আজ থেকে জীববিজ্ঞান সহজ হোক

লেখাটি , বিভাগে প্রকাশিত

জীববিজ্ঞান শব্দটা যতটা কাটখোট্টা, তার চাইতেও কিছু শিক্ষার্থী বা পাঠকেরদের কাছে বিষয়টা কঠিন বেশি। কিন্তু, কেন? এই কেন এর আবার হরেক রকম উত্তর আছে। কারও মতে এটা খালি মুখস্ত করতে হয়, তাই এটা বাজে। কারও আবার তথ্য মনে রাখতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। যার যেই যন্ত্রণাই হোক না কেন, সব একপাশে রেখে আজকের এই ব্লগপোস্টটি মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে। কারণ হিমালয়ের বায়োনাথ বাবার দেওয়া কিছু পরামর্শ আমি শেয়ার করবো। তার আগে বলে নিই, এই লেখাটি মূলত শিক্ষার্থীদের জন্য। তো, চলো, শুরু করা যাক!

শুরুটা হোক সুন্দর

সাইকোলজিক্যালি একটা কথা সত্য যে তুমি যদি কোন কাজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে শুরু করতে না পারো অথবা খুব বেশি প্রেশার নিয়ে কোনো কাজ শুরু করো, তাহলে কাজটা করতে একদিকে যেমন বোরিং লাগবে, তেমনি অন্যদিকে কাজটার আউটপুটও যথেষ্ট হবে না। জীববিজ্ঞান শেখার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

একদম ফ্রী মাইন্ডে বই খুলে পড়া শুরু করে দিতে হবে। মনে করবা, তুমি জে কে রাওলিং এর “হ্যারি পটার” পড়ছো। ব্রেইনকে রিল্যাক্স অবস্থায় রেখে এভাবে পড়তে থাকো। কোন কিছু কঠিন মনে হলে না বুঝলে স্কিপ করে চলে যাও, এটা নিয়ে ভাবারই দরকার নেই।

মনে করো, তুমি “প্রথম কোষের সৃষ্টি ও কোষতত্ত্ব” টপিকটা পড়ছো। এক্ষেত্রে কিছু বিক্রিয়া বা বৈশিষ্ট্যের কথা তোমার মাথার উপর দিয়ে যেতেই পারে; যাক, কোনো সমস্যাই নাই। ঐ অংশগুলো নিয়ে না ভেবে পুরো টপিকটা একবার পড়ে ফেলো।

ফোকাস পয়েন্ট, কী-ওয়ার্ড ও ছবি

উপন্যাসের স্টাইলে পড়া শেষ! এখন ঐ টপিকটাই আবার শুরু থেকে পড়া শুরু করো। এবার পড়তে হবে সিআইডির ইনভেস্টিগেশনের স্টাইলে। পড়তে গেলে যে যে শব্দ বা বাক্য তোমার কাছে সহস্যজনক বা কঠিন মনে হবে, সেগুলো আন্ডারলাইন করে রাখো। কিছু কী-ওয়ার্ড মার্ক করো। যেমনঃ “প্রথম কোষের সৃষ্টি ও কোষতত্ত্ব” টপিকটা পড়তে গেলে Pre-existing cell, RNA-World Hypothesis, এন্ডোসিম্বায়োসিস, হোমিওস্ট্যাটিক অবস্থা, মেটাবলিজম, আত্ম-প্রজনন ইত্যাদি শব্দ বা টার্ম খুজে পাবা, যেগুলোর আগা-গোড়া কিছুই হয়ত প্রথমে বুঝতে পারবা না। সেগুলো পয়েন্ট আউট করে রাখো।

তোমার চিহ্নিত শব্দ, বাক্য বা পয়েন্টগুলোর কোনো ব্যাখ্যা বা সচিত্র বর্ণনা ঐ বইতে আছে কিনা দেখো। যদি ব্যাখ্যা থাকে, তাহলে সেগুলো পড়ে-দেখে বোঝার চেষ্টা করো। অবশ্যই মনে রাখবে, তুমি একটা পদ্ধতি বা বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানছো। সুতরাং, সেটাকে সেভাবেই বুঝতে হবে, ভূগোল পড়ার মতো পড়লে হবে না।

অনুধাবন

এমন হতে পারে, ঐ মার্ক করা বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা বইতে নেই অথবা আছে, কিন্তু তুমি বুঝতে পারছো না; তাতেও স্মস্যা নেই। এখানেও একতা জবরদস্ত সমাধান আছে, যা সাধারনত অনেকেই জানে না, আর জানলেও এই পদ্ধতি অনুসরণ করে না। এই পদ্ধতিটি হলো Visualization।

যেগুলো তুমি বুঝতে পারোনি অথবা বুঝেছ, কিন্তু কঠিন মনে হয়েছে- সেগুলো গুগলে সার্চ করো। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, Biology Dictionary, National Human Genome Research Institute   ইত্যাদি নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইটে যেমন সুন্দর বর্ণনা পেয়ে যাবা, তেমনি কিছু ওয়েবসাইট (Visible Biology, BIOZONE International), অ্যাপস (Visible Biology, BioDigital Human – 3D Anatomy, Teach Me Physiology) এবং ইউটিউবে (Nucleus Biology, Free Animated Education) ঐ টপিকের কিছু বাস্তব ছবি, থ্রিডি ডায়াগ্রাম অথবা অ্যানিমেশন ভিডিও পেয়ে যাবা, যেগুলো তোমাকে টপিকটা বুঝতে বিশেষভাবে সহযোগিতা করবে।

তুমি তখন বুঝতে পারবা যে বাস্তবিকভাবে ঐ বিষয়টা কেমন হয়। যেমনঃ Chemical evolution, RNA-World Hypothesis, Inside a cell, Cell-theory ইত্যাদি লিখে গুগলে সার্চ করলে হাজারটা ছবি, গ্রাফিক্স, অ্যানিমেশন ভিডিও পেয়ে যাবা, যেখানে থেকে তুমি সহজেই “প্রথম কোষের সৃষ্টি ও কোষতত্ত্ব” টপিকটা অনুধাবন করতে পারবা।

মজার বিষয় হলো, এমন কিছু বই আছে, যেখানে ক্রোমোজোম, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ইত্যাদির বাস্তব ছবি পাবা, যার ফলে জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন কাহিনী ভিজুয়ালাইজ করতে সুবিধা হবে। আমার দেখা এমন এমন দুটি বই হলো “Principles of Genetics” এবং “জীবকোষ তা নয় যা তুমি ভাবছো”। এই বই দুইটিতে কোষের বিভিন্ন বিষয়ের অঙ্কিত ছবি যেমন আছে, তেমনি ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপের মাধ্যমে দেখলে সেগুলো কেমন হয়, তার বাস্তব ছবিও আছে। ফলে জীববিজ্ঞানকে প্রাণবন্ত মনে হয়। বই দুটো পড়ে দেখতে পারো!

এভাবে তুমি জীববিজ্ঞানের বিষয় বা পদ্ধতিগুলোর বাস্তবিক রূপ উপলব্ধি করতে পারবা। এর পাশাপাশি বাস্তব জীবনে জীববিজ্ঞানের কোন শিক্ষা তোমার কাজে লাগে বা লাগতে পারে, সেগুলো খুঁজে বের করো। যেমনঃ বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় ঘটনা, রোগব্যাধি ইত্যাদি। এতে করে জীববিজ্ঞানকে কোনো অখাদ্য মনে হবে না, বরং এটাকে বাস্তবসম্মত ও গুরুত্বপূর্ণ মনে হবে। তখন তোমার জন্য জীববিজ্ঞান বোঝা আর শেখা দুটোই সহজ হয়ে যাবে।

প্রবাহচিত্র/ছক

অনেক পদ্ধতি-প্রক্রিয়া, তথ্য-উপাত্ত ইত্যাদি রয়েছে, যেগুলো মনে রাখাটা অনেক ক্ষেত্রে কঠিন মনে হয়। সেক্ষেত্রে তুমি নিজে সুবিধামতো প্রবাহচিত্র (Flowchart) বা ছক (Table) বানিয়ে সেগুলোকে আয়ত্ত করতে পারো। ধরো, কোষপ্রাচীরের তন্তু কীভাবে গঠিত হয়, সেই পদ্ধতিটা তুমি সহজে মনে রাখতে পারছো না। এখন তুমি নিচের মতো একটি প্রবাহচিত্র বানাতে পারোঃ

এই ফ্লোচার্ট এক নিমিষেই মনে করিয়ে দিবে যে অসংখ্য β-D গ্লুকোজ অণু থকে সেলুলোজ, ১-৩ হাজার সেলুলোজ অণু মিলে সেলুলোজ চেইন, ১০০টি এরকম চেইন মিলে মাইসেলি, ২০টি মাইসেলি নিয়ে মাইক্রোফাইব্রিল, ২৫০টি মাইক্রোফাইব্রিল থেকে ম্যাক্রোফাইব্রিল এবং অনেকগুলো ম্যাক্রোফাইব্রিল মিলে কোষপ্রাচীরের তন্তু (ফাইবার) গঠন করে। একইভাবে দেহে রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়াও নিজের প্রবাহচিত্রের মাধ্যমে মনে রাখতে পারবে-

একইভাবে জীবজগতের বিভিন্ন পর্বের মধ্যকার তফাৎ বা মারগুলিস-হুইটেকারের পাঁচ রাজ্যের মিল-অমিল ইত্যাদি খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে টেবিল বানিয়ে মনে রাখতে পারো। এটা কঠিন না, ব্যাপারটা হলো তোমাকে খাটুনি করতে হবে!

মৌলিক বিষয় আত্তীকরণ

এতক্ষণ যে পদ্ধতিগুলো বললাম, সেগুলো চলতে থাকবে। এর পাশাপাশি ছোট্ট দুইটা কাজ করতে হবে। প্রথমত “কেন” এর উত্তর অনুসন্ধান করা। তুমি বই পড়ে জানতে পারলে, নিউক্লিক এসিড মূলত ২ ধরণের। এও জানতে পারলে যে আমাদের দেহে দুটোই আছে। কিন্তু ভাইরাসের দেহে সাধারণত যেকোনো একটা থাকে। কিন্তু কেন? আবার তুমি জানতে পারলে মাইটোকন্ড্রিয়নকে অন্তঃকোষীয় মিথোজীবী বলা হয়। কিন্তু কীভাবে এটি স্বাধীন কোষ থেকে মিথোজীবী হলো?

তোমাকে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। এর মানে এই নয় যে এগুলো মুখস্ত করতে হবে বা ব্যাখ্যাগুলো ভুলে গেলে মহাপাপ হবে। তুমি মূল কন্সেপ্টটা বোঝার জন্য এই ব্যাখ্যাগুলোর সাহায্য নিবা, ব্যাস এতটুকুই! তা না হলে বিভিন্ন বিষয়ে ঘাপলা থেকে যাবে। তো, এই ব্যাখ্যাগুলো খুঁজে পেতে তুমি বিভিন্ন ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখতে পারো। যেমনঃ এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, a-z-animals.com, বায়োলজি ডিকশনারি ইত্যাদি। এছাড়াও তোমার জীববিজ্ঞানের শিক্ষকের কাছে প্রশ্ন করতে পারো। প্রশ্ন করতে পারো বিভিন্ন বিশ্বস্ত ওয়েব ফোরাম অথবা নির্ভরযোগ্য ফেসবুক গ্রুপে। সেখানে পিএচইডই গবেষক, নিয়মিত ব্লগার, শিক্ষক, বিজ্ঞান লেখক এবং দক্ষ অলিম্পিয়াডিয়ানরা তোমার প্রশ্নের উত্তর দিবে।

দ্বিতীয় কাজটি হলো একটা কিছুর সাথে তুলনা করে পড়া। যেমনঃ তুমি বইতে মিউচুয়ালিজম সম্পর্কে পড়লা। তুমি বুঝলা যে এটা দুটো জীবের এমন এক ধরণের মিথস্ক্রিয়া, যেখানে উভয়পক্ষই লাভবান হয়। তুমি বিষয়টাকে পার্টনারশিপে ব্যবসা করার সাথে তুলনা করে মনে রাখতে পারো। ধরো, তুমি আর তোমার বন্ধু দুজনে মিলে রেস্টুরেন্টের ব্যবসা শুরু করেছো। এখন দুজনেই এই ব্যবসায় অবদান রাখছো এবং দুজনেই সেই অনুসারে প্রফিট পাচ্ছো। তুমি তোমার বন্ধুর কাজে তাকে সাহায্য করছো, আবার তোমার ব্যবসায়িক ঝামেলাতেও তোমাকে তোমার বন্ধু সহযোগিতা করছে। এটাই হলো মিউচুয়ালিজমের মূল ধারণা। এভাবে টেকনিক দিয়ে জীববিজ্ঞান শিখতে হয়।

চালাও তোমার কলম

কলমের যে কী ক্ষমতা, তা বলে বোঝানো যাবে না। তুমি যেটা পড়েছো বা শিখে ফেলেছো, সেটা নিয়ে লেখালেখি করলে তোমার মনে রাখার ক্ষমতা আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে। বইতে একটা বিষয় লিখতে বা বোঝাতে গিয়ে অনেক কথা, শব্দ বা অপ্রয়োজনীয় বাক্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে তুমি একটা কন্সেপ্ট বোঝার জন্য নিজের মতো করে বই দেখে দেখে ঐ টপিকের প্রসেস বা ব্যাখ্যাটা লিখে ফেলো। তখন সহজেই তুমি সেই বিষয়টা ক্যাপচার করতে পারবা।

এছাড়াও আরেকটা কাজ করতে হবে; সেটা হলো না দেখে লেখা। তুমি একটা নির্দিষ্ট টপিক বা বিষয়বস্তু পড়া-জানা শেষ করে সেই পড়া বিষয়গুলো নিজের মতো করে পরিষ্কার খাতায় লেখো। মাঝেমধ্যে হয়ত কিছু জিনিস মনে নাও পড়তে পারে, কিছু খটকা থাওতে পারে। কিন্তু এগুলো কোনো ব্যাপার না। এই অভ্যাস চালু থাকলে একদিন জীববিজ্ঞানের অনেক কিছুই অনায়াসে মনে রাখতে পারবা। একে Active Recall বলে।

চর্চা

এতক্ষণ যে জাদুগুলোর কথা বলা হলো সেগুলো প্রয়োগ করতে থাকতে হবে। লেখো থাকো শেখার উদ্দেশ্যে। নিয়মিত ঐ কাজগুলো করো। আজকে “নিউক্লিয়াস” পড়ে আবার দুই সপ্তাহ পরে বই খুলে “সাইটোপ্লাজম” পড়লে কোনো লাভ হবে না। একটা সিকোয়েন্স অনুসরণ করে চলতে হবে। তাহলে আজ অথবা কাল জীববিজ্ঞানের প্যারা দূর হবেই।

উপসংহার

সবশেষে বিপদসংকেত দিতে চাই। তোমাকে জীববিজ্ঞান শিখতে হলে কিছু কাজ থেকে দূরে থাকতে হবে। যেমনঃ

  • এক নাগাড়ে অনেক্ষণ আগ্রহ ছাড়াই পড়তে থাকা
  • না বুঝে খালি মুখস্ত করা
  • ইন্টারনেটে একটা বিষয়ের ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে অন্যদিকে চলে যাওয়া
  • শুধুমাত্র নম্বর পাওয়ার উদ্দেশ্যে পড়া
  • এই যাত্রায় হতাশ হয়ে যাওয়া

এতক্ষণ যা বললা, সেগুলো আশা করি আমার পাঠক বন্ধুদের কাজে লাগবে এবং জীববিজ্ঞান শেখার যাত্রা সুন্দর হবে। যদি এই আর্টিকেলটি থেকে নতুন কিছু জেনে অথবা শিখে থাকো, তাহলে শেয়ার করতে ভুলবে না কিন্তু। জীববিজ্ঞান সহজ হোক! বুয়েনা সুয়্যার্তে!

লেখাটি 186-বার পড়া হয়েছে।

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 904 other subscribers