নীল গ্রহের দানবেরা

লেখাটি , বিভাগে প্রকাশিত

প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীর কথা ভাবলেই আমাদের কল্পনায় ভেসে উঠে অতিকায় সব প্রাণীর ছবি। তখন জল-স্থল-আকাশ দাবড়িয়ে বেড়াতো আড়াই মিটার লম্বা মিলিপিডরা, এগারো মিটার বিস্তৃত ডানা বিশিষ্ট দৈত্যাকার উড়ন্ত ডাইনোসর এবং প্রায় একটন ওজনের সাপ। কিন্তু সর্বকালের সবচাইতে বড় দানব প্রাণীটিকে খুঁজে পেতে হলে আপনাকে প্রাগৈতিহাসিক যুগের দিকে তাকাতে হবে না। আমাদের সময়ের সাগর দানব নীল তিমিকেই ধরা হত সর্বকালের সবচাইতে বিরাটাকার প্রাণী। নীল তিমির ওজন প্রায় দুইশ টন এবং লম্বায় ত্রিশ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। গত প্রায় বিলিয়ন বছরের ইতিহাসে এর চাইতেও বড় কোন প্রাণী ছিল বলে বিজ্ঞানীদের জানা ছিল না।  

কিন্তু প্রচলিত এই ধারণা থেকে বিজ্ঞানীরা এখন নড়েচড়ে বসেছেন। সম্প্রতি পাওয়া একটা ফসিল রেকর্ড বলছে ভিন্ন কথা। বিগত দুইশ থেকে আড়াইশ মিলিয়ন বছরের মধ্যে নীল তিমির থেকেও বড় আকারের প্রাণী সাগর দাবড়িয়ে বেড়াতো। সময়টা ছিল পৃথিবীর সবচাইতে বড় গণবিলুপ্তির কিছু সময় পরে। দৈত্যাকার এই প্রাণী দেখতে কেমন ছিল কিংবা এর নাম পর্যন্তও এখনো অজানা। তবে বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে চলেছে যেই প্রশ্নটা, প্রাগৈতিহাসিক সাগরে এত বিশাল আকৃতির প্রাণী কি খেয়ে বেঁচে ছিল?  

নীল তিমি। ছবি সূত্রঃ লাইভ সায়ন্স

ডাইনোসরেরা যখন পৃথিবীর সম্রাট তখন সাগর শাসন করত প্লেসিওসর আর মোজেসরদের মত সরীসৃপরা। প্লেসিওসরদের গলা ছিল বেশ লম্বা আর মোজেসর’রা দেখতে অনেকটা বিশাল কুমিরের মতন ছিল, এদের পাখনাও ছিল। কিন্তু ফসিল রেকর্ড বলছে, সাগরের হর্তা-কর্তাদের মধ্যে 

তৃতীয় আরেকটা দলও ছিল। এই গ্রুপের সদস্যদের প্রথম ফসিল পাওয়া যায় ১৮১১ এবং ১৮১২ সালে ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত লাইম রেজিস এ। ফসিল সন্ধানকারীদের অগ্রদূত মেরি অ্যানিং এবং তার ভাই জোসেফ এই ফসিল গুলো আবিষ্কার করেন। ব্রিটিশ সার্জন এভারার্ড হোম সেগুলোকে বিশ্লেষণ করে ১৮১৪ এবং ১৮২০ সালের মধ্যে ধারাবাহিক ভাবে কয়েকটা গবেষণা পত্র লেখেন। কিন্তু ফসিলে পাওয়া এই প্রাণীটির শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে হোম নিশ্চিত ছিলেন না। একদিক থেকে ভাবলে মনে হয় এরা সরীসৃপ আবার অন্যদিক দিয়ে মনে হয় বিশাল আকৃতির কোন মাছ।

পরবর্তী কিছু দশকের মধ্যে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, এই প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীটি ছিল মূলত একটি সরীসৃপ। এদের নাম রাখা হয় ইকথাইওসরাস। এই নামের অর্থ “টিকটিকি মাছ”। পৃথিবীর ইতিহাসের ২৫.২-৬.৬ কোটি বছর অবধি সময়টাকে ধরা হয় মেসোজোয়িক মহাযুগ। ট্রায়াসিক, জুরাসিক এবং ক্রেটাসিয়াস- এই তিন যুগ নিয়ে হচ্ছে মেসোজোয়িক মহাযুগ। লাইম রেজিস এ পাওয়া ফসিল বলছে ইকথাইওসরাস’রা বাস করত জুরাসিক যুগে। তবে পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তে পাওয়া ফসিল বলছে, জুরাসিকের আগের ট্রায়াসিক এবং পরে ক্রেটাসিয়াস যুগেও এরা ছিল। ইকথাইওসরাস হল একটি ডায়াপ্সিড। বলে রাখা ভালো, ডায়াপ্সিড’রা হলো সরোপসিডদের বংশধর। সকল সরীসৃপরা এই বংশ থেকে বিবর্তিত হয়েছে। 

ম্যারি অ্যানিং এর আবিষ্কৃত ইকথাইওসরাস এর ফসিল। ছবি সূত্রঃ অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি মিউজিয়াম অব নেচারাল হিস্ট্রি

জুরাওসিক এবং ক্রেটাসিয়াসের ইকথাইওসরাস’রা দেখতে প্রায় একই। দেহের গড়ন অনেকটা ডলফিন আর টুনা মাছের মাঝামাঝি। দৈর্ঘ্যে কয়েক মিটার লম্বা। বিবর্তনের ধারায় স্তন্যপায়ী ডলফিন আর তিমির মত এরাও ডাঙা থেকে পরে সমুদ্রে ফিরে গেছে। সমুদ্রে টিকে থাকার জন্যে এদের পা গুলো ডানার মতন ফ্লিপার হয়ে গিয়েছিল। গত বছর জানুয়ারি মাসে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা একটি সম্পূর্ণ ইকথাইওসরাসের কঙ্কাল উন্মোচন করেন। দৈর্ঘ্যে দশ মিটার লম্বা এই ফসিলটি পাওয়া গিয়েছিল রুটল্যান্ডে, ১৮২ মিলিয়ন বছরের পুরোনো একটি জুরাসিক শিলার উপর। এরা সাইজে একটা হোয়াইট হাঙ্গরের দ্বিগুণ হবে। তবুও একটা নীল তিমি এর থেকে তিন গুণ বড় হবে।  

তবে ট্রায়াসিকের ইকথাইওসরাস’রা আকারে আরও বিশাল। ২০০৪ সালে পশ্চিম কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় সিকান্নি চিফ নদীর তীরে একটি বিশাল ( প্রায় একুশ মিটার লম্বা ) ইকথাইওসরাসের ফসিল এর সন্ধান মেলে। এর আবিষ্কারক হলেন এলিজাবেথ নিকোলস, তিনি তখন কানাডার আলবার্টায় দ্য রয়েল মিউজিয়ামে কর্মরত ছিলেন এবং তার সহকর্মী মাকোতো মানবে, তিনি জাপানে ন্যাশনাল সায়েন্স এন্ড নেচার মিউজিয়ামে কর্মরত ছিলেন। ফসিলটি ২১৮ মিলিয়ন বছরের পুরোনো ট্রায়াসিক যুগের। গবেষকদের মতে এটি ইকথাইওসরাসের একটি নতুন প্রজাতি, বৈজ্ঞানিক নাম শোনিসরাস সিকানিয়েন্সিস। বিশাল আকারের জন্যে এরা গিনিস বুক রেকর্ডে সর্বকালের সবচাইতে বড় সামুদ্রিক সরীসৃপ হিসেবে জায়গা করে নেয়। 

কলাম্বিয়ায় পাওয়া জীবাশ্ম কঙ্কালটি এখনো অসম্পূর্ণ। এর ত্রিশ থেকে চল্লিশ শতাংশ এখনো খুঁজে পাওয়া যায় নি। তবে এই পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া সবচাইতে বড় ইকথাইওসরাসের জীবাশ্ম এটি। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন বৃহৎ প্রাণীর সন্ধান খুব কমই মেলেছে। হাতে গণা কয়েকটা গ্রুপের প্রাণীর শরীরের ওজন বিশ টন অতিক্রম করেছে। এদের মধ্যে আছে লম্বা ঘাড়ওয়ালা সরোপড ডাইনোসর, তিমি। তবে ট্রায়াসিকের ইকথাইওসরাস’রা সম্ভবত এদেরকেও ছাড়িয়ে যাবে। ২০১৬ সালে দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডের লিলস্টকে প্রায় এক মিটার লম্বা একটা হাড়ের ফসিল খুঁজে পাওয়া যায়। এর আবিষ্কারকর্তা পল দে লা সল্লে, বর্তমানে এচ কালেকশন মিউজিয়াম অব জুরাসিক মেরিন লাইফ-এ কর্মরত আছেন। পরে জানা যায়, জীবাশ্মটি একটা ইকথাইওসরাসের নিচের চোয়ালের অংশ ছিল যার বয়স ২০৫ মিলিয়ন বছর। 

দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডের লিলস্টকে প্রায় এক মিটার লম্বা একটা হাড়ের ফসিল খুঁজে পাওয়া যায়। ছবি সূত্রঃ ইউরোপিয়ান সায়ন্টিস্ট

একবারটি ভেবেই দেখুন, চোয়ালের একটা অংশ-ই যদি এত বড় হয় তাহলে পুরো ইকথাইওসরাসের দেহের আকার কত খানি হবে? বিজ্ঞানীদের অনুমান বলছে, পুরো ইকথাইওসরাসটি’র দেহের আকার ২০-২৫ মিটার লম্বা হতে পারে। যদি এই অনুমান সত্যি হয়, তাহলে শোনিসরাস সিকানিয়েন্সিস- এর আকারও হার মানবে এদের কাছে।  ১৮৪০ থেকে ১৯৫০ সাল, এই শ খানেক বছরের ভেতর অস্ট ক্লিফে পাঁচটি লম্বা লম্বা হাড়ের ফসিল পাওয়া যায়। অস্ট ক্লিফ লিলস্টক উপকূল থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। প্রথমে ধরে নেয়া হয়েছিলো  এগুলো সম্ভবত ডাইনোসর কিংবা স্থলে বাস করা অন্য কোন সরীসৃপ এর পায়ের হাড় হবে। তবে হাড় গুলোর কোনটায় অদ্ভুত রকমের গর্তের উপস্থিতি বিজ্ঞানীদের মনে সন্দেহ জাগায়। এই গর্ত হাড় গুলোকে বরং কোন ইকথাইওসরাসের চোয়ালের হাড় হবার ব্যাপারে ইঙ্গিত দেয়।   

পরবর্তীতে গবেষকরা পুনঃনিরীক্ষণ করে নিশ্চিত হন যে, অস্ট ক্লিফে খুঁজে পাওয়া হাড়গুলো মূলত বড় কোন ইকথাইওসরাসের চোয়ালের অংশ। সেই ইকথাইওসরাস সাইজে কত বড় হতে পারে? বিজ্ঞানীদের অনুমান বলে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ মিটার লম্বা। লিলস্টকে খুঁজে পাওয়া ইকথাইওসরাসের চাইতেও অনেক বড়। হার মানাবে আমাদের কালের দানব নীল তিমির আকারকেও। তবে বিজ্ঞানীদের এই অনুমান কতটা সঠিক হতে পারে? প্রজাতির বিবর্তনের সাথে সাথে, তাদের দেহের ভিন্ন ভিন্ন অংশ পরিবর্তিত হয় ভিন্ন ভিন্ন হাড়ে। এমনটা হতেই পারে, লিলস্টক এবং অস্ট ক্লিফে খুঁজে পাওয়া ইকথাইওসরাসদের মাথার সাইজ দেহের অন্যান্য অংশের তুলনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বৃহৎ ছিল। ফলত এদের দেহের আকার অতটা লম্বা নাও হতে পারে। 

তবে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, ট্রায়াসিকের ইকথাইওসরাসদের আকার ছিল অকল্পনীয় রকমের বড়। ১৮৭৮ সালে ভূতত্ত্ববিদ জেমস হেক্টর তার গবেষণাপত্রে ইকথাইওসরাসের একটা  কশেরুকার কথা উল্লেখ করেন। কশেরুকাটির ব্যাস ছিল ৪৫.৮ সেন্টিমিটার। এটি খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল নিউজিল্যান্ড এ। যদি এই তথ্য সত্য হয় তাহলে এটিই হবে এযাবৎ কালের সবচাইতে বড় ইকথাইওসরাস’টির ফসিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে ফসিলটি হারিয়ে গেছে, হয়ত কোন ট্রান্সপোর্ট জাহাজ থেকে সাগরে পড়ে গিয়ে। তার মানে পৃথিবীতে কখনো নীল তিমির চাইতেও বড় আকারের কোন দানবের অস্তিত্ব ছিল কিনা সে ব্যাপারে একদম নিশ্চিত হবার কোন প্রমাণ এখনো নেই। 

ইকথাইওসরাসদের পূর্বসূরিদের আকার কেমন ছিল?  

নিউজিল্যান্ড এ পাওয়া ফসিল বিজ্ঞানীদের মনে কৌতূহল রেখেই হারিয়ে যায়। তবে গবেষকরা ২১ মিটার লম্বা ইকথাইওসরাসের ব্যাপারে নিশ্চিত। কিন্তু এরা আকারে নীল তিমিকে হার মানাতে পারে কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায় নি। এর কারণ এত বড় ইকথাইওসরাসের কঙ্কালের পূর্ণাঙ্গ ফসিল এখনো খুঁজে পাওয়া যায় নি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই ইকথাইওসরাসদের বিবর্তনের ইতিহাস কি? কেনইবা এদের আকার এত বড় হলো? 

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচাইতে বড় গণবিলুপ্তি ঘটে  আজ থেকে ২৫ কোটি বছর আগে। এর নাম পারমিয়ান-ট্রায়াসিক এক্সটিঙ্কশন। সমুদ্রের প্রায় ৯৬% প্রাণী এবং স্থলের প্রায় ৭০% প্রাণীই হারিয়ে যায় এই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞে। ঠিক কি কারণে এই গণবিলুপ্তি ঘটে ছিল সে ব্যাপারে কেউই সঠিক ভাবে বলতে পারে না। কারো কারো মতে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত, উল্কাপাত কিংবা কাছের কোন সোপারনোভা বিস্ফোরণ ছিল এই গণবিলুপ্তি’র কারণ। সে যে কারণেই ঘটুক না কেন এক ভয়াবহ ধ্বংসলীলার মধ্য দিয়ে শেষ হয় পারমিয়ন যুগের। শুরু হয় ট্রায়াসিক যুগ। পারমিয়ান-ট্রায়াসিক এক্সটিঙ্কশনের কারণে, ট্রায়াসিকের শুরুর দিকে সমুদ্র প্রায় প্রাণহীনই ছিল বলা যায়। 

পারমিয়ান-ট্রায়াসিক এক্সটিঙ্কশন। সমুদ্রের প্রায় ৯৬% প্রাণী এবং স্থলের প্রায় ৭০% প্রাণীই হারিয়ে যায় এই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞে। ছবি সূত্রঃ আর্থ আর্কাইভ

এর চার মিলিয়ন বছর পর পৃথিবীর মাটিতে আগমন ঘটে আদি-ইকথাইওসরাসদের। সময়টা আজ থেকে ২৪৮ মিলিয়ন বছর আগের। আদি-ইকথাইওসরাস’দের সাইজ ছিল খুবই ছোট। এপর্যন্ত খুঁজে পাওয়া সবচাইতে পুরানা আদি-ইকথাইওসরাস প্রজাতি দুইটা হচ্ছে- কার্টোরহিঙ্কাস লেন্টিকার্পাস এবং স্ক্লেরোকারমাস পারভিসেপস। এদের প্রথমটার আকার দৈর্ঘ্যে মাত্র ০.৪ মিটার এবং পরেরটার হচ্ছে ১.৬ মিটার। তবে দীর্ঘদিন ইকথাইওসরাস’রা ক্ষুদ্রাকৃতির থাকে নি। ২০১৮ সাল নাগাদ, নরওয়ের অস্লো বিশ্ববিদ্যালয়ের লেন লিবে ডেলসেট এবং তার সহকর্মীরা, নরওয়ের উত্তর উপকূলে অবস্থিত স্পিটসবার্গেনঅফ দ্বীপে ইকথাইওসরাসের কিছু দেহাবশেষ খুঁজে পান। ফসিল গুলো ট্রায়াসিকের শুরুর ৫ থেকে ১০ মিলিয়ন বছরের মধ্যে কোন এক সময়ের। এগুলো থেকে ধারণা করা যায়, ট্রায়াসিকের শুরুর দিকেও কয়েক মিটার লম্বা ইকথাইওসরাস ছিল।  

২০২১ সালে স্যান্ডার এবং তার সহকর্মীরা নেভাদার ফসিল পর্বতে, দুই মিটার লম্বা একটি ইকথাইওসরাসের মাথার খুলি ও সাথে আরও কিছু হাড়ের ফসিল এর সন্ধান পান। স্যান্ডার ধারণা করেন, ইকথাইওসরাসটি অন্তত সাড়ে সতেরো মিটার লম্বা হবে। এর নাম রাখা হয় সাইম্বোস্পন্ডিলস ইয়ংওরাম। গবেষকদের মতে, আজ থেকে ২৪৬ মিলিয়ন বছর আগে, পারমিয়ান-ট্রায়াসিক এক্সটিঙ্কশন এর ৬ মিলিয়ন বছর পর এরা পৃথিবীতে বাস করত। অর্থাৎ আদি-ইকথাইওসরাসদের আগমনের দুই মিলিয়ন বছর পরে এদের আগমন ঘটে। পারমিয়ান-ট্রায়াসিক এক্সটিঙ্কশন এর কিছু মিলিয়ন বছর পরে ইকথাইওসরাস’রা ডাঙা ছেড়ে পানিতে চলে গিয়েছিল। নেভাদায় পাওয়া ফসিল জানান দিচ্ছে, পানিতে চলে যাবার পরে ইকথাইওসরাসদের আকার তড়তড় করে বাড়তে থাকে। খুবই দ্রুত গতিতে।  

ইকথাইওসরাস’দের দেহের আকার কি করে এত দ্রুত বাড়তে থাকলো?   

ডাঙা ছেড়ে পানিতে যাওয়ার পর অবাক করা গতিতে ইকথাইওসরাস’দের দেহের আকার বাড়তে থাকে। নীল তিমিরাও ডাঙা ছেড়ে পানিতে বসবাস শুরু করেছিলো। তবে তাদের এত বিশাল আকৃতিতে বিবর্তিত হতে সময় লেগেছে দশ মিলিয়ন বছর। সেই তুলনায় ইকথাইওসরাস’রা অনেক কম সময়ে ( মাত্র ২ মিলিয়ন বছর ) বিশাল আকৃতির সাগর দানবে পরিণত হয়েছে। এর পেছনে কারণ কি হতে  পারে? কেউ  কেউ মনে করেন, তখন পানিতে ইকথাইওসরাস’দের সাথে পাল্লা দেবার মতন তেমন কেউ ছিল না। আগেই বলেছি, ইকথাইওসরাস’দের আগমন ঘটেছে পারমিয়ান-ট্রায়াসিক এক্সটিঙ্কশন এর কিছু সময় পরেই, যখন সাগর প্রায় প্রাণহীন ছিল। ফলত সাগরের পরিবেশ ইকথাইওসরাস’দের  বিবর্তিত হবার জন্যে বেশ অনুকূলে ছিল। 

নীল তিমিদের এত বিরাট আকারে বিবর্তিত হবার জন্যে সবচাইতে প্রচলিত হাইপোথিসিস হলঃ পৃথিবী ঠাণ্ডা হতে থাকলে কিছু কিছু জায়গায় বিশেষ করে সাগরে প্রাণীদের প্রজনন ক্ষমতা বেড়ে গিয়েছিল। ফলত পৃথিবী যখন গ্লাসিয়াল সাইকেলে প্রবেশ করে, তখন নীল তিমির দেহের আকার বাড়তে থাকে। কিন্তু ট্রায়াসিক এ এমন কিছুই ঘটে নি। কিন্তু দেহের এত বিশাল আকার কোন প্রাণীকে কি সুবিধা দেয়? উত্তরটা খুবই সোজা- কেউই তাকে ধরাশায়ী করতে পারবে না এত সহজে। এইটা একটা বড় সুবিধা টিকে থাকার ক্ষেত্রে। দৈত্যাকৃতির দেহের জন্যে খাবারও চাই সেরকম। প্রশ্ন হচ্ছে সে সময় এই বিশাল দানবেরা কি খেয়ে বেঁচে থাকতো?   

নীল তিমির বিবর্তন। ছবি সূত্রঃ জুলি ব্রিজ

তিমিদের কথাই ভাবা যাক। বিশ মিটার লম্বা স্পার্ম তিমিদের দাঁত থাকায় এরা দারুণ শিকারি। এদের শিকারের তালিকায় থাকে স্কুইড এবং সমুদ্রের অন্যান্য বড় বড় প্রাণী। কিন্তু সাগর দানব নীল তিমিদের দাঁত নেই। এরা ফিল্টার ফিডার। এদের খাবার তালিকায় থাকে ছোট ছোট প্ল্যাঙ্কটন এবং ক্রিল। দাঁতবিহীন ফিল্টার ফিডারদের দেহ এত বিশাল আকারের হবার পেছনে কারণ আছে। সমুদ্রের বেশির ভাগ প্রাণীই ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন খেয়ে বেঁচে থাকে। ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন’রা হলো একটি খাদ্য শৃঙ্খলের প্রাথমিক উৎপাদক। এরা সরাসরি সূর্যের আলোকে ব্যবহার করে শর্করা তৈরি করে। ছোট ছোট প্রাণীরা সরাসরি ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন’দের খায় আর বড় প্রাণীরা ছোট প্রাণী গুলোকে খেয়ে বেঁচে থাকে। সাধারণত একটা খাদ্য শৃঙ্খলে অনেক গুলো ধাপ থাকে। প্রতিটা ধাপেই শক্তির ব্যয় ঘটতে থাকে। 

তাই কোন বড় প্রাণী যদি সরাসরি ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন এবং বেশি বেশি ছোট ছোট প্রাণীদের খায় তাহলে এরা তুলনামূলক বেশি শক্তি পায়। অপরদিকে যারা বড় প্রাণী শিকার করে খায় তারা এত বিরাট আকার দেহ চালনার জন্যে যথেষ্ট শক্তি পায় না। 

কিন্তু ইকথাইওসরাস’দের দাঁত ছিল। এরাও স্পার্ম তিমিদের মতন ভীষণ শিকারি। তারপরেও এদের দেহ এত বিরাটাকৃতির, এর পেছনে রহস্য কি? পারমিয়ান-ট্রায়াসিক এক্সটিঙ্কশন ট্রায়াসিকের সাগর থেকে বেশির ভাগ প্রাণীকেই কেড়ে নেয়। আর তাই ট্রায়াসিকের সাগরের খাদ্য শৃঙ্খল গুলো ছিল ছোট ছোট। তখন সাগর ছিল অ্যামোনাইটস, শাঁস সহ মোলাস্কা আর বান মাছের মতন দেখতে কনডন্টে ভরপুর। এইসব বেশির ভাগ প্রাণীরই সাইজ দশ সেন্টিমিটার এর বেশি ছিল না। ইকথাইওসরাস’দের তখন উপায়ন্তর না দেখে এসব খেয়েই বেঁচে থাকতে হয়েছে। সাইজে ছোট হলেও এসব প্রাণী ছিল প্রাইমারি খাদক। এরা সরাসরি উৎপাদক’কে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করত। আর তাই এরা ইকথাইওসরাস’দের প্রচুর পরিমাণ শক্তির জোগান দিয়েছে যা তাদের এত বড় শরীর টিকিয়ে রাখার জন্যে যথেষ্ট ছিল।     

ট্রায়াসিক-এক্সটিঙ্কশন। ছবি সূত্রঃ আরস টেকনিয়া

বিরাটাকার এই দানব ইকথাইওসরাস’রা ট্রায়াসিক যুগের শেষ অবধি বেঁচে ছিল। ২০২২ সালের এপ্রিলে, স্যান্ডার এবং তার সহকর্মীরা সুইজারল্যান্ড এর আল্পসে একটি ইকথাইওসরাসের দাঁতের ফসিল খুঁজে পান। এটি দশ সেন্টিমিটার লম্বা ছিল। স্যান্ডার এর মতে  ইকথাইওসরাসটি সাইজে ২০ মিটার লম্বা হতে পারে। এরা বাস করত ট্রায়াসিকের একদম শেষ দিকে। ট্রায়াসিক যুগের শেষ হয় আরেকটি বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে। এর নাম ট্রায়াসিক-এক্সটিঙ্কশন। একসময় পৃথিবীর সকল মহাদেশ “প্যাঞ্জিয়া” নামে একটা একক উপমহাদেশ হিসেবে একত্রিত ছিল। যখন এটি ভাঙতে শুরু করল তখনই ঘটে এক ভয়াবহ আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত। আর এর ফলেই ঘটে এই ট্রায়াসিক-এক্সটিঙ্কশন।   

এরই মধ্য দিয়ে হারিয়ে যায় দানবাকৃতির সব ইকথাইওসরাস। পরবর্তী জুরাসিক যুগে কিছু কিছু ছোট ছোট ইকথাইওসরাস টিকে ছিল। বিরাটাকার ইকথাইওসরাস’দের বিলুপ্তির পেছনে এদের দৈত্যাকৃতির দেহও একরকম দায়ী ছিল। কেননা ট্রায়াসিক-এক্সটিঙ্কশনের সময় একে একে সব অ্যামোনাইটস আর কনডন্টে’র পরিমাণও কমে আসে। ফলে ইকথাইওসরাস’দের বিশাল দেহের জন্যে পর্যাপ্ত খাদ্যের জোগানও শেষ হয়ে গিয়েছিল। পৃথিবীতে যখনই কোন গণবিলুপ্তি’র ঘটনা ঘটেছে, বিরাটাদেহী প্রাণী গুলোই বেশি হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। এভাবেই পৃথিবীর মাটি থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় অতিকায় সব ইকথাইওসরাস’রা। এর পর জুরাসিক যুগে শুরু হয় ডাইনোসর সাম্রাজ্যের। এরাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় বিরাট এক গণবিলুপ্তির মধ্য দিয়ে ক্রেটাসিয়াস এর শেষে। আর এরপরে নীল তিমিরা তাদের বিবর্তনের যাত্রা শুরু করে ইওসিন যুগে। তবে খুব সম্ভবত পৃথিবীর সবচাইতে বড় দানবেরা বাস করত ট্রায়াসিক যুগেই। 

বি.দ্র. লেখাটি পূর্বে দৈনিক বাংলা পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল।

তথ্যসূত্রঃ নিউ সায়ন্টিস্ট   

লেখাটি 42-বার পড়া হয়েছে।

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 904 other subscribers