। 

লরার কথায় সকলরর চিন্তায় ছেদ পড়ে সকলে ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে রইলো তার দিকে।

মহামান্য কেমির মুখে মৃদু হাসির রেখা দেখা দিলো। যা তিনি লুকিয়ে ফেলার ব্যর্থ চেষ্টা করলেন।  

টমাসের নাক দিয়ে তো ফোঁস করে স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসলো। তাঁর কোনোভাবে এখন মরার ইচ্ছে নাই। দুই পুত্রের জনক টমাসের পুত্রদ্বয়কে রেখে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে চলে যেতে মন কোনোভাবে সাই দিচ্ছিলো না। 

ছয়

খুব ভোরে লরার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আজ এই পৃথিবীতে তার শেষদিন। আর কখনো হয়তো ফিরে আসা হবে না তার এই পৃথিবীতে। শেষ দিনে এখনো তার একটা কাজ বাকি। লরা গুটি গুটি পায়ে হেঁটে বাইরে বেরিয়ে গেল। সে ফুলের দোকানে যাচ্ছে সাদা গোলাপর সন্ধানে। তার প্রিয় মানুষগুলোকে আজ সে সাদা গোলাপ দিবে। তার পছন্দের গোলাপ। 

কবরের উপর গোলাপের তোড়া দুটো রাখতেই লরার চোখে অশ্রুর বন্যা বইতে লাগলো। তাঁর যে অনেক কথা বলার ছিল এবং আছে সেগুলো সে আজো হয়তো বলতে পারবে না। আজো সে কোনোভাবে উচ্চারণ করতে পারলো না সে যে কতটা ভালোবাসে তার বাবা মাকে। পারলো না বলতে তাঁদের সে প্রতিটা মুহূর্তে মিস করে। 

লরা স্পেসশুট পড়ে তৈরী। আরেকটু পর সে পাড়ি জমাবে অজানা এক উদ্দেশ্যে।

তিন দিন পর…….

মহামান্য কেমি তার রুমে বসে আছে। তাঁর চোখে মুখে আনন্দের আভা ফুটে উঠেছে। কিছুক্ষণ আগেই লরাকে বহনকারী স্পেসশীপটা হারিয়ে গিয়েছে।

হারিয়ে গিয়েছে!!! শব্দটা উচ্চারণ করতেই মহামান্য কেমি হেসে উঠলো।

এটাকে আসলেই হারিয়ে যাওয়া বলা  যাবে??  নাকি গুম করা হয়ছে?  নাকি খুন করা হয়ছে বলা যাবে??? 

হ্যাঁ বিজ্ঞানী লরা হারিয়ে হিয়েছে মহামান্য কেমির জীবনদশায় সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার ওয়ার্মহোলের ভেতরে। ওয়ার্মহোলের মাধ্যমে   পৌছে গিয়েছে নতুন এক মাল্টিভার্সে। যেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছে বিশাল সেই গ্রহাণুটি।

গ্রহাণু!!!!! না গ্রহাণু তো না লরা জন্য অপেক্ষা করছে ভিন গ্রহী কিছু প্রানী। যাঁরা তাকে দিয়ে তাদের কৌতুহল মেটাবে। যারা তাঁকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে জানতে চেষ্টা করবে মানুষ আসলে কতটুকু বিস্ময়কর ও বুদ্ধিমান প্রাণী।  

 

জান্নাতুল মাওয়া
জান্নাতুল মাওয়া। শিক্ষার্থী।