নিরামিষভোজী কুকুর বিড়াল

লেখাটি বিভাগে প্রকাশিত

পাড়া গাঁয়ের বাড়ির আঙিনায় এখনো একটা দৃশ্য প্রায়ই চোখে পড়ে। মধ্য দুপুরে বাড়ির কর্তা ভুরি ভোজ সেরে পাতের অবশিষ্টাংশ মাছের কাঁটা, আধা চিবোনো মুরগির হাড় হাতে করে নিয়ে কল পাড়ে ছুড়ে ফেলে। আর ওমনি একদল কুকুর তাদের ছানা-পোনা সহ হুমড়ি খেয়ে এসে পড়ে এসব উচ্ছিষ্টের উপর। মনের আনন্দে তারা এসব খেতে থাকে। কুকুরদের খাওয়া শেষ হলে কোত্থেকে যেন ছুটে আসে একদল সুযোগ সন্ধানী বিড়াল। গ্রামে আবার কেউ কেউ শখের বসে কুকুর-বিড়াল পুষে। ওদের জন্যে খাবারের আয়োজনটা আবার রমরমা। রান্না করা মাছ-মাংসের একটা ভাগ রেখে দেয়া হয় এদের জন্যে। শহর বন্দরে অবশ্য হিসেব আলাদা। সেখানে কুকুর-বিড়াল নিতান্তই শখের বসে পোষা হয়। তবে এসব কুকুর-বিড়াল এর জাত-চেহারা সবই ভিন্ন। 

তাদের মালিক তাদের জন্যে বাজার থেকে আলাদা করে খাবার কিনে আনে। পাশাপাশি ঘরে রান্না হওয়া মাছ-মাংস তো আছেই। মালিক নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে যেমন সচেতন তেমনি তার পোষা কুকুর-বিড়ালের জন্যেও। শিরোনামটা পড়েই আপনারা বোঝতে পারছেন, আজকে কথা হবে কুকুর-বিড়ালদের খাওয়া-দাওয়া নিয়ে। আচ্ছা, একটা প্রশ্ন, আমাদের পোষা এসব আদরের কুকুর-বিড়ালেদের কি সব সময়ই কেবল মাছ-মাংসই খেতে ইচ্ছে করে? তাদের কি কখনো এক একবার একটু নিরামিষাশী হয়ে থাকতে ইচ্ছে করে না? এই ধরুন লতা-পাতা, শাক-সবজি ইত্যাদি খেয়ে। তাদের ইচ্ছে হয় কিনা জানি না, তবে ইদানিং সময়ে  তাদের মালিকেরা কেউ কেউ চায় তাদের পোষা প্রাণী গুলোও তাদের মতন করে নিরামিষভোজী হয়ে উঠুক। 

এমনকি অনেক মাটস (এক জাতের গৃহপালিত কুকুর যাদের পূর্বপুরুষদের হদিস মেলে নি এখনো) এবং মগিস (এক জাতের গৃহপালিত বিড়াল), তাদের প্রভুদের মতন দিব্যি নিরামিষভোজী হয়ে উঠেছে। বাজারেও এখন এসব নিরামিষাশী কুকুর-বিড়ালদের জন্যে উদ্ভিজ্জ খাবার-দাবার এর জোগান বেড়েছে। ২০১৮ সালের হিসাব বলছে, পুরো বিশ্বে ৩৭০ মিলিয়ন পোষা বিড়াল আর ৪৭০ মিলিয়ন পোষা কুকুর ছিল। সবমিলিয়ে চীনা পোষা কুকুর বিক্রি হয়েছিল ১৩৪ বিলিয়ন ডলার। দিন দিন বেড়ে চলেছে এসব গৃহপালিত কুকুর-বিড়ালের খাবারের বেচা-বিক্রিও। যুক্তরাজ্যে ২০১৯ সাল অবধি বিগত পাঁচ বছর ধরে গৃহপালিত পোষা প্রাণীর খাবার বিক্রি বেড়েছে সতেরো শতাংশ।  

প্রতি বছরই গৃহপালিত পশুদের জন্যে হাজার হাজার নতুন খাদ্য পণ্য বাজারে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, এসব খাদ্য পণ্যের মধ্যে উদ্ভিজ্জ খাদ্যবস্তু আছে অনেক। এর কারণ, মানুষের মধ্যে দিন দিন বেড়ে চলেছে প্রানিজ আমিষ ছেড়ে যোগ নিরামিষাশী হয়ে উঠার প্রবণতা। আর এরই ধারাবাহিকতায় তারা চান, তাদের পোষা কুকুর-বিড়ালও হয়ে উঠুক নিরামিষাশী। ফলত বাজারে বেড়েছে এসব গৃহপালিত পশুদের জন্যে উদ্ভিজ্জ খাদ্যদ্রব্যের চাহিদা। আজকাল মানুষজন প্রানিজ খাদ্যদ্রব্য উৎপাদনের উপর পরিবেশ দূষণের প্রভাব নিয়ে বেশ চিন্তিত। আর তাই তারা নিজেদের জীবনব্যবস্থা পরিবর্তনের যেমন চেষ্টা করছেন, তেমনি তাদের পোষা কুকুর-বিড়ালের জীবনব্যবস্থা পরিবর্তনের ব্যাপারেও মনোযোগী হচ্ছেন। পোষা কুকুর-বিড়ালের জন্যে আদর্শ খাবার সরবরাহ করার চিন্তা থেকেও অনেকে তাড়িত হচ্ছেন। 

এই তাড়নায় কেউ কেউ আবার তাদের পোষা কুকুর-বিড়ালের জন্যে প্যালিও-স্টাইল খাদ্যাভ্যাসের দিকেও ঝোঁকছেন। এই ধরণের খাদ্যাভ্যাসের খাবার তালিকায় থাকে না কোন রান্নাকরা কিংবা কোনরকম প্রক্রিয়াজাতকৃত কোনো খাবার। প্রস্তরযুগের মানুষেরা যেমন কাঁচা মাংস, ফলমূল খেয়ে থাকতো অনেকটা সেরকম। পোষা প্রাণীদের প্যালিও-স্টাইল খাদ্যাভ্যাসে থাকে কাঁচা মাংস, রক্ত, নাড়িভুঁড়ি, কলিজা, অস্থিমজ্জা প্রভৃতি।  

এধরণের খাদ্যাভ্যাসকে বলা হয় বায়োলজিক্যাললি-অ্যাপ্রোপ্রিয়েট র ফুড ডায়েটস (Biologically-appropriate raw food diets), সংক্ষেপে BARF। কিন্তু উদ্ভিজ্জ খাদ্যবস্তুর বাজারদর অন্য গুলোর তুলনায় অনেকটা বাড়তির দিকে। ২০২০ সালে এই বাজারদর ছিল ৯ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৮ সালের মধ্যে তা দ্বিগুণ এ পরিণত হবার সম্ভাবনা আছে। সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, বর্তমানে পুরো বিশ্বে প্রায় এক শতাংশ গৃহপালিত বিড়াল ভেগান ডায়েটে অভ্যস্ত, যেখানে গৃহপালিত ভেগান কুকুরের সংখ্যা দেড় শতাংশেরও বেশি। তবে এসব উদ্ভিজ্জ পশু খাদ্যদ্রব্য বেশি বেশি বিক্রি হচ্ছে মানে এই নয় যে, কুকুর-বিড়াল’রাও বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে এসব খাদ্যদ্রব্যের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। কিংবা এরা কোন বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে।  

নিরামিষভোজী কুকুর-বিড়ালদের মধ্যে কিন্তু কুকুরের সংখ্যাই বেশি। বিবর্তনের ধারায় কুকুর হচ্ছে নেকড়ে’দের উত্তরসূরি। যদিওবা নেকড়ে’রা মাংসাশী প্রাণী, কিন্তু প্রায় দশ হাজার বছরের সহবিবর্তন মানুষ সঙ্গী কুকুরদের করে তোলেছে সর্বভুক প্রাণী। তবে এখনো কুকুরদের পছন্দের খাবার মাংস হলেও, উদ্ভিজ্জ খাদ্যদ্রব্যে কুকুরদের দরকারি প্রায় সবরকম পুষ্টি উপাদানই উপস্থিত থাকে। অন্যদিকে বিড়াল প্রাণীটি এখনো পুরোপুরিভাবে গৃহপালিত হয়ে উঠে নি। খাদ্যাভ্যাসের দিক থেকে এরা বাধ্যতামূলক ভাবে মাংসাশী। তার মানে তাদের প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি উপাদান উদ্ভিজ্জ খাদ্য উৎসে উপস্থিত থাকে না। কিছু কিছু পুষ্টি উপাদান কেবল প্রানিজ আমিষেই পাওয়া যায়।

যেমন বিড়ালের দেহে টাউরিন অ্যামাইনো এসিডটি তৈরি হয় না। এই অ্যামাইনো এসিড উদ্ভিজ্জ খাদ্যদ্রব্যে থাকে না, কেবল প্রানিজ খাদ্য উৎসেই পাওয়া যায়। এছাড়াও বিড়ালের দেহের জন্য দরকারি পুষ্টি উপাদান অ্যারাকিডনিক এসিড (এক ধরণের ফ্যাটি এসিড) এর প্রধান উৎসও হচ্ছে প্রানিজ আমিষ। এদের বিপাক প্রক্রিয়া ক্যারিটিনয়েডস থেকে ভিটামিন এ সংশ্লেষণ করতে পারে না। আর তাই বিড়াল’দের এই ভিটামিন আহরণ করতে হয় প্রানিজ খাদ্য উৎস থেকেই। কোলেক্যালসিফেরল নামের এক ধরণের প্রানিজ ভিটামিন ডি বিড়ালের জন্যে একটা দরকারি পুষ্টি উপাদান, যা কেবল প্রানিজ খাদ্য উৎসেই পাওয়া যায়। তাছাড়া এদের দেহের শক্তির প্রধান উৎসই হচ্ছে অ্যামাইনো এসিড এবং স্নেহ, গ্লুকোজ নয়। বলা যায়, কুকুরের তুলনায় বিড়াল’দেরই প্রোটিন আর ফ্যাট এর চাহিদা বেশি।

বন্য বিড়াল’রা তাদের দৈহিক ক্যালরির অর্ধেক পায় প্রোটিন থেকে, আর বাকি অর্ধেক পায় স্নেহ থেকে। এদের আমিষ জাতীয় খাদ্যের তালিকায় থাকে ছোট ছোট স্তন্যপায়ী আর পতঙ্গ। মাত্র দুই শতাংশ ক্যালরি এরা শর্করা জাতীয় খাবার যেমন ঘাস থেকে গ্রহণ করে। কিন্তু বিড়ালের সবরকমের পুষ্টি উপাদান এর চাহিদা উদ্ভিজ্জ খাবার এবং অন্যান্য সম্পূরক খাদ্য উপাদান দিয়ে পূরণ করা অসম্ভব না। এজন্যে যেসব খাদ্য উপাদান উদ্ভিজ্জ খাবারে থাকে না, সেগুলো কৃত্রিম ভাবে খাবারে যোগ করতে হবে। যেমন বিড়ালের জন্যে প্রস্তুত সুষম খাবারে সিনথেটিক টাউরিন অ্যামাইনো এসিড যোগ করতে হবে। 

আসলে কোন প্রাণী প্রজাতিরই যে প্রানিজ খাদ্যদ্রব্য খেতেই হবে ব্যাপারটা মোটেও তা নয়। যেই বিষয়টার উপর মনোযোগ দিতে হবে তা হল, দরকারি সব রকম পুষ্টি উপাদান যাতে পরিমাণমত থাকে এবং সহজপাচ্য ও সুস্বাদু হয়। এই কথা অন্যসব মাংসাশী কিংবা পতঙ্গভুক প্রাণী যেমন ফেরেট, সাপ, টিকটিকি এবং মাছ সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এই দিক থেকে দেখলে, আমিষের প্রধান উৎসটা কি হবে সেটা ভাববার বিষয়। যেমন কিছু কিছু নিরামিষভোজী পোষা প্রাণীর আমিষের প্রধান উৎস উদ্ভিজ্জ খাদ্যদ্রব্য, কারো কারো ক্ষেত্রে আবার ছত্রাক কিংবা সামুদ্রিক শৈবাল। তবে কখনো ভেজেটারিয়ান আর পেস্কেটারিয়ান খাদ্যাভাসে ডিম, দুধ এবং মাছ রাখা হয়। কিন্তু খাবারটা পুষ্টিমানের দিক দিয়ে যথেষ্ট কিনা সে ব্যাপারটা অতটাও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না।  

কুকুর বিড়াল’রা কি নিরামিষ খাদ্যাভ্যাসে খুশি?       

খাবার পুষ্টিমানের সাথে সাথে এর স্বাদের বিষয়টাও মাথায় রাখতে হবে। খাবারের পুষ্টিগুণ ভালো হলেই যে সে খাবার গ্রহণযোগ্য তা তো না। অনেক মনে করেন, কুকুর-বিড়াল’দের মাংস থেকে বঞ্চিত করে কেবল নিরামিষ খাবার খাওয়ানো একটা নিষ্ঠুরতর আচরণ। নিরামিষ খাদ্যাভ্যাসে পোষা কুকুর-বিড়াল’দের মনের অবস্থা কেমন- সেটা বোঝতে যুক্তরাজ্যে’র উইনচেস্টার সেন্টার ফর অ্যানিমাল ওয়েলফার বিশ্ববিদ্যালয় এর এন্ড্রু নাইট এবং তার সহকর্মীরা একটা জরিপ করেন। তারা প্রায় চার হাজার কুকুর-বিড়ালের মালিকদের সাথে কথা বলেন। সেই সাথে নিরামিষ ভোজনে কুকুর-বিড়াল’দের আচরণ খেয়াল করেন। জরিপে দেখা গেল, কুকুর’দের কাছে এসব উদ্ভিজ্জ খাদ্যদ্রব্য বেশ মুখরোচক লাগছে। খুব দ্রুত খাবার পাত্র খালি করে পুনরায় খাদ্য পাবার জন্যে খালি পাত্রের মধ্যে মুখ ডুবিয়ে আছে। খাবার পেলে, সেগুলোর উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে কিংবা খাবার ঝুরি থেকে চুরি করে খেয়ে নিচ্ছে। 

খাবার খেতে সুস্বাদু না হলে কুকুর অগত্যা সে খাবারে মুখ তুলে না। অন্যদিকে সদ্য খাওয়া খাবার খেতে সুস্বাদু হলে, বিড়াল তার চোয়াল চাটতে থাকে, মুখ নাড়তে থাকে এবং চোখ অর্ধেক বন্ধ করে রাখে। কিন্তু খাবার পছন্দ না হলে, এরা লেজ এবং কান নাড়াতে থাকে, নাক চাটতে থাকে আর পুরো শরীর ঝাঁকাতে থাকে। নাইট প্রায় আড়াই হাজার কুকুর এবং এগারো শ বিড়াল এর উপর জরিপ করেছেন। উদ্দেশ্য বিভিন্ন ধরণের খাদ্যাভ্যাস এর প্রতি এরা কেমন আচরণ করে সেটা বোঝা। এই দুই ধরণের প্রাণীর মধ্যে রুচির দিক দিয়ে উল্লেখযোগ্য কোন পার্থক্য দেখা গেল না। এরা উভয়ই নিরামিষ ভোজন মাংস খাওয়ার মতই উপভোগ করছে। তবে সুস্বাদু হলেই যে সে খাবার স্বাস্থ্যকর হবে তাও না। পোষা প্রাণীদের স্বাস্থ্যের উপর নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস কি প্রভাব ফেলে তা নিয়ে দু’বছর আগে একটা গবেষণাপত্র প্রকাশ করা হয়। গবেষণাটির নেতৃত্ব দেন কানাডার গুয়েলফিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাড্রোনি ভারব্রুগে। তারা হাজার খানেক পোষা বিড়াল মালিকের সাথে আলাপ করেন, যাদের ১৮ শতাংশই নিজেদের পোষা বিড়াল কে উদ্ভিজ্জ খাবার খাওয়ান। 

তারা মালিকদের তাদের পোষা বিড়ালের স্বাস্থ্য সমস্যা সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে বলেন। সেই সাথে উদ্ভিজ্জ আহারের উপর নির্ভরশীল এসব বিড়ালের মল পরীক্ষা করে দেখেন এবং প্রতিটি বিড়াল এর জন্য “বডি স্কোর” নির্ণয় করেন। 

গবেষকরা অনুমান করেছিলেন, উদ্ভিজ্জ খাবার খেয়ে দিন যাপন করা বিড়াল’রা হয়ত সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হবে না। কিন্তু তারা ফল পেলেন উল্টো। উদ্ভিজ্জ আহার নির্ভরশীল এসব বিড়ালের দেহে, পাকতন্ত্রজনিত কোন রোগের তেমন কোন চিহ্ন নেই এবং বেশির ভাগ বিড়ালেরই শারীরিক অবস্থা বেশ ভালো। গবেষকরা এমন ফলাফলে বেশ অবাকই হলেন। তবে যেহেতু এই গবেষণায় অংশ নেয়া মালিক’রা স্বনির্বাচিত ছিলেন, তাই এই জরিপ পক্ষপাতদুষ্ট হবার সম্ভাবনা আছে। বিষয়টা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে নাইট প্রায় দেড় হাজার বিড়ালের উপর আরেকটা গবেষণা করেন। এইবারেও ফল পাওয়া গেল একই রকম। 

কুকুর’দের বেলায়ও এই গবেষণায় একই রকম ফলই মেলেছে। নাইট প্রায় আড়াই হাজার কুকুর নিয়ে গবেষণা করেন যাদের অর্ধেক গতানুগতিক খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত, কিছু সংখ্যক কাঁচা মাংস খায় এবং বাকি গুলো ভেগান ডায়েট এ অভ্যস্ত। গবেষকরা জরিপে অংশ নেয়া মালিকদের বছর খানেক ধরে তাদের নিজেদের পোষা কুকুর গুলোর খেয়াল রাখতে বললেন। সেই সাথে কিছু বিষয় যেমন নিয়মিত পশুচিকিৎসক দেখানো, রোগ ডায়াগনসিস করা, ওষুধ প্রদান এবং এদের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত নিজস্ব পর্যবেক্ষণ নোট করতে বললেন। দেখা গেল যেসব কুকুর কাঁচা মাংস খায় তারা সবচাইতে বেশি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছিল। আর সবচাইতে খারাপ স্বাস্থ্যের অধিকারী হল গতানুগতিক খাদ্যাভ্যাসে অভস্ত কুকুর গুলো। কাঁচা মাংস খাওয়া কুকুর গুলো ছিল সবচাইতে তাজা। তবে নাইট এর মতে এই জরিপে ভেগান ডায়েটই সর্বোত্তম খাদ্যাভ্যাস হিসেবে বিবেচিত হয়। 

এই গবেষণায় একটা বিষয় ভালো মতনই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ উদ্ভিজ্জ খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত কুকুরদের শারীরিক অবস্থা গতানুগতিক খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত কুকুরদের তুলনায় অধিক ভালো। তবে এখানে অবশ্যই “পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ”- এই কথাটা মাথায় রাখতে হবে। পোষা প্রাণীদের জন্যে ব্যবহার করা সকল ধরণের খাদ্যাভ্যাসেই কিছু না কিছু সমস্যা আছে। যেমন গতানুগতিক খাদ্যাভ্যাস গুলোয় প্রায়ই যথেষ্ট পরিমাণ পুষ্টি উপাদান থাকে না এবং এমন কিছু প্রোটিন থাকে যেগুলো পোষা কুকুর-বিড়ালের মধ্যে অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। 

BARF ডায়েট-এ কিছু দরকারি পুষ্টি উপাদান কম থাকে এবং অপ্রত্যাশিতভাবে নানান ব্যাকটেরিয়া এবং আন্ত্রিক পরজীবী সংক্রমিত থাকে। ভেগান ডায়েটেও একই রকম সমস্যা খুঁজে পাওয়া গেছে। বাজারে প্রচলিত এমন ২৬ টা উদ্ভিজ্জ খাদ্যদ্রব্য পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এদের মধ্যে মাত্র চারটা’য় সব ধরণের পুষ্টি উপাদান ঠিকঠাক মতন আছে। নাইট এর মতে সমস্যা আসলে খাদ্যাভ্যাসে নয়, সমস্যা খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায়। তিনি প্রানিজ খাদ্যদ্রব্য এবং উদ্ভিজ্জ খাদ্যদ্রব্য, পতঙ্গ খাদ্যদ্রব্যসহ ১৯ টা ভিন্ন ভিন্ন ধরণের খাদ্যদ্রব্য নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন। তিনি বলেন, আসলেই যদি এসব খাদ্যদ্রব্যে সব রকম পুষ্টি উপাদান যোগ করা হত তাহলে এসব খাদ্য দ্রব্য প্রায় সব গুলোই আদর্শ খাদ্যদ্রব্য হয়ে উঠত। এটা না হবার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। যেমন সব ধরণের খাদ্য উপাদান সব মৌসুমে না পাওয়া, খাদ্যে স্বাদবর্ধক যোগ করা এবং অতিরিক্ত সময় ধরে রান্না করা যা খাবারের পুষ্টি উপাদান নষ্ট করে ফেলে। 

সতর্কীকরণ 

তবে কুকুর-বিড়ালদের ভেগান ডায়েট এ অভ্যস্ত করাতে গিয়ে সব সময় যে ভালো ফল পাওয়া গেছে তা না। এক ফরাসি চিকিৎসকের কাছে শোনা একটা ঘটনা এমনটাই দাবী করে। এক দম্পতি তার কাছে তাদের পোষা দুইটা বিড়াল কে নিয়ে আসেন চিকিৎসার জন্যে। বিড়াল দুটোর মুমূর্ষু অবস্থা। শরীর ফুলে গেছে এবং ক্ষুধা প্রায় লাগে না বললেই চলে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানা গেল, বিড়াল গুলো রক্তশূন্যতায় ভোগছে। শরীরে পেশীর ঘনত্ব একদম কমে গেছে। সেই সাথে বিড়াল গুলোর দেহে ভিটামিন বি৯ তথা ফলিক এসিড একদমই নেই বললেই চলে। চিকিৎসক জানান ঐ দম্পতি গত পাঁচ মাস ধরে এদের পোষা বিড়াল দুটোকে উদ্ভিজ্জ খাদ্য দিচ্ছেন। তাই তিনি তাদের পুনরায় আগের গতানুগতিক খাদ্য প্রদানের পরামর্শ দেন। কিন্তু তারা জানান, তারা তাদের বিড়াল দুটোকে প্রানিজ খাদ্য প্রদান করতে রাজি নন। তখন তিনি ব্যবস্থাপত্রে কিছু পুষ্টি উপাদানের সাপ্লিমেন্ট লিখে দেন। 

মাস খানেক বিড়াল দুটিকে খাবারের সাথে সাপ্লিমেন্ট খাওয়ানো হল। তাতেও  স্বাস্থ্যের উন্নতি না হওয়ায় তারা পুনরায় বিড়াল দুটোকে প্রানিজ খাদ্য প্রদান করেন। কিছুদিনের মধ্যেই বিড়াল দুটি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠল। ঐ পশুচিকিৎসক জানান, আসলে বিড়াল দুটিকে যেই উদ্ভিজ্জ খাদ্য খাওয়ানো হচ্ছিল, তাতে ফলিক এসিড সহ অন্যান্য ভিটামিন বি এর বেশ ঘাটতি ছিল। তা স্বত্ত্বেও, সবরকম পুষ্টি সমৃদ্ধ ভেগান ডায়েট কুকুর-বিড়াল এর জন্যে ভালো খাদ্যাভ্যাস হতে পারে। নাইট এর মতে এর পেছনে দুটো কারণ কাজ করতে পারে- এক. ভেগান ডায়েট এ অ্যালার্জির অনুপস্থিতি, এবং দুই. কুকুর-বিড়াল এর শরীরের ঠিকঠাক ওজন বজায় রাখতে। যেহেতু গতানুগতিক খাবারে অতিরিক্ত ক্যালরি উপস্থিত থাকে, তাই গতানুগতিক খাদ্যাভ্যাস পরিহার করাই ভালো। দ্বিতীয় কারণটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা আজকের দিনে মানুষের মতন কুকুর-বিড়ালের জন্যেও স্থুলতা একটা সাধারণ সমস্যা এবং দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

তবে পশুচিকিৎসকরা এ ব্যাপারে এখনো সন্দিহান। ব্রিটিশ ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশন (BVA-British Veterinary Association) এর প্রেসিডেন্ট জাস্টিন শটন বলেন, “ভেগান ডায়েট কুকুর-বিড়ালের জন্যে আদর্শ খাদ্যাভ্যাস হতে পারে- এই বিষয়ে একেবারে নিশ্চিত হবার মতন যথেষ্ট তথ্য উপাত্ত এখনো পাওয়া যায় নি। এ বিষয়ে আরো বিস্তর গবেষণা দরকার। তিনি মনে করেন, বিড়াল যেহেতু অপরিহার্য ভাবে মাংসাশী প্রাণী তাই এদের ভেগান ডায়েট প্রদান করা উচিত নয়।” 

ফ্রান্সের এই ঘটনার পর থেকে সেখানে গবেষকরা, পোষা প্রাণীদের ভেগান ডায়েট প্রদান করার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। যুক্তরাজ্যে পশু কল্যাণ আইন অনুসারে বলা হয়েছে, “মালিকদের অবশ্যই তাদের পোষা প্রাণীদের পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টিকর খাদ্য প্রদানে সচেষ্ট থাকতে হবে। কেউ সেটা করতে না পারলে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।” এতসব কিছুর পরেও নাইট এবং তার সহকর্মীরা মনে করেন, উদ্ভিজ্জ নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস এর মাধ্যমেও কুকুর-বিড়ালদের সবরকম পুষ্টি উপাদানের চাহিদা মেটানো সম্ভব। এ বিষয়ে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণাদিও আছে। 

তথ্যসূত্রঃ নিউ সায়ন্টিস্ট ম্যাগাজিন এর মিটস ফ্রি মাটস এন্ড মগিস প্রবন্ধ আলোকে লেখা।

লেখাটি 57-বার পড়া হয়েছে।

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 906 other subscribers