বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী: কলম

১.

সকাল থেকেই জাহিদ সাহেবের মনটা ভীষণ খারাপ। শুধু জাহিদ সাহেবই না সেই সাথে মনির সাহেব, মনোয়ার সাহেব এবং জসিম সাহেবেরও মনটা খারাপ হয়ে আছে। অফিসে আসার পর থেকেই তাদের কাজে কোনো মন নেই। একটু পর পর চেয়ার ছেড়ে উঠে তারা অফিসের এক কোনায় গিয়ে কি যেন কানাঘুষা করে। অফিসের অন্যদের চোখে সেটা পড়লেও কেউ তাদের কিছু জিজ্ঞেস করে নি। সবাই যার যার নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত। আর তাছাড়া এই চারজন অফিসের সবচেয়ে সিনিয়র কর্মী। তাই কেউ তাদের ঘাটায় না। 

কিন্তু অফিসের বস রায়হান চৌধুরি ব্যাপারটাকে কোনোভাবেই এড়িয়ে গেলেন না। বয়সে এবং অফিস পরিচালনায় একেবারে নবীন হলেও অফিসের নিয়ম কানুনের ব্যাপারে সে খুবই কড়া। বাবার মৃত্যুর পর তাকেই এক হাতে সংসার এবং এই পত্রিকার ব্যবসা দুটোরই হাল ধরতে হয়েছে বলে সে নিজেকে একজন দ্বায়িত্বনিষ্ঠ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। আর তাই অফিসের কাজে কোনো গাফলতিও সে সহ্য করে না। 

সূতরাং, রায়হান চৌধুরি সেই চারজনকে তার রুমে ডেকে নিল এবং বললো, কি ব্যাপার জাহিদ সাহেব? আপনাদের চারজনকে আজ একটু অন্যমনস্ক লাগছে। ঘটনা কি? কোনো সমস্যা? 

classic close up draw expensive

কলম

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী

সঞ্জয় মুখার্জী

জাহিদ সাহেব বললো, না স্যার। তেমন কিছু না। 

কিছু একটা তো বটেই। নইলে আপনাদের তো কখনও এমন চেহারায় দেখিনি। কাজেও মন নেই আজ আপনাদের।  কি হয়েছে একটু খুলে বলুন তো।

কেউই মুখ ফুটে কিছু বলতে চাচ্ছিল না। কিন্তু রায়হান চৌধুরির মেজাজ অন্য দিকে চলে যাচ্ছে দেখে জাহিদ সাহেব বলে উঠলো, স্যার, আমরা চারজন আসলে খুবই আতংকে আছি!

আতংক? আমার অফিসে আবার কিসের আতংক? কই কেউ তো কিছু বললো না। এই… 

রায়হান সাহেব সিকিউরিটিকে ডাকতে যাচ্ছিলেন। সেটি দেখে মনোয়ার সাহেব বলে উঠলেন, না স্যার, না স্যার… অফিসের বিষয় নয়। অন্য কারো কিছুও নয়। এই আতংক কেবল আমাদের এই চারজনের।

ও আচ্ছা। তা কিসের আতংক শুনি। 

কলম হারাবার আতংক, স্যার!

রায়হান চৌধুরি অবাক হয়ে বললেন, কলম! সেটাও একটা হারাবার বস্তু? আর তা নিয়ে আবার আতংক! কি যে হয়েছে আপনাদের জাহিদ সাহেব? আপনাদের চারজনের একসাথে কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠান আছে, চারজনেরই ছুটি লাগবে, এই তো! সে কথা মুখ ফুটে বললেই তো হয়। এর জন্য এমন উদ্ভট গল্প বানাবার কি দরকার!  

মনোয়ার সাহেব মনে মনে বলে উঠলেন, ব্যাটা তুই কি বুঝবি কলম কি জিনিস! দুই দিনের ছোকরা কপাল গুনে একটা বড়লোক বাপ পেয়েছিলি বলে এখানে এসে আমাদের বস হয়ে গিয়ে এখন পোদ্দারি করছিস। কলম যে কি জিনিস সেটা তোর বাপ থাকলে টের পেতি। এক কলমের খোঁচায় এক্ষুনি তোকে সব সম্পত্তি থেকে ত্যাজ্য করে দিত।  

জাহিদ সাহেবের মাথায়ও মনোয়ার সাহেবের মতো একই কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল। কিন্তু হাজার হলেও বস। তার মুখের উপর তো এভাবে বলা যায় না। জাহিদ সাহেব বললো, না স্যার, আমাদের কোনো ছুটি লাগবে না। আমরা সত্যিই কলম হারাবার আতংকে আছি। আমাদের পরিচিত যারা আছে সবার কলম গত কয়েকদিনের মধ্যে হারিয়ে গেছে। এখন শুধু আমাদের চারজনের চারটি কলমই অবশিষ্ট আছে। 

জসিম সাহেব বললো, স্যার আমাদের কাছে যে তথ্য রয়েছে সে অনুযায়ী এই চারটি কলমই হয়তো পৃথিবীর সর্বশেষ কলম। তাই স্যার আমরা এগুলোকে হারাবার ভয়ে আছি। 

রায়হান চৌধুরি বললো, শুনুন এসব যা তা কথা বাদ দিন। কলমের যুগ বহু আগেই শেষ হয়েছে। এখন আর কেউ কলম ব্যবহার করে না। তাই কলমের কোনো ইন্ডাস্ট্রি নেই, কোনো প্রোডাকশন নেই। মোটকথা এর কোনো প্রয়োজন নেই। কেবল জাদুঘরে দু’একটা সাজানো থাকলে থাকতে পারে। সূতরাং, এর থাকা বা না থাকায় কিছু আসে যায় না।   

cup smartphone desk notebook
Photo by Markus Spiske on Pexels.com

মনির সাহেব বললো, সেটা আপনি ঠিকই বলেছেন স্যার। কলম তো এখন আর কোনো কাজেই লাগে না। ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস আর থট রিকগনিশনের মাধ্যমেই তো এখন লেখালেখির কাজ চলছে। আমরাও তো তাই করি। কিন্তু তারপরও আমরা যারা কলম যুগের সর্বশেষ মানুষ তাদের কাছে কলম এখনও একটা আবেগের বস্তু। তাই আমরা কিছু কলম আমাদের কাছে রেখে দিয়েছিলাম সেগুলো নিয়ে মাঝে মাঝে স্মৃতিচারণ করার জন্য। আর কলম আমাদের কাছে আজীবন একটি ভালোবাসার বস্তুই হয়ে থাকবে।

কেন?

কারণ, কলমের সাথে জড়িয়ে থাকা আমাদের অসংখ্য স্মৃতি! সেই ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির পাশাপাশি কলম দিয়ে আমরা কলমযুদ্ধ খেলতাম। কলম দিয়ে তীর, বাবল, পেপারওয়েটসহ নানা ধরনের খেলনা বানাতাম। লিখতে গিয়ে চিন্তা করার সময় কলমের পিছন কামড়ে ধরতাম। নিজের কলম হারিয়ে ফেললে অন্যের কলম চুরি করতাম। যুবক বয়সে জামার রঙের সাথে মিল করে বুকপকেটে কলম রাখতাম। কত কলম যে আমাদের পকেটে পায়খানা করে দিয়ে কত জামা-প্যান্ট নষ্ট করে দিয়েছে তার কোনো হিসেব নেই। বলতেই ফিক করে হেসে দিল মনির সাহেব। 

জাহিদ সাহেব বললো, শুধু কি তাই? ছোটবেলা থেকে আমরা আমাদের মনের ভাব ব্যক্ত করেছি এই কলমের মাধ্যমেই। প্রেমিকাকে প্রেম নিবেদন করেছি, পরীক্ষা দিয়ে পাশ করেছি, চাকরি নিয়েছি, জীবিকা নির্বাহ করেছি সব তো এই কলম দিয়েই। ‘অসির চেয়ে মসী শক্তিশালী’ ছোটবেলা থেকেই এই কথা পড়ে এসেছি এবং বাস্তব জীবনে সাংবাদিকতা করতে এসেও এ কথার সত্যতার প্রমাণ পেয়েছি। কলমের এক খোঁচায় কত মানুষকে উদ্ধার করেছি, কত মানুষের ঘুম হারাম করে দিয়েছি। পরিবর্তন এলো তো এই সেদিন। গত দশ বছরে সবকিছু এতোটাই পরিবর্তন হয়ে গেল যে কলম একেবারে হারিয়েই গেল। কিন্তু তারপরও আমরা যারা কলম যুগের সর্বশেষ মানুষ তাদের একটা আলাদা কমিউনিটি তৈরি করেছি। সেখানে আমরা কলম নিয়ে যাবতীয় কার্যকলাপ করি। প্রতিদিন কলম দিয়ে কাগজে লিখে, এঁকে আমরা একে অপরের সাথে শেয়ার করি, কলমের যুগের অভিজ্ঞতা ধরে রাখি। এমনকি আমরা বিশ্ব কলম দিবসও পালন করি। কিন্তু গত কয়েক দিনে আমরা আমাদের কমিউনিটিতে বিভিন্ন দেশের বন্ধুদের কলম গায়েব হয়ে যাবার বিষয়টি জানতে পারি। বিষয়টি এখনও মূল গণমাধ্যমে আসেনি তবে অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে যে কোনো দিন গণমাধ্যমে এর খবর জানা যাবে। তবে আমরা ইতোমধ্যেই আমাদের কমিউনিটির মাধ্যমে জেনে গেছি যে, আমাদের এই চারজনের চারটি কলম ছাড়া আর কোনো কলমই পৃথিবীতে আর অবশিষ্ট নেই। কোনো এক অজানা কারণে অদ্ভূতভাবে কলমগুলো অদৃশ্য হয়ে গেছে।  

রায়হান সাহেব বললেন, তা কোথায় আপনাদের সেই বিখ্যাত কলমগুলো? দেখি। 

জাহিদ সাহেব “জি স্যার, দেখাচ্ছি” বলতে বলতে প্যান্টের পকেটে হাত দিতেই চমকে ওঠে। সে কি! এই রুমে ঢুকার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত কলমটি তার পকেটে ছিল। এমনকি একটু আগে কথা বলতে বলতেই সে তার পকেটে কলমটির অস্তিত্ব অনুভব করছিল। এই এক মুহুর্তেই কোথায় গায়েব হয়ে গেল কলমটি? একই অবস্থার কথা জানালেন মনির সাহেব, মনোয়ার সাহেব এবং জসিম সাহেব। পুরো ঘটনাটি রুমে সকলের সামনেই ঘটে গেল। কিন্তু কেউ কিচ্ছুটি টের পর্যন্ত পেল না। ঘটনার আকস্মিকতায় তারা সকলে হতবিহবল হয়ে গেল। হতবিহবল হল না কেবল একজন, রায়হান চৌধুরি।  

তিনি এবার ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে তার বাবার বয়সী কর্মচারীদের বলে উঠলো, ফাজলামির আর জায়গা পান না! অফিসটাকে মশকরার জায়গা বানিয়ে ফেলেছেন আপনারা। এজন্যই ম্যানেজারকে বলেছিলাম এসব বুড়ো লোকদের ছাটাই করে ফেলতে। কাজে কর্মে মন নেই, উদ্ভট চিন্তা যত। যান, মন দিয়ে কাজ করুন। ফের যেন কলম নিয়ে কোন কথা না শুনি। যান! 

নিজের হাঁটুর বয়সী ছেলের কাছ থেকে এমন ধমক খেয়ে জাহিদ সাহেবসহ সকলের মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। লজ্জায়, অপমানে তাদের মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করল। এ ঘটনার পর এ অফিসে আর কাজ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হল না। তারা সকলেই চাকরি থেকে ইস্তফা দিলেন। তবে যাবার আগে তারা রায়হান চৌধুরিকে আবারও মনে করিয়ে দিলেন যে, পৃথিবীতে কলমের প্রয়োজনীয়তা যতই ফুরাক না কেন, আবারও কোনো একদিন মানবজাতির এই কলমের প্রয়োজন পড়বে। কেননা, অসির চেয়ে মসীই শক্তিশালী। 

ছবি: মিডজার্নি

মাসখানেক পর একদিন জাহিদ সাহেব তার বাসায় বসে টেলিভিশন দেখছিলেন। হঠাৎ এক ব্রেকিং নিউজে তার চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা’র গোয়েন্দা ইউনিট এক নতুন প্রজাতির এলিয়েনের সন্ধান পেয়েছে যারা পৃথিবীতেই মানুষের বেশে অবস্থান করে নানা প্রকার তথ্য সংগ্রহ করছে এবং অন্য গ্রহে প্রাণের বিকাশে কাজ করে চলেছে। ক’দিন আগে পৃথিবী থেকে সমস্ত কলম চুরির ঘটনাটিও এরাই ঘটিয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে প্রাপ্ত গোয়েন্দা তথ্য মতে, এলিয়েনদের এই চুরির পিছনে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না। তারা পৃথিবীতে পরিত্যক্ত কলমগুলো নিয়ে নতুন একটি গ্রহে দ্রুত বিকাশমান একটি প্রজাতির সভ্যতার বিকাশের উদ্দেশ্যে তাদেরকে বিতরণ করেছে এবং সভ্যতার বিকাশে মস্তিষ্কের সৃজনশীলতার উন্নয়নে কলম দিয়ে লেখার প্রক্রিয়াটি যে একটি যুগান্তকারী প্রক্রিয়া তা তারা উল্লেখ করেছে। 

তবে এই প্রজাতির এলিয়েনরা বর্তমানে আরেকটি বিশেষ ধরণের চুরির পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে। আর এবারে তাদের চুরির বস্তু হল ভাষা। নতুন আরেকটি গ্রহে বিকাশমান আরেক প্রজাতির প্রাণিকে ভাষা শিক্ষা দিতে তারা পৃথিবী থেকে মধুরতম ভাষাগুলো সংগ্রহ করবে। আর একই প্রেক্ষিতে তারা আরও কয়েকটি ভাষার সাথে বাংলা ভাষাকেও সংগ্রহ করবে বলে গোয়েন্দা ইউনিট জানতে পেরেছে। 

এ খবর দেখে জাহিদ সাহেব উত্তেজনায় সাথে সাথে মনির সাহেব, মনোয়ার সাহেব এবং জসিম সাহেবকে ফোন দিয়ে পুরো ঘটনা সবিস্তরে বর্ণনা করলেন। সব শুনে তারা ভীষণ অবাক হলেন এবং একই সাথে তাদের প্রতি রায়হান চৌধুরির করা আচরণের তীব্র নিন্দা প্রকাশ করলেন। যাক, তারপরও কলম হারানোর এই জটিল রহস্য উদঘাটিত হয়েছে জেনে তারা ভিতরে ভিতরে কিছুটা হালকা অনুভব করলেন। সকলের সাথে কথা শেষ করে জাহিদ সাহেব ফোন রাখতেই বাসায় কলিং বেল বেজে উঠলো। জাহিদ সাহেব দরজা খুলতেই দেখলেন তার সামনে রায়হান চৌধুরি দাঁড়িয়ে আছেন। জাহিদ সাহেব মনে মনে ভাবলেন, এহ, আসল ঘটনা জানতে পেরে এখন নিশ্চই ক্ষমা চাইতে এসেছে। করবো না তোকে ক্ষমা! আমি, মনির, মনোয়ার, জসিম আমরা কেউই তোকে ক্ষমা করবে না। তবে মনে মনে এ কথা বললেও জাহিদ সাহেব মুখ ফুটে এ কথা বলতে পারলেন না। তিনি কেবল তীর্যকভাবে তাকিয়ে রায়হান সাহেবকে বললেন, আপনি? কেন এসেছেন এখানে? 

রায়হান চৌধুরি একটু মুচকি হেসে নিজের পকেট থেকে একটি কলম বের করলেন। এরপর সেটি জাহিদ সাহেবের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, আপনার কলমটি ফেরত দিতে এলাম। যে জন্য এটি নিয়েছিলাম সে কাজ হয়ে গেছে। আপনি ঠিকই বলেছিলেন, “অসির চেয়ে মসী শক্তিশালী”। ভালো থাকবেন।  

জাহিদ সাহেব রায়হান চৌধুরির কথার জবাব দেয়ার জন্য মুখ খুললেন  ঠিকই, কিন্তু তার মুখ থেকে কোনো কথা বেরোলো না। 

জাহিদ সাহেবের মুখের ভাষা চুরি হয়ে গেছে।  

সঞ্জয় মুখার্জী
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। জীববিজ্ঞানসহ নানা বিষয়ে লিখতে ভালোবাসেন। প্রকাশিত গ্রন্থসমূহঃ গল্পে গল্পে অণুজীব আবিষ্কার, রোগ জীবাণুর গল্প, অণুজীববিজ্ঞানের মজার প্রশ্ন ও উত্তর, কল্পে গল্পে করোনাবিদ্যা, প্যালিন্ড্রোম কবিতাবলি, ডিজিটাল ঈশপের গল্প। বইগুলোর লিংকঃ https://www.rokomari.com/book/author/73378/sanjoy-mukharjee