সৌরজগতের জন্ম হল যেভাবে

লেখাটি , বিভাগে প্রকাশিত

অসীম মহাবিশ্বের বুকে অস্তিত্ব থাকা হয়তো একমাত্র বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষের স্থায়ী ঠিকানা সৌরজগত। তাইতো মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির ওরিয়ন-সিগনাস আর্মে অবস্থিত সূর্য নামের মাঝারি আকৃতির আপাত বৈশিষ্ট্যহীন নক্ষত্রটি মহাবিশ্বের অগনিত অন্য সব নক্ষত্রের মাঝে অনন্য। নিউক্লিয়ার শক্তির বদৌলতে এটি আলোকিত করে চলেছে অবিরাম ঘুরতে থাকা আটটি গ্রহকে। এরা ছাড়াও সূর্যের রাজত্বে আরো আছে কয়েকটি বামন গ্রহ, কয়েকশত উপগ্রহ এবং কয়েক মিলিয়ন গ্রহাণুপুঞ্জের অস্তিত্ব। এদের সবার সরব উপস্থিতিতে পূর্ণতা পায় সোলার সিস্টেম।

আচ্ছা ভাবুন তো, মহাবিশ্বে মোট নক্ষত্রের সংখ্যা কত? বিজ্ঞানীরা এখনো পর্যন্ত নিশ্চিত হতে না পারলেও এদের সংখ্যা খুব সম্ভবত ২০০ বিলিয়ন ট্রিলিয়নের কম হবে না। সংখ্যাটির বিশালতা অনুমান করতে পারছেন? একে লিখতে গেলে প্রয়োজন পড়বে মোট তেইশটি শূন্য! বিজ্ঞানীরা কিন্তু মোটেই খেয়াল খুশি মত এই সংখ্যা নির্ধারণ করেন নি। বরং এর পেছনে রয়েছে বেশ শক্ত যুক্তি। খুব সম্ভবত আমাদের মহাবিশ্বে মোট গ্যালাক্সির সংখ্যা দুই ট্রিলিয়নের কাছাকাছি। যদি এদের প্রতিটিতে গড়ে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির মত ১০০ বিলিয়ন করে নক্ষত্র থাকে, তাহলে মহাবিশ্বে মোট নক্ষত্রের সংখ্যা দাঁড়ায় ২ × ১০২৩ টি। অর্থাৎ, ২০০ বিলিয়ন ট্রিলিয়ন। এই কল্পনাতীত সংখ্যক নক্ষত্রগুলো কি নিজ পরিমন্ডলে নিঃসঙ্গ পথিকের মত একা একা ভেসে বেড়ায়? নাকি আমাদের সূর্যের মতন এদেরও রয়েছে নিজস্ব প্ল্যানেটারি সিস্টেম? 

নক্ষত্রের মোট সংখ্যার মত এই প্রশ্নেরও নিশ্চিত উত্তর নেই বিজ্ঞানীদের। মহাবিশ্বের এতো এতো নক্ষত্রের মাঝে পৃথিবী থেকে খালি চোখে দৃশ্যমান হয় কেবল মাত্র হাজার দশেক। টেলিস্কোপ ব্যবহার করলে এদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫০ মিলিয়নে। প্রযুক্তির সহায়তায় মোটামুটি সহজেই নক্ষত্রদের দেখা পেলেও দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের কাছে অধরা রয়ে গেছে এদের ঘিরে আবর্তিত হওয়া গ্রহ-উপগ্রহ বা প্ল্যানেটারি সিস্টেম। কারণ নক্ষত্রের তুলনায় গ্রহদের আকার নিতান্তই ক্ষুদ্র এবং এদের নিজস্ব কোন আলো নেই। অন্তহীন মহাবিশ্বে এদের দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা যেন খড়ের গাদায় সূচ খুঁজে বের করার চেয়েও শতগুনে কম। কিন্তু মহাবিশ্বের একমাত্র (!) বুদ্ধিমান প্রানীদের ঠেকিয়ে রাখা মোটেও সহজ কোন কাজ নয়। ঠিকই বিজ্ঞানীরা পরোক্ষ উপায়ে খুঁজে বের করে ফেললেন দূর নক্ষত্রদের প্ল্যানেটারি সিস্টেম। সেখান থেকেই তারা নিশ্চিত হলেন যে খুব সম্ভবত মহাবিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি নক্ষত্রকে ঘিরে কমপক্ষে একটি হলেও গ্রহ আবর্তিত হচ্ছে। বেশ কিছু নক্ষত্রের বেলায় ঘূর্ণায়মান নক্ষত্রের সংখ্যা একাধিক। অর্থাৎ, নিশ্চিতভাবেই মহাবিশ্বে অস্তিত্ব রয়েছে আমাদের সৌরজগতের মত প্ল্যানেটারি সিস্টেমের। যা-ই হোক, এখন প্রশ্ন হলো কি করে তৈরি হয় এই সৌরজগতগুলো? কিভাবে গ্যাস ও ধূলিকণা থেকে আবির্ভাব ঘটে গ্রহ-নক্ষত্রদের? কিভাবে গ্রহরা বাঁধা পড়ে নক্ষত্রদের অদৃশ্য আকর্ষণে? চলুন একে একে জেনে নেয়া যাক প্রশ্নগুলোর উত্তর।   

ধূলিকণা ও গ্যাস থেকে নক্ষত্র

মহাবিশ্বের গ্যালাক্সিগুলো গ্যাস ও ধূলিকণার আড্ডাখানা। সেসব গ্যাসের সিংহভাগই হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম। অবশ্য কিছু পরিমাণ ভারী মৌল ও বরফের দেখা মিলে সেখানে। গ্যালাক্সির সব জায়গায় এই গ্যাস ও ধূলিকণারা সমানভাবে ছড়িয়ে থাকে না। বরং বিভিন্ন জায়গায় অনেকখানি গ্যাস ও ধূলিকণারা এক রকম জটলা পাকিয়ে থাকে। নানা কারণে এমনটা হয়। যেমনঃ অধিকাংশ নক্ষত্র তাদের জীবনের শেষ প্রান্তে এসে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংস হয়ে যায়। এই ঘটনার নাম সুপারনোভা। মৃত্যু পথযাত্রী নক্ষত্রের বাইরের পৃষ্ঠের প্রায় পুরোটাই বিস্ফোরণের মাধ্যমে চারদিকে ছড়িয়ে যায়। ফলে গ্যালাক্সির ভেতরে তৈরি হয় মেঘ সদৃশ গ্যাসের প্রবাহ। অনেক সময় এরা একে অন্যের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং গ্র্যাভিটির প্রভাবে একে অন্যের সাথে বাঁধা পড়ে যায়। এভাবে গ্যালাক্সির ভেতরে তৈরি হয় অপেক্ষাকৃত বেশি ঘনত্বের মেঘের এলাকা। 

ছবিঃ গ্যালাক্সির ভেতরে গ্যাস ও ধূলিকণাদের চলাচল

বেশি ঘনত্বের গ্যাস ও ধূলিকণার এলাকার গ্র্যাভিটির শক্তিমত্তা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি হয়। এর প্রভাবে সেখানে আরো বেশি গ্যাস ও ধূলিকণা আকর্ষিত হয়। এদের আগমনে সামগ্রিকভাবে গ্যাসের এলাকার ঘনত্ব ও পরিধি বাড়তে থাকে। প্রায় অনন্তকাল ধরে চলতে থাকে এই প্রক্রিয়া। এক সময় সেখানে তৈরি হয় এক প্রকান্ড ঘূর্ণনশীল গ্যাসীয় মেঘ। আমাদের সৌরজগত যেই গ্যাসীয় মেঘ থেকে তৈরি হয়েছিল তার ব্যাস ছিল খুব সম্ভবত ৬০ আলোকবর্ষেরও বেশি। গ্যাসীয় মেঘ ঘুরতে থাকার কারণে এক সময় এর আকৃতি হয়ে যায় অনেকটা চিতই পিঠার মতন। অর্থাৎ, কেন্দ্রের আশেপাশের এলাকাগুলো ক্রমশ স্ফীত হতে থাকে এবং পরিধি বরাবর এলাকাগুলো পাতলা হতে থাকে। শক্তিশালী গ্র্যাভিটির প্রভাবে গ্যাসীয় মেঘের মধ্যে চলা সংকোচন প্রক্রিয়ার জন্যই এমনটা ঘটে। 

সহজে কল্পনা করার জন্য একে প্লেটের মধ্যে ভেজে রাখা পোচ করা ডিমের সাথেও তুলনা করতে পারেন। ডিমের কুসুমের অংশ নির্দেশ করবে মাঝের স্ফীত অংশ এবং এর সাদা অংশ নির্দেশ করবে গ্যাসীয় মেঘের পরিধির অংশগুলোকে। যা-ই হোক। গ্র্যাভিটির প্রভাবে কোরের গ্যাসীয় অণুগুলো একে অন্যের খুব কাছাকাছি চলে আসে। ফলে তৈরি হয় প্রচণ্ড চাপ ও তাপ। এক সময় সেখানে থাকা হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো ফিউশিত হওয়া শুরু করবে। হালকা পরমাণুর নিউক্লিয়াসগুলো পরিণত হবে অপেক্ষাকৃত ভারী পরমাণুর নিউক্লিয়াসে। ফিউশন প্রক্রিয়া সংঘটিত হবে মূলত গ্যাসীয় মেঘের কেন্দ্রে। কারণ এর জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের ঘনত্ব কোরের বাইরের অংশে থাকে না। ফিউশনের মাধ্যমে অবমুক্ত হয় বিপুল পরিমাণ শক্তি। এদের উপস্থিতি আরো উত্তপ্ত করে তুলে গ্যাসীয় মেঘের কোরকে। ফলে এক সময় দপ করে জ্বলে উঠে সেটি এবং আলোর বন্যায় ভেসে যায় চতুর্দিক। প্রায় দশ মিলিয়ন বছরের দীর্ঘ কর্মযজ্ঞ শেষে গ্যালাক্সিতে ভেসে বেড়ানো অলস গ্যাস ও ধূলিকণা থেকে জন্ম নেয় নক্ষত্র।   

ছবিঃ গ্যাস ও ধূলিকণা থেকে নক্ষত্রের জন্ম প্রক্রিয়া

নিউক্লিয়ার ফিউশন শুরুর পর গ্যাসীয় কোরের অভ্যন্তরীণ সংকোচন মোটামুটি বন্ধ হয়ে যায়। কারণ ফিউশন থেকে উৎপন্ন শক্তির প্রেসার কাজ করে গ্র্যাভিটির বিপরীতে। অর্থাৎ, গ্র্যাভিটি গ্যাসকে সংকুচিত করতে চাইলেও রেডিয়েশন প্রেসার এদের ঠেলে দূরে সরিয়ে দিতে চায়। দুই বিপরীতমুখী বলের প্রভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় সাম্যাবস্থান। বিলিয়ন বিলিয়ন বছর ধরে বজায় থাকতে পারে এটি। যতদিন নক্ষত্রের বুকে ফিউশনের মূল জ্বালানি হাইড্রোজেনের উপস্থিতি থাকবে ততদিন চলতে থাকবে গ্র্যাভিটি ও রেডিয়েশন প্রেসারের মল্লযুদ্ধ। রেডিয়েশন প্রেসার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। নক্ষত্রের আবির্ভাবের পর মূল গ্যাসীয় মেঘের ভেতরে থাকা গ্যাস ও ধূলিকণাদের এক রকম গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয় এটি। একারনে সৌরজগতের ভেতরে হাইড্রোজেন গ্যাসের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। উপরের তৃতীয় ছবিতে বিষয়টি দেখানো হয়েছে। 

গ্রহরা যেভাবে এলো

সোলার সিস্টেমের কেন্দ্রীয় নক্ষত্র থেকে এবার দৃষ্টি ফেরানো যাক একে ঘিরে ঘূর্ণায়মান গ্রহদের দিকে। এদের গঠন পদ্ধতি অত্যন্ত জটিল। বিজ্ঞানীরাও এখন পর্যন্ত পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেন নি এদেরকে। অবশ্য এখন পর্যন্ত যেটুকু জানা গেছে তা নিয়ে কিছুটা ধারণা দেয়া যেতেই পারে। সৌরজগতের মূল নক্ষত্রের জন্ম হয় গ্যালাক্সির ভেতরে থাকা স্বাভাবিকের অনেক বেশি ঘনত্বের বিশাল ঘূর্ণায়মান গ্যাসীয় মেঘ ও ধূলিকণা থেকে। আবার, এই গ্যাসীয় মেঘের পুরোটাও কিন্তু সমান ঘনত্ব বিশিষ্ট নয়। বরং এর কিছু এলাকার ঘনত্ব অন্য অংশের চেয়ে অনেক বেশি। সবচেয়ে বেশি ঘনত্বের এলাকা হলো এর কেন্দ্র ও আশেপাশের এলাকা। যাকে কিনা আমরা তুলনা করেছিলাম পোচ করা ডিমের কুসুমের সাথে। অন্যদিকে, ডিমের সাদা অংশ খ্যাত গ্যাসীয় মেঘের কোরের বাইরের দিকের এলাকা অপেক্ষাকৃত কম ঘনত্ব বিশিষ্ট। বিজ্ঞানীরা এই এলাকার একটি শক্ত নাম দিয়েছেন- প্রোটোপ্ল্যানেটারি ডিক্স। নাম শুনেই নিশ্চিত বুঝতে পারছেন যে এটা দেখতে ডিস্কের মতন। এই ডিস্কেরও বিভিন্ন জায়গায় অনেক 

সময়ে তৈরি পারে গড় মানের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি ঘনত্বের এলাকা। এই এলাকাগুলো গ্র্যাভিটির প্রভাবে স্থানীয়ভাবে সংকুচিত হতে থাকে। ফলে সেখানে থাকা কয়েক সেন্টিমিটার আকারের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বস্তুরা একে অন্যের সাথে জোড়া লেগে যায়। জোড়া লেগে লেগে এক সময়ে তৈরি হয় এক কিলোমিটারের সমান আকারের বস্তু। এদেরকে বলা হয় প্ল্যানেটাসিমাল। এরাই পূর্নাঙ্গ গ্রহ তৈরির প্রথম ধাপ।

ছবিঃ শিল্পীর কল্পনায় প্রটোপ্ল্যানেটারি ডিক্স

অধিকাংশ প্ল্যানেটাসিমাল নানান কারণে খুব বেশি সময় টিকে থাকতে পারে না। ধ্বংস হয়ে যায়। টিকে যাওয়াগুলো প্রটোপ্ল্যানেটারি ডিক্সের মধ্যে দিয়ে গতিশীল থাকে। চলতি পথে তারা আশেপাশে থাকা গ্যাস ও ধুলিকণাদের আকর্ষণ করে। ফলে ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে প্ল্যানেটাসিমালের আকার। আকার বৃদ্ধির সাথে সাথে গ্যাস ও ধূলিকণাদের আকর্ষণ করার সক্ষমতাও পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। এই ঘটনার নাম অ্যাক্রিশন। দীর্ঘ সময় এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে এক সময়ে তৈরি হতে পারে পূর্নাঙ্গ গ্রহ। মোটা দাগে মহাবিশ্বে দুই ধরণের গ্রহের অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া যায়। টেরেস্টিয়াল এবং গ্যাস জায়ান্ট। প্রথম ধরণের গ্রহে পাথুরে পৃষ্ঠের অস্তিত্ব থাকে। এদের আকার অপেক্ষাকৃত ছোট হয়। যেমনটা আমাদের পৃথিবী। এরা অবস্থান করে মূল নক্ষত্রের অনেকটাই কাছাকাছি। অন্যদিকে, গ্যাস জায়ান্ট গ্রহগুলো বিশালাকার। এদের কোর কঠিন পদার্থের তৈরি হলেও পৃথিবীর মত কঠিন পৃষ্ঠের অস্তিত্ব নেই। হাজার হাজার কিলোমিটার প্রশস্ত সুবিশাল বায়ুমন্ডলের পুরোটাই গঠিত গ্যাসীয় পদার্থের সমন্বয়ে। আমাদের সৌরজগতে থাকা ইউরেনাস, শনি এবং নেপচুন গ্রহের গঠনও ঠিক এই ধরণের। সাধারণত গ্যাস জায়ান্ট গ্রহগুলোর অবস্থান হয় মূল নক্ষত্র থেকে অনেকটা দূরে।

অ্যাক্রিশনের মাধ্যমে প্ল্যানেটাসিমাল থেকে উভয় ধরণের গ্রহ তৈরি হওয়ার মোটামুটি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। মূল নক্ষত্রের কাছে প্রোটোপ্ল্যানেটারি ডিক্সের তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবে অনেক বেশি থাকে। দূরত্ব বাড়ার সাথে সাথে কমে আসে তাপমাত্রা। আমাদের সূর্যের বেলায় কোরের কাছাকাছি এলাকায় তাপমাত্রা ছিল প্রায় ২০০০ কেলভিনের কাছাকাছি এবং বাইরের তাপমাত্রা ছিল মাত্র ৫০ কেলভিন। উচ্চ তাপমাত্রার দরুন মূল নক্ষত্রের কাছাকাছি এলাকায় অস্তিত্ব থাকে কেবল আয়রন, নিকেল, সিলিকন, ম্যাগনেসিয়াম, সালফার, অ্যালুমিনিয়াম, ক্যালসিয়াম ইত্যাদির মতন উচ্চ গলনাঙ্ক বিশিষ্ট মৌলের। বাকি সব কিছুই বাস্পীভূত হয়ে যায়। তাই গ্রহ তৈরিতে প্ল্যানেটাসিমালগুলোর মূল উপকরণ হয় এরাই। এই ধরণের বস্তুগুলোর পরিমাণ খুব একটা বেশি থাকে না বলে গঠিত গ্রহের আকারও খুব বেশি বড় হতে পারে না। অন্যদিকে, মূল নক্ষত্র থেকে অনেক দূরের প্ল্যানেটাসিমালগুলো কম তাপমাত্রার সুযোগে পানি, বরফ, মিথেন ইত্যাদি সহ সকল ধরণের বস্তুকে কাছে টেনে নিতে পারে। ফলে সহজেই এদের আকার বৃদ্ধি পায়। প্রোটোপ্ল্যানেটারি ডিক্সে থাকা হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাস আত্তীকরণের মাধ্যমে এরা এক সময় পরিনত হতে পারে বিশাল আকারের গ্যাসীয় বায়ুমণ্ডল বিশিষ্ট গ্রহে।

ছবিঃ নো ক্যাপশন

প্ল্যানেটাসিমালদের মাধ্যমে গ্রহ গঠনের এই পদ্ধতির নাম কোর অ্যাক্রিশন মডেল। মোটামুটি সর্বজন স্বীকৃত হলেও এই মডেলেরও রয়েছে নানান সীমাবদ্ধতা। সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতার নাম সময়। এই মডেল অনুসারে নেপচুন বা ইউরেনাসের মত সৌরজগতের একদম শেষ প্রান্তে থাকা গ্যাস জায়ান্ট গ্রহগুলোর তৈরি হতে সময় প্রয়োজন হবে প্রায় ১০ মিলিয়ন বছর। কিন্তু সমস্যা হল প্রোটোপ্ল্যানেটারি ডিক্সের অস্তিত্ব থাকতে পারে সর্বোচ্চ কয়েক মিলিয়ন বছর পর্যন্ত। অর্থাৎ, কোর অ্যাক্রিশন মডেলের টাইম ফ্রেমে মূল নক্ষত্র থেকে অনেক দূরে থাকা গ্যাস জায়ান্টগুলোর গঠন এক রকম অসম্ভব! 

সমস্যা সমাধানে বিজ্ঞানীরা বিকল্প আরেকটি মডেলের কথা বলেছেন। এর নাম ডিস্ক ইনস্ট্যাবিলিটি মডেল। এই পদ্ধতিতে প্ল্যানেটাসিমালের কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। প্রোটোপ্ল্যানেটারি ডিক্সে থাকা গ্যাস ও ধূলিকণা সরাসরি ঘনীভূত হয়ে তৈরি করতে পারে গ্যাস জায়ান্ট গ্রহ। সময়ও লাগে অনেক কম। মাত্র কয়েক হাজার বছর। কিন্তু আসলেই ডিস্কের গ্যাস গ্রহ তৈরির মত ঘনীভূত হতে পারে কিনা তা নিয়ে অনেক বিজ্ঞানীদের মধ্যেই রয়েছে সন্দেহ। কোর অ্যাক্রিশন মডেল অথবা ডিস্ক ইনস্ট্যাবিলিটি মডেল- কোনাটি পুরোপুরি সঠিক সেটি বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিতভাবে জানেন না। এমনও হতে পারে যে এরা উভয়েই আংশিক সঠিক। একেক মডেল একেক অবস্থায় কাজ করে। তবে একটা কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। তাহলো, হট জুপিটার (এরা বৃহস্পতির মত বিশাল আকারের গ্যাস জায়ান্ট গ্রহ। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে এদের অবস্থান মূল নক্ষত্রের খুব কাছে।) নামে বিশেষ এক ধরণের এক্সোপ্ল্যানেটের বেলায় মডেল দুইটির কোনটাই খাটে না। সেগুলোকে ব্যাখ্যা করতে প্রয়োজন প্ল্যানেটারি মাইগ্রেশন নামের আরেকটি মডেলের! 

গ্রহের গঠন রহস্য নিয়ে কথা বলার শুরুতেই বলেছিলাম আমাদের অজ্ঞানতার কথা। নিশ্চয়ই আমার কথার মর্মার্থ এতক্ষণে অনুধাবন করতে পেরেছেন। আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে এসে জ্যোতির্বিদরা কেবল একটি বিষয়েই চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হতে পেরেছে। আর সেটি হলো, প্রোটোপ্ল্যানেটারি ডিক্সই গ্রহদের জন্মের আঁতুড়ঘর। জীবনচক্রের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থায় থাকা বিভিন্ন নক্ষত্রেদের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে এটি। এর বাইরে বাকি সব কিছুই এক রকম অনিশ্চিত।     

তথ্যসূত্রঃ

  • হোয়াট ডু উই রিয়েলি আন্ডারস্ট্যান্ড এবাউট প্ল্যানেটারি ফর্মেশন, প্ল্যানেট হান্টারস, ১৪ জানুয়ারি ২০১৪ 
  • এ কার্টুন গাইড টু দ্য ফ্যাসিনেটিং রেলম অফ ফিজিক্স, ড. বেঞ্জামিন ভার, ড. বরিস লেমার, রিনা পিকলো  

লেখাটি 94-বার পড়া হয়েছে।

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 907 other subscribers