শহরের প্রাণীরা কি বিবর্তিত হচ্ছে?  

লেখাটি বিভাগে প্রকাশিত

বিবর্তন একটি অবিরাম চলমান প্রক্রিয়া। এর যাত্রা প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন বছর আগে, পৃথিবীতে যখন বেজে উঠে প্রথম প্রাণের স্পন্দন। এখনো জীবদেহের ভেতরে সর্বদা এই প্রক্রিয়া চলমান। সত্যিই কি তাই? আরও সরল করে প্রশ্নটা করলে, আপনার শহুরে জীবজগতের বেলায়ও কি কথাটা সত্য? প্রকৃতিবিদদের চোখে, আমাদের পৃথিবীর ইতিহাস দুঃখ-ক্লেশে পরিপূর্ণ। বিলুপ্তি, প্রাচীন বন-জঙ্গল ধ্বংস, বন্যা, অগ্নিকাণ্ড- কি ঘটে নি! কিন্তু বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানীদের কাছে বিষয়টা খুবই স্পষ্ট। বিবর্তন এখনো ঘটে চলেছে। এমনকি আপনি এবং আপনার আশেপাশে শহুরে জীবকুলের বেলায়ও কথাটা প্রযোজ্য। খুবই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে, আমাদের চারপাশের পরিবর্তনটা টের পাওয়া যাবে। বিবর্তন কি করে একটা নতুন জগতের জন্ম দিচ্ছে। 

অধ্যাপক রব ডান এর লেখা “অ্যা ন্যাচারাল হিস্ট্রি অব ফিউচার”– বইয়ের প্রচ্ছদ।

বহু শতাব্দী জুড়ে, বিবর্তনকে বিবেচনা হয়েছে একটা বেশ ধীর প্রক্রিয়া হিসেবে। কিন্তু গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতায় বিজ্ঞানীদের এই ধারণা পাল্টে গেছে। বিবর্তন বেশ দ্রুতও ঘটতে পারে, এমনকি এক দিনের ভেতরেও। উদাহরণ হিসেবে করোনা ভাইরাসের কথা বলা যায়। নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটির পরিবেশবিদ্যার অধ্যাপক রব ডান, তার “অ্যা ন্যাচারাল হিস্ট্রি অব ফিউচার” বই-য়ে দাবি করেছেন, শহরে বিবর্তন ঘটে চলেছে অস্বাভাবিক রকম দ্রুত গতিতে। মানুষ বিবর্তন প্রক্রিয়াকে আবিষ্কার করেছিল গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ এর মতন বন্য জীবনে। সে জীবন থেকে বহু দূরে গড়ে উঠেছে শহরতলি। তাতে কি? মানুষের প্রকৃতির উপর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা কিংবা প্রকৃতি নিধন কার্যকলাপ, কোনো কিছুই প্রকৃতির নিয়মকে নতুন করে লিখতে পারবে না। মানুষের কার্যকলাপ বরং বিবর্তনের গতিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। জীবজগতে ঘটে চলেছে আমূল পরিবর্তন। ভবিষ্যতে কি কি নতুন প্রজাতির উদ্ভব হতে পারে, বিবর্তনের আইন সে বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে। গাণিতিক পরিবেশবিদ রবার্ট ম্যাকআর্থার এবং বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী এডওয়ার্ড অসবোর্ন উইলসন, “দ্য থিওরি অব আইসল্যান্ড বায়োজিওগ্রাফি” নামে একটা মডেল দাঁড় করান। এই মডেল কোনো দ্বীপে জীবজগতে বিবর্তনের গতিকে ব্যাখ্যা করে। 

পুলিৎজার পুরষ্কার জেতা বই “দ্য অ্যান্ট” বই এর লেখক বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী এডওয়ার্ড অসবোর্ন উইলসন।

এই বিজ্ঞানী দ্বয় ১৯৬৭ সালে একটা বই লিখেন। বইটায় তারা দেখান একটা দ্বীপ মূল ভূখণ্ডের কতটা কাছাকাছি হতে পারে। দ্বীপ যত বড় হবে তত বেশী জীবপ্রজাতি সেখানে বসবাস শুরু করবে, তত বেশী প্রজাতি সেখানে টিকে থাকতে পারবে। বড় দ্বীপে নতুন প্রজাতি বিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। বিষয়টা কেবল সত্যিকারের দ্বীপের ক্ষেত্রেই নয়, দ্বীপ-সদৃশ বাসস্থানের (কিন্তু দ্বীপ নয়) বেলায়ও প্রযোজ্য। একটা ভুট্টাখেতকেও তার চারপাশের বন সমুদ্রের সাপেক্ষে দ্বীপের মতই লাগে। ফেইস মাইট’দের (মানুষের মুখে সংক্রমণকারী পতঙ্গ) কাছে আপনার শরীর একটা দ্বীপের মতই। একটা শহরও তাই। বৈশ্বিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমরা নগরায়ণ এর এই বিশাল দ্বীপগুলোর সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছি। সামুদ্রিক দ্বীপের মতন এই বাসস্থানগুলোর ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার প্রযোজ্য- বড় বাসস্থান গুলোয় নতুন প্রজাতি বিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। বিজ্ঞানীরা বেশ কাছ থেকে শহর গুলোয় বিবর্তন প্রক্রিয়াকে পর্যবেক্ষণ করছেন। 

শহরে নতুন প্রজাতি বিবর্তিত হওয়ার একটা উপায় হল বিচ্ছেদ। একটা প্রজাতির কিছু কিছু সদস্য তার সঙ্গীদের ছেড়ে আলাদা বাসস্থানে বসবাস করা শুরু করে। এই প্রক্রিয়া বেশ দীর্ঘদিন ধরেই নতুন প্রজাতি বিবর্তনের চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছে। ঠিক আমাদের পূর্বপুরুষেরা যখন শহরের গোড়াপত্তন করেছেন তখন থেকেই। খাঁচায় বন্দী চড়ই, ঘরের আনাচে কানাচে ছুটে চলা ইঁদুর, গ্রানারি ওইভলস (এক ধরনের লালচে গোবরে পোকা), শস্য পোকা- এদের পূর্বসূরিরা একসময় তাদের স্থানীয় সঙ্গীদের থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। এই প্রক্রিয়া বেশ দ্রুত চলতে থাকে। নিউ ইয়র্কের বাদামি ইঁদুরদের নাক বেশ লম্বা, উপরের পাটিতে আছে ছোট সাইজের মোলার দাঁতের সারি। কিন্তু উনিশ শতকের শেষদিকেও এদের নাক এত লম্বা ছিল না, আর উপরের পাটির মোলার দাঁতের সাইজও ছিল বড়। এর কারণ এখনকার বাদামি ইঁদুর তাদের পূর্বসূরিদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত নরম আর ভালো মানের খাবার খেতে পারে। যুক্তরাজ্যে শহরে বসবাসকারী শেয়াল জনগোষ্ঠীরাও পরিবর্তিত হচ্ছে। গত শতাব্দী থেকে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরে শেয়াল বসবাস শুরু করেছে। এর প্রধান কারণ শহরে মানুষের খাবার উচ্ছিষ্ট প্রাচুর্যতা। শহুরে শেয়ালদের বাসস্থান খুবই ছোট হয়। বুনো শেয়ালদের থাকার জায়গা যেখানে অন্তত ত্রিশ বর্গ কিলো হয়, শহুরে শেয়ালদের জন্যে মাত্র শূন্য দশমিক চার বর্গ কিলো জায়গাই যথেষ্ট। 

এমনকি শহুরে শেয়ালদের হাড়ের গড়নও বিবর্তিত হয়েছে। গবেষণা বলছে, শহুরে শেয়ালদের নাকের সামনের দিকে প্রলম্বিত অস্থি বুনো শেয়ালদের তুলনায় ছোট আর চওড়া হয়। সেই সাথে মাথার খুলির যে পার্টটা মগজ ধারণ করে, তার সাইজও বুনো শেয়ালদের তুলনায় ছোট হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, শেয়ালরা নিজে থেকেই শহুরে জীবনে নিজেদের পোষ মানানোর চেষ্টা করেছে। আমাদের আশপাশে বসবাসে অভ্যস্ত কিছু জীব-জন্তু যেমন শতরঞ্চিতে ঘুরে বেড়ানো গোবরে পোকা (কার্পেট বিটল) কিংবা মাকড়শা, এরা বিবর্তনিক ভাবে বেশ দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে। এদের পক্ষে আর তখন পেছনে ফিরে যাওয়া সম্ভব হয় না। সঙ্গীদের থেকে একবার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে, এরা স্বাধীনভাবে বিবর্তিত হতে থাকে। নতুন পরিবেশে জেনারেশন গুলোতে পরিবর্তন আসার সুযোগও বেশী। বাড়ির আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ানো ছোট ছোট ইঁদুর, কার্পেট বিটল, কিংবা বাইরের বড় ইঁদুর, এরা সবাই-ই সম্পূর্ণ নতুন গতিপথে বিবর্তিত হচ্ছে। 

আপটাউন শহরের ইঁদুর

নিউইয়র্কের ফোর্ডহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেসন মুন্সি-সাউথ এবং তার গবেষণা দল সেখানকার বাদামি ইঁদুর নিয়ে গবেষণা করেন। ২০১৭ সালে তাদের করা জিনোমিক বিশ্লেষণ বলছে, এই ইঁদুরগুলোর দুইটা স্বতন্ত্র জাত আছে। ম্যানহাটন শহর আপটাউন, মিডটাউন আর ডাউনটাউন এই তিন ভাগে বিভক্ত। এই শহরের উত্তর অংশকে বলে  আপটাউন ম্যানহাটন, দক্ষিণ অংশকে বলা হয় ডাউনটাউন ম্যানহাটন। আর মাঝামাঝি এলাকা মিডটাউন ম্যানহাটন হিসেবে পরিচিত। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আপটাউন ম্যানহাটন এর বাদামি ইঁদুর, ডাউনটাউন ম্যানহাটন এর বাদামি ইঁদুরের সাথে রতিক্রিয়া করে না। মিডটাউন ম্যানহাটন মূলত বাণিজ্যিক এলাকা, এখানে মানব বসতি তেমন একটা নেই। সুতরাং এখানে বাড়ির গৃহস্থালির বর্জ্য  আর খোলা উঠান থাকবার সম্ভাবনাও নেই। অনেকটা সেকারণেই মিডটাউন ম্যানহাটনে বাদামি ইঁদুরদের সংখ্যাও খুব কম। 

বাদামি ইঁদুর

এমনকি বিবর্তিত হচ্ছে কবুতরও। মিসৌরির সেন্ট লুইস এ অবস্থিত ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানান, যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরে বাস করা কবুতরও জিনগতভাবে একে অপরের থেকে আলাদা ভাবে বিবর্তিত হচ্ছে। বিবর্তিত হচ্ছে কবুতরের পালকে বাস করা উকুন প্রজাতিরাও। এসব উকুনদের উপরে নির্ভরশীল ব্যাকটেরিয়ারা আরও দ্রুত বিবর্তিত হচ্ছে তাদের আশ্রয়দাতা উকুনদের তুলনায়। অপেক্ষাকৃত কম জেনারেশন টাইমের প্রজাতিরা বেশ দ্রুত বিবর্তিত হয়। কেবল অন্ধ প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়াই এখানে কাজ করছে তা নয়, আরো ফ্যাক্টর আছে। ডারউইন তার “দ্য অরিজিন অব স্পিসিস”-বইয়ে বলেছিলেন, ভিন্ন এলাকার প্রজাতিদের মধ্যে আন্তঃপ্রজনন না ঘটলে সেসব প্রজাতি দ্রুত বিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। নিশ্চিতভাবেই ডারউইন এর এই বক্তব্য সঠিক। বর্তমানে এ ধরনের আন্তঃপ্রজননকে ডাকা হয় “জিনের প্রবাহ বা জিন ফ্লো” নামে। সাধারণত যে-সব জীব সহজেই ছড়িয়ে পড়ে দিগ্বিদিকে, ডানার মাধ্যমে, কোনো বাহকের মাধ্যমে (সেটা পাখির মাধ্যমে হোক, উকুনের ভেতরে হোক কিংবা মানুষের সাথে উড়োজাহাজ, ট্রেন, নৌকা কিংবা অটোমোবাইল এ করেই হোক), তাদের ক্ষেত্রে আন্তঃপ্রজনন হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। 

সামুদ্রিক দ্বীপগুলোয় কোনো একটা প্রজাতি স্বতন্ত্র ভাবে বিবর্তিত হবে কিনা সেটা অনেকাংশেই নির্ভর করে তাদের ছড়িয়ে পড়বার সক্ষমতার উপর। গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের ফিঞ্চ পাখিরা স্বল্প পরিমাণ দূরত্বে উড়তে পারে। এরা তাদের প্রধান বাসভূমির আত্মীয়দের থেকে জিনগতভাবে বেশ বিচ্ছিন্ন। ফলত তারা তাদের পূর্বসূরিদের থেকে অনেকটাই আলাদা। গুণাগুণ, আচরণ, চঞ্চুর গড়ন- সবদিক থেকেই প্রতিটা ফিঞ্চ প্রজাতি আর উপপ্রজাতি এখন আলাদা। মকিংবার্ডদের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার লক্ষণীয়। 

নীল রঙা পায়ের ববি পাখি

তবে সেরকমটা হয়নি নীল রঙা পায়ের ববি পাখিদের বেলায়। কারণ এরা বেশ লম্বা দূরত্ব উড়ে যায়। ফলে তাদের ভিন্ন ভিন্ন এলাকার নিজ প্রজাতিদের মধ্যে আন্তঃপ্রজনন হয় বেশী। একই কথা অন্যান্য সামুদ্রিক পাখিদের জন্যেও সত্য। দূরের দ্বীপগুলোয়, একটা প্রাণী কতটা চলতে পারবে তা নির্ধারিত হয় তাদের জৈবিক বৈশিষ্ট্য দিয়ে। শহরের ব্যাপার ভিন্ন। এখানে কোন প্রাণী কতটা পথ অতিক্রম করবে তা অনেকাংশেই নির্ধারণ করে মানুষের কার্যকলাপ। বর্তমানে শহরে আধুনিক ইঁদুরদের তাদের পূর্বসূরিদের থেকে আলাদা হয়ে বিবর্তিত হওয়ার পেছনে একটা কারণ হচ্ছে জাহাজের স্বাস্থ্যবিধির কঠোর নিয়ন্ত্রণ। কারণ এতে ইঁদুর দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়বার সুযোগ কম পায়। কিন্তু ফেইস মাইট’রা (ডেমোডেক্স ফলিকুলরাম) সহজেই আমাদের সাথে সাথে ছড়িয়ে পড়ে এক শহর থেকে অন্য শহরে। ফলত এদের মধ্যে ভিন্নতা সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা কম। লন্ডনের ভূগর্ভস্থ মশারা নজরে আসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। তখন বোমা হামলা থেকে বাঁচতে হাজার হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল ভূগর্ভস্থ স্টেশনে। তারাই প্রথম কিউলেক্স পাইপিয়েন্স এফ. মোলেস্টাস নামের মশাদের সম্মুখীন হয়। এরা কিউলেক্স পাইপিয়েন্স মশাদেরই একটা ভিন্ন জাত।

ফেইস মাইট (ডেমোডেক্স ফলিকুলরাম)

কিউলেক্স পাইপিয়েন্স, সাধারণত গৃহ মশা হিসেবেই পরিচিত। এরা গ্রীষ্মকালে বেশ সক্রিয় থাকে। তখন এদের ডিম পাড়ার সময়। সেজন্যে এদের দরকার হয় মেরুদণ্ডী প্রাণীদের রক্ত। এরা পাখিদের রক্ত বেশি পছন্দ করে, তবে মানুষের রক্তও পান করে। অপরদিকে ভূগর্ভস্থ কিউলেক্স পাইপিয়েন্স মশা সাড়া বছরই সক্রিয় থাকে। এরা পান করে স্তন্যপায়ীদের রক্ত। এদের স্ত্রী সদস্যরা রক্ত ছাড়াই ডিম পাড়তে পারে। এটাও প্রজাত্যায়নের একটা উদাহরণ। মোলেস্টাস জাতের মশারা বেশিরভাগই বাস করে শহরতলির সাবওয়ে, নর্দমা কিংবা প্যারিস, মিনস্কিন বেলারুশ, কিরগিজস্তানের মাইলু-সু, টোকিও এবং নিউইয়র্কের মতো শহরগুলির বন্যা প্লাবিত এলাকায়। সাম্প্রতিক গবেষণা বলে, মোলেস্টাস জাতের মশাদের পূর্বসূরি কিউলেক্স পাইপিয়েন্স মশারা বাস করত মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন শহরগুলোতে। এসব শহরের বেশিরভাগই ফারটাইল ক্রিসেন্ট অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত।

কিউলেক্স পাইপিয়েন্স

কিউলেক্স পাইপিয়েন্স মশারা পরবর্তীতে শীতকালে ঠান্ডার প্রকোপে মধ্যপ্রাচ্য থেকে  উত্তরে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু মোলেস্টাস মশারা রয়ে যায় প্রচণ্ড ঠান্ডায়ও। কেননা শহরের ভূগর্ভস্থ উষ্ণতা এদের আলাদা সুবিধা দেয়। দীর্ঘদিন ধরে মাটির নিচে বসবাস করার কারণে, মোলেস্টাস মশাদের মধ্যে এক নতুন জিন বিবর্তিত হয়। এই জিন গন্ধ শনাক্তকরণ, হজম এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাথে জড়িত। প্রচুর পরিমাণে জৈব বর্জ্য সমৃদ্ধ নর্দমায় টিকে থাকার পেছনেও দায়ী এই জিন। লন্ডনের ভূগর্ভস্থ মোলেস্টাস মশারা প্রতিনিয়তই বিবর্তিত হচ্ছে। ভিক্টোরিয়া লাইন মোলেস্টাস মশারা বেকারলু লাইন মোলেস্টাস মশাদের থেকে জিনগতভাবে আলাদা। কিন্তু গৃহ কিউলেক্স পাইপিয়েন্স মশাদের মধ্যে সেরকম কোনো বিবর্তন চোখে পড়েনি বিজ্ঞানীদের। এর অন্যতম কারণ এরা সহজেই ছড়িয়ে পড়ে আর আন্তঃপ্রজননে অংশ নেয়। 

ভবিষ্যতে কি কোনো নতুন প্রাণী প্রজাতি বিবর্তিত হবে?   

শহুরে ইঁদুর এবং মশা’দের এত দ্রুত গতিতে বিবর্তিত হওয়ার ঘটনা থেকে কি শহরের ভবিষ্যৎ বিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়? কিংবা সামনে শহরে নতুন কোন প্রাণী প্রজাতি বিবর্তিত হবে কিনা সে ব্যাপারে কি আন্দাজ করা যায়? বিবর্তনের পরিণতি বেশ স্বতন্ত্র। কমোডো ড্রাগন কিংবা ছত্রাক-চাষি পিঁপড়েদের অস্তিত্ব নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করাটা কঠিন হলেও বিবর্তনের বড় পরিবর্তনগুলো অনুমানযোগ্য। ঠান্ডা জলবায়ুতে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের দেহের আকার বড় হতে থাকে। শহুরে প্রজাতিদের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার লক্ষ করা যায়। যেমন উত্তরের ইঁদুর বেশ মোটাসোটা হয়। কিন্তু বিষুবীয় অঞ্চলের ইঁদুর ছোট সাইজের হয়। দ্বীপে বিভিন্ন প্রজাতি উড়া এবং ছড়িয়ে পড়বার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। উদাহরণ হিসেবে গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের উড্ডয়ন ক্ষমতাবিহীন করমোরান্টস’দের কথা বলা যায়। অনিশ্চিত আশ্রয়ের খোঁজে দূরদূরান্তে পাড়ি জমানোর চাইতে নিজ আশ্রয়ের ধারে কাছে থেকে যাওয়াটাই বেশী লাভজনক। শহরেও একই ব্যাপার। 

গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের উড্ডয়ন ক্ষমতাবিহীন করমোরান্টস

ফ্রান্সের মন্টপেলিয়ার শহরের হাকসবিয়ারড গাছেদের বীজ ডানা তাদের গ্রাম্য বুনো আত্মীয় প্রজাতিদের থেকে ছোট হয়। গ্রানারি ওইভলসদের ডানা  পুরোপুরিভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কোনো কোনো শহরের ব্ল্যাক বার্ডদের মধ্যে পরিযাণ বন্ধ হয়ে গেছে।দ্বীপগুলোয় কোনো কোনো প্রজাতি সঙ্গম ছাড়াই বংশবৃদ্ধি করবার ক্ষমতা অর্জন করেছে। কোনো কোনো প্রজাতির প্রাণীরা তাদের সঙ্গী ছাড়াই একাকী এসব দ্বীপে বসবাস শুরু করেছে। সুতরাং এই অবস্থায় সঙ্গীর সাথে মিলন ব্যতীত সন্তান জন্ম দিতে পারাটাই এদের জন্যে বেশী সুবিধাজনক। ফলত তাদের জিনপুলে সঙ্গম ছাড়াই সফলভাবে সন্তান উৎপাদন করতে পারার পেছনে দায়ী জিন এর সংখ্যা বাড়তে থাকে। 

ফ্রান্সের মন্টপেলিয়ার শহরের হাকসবিয়ারড গাছেদের বীজ ডানা তাদের গ্রাম্য বুনো আত্মীয় প্রজাতিদের থেকে ছোট হয়

শহরে সুরিনাম রোচ নামে কিছু আমেরিকান তেলাপোকা এবং পিঁপড়াদের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটেছে। প্রজাতিদের অঙ্গসংস্থানিক বিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে এদের  খাদ্যের পর্যাপ্ততা এবং ধরণ সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়। অ্যারিজোনা শহরের গৃহ চড়ই পাখিদের চঞ্চু বেশ বড় এবং শক্ত হয়। শক্ত চঞ্চু দিয়ে এরা সহজেই শহরের মাটিতে খুঁজে পাওয়া শক্ত বীজ ভেঙ্গে খেতে পারে। মানুষ কি ধরনের খাবার খেতে দেয় তার উপর ভিত্তি করেও প্রাণীদের মধ্যে পরিবর্তন আসে। যেমন গৃহ ইঁদুর এবং কুকুর’দের মুখে অপেক্ষাকৃত বেশী পরিমাণ অ্যামাইলেজ এনজাইম তৈরি করে। এর কারণ, মানুষ এদের বেশি পরিমাণ শর্করা জাতীয় খাবার খেতে দেয়। অ্যামাইলেজ শর্করা ভাঙার এনজাইম। শহুরে জীবনের সাথে মানিয়ে নেয়ার আরেকটা উপায় হচ্ছে মগজের ক্ষমতা। যেমন দাঁড়কাকেরা দলবদ্ধ হয়ে ডাস্টবিনের ময়লার ব্যাগ খুলে এর মধ্যে খাবার খুঁজতে জানে। ইতোমধ্যেই শহরে বেশ কয়েকটা পাখি প্রজাতি এমন উদ্ভাবনী বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন হিসেবে বিবর্তিত হয়েছে। যেমন দাঁড়কাক, কাক, রেভেন (দাঁড়কাক এবং কাকের চাইতে বড় সাইজের কাক), জে (বৈজ্ঞানিক নাম- গ্যারুলাস গ্লেন্ডারিয়াস, কাক গোত্রেরই একটা পাখি) এবং তোতাপাখি।

দাঁড়কাকেরা দলবদ্ধ হয়ে ডাস্টবিনের ময়লার ব্যাগ খুলে এর মধ্যে খাবার খুঁজতে জানে

ভবিষ্যতে অপেক্ষাকৃত বড় মগজ আর উদ্ভাবনী বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন প্রাণীরাই শহরে টিকে থাকার ক্ষেত্রে বেশি সুবিধা পাবে বলে আশা করা যায়। তবে শহরে টিকে থাকার জন্যে এটাই একমাত্র উপায় না। যে-সব প্রাণীর মগজের সাইজ ছোট তারাও বেশ সফলভাবে শহরে টিকে থাকতে পারে। যেমন কবুতর আর সুইফটস পাখিদের কথা বলা যায়। এদের শহরে সফলভাবে টিকে থাকার পেছনে কারণ হল, এদের অধিক বেশী সন্তান উৎপাদনের সক্ষমতা। শহরের হাবভাব বেশ বৈচিত্র্যময়। বিচিত্র পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে হলে অবলম্বন করতে হয় ভিন্ন ভিন্ন উপায়। নয়তো অধিক বেশী সন্তান উৎপাদনের সক্ষমতা থাকতে হয়। শহরে প্রাণীদের বিবর্তনের পেছনে বড় কলকাঠি হচ্ছে মানুষ এবং তাদের ব্যবহার্য বিভিন্ন রাসায়নিক বায়োসাইড। জার্মান তেলাপোকা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত স্যুগার ফাঁদ এখন আর তেমন কাজ করে না। কেননা এই তেলাপোকারা এখন স্যুগারের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে না। পাশাপাশি ছারপোকা, জার্মান তেলাপোকা, গৃহ মাছি, গৃহ মশাসহ আরও অনেক ক্ষতিকারক পতঙ্গই বিভিন্ন কীটনাশকের প্রতি রেজিস্ট্যান্স ক্ষমতা অর্জন করেছে। ফলত এসব ক্ষতিকারক পতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ ধরনের বিবর্তনীয় চাপের কারণে ভবিষ্যতে মারাত্মক ধরনের রোগ-বালাই ছড়িয়ে পড়তে পারে। ম্যালেরিয়া পরজীবী বহনকারী মশা’দের দুইটা প্রজাতি তাদের গ্রাম্য বুনো প্রজাতি থেকে স্বতন্ত্রভাবে বিবর্তিত হচ্ছে। এর পেছনে কারণ মানুষের বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট নির্বাচনীয় চাপ। এটা পাখির চঞ্চুর বিবর্তনের মতন দৃশ্যমান বিবর্তন না। শহর বেশ বড়সড় বিবর্তনীয় পরীক্ষার মঞ্চ হিসেবে কাজ করছে। ধীরে ধীরে তা আমাদের চারপাশে উন্মোচিত হচ্ছে। শহরের বিচিত্র পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে প্রতিনিয়ত প্রাণী প্রজাতিগুলোর মধ্যে চলছে বিবর্তন। মানুষের কর্মকাণ্ড ও এখানে সৃষ্টি করছে বিবর্তনীয় চাপ। এসবকিছুই প্রাকৃতিক নির্বাচন এর অবিরাম প্রক্রিয়ার ফল। মানুষ যতই প্রকৃতিতে ধ্বংসযজ্ঞ চালাক না কেন, জীবজগতে বিবর্তন সর্বদা চলতে থাকবে।

তথ্যসূত্রঃ নিউ সায়ন্টিস্ট ম্যাগাজিনের “সিটি অ্যানিম্যাল” প্রবন্ধ আলোকে লেখা।               

লেখাটি 55-বার পড়া হয়েছে।

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।