ইসলামি স্বর্ণযুগের পাঁচ তারকা

লেখাটি , বিভাগে প্রকাশিত

বর্তমান কালের আধুনিক বিজ্ঞান বেশ কয়েকটি যুগের আবিষ্কার, উদ্ভাবন ও জ্ঞানচর্চার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এমনই একটি সময় হলো “ইসলামি স্বর্ণযুগ”। এই সময় মিশর, ইরান, ইরাক, তুর্কিয়ে প্রভৃতি অঞ্চলে কিছু মহামানবের আবির্ভাব ঘটে, যাঁরা নিষ্ঠার সাথে জ্ঞানচর্চা করতেন। কেউ ছিলেন চিকিৎসক, কেউ গণিতজ্ঞ, আবার কেউ বা ছিলেন রসায়নবিদ। আজকের এই ব্লগ পোস্টের মাধ্যমে এমনই পাঁচ তারকার ব্যাপারে জানতে চলেছি। শুরু করা যাক!

ইসমাইল আল জাযারি

ইসমাইল আল জাযারি ১১৩৬ সালে তৎকালীন “জারিযার ইবনে ওমর” নামক স্থানে ১১৩৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। এই অঞ্চলটি বর্তমান তুর্কিয়ে ও ইরাক সংলগ্ন একটি অঞ্চল। তাঁর জন্মের সময়টা ছিল মুসলিমদের স্বর্ণযুগ। কর্মজীবনে প্রবেশের আগে তিনি প্রকৌশলবিদ্যা রপ্ত করেন। এরপর তিনি আর্তুকলু প্রাসাদের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আল জাযারি সুলতান নাসিরুদ্দীনের পরামর্শে নিজের প্রত্যেকটি আবিষ্কারের বিস্তারিত বর্ণনা লিখে রাখতেন। তিনি তাঁর আবিষ্কারগুলোর ব্যাপারে “কিতাব ফি মা’রিফাত আল-হিয়্যাল আল-হানদাসিয়্যাহ” নামক একটি বই লেখেন। বইটিতে বিভিন্ন বিষয়, প্রকৌশল ও প্রায় ৫০টি যন্ত্রের নির্মাণ পদ্ধতির কথা রঙিন চিত্র সহকারে ব্যাখ্যা করেছিলেন। ১৯৭৪ সালে ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার ডোনাল্ড হিল বইটিকে “The Book of Knowledge of Ingenious Mechanical Devices” নামে অনুবাদ করেন। তখন তিনি বুঝতে পারেন যে আধুনিক প্রকৌশলবিদ্যায় আল জাযারির আবিষ্কারগুলোর যথেষ্ট অবদান রয়েছে। তাঁর মতে, আল জাযারির অনেক আবিষ্কার ইউরোপিয়ান শিল্প বিপ্লবে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল।

ইসমাইল আল জাযারি। ছবিঃ The Famous People

The Book of Knowledge এ আল জাযারির আবিষ্কৃত প্রায় ১০০টি যন্ত্রের বিবরণ রয়েছে। আল জাযারির উল্লেখযোগ্য আবিষ্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় ওয়াশিং মেশিন, সাকশন পাম্প, ক্র্যাঙ্কশ্যাফ্ট, ফ্লাশ-মেকানিজম যুক্ত মেশিন, ওয়াটার-ক্লক, এলিফেন্ট ক্লক, ক্যামশ্যাফ্ট, ক্র্যাঙ্ক-স্লাইডার মেকানিজম, সেগমেন্টাল গিয়ার ইত্যাদি। এতো সুন্দরভাবে তিনি এগুলোর ছবি এঁকেছিলেন যে ডোনাল্ড হিল তাঁকে “Leonardo da Vinci of East” আখ্যা দিয়েছিলেন।

অন্ধকার যুগের এক আলো হলেন আল জাযারি। তাঁর আবিষ্কার, প্রকৌশল ও উদ্ভাবনের উপরেই দাঁড়িয়ে আছে আজকের রোবটিক্স। আধুনিকও ইঞ্জিনিয়ারিংও অনেকাংশে আল জাযারির প্রতি কৃ্তজ্ঞ।

জাবির ইবনে হাইয়ান

আবু আব্দুল্লাহ জাবির ইবনে হাইয়ানের পিতা একজন চিকিৎসক ছিলেন। সেই সূত্রে তিনিও গণিতশাস্ত্র নিয়ে পড়া শেষ করে চিকিৎসাবিদ্যা সম্পর্কেও যথেষ্ট জ্ঞানার্জন করেন। কুফায় তিনি চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে এই দায়িত্বের পাশাপাশি রসায়ন নিয়েও বেশ পড়াশোনা করেছিলেন এবং অনেক কিছু সম্পর্কে জানতে পারেন।

জাবির ইবনে হাইয়ান কুফায় একটি গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেন। এই আলকেমিস্টই সর্বপ্রথম গবেষণাগারের রাসায়ন চর্চা করেন বলে জানা যায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো মৃত্যু পর্যন্ত‌ তিনি ঐ গবেষণাগারে‌ কাজ করেছিলেন। তার মৌলিক কর্ম সমূহের কল্যাণেই রসায়নশাস্ত্র একটি স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে গড়ে উঠতে থাকে।

জাবির ইবনে হাইয়ান। ছবিঃ CNN Indonesia

জাবির রসায়নের গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া যেমন বাষ্পীকরণ, হাইড্রোক্লোরিক ও নাইট্রিক এসিড সংশ্লেষণ, পরিস্রবণ, ভষ্মীকরণ ইত্যাদি নিয়ে কাজ করেছিলেন। তিনি ধাতুর পরিশোধন, ইস্পাত তৈরির প্রক্রিয়া, লেখার কালির প্রস্তুত প্রণালী, লোহার মরিচা রোধক বার্নিশ ইত্যাদি সম্পর্কে তাঁর বইতে লিখে রেখেছিলেন। আর এর উপর ভিত্তি করে রসায়ন অনেক দূর এগিয়ে যায়। এ সকল কারণে তাঁকে সাধারণ রসায়নের জনক বলা হয়।

আল খাওয়ারিজমি

গণিতশাস্ত্র যাঁদের কাছে চিরঋণী, সেই জ্ঞানতাপসদের একজন হলেন মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খাওয়ারিজমি। বীজগণিতের জনক এই গণিতবিদ বহু সাধনার পরে লিখেছিলেন তাঁর ঐতিহাসিক গ্রন্থ “হিসাব আল জাবর ওয়া আল মুকাবালাহ”। এই গ্রন্থের আল জাবর অংশ থেকে ইউরোপীয়রা পরবর্তীতে বীজগণিতের নাম দেয় অ্যালজেবরা। এই বইটিতে তিনি প্রায় ৮০০ গাণিতিক উদাহরণ উপস্থাপন করেন এবং সমীকরণ সমাধানের ৬ টি নিয়ম উল্লেখ করেন। দ্বাদশ শতাব্দীতে এই বইটি ল্যাটিন অনুবাদ(অ্যালগরিদমো ডি নিউমেরো ইন্দোরাম) ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হতো।

আল খাওয়ারিজমি। ছবিঃ New Scientist

আল খাওয়ারিজমি পাটিগণিত নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন। তাঁর লেখা পাটিগণিত বিষয়ক গ্রন্থ হল “কিতাবুল হিসাব আল আদাদ আল হিন্দি”। আপনি জেনে অবাক হবেন, Algorithm শব্দটি আল খাওয়ারিজমি নামের ল্যাটিন অংশ algorismi থেকে। ত্রিকোণমিতি এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানেও এই গণিতবিদ অসামান্য অবদান রেখেছিলেন। তাঁর কাজগুলো মাস্টার জ্যাকব, ওমর খৈয়াম, ফিরোনানসি এবং লিওনার্ডোর মতো গণিতজ্ঞদেরকে বেশ প্রভাবিত করেছিল।

হাসান ইবনুল হায়সাম

বলা হয়ে থাকে, হায়সাম (Haytham) বীজগণিত ও জ্যামিতির মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করেছিলেন। তিনি ৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে ইরাকের বসরায় জন্মগ্রহণ করেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তিনি বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। অপটিক সায়েন্স বা আলোক বিজ্ঞান নিয়ে তিনি “কিতাবুল মানাযির” নামের একখানা চমৎকার গ্রন্থ লিখেছিলেন। কেপলার এবং বেকনের মতো গবেষকেরাও এই গ্রন্থ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাঁদের গবেষণা করেছিলেন। এই বইটি পরবর্তীতে “Book of optics” শিরোনামে ইংরেজীতে অনুবাদ করা হয়। এই গ্রন্থটিকে নিউটনের প্রিন্সিপিয়া ম্যাথাম্যাটিকার সমতুল্য ধরা হয়ে থাকে।

হায়সামের পরীক্ষণ-পদ্ধতি ছিল অনেকটা বর্তমান কালের গবেষণা পদ্ধতির মতো। তিনিই প্রথম আলোর প্রতিফলনের ব্যাপারে গ্রিকদের ভুল ধারণা ভেঙে সঠিক ধারণা প্রদান করেন। তিনি বলেছেন যে বস্তু থেকে আলো প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে প্রবেশ করে বলেই আমরা যেকোনো জিনিস দেখতে পারি। তিনি গতি, মাধ্যাকর্ষণ ও গণিত নিয়েও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মতামত ও ধারণা প্রকাশ করেছিলেন। তিনিই প্রথম ম্যাগনিফাইং গ্লাস আবিষ্কার করেছেন।

হাসান ইবনুল হায়সাম। ছবিঃ DK Find Out

“আল শুকুক আ’লা বাতলামিয়াস” নামক গ্রন্থে এই মহাজ্ঞানী জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছিলেন। এছাড়াও চাঁদ নিয়ে লিখেছিলেন “মাক্বালা ফি দাও আল-ক্বমার”। তিনি ইউক্লিড, অ্যাপোলোনিয়াস প্রমুখ গণিতবিদদের কাজের উপর ভিত্তি করেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন। এছাড়াও তিনি সংখ্যাতত্ত্ব এবং ক্যালকুলাস নিয়েও কাজ করেছিলেন। অনেকের ধারণা, এই জ্ঞানতাপসের কিছু মৌলিক কর্ম হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে।

ইবনে সিনা

ইসলামি স্বর্ণযুগের একজন প্রখ্যাত বহুবিদ্যাবিশারদ হলেন আলি হুসাইন ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে সিনা। অ্যারিস্টটলীয় দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হওয়া এই পেরিপেটিক দার্শনিককে আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যা এবং শল্যচিকিৎসার অগ্রপথিক মনে করা হয়। তিনি তাঁর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে ৫ খণ্ডের “আল-কানুন ফিত-তিব্ব” নামক একটি অসাধারণ বই লিখেছিলেন। চিকিৎসাবিদ ড.ওসলার এই গ্রন্থকে “চিকিৎসাশাস্ত্রের বাইবেল” আখ্যা দিয়েছিলেন। চিকিৎসাবিদ্যার ভিত্তিমূলে এই অমর গ্রন্থটি অবস্থান করছে। ইউনানী চিকিৎসায় এই বইয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

ইবনে সিনা। ছবিঃ Famous Philosophers

অনেক অল্প বয়সেই তিনি একাই ইউক্লিডের জ্যামিতি সমাধান করতেন। ধারণা করা হয়, ১৮ বছর বয়সেই ডাক্তার হওয়া এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাশাস্ত্রের উপর ৪০টি বই লিখেছেন। এই মুসলিম বিজ্ঞানীর নামে বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল গড়ে উঠেছে।

এই পাঁচজনের কাছে আধুনিক বিজ্ঞান চিরকৃ্তজ্ঞ। ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে তাঁদের নাম লেখা থাকবে। যদি এই বিদ্বানদের জন্ম না হতো, তবে বিজ্ঞান হয়ত এ পর্যন্ত এতো সহজে পৌঁছাতে পারতো না। স্যালুট টু দেম!

তথ্যসূত্র

১. Ibn Sina-Famous Philosophers
২. ইবনে আল-হাইথাম: আলোকবিজ্ঞানের কান্ডারি এক মহাবিজ্ঞানীর গল্প
৩. al-Khwārizmī-Britannica
৪. আল জাযারি, মুসলিম বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানী
৫. Abū Mūsā Jābir ibn Ḥayyān | Muslim alchemist – Britannica

[এই লেখাটির কিছু অংশ ইতিপূর্বে Scientia Society এর ফেসবুকে পেইজে প্রকাশিত হয়েছে]

লেখাটি 220-বার পড়া হয়েছে।

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 906 other subscribers