ভোট গণনায় মহাজাগতিক “ভুত”-এর উৎপাত

ধরেন আপনি নির্বাচন করবেন। অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়ে শেষমেশ নমিনেশন পেলেন। ভোটও হয়ে গেল।

আজকে ভোটের ফলাফল। 

কিন্তু, হায়হায়, একি সর্বনাশ!

যে কালু মিয়ার ভোটে জীবনে জেতার কোন সম্ভাবনাই নাই, সেই কালু মিয়া আপনার চেয়ে অনেক বেশি ভোট পেয়ে জিতে গেছে।

কিন্তু এবারের ভোটে তো ইভিএম মেশিন ব্যাবহার করা হয়েছে। সেখানে তো ভোট কারচুপির কোন উপায়ই নেই। 

কিন্তু, কালু মিয়ার জিতারই কোন সম্ভাবনা নাই।

তাহলে কি হলো এখানে? কোন দৈববলে কালু মিয়া জিতে গেল এবারের নির্বাচনে? 

ইতিহাসের পাতায়

২০০৩ সালের ১৮ মে, বেলজিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় ডিজিটাল পদ্ধতির এক ভোট। সেখানে নিরাপত্তার জন্য একটা বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়।

সেটা হলো, এখানে ভোট দেয়ার জন্য প্রথমে ভোটারদের একটা করে কার্ড দেয়া হয়। সেই কার্ড কম্পিউটারে প্রবেশ করানো হলেই কম্পিউটারে ভোট দেয়া যাবে। কার্ড প্রবেশ করানোর পর প্রার্থীদের একটা লিস্ট কম্পিউটারে ভেসে উঠত, যেখানে ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীদেরকে ভোট দিতে পারত। ভোট শেষে কার্ডটা আবার জমা নেয়া হয়। এই আলাদা কার্ড দেয়ার প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল ভোটে কারচুপি রোধ করা। এতে করে সবার ভোট কার্ডে যেমন ভোটটার তথ্য জমা থাকে, তেমনি কম্পিউটারেও ভোটের তথ্য জমা থাকে। ফলে, কেউ সিস্টেম হ্যাক করলেও কার্ডের তথ্য দিয়ে সঠিক তথ্য বের করা সম্ভব।

ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর যখন ভোট গণনা শুরু হলো, তখন বেলজিয়ামের স্কারবেক নামক ব্রাসেলসের এক মিউনিসিপালিটিতে ভোটের ফলাফলে সমস্যা দেখা দেয়।

মারিয়া ভিন্ডভোগাল। ছবি সুত্র- এইচ এল এন

স্কারবেকের একজন প্রার্থীর নাম ছিল মারিয়া ভিন্ডভোগাল। তার দলের নাম ছিল ওয়ার্কার্স পার্টি। তখনকার সময়ে তার দল বেলজিয়ামে ততটা জনপ্রিয় ছিল না। তাই, ধারণা করা হচ্ছিল, স্কারবেকের নির্বাচনে তিনি ৫০০-৬০০ ভোটের বেশি পাবেন না। কিন্তু, ভোটিং কম্পিউটার থেকে প্রাপ্ত তথ্য ছিল রীতিমতো চমকে দেয়ার মত। যেখানে, মারিয়ার পক্ষে ৫০০-৬০০ ভোট পাওয়াই কষ্টসাধ্য হওয়ার কথা, সেখানে তিনি পেলেন ৪৬১০ টা ভোট।

প্রথমে নির্বাচন কমিশন ভেবেছিল, তাদের প্রেডিকশন ভুল, মারিয়া হয়তো আসলেই এত ভোটই পেয়েছে। তাই তারা যথারীতি তাদের গণনা কার্যক্রম অব্যাহত রাখল। কিন্তু গণনা শেষ করে আবার তারা অবাক হলো। কারণ, মোট ভোটের সংখ্যা, মোট ভোটারদের সংখ্যার চেয়েও বেশি আসছে। কম্পিউটার ঝামেলা করছে দেখে তারা তাদের ব্যাকাপ প্ল্যান, কার্ডটাকে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিলেন, যেহেতু কার্ডেও ভোটের তথ্য সংরক্ষিত থাকে।

কার্ডের মাধ্যমে ভোট গণনা করে তারা দেখলেন, ভোটটসংখ্যা ঠিকই আছে। এমনকি মারিয়াকে নিয়ে তাদের ধারণাও ঠিকই আছে। তিনি পেয়েছেন ৫১৪ টি ভোট, যা তাদের প্রেডিকশনের সাথে মিলে যায়।

ঘটনাটা ঠিক কালু মিয়ার ঘটনার মতো।

কিন্তু ঠিক কি হয়েছিল ওই সময়ে? 

মারিয়া কি ভোটিং সিস্টেম হ্যাক করেছিলেন?

কিন্তু, তার তো জানার কথা কার্ড সিস্টেমের কারণে সিস্টেম হ্যাক করেও লাভ নেই।

নাকি কোন অলৌকিক শক্তি মারিয়াকে সাহায্য করেছিল?

ঠিক কি হয়েছিল সেদিন?

মহাজাগতিক রশ্মির আবিষ্কার

১৮৯৬ সালে হেনরি বেকেরেল তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার করেন। তেজস্ক্রিয়তা হলো মূলত বিভিন্ন ধরনের কণিকা, যেগুলো তেজস্ক্রিয় পদার্থ হতে নির্গত হয়। তেজস্ক্রিয়তা মূলত দুই প্রকার। আমরা যে আলো, তাপ, মাইক্রোওয়েভ, রেডিও ওয়েভ দেখি, সেগুলোও কিন্তু তেজস্ক্রিয়তা। এগুলোকে বলে নন-আয়োনাইজিং বিকিরণ (Non-ionizing Radiation)।কারণ, এগুলো যেসকল মাধ্যমের মধ্য দিয়ে যায়, সেসব মাধ্যমকে চার্জিত বা আয়নিত করে না। আবার, এক্স-রে, আলফা রশ্মি-এগুলোও আরেক ধরনের তেজস্ক্রিয়তা। এগুলোকে বলে আয়োনাইজিং বিকিরণ (Ionizing Radiation)। এ ধরনের কণিকাগুলো যে মাধ্যমের মধ্য দিয়ে যায়, সেই মাধ্যমকে চার্জিত বা আয়নিত করতে পারে। যত বেশি আয়োনাইজিং বিকিরণ থাকবে, তত বেশি কোন মাধ্যম আয়নিত হবে।

এই মূলনীতি ব্যবহার করে এক ধরনের আয়োনিকরণ তেজস্ক্রিয়তা মাপার যন্ত্র তৈরি করা হয় যেটার নাম গোল্ড লিফ ইলেক্ট্রোস্কোপ। ক্লাস ৯-১০ এ চার্জ মাপার জন্য ব্যবহৃত বিখ্যাত স্বর্ণপাতা যন্ত্রের নাম সকলেরই মনে থাকার কথা। এটাই সেই মেশিন। 

(বি.দ্রঃ এখন থেকে তেজস্ক্রিয়তা বলতে আয়োনাইজিং বিকিরণ-কে-ই আমরা বুঝব)

এখানে, খুবই পাতলা দুইটা স্বর্ণের পাত ব্যবহার করা হত। যখন কোন চার্জিত পদার্থ এর সামনে রাখা হত, তখন সেই চার্জিত পদার্থের চার্জের ফলে সেই স্বর্ণের পাতগুলোও তড়িৎ আবেশ প্রক্রিয়ায় চার্জিত হতো। ফলে, সেই স্বর্ণের পাতগুলোও একই চার্জে চার্জিত হত এবং উভয় পাত একই ধরনের চার্জে চার্জিত হওয়ার ফলে , স্বর্ণের পাতগুলোর নিজেদের মধ্যে বিকর্ষণ তৈরি হতো এবং এরা নিজেদের মধ্যে একটা কোণ তৈরি করে পরস্পর হতে দূরে সরে থাকত। 

ছবিঃ গোল্ডলিফ ইলেক্ট্রোস্কোপ। সুত্র- রিসার্চ গেইট

এখান, যে পদার্থের তেজস্ক্রিয়তা বেশি, সেটাকে চার্জিত স্বর্ণের পাতের কাছাকাছি আনলে, সেটা স্বর্ণের পাতের আশেপাশের মাধ্যমকে বিপরীত চার্জে চার্জিত করে। ফলে, স্বর্ণের পাত থেকে চার্জ, ওই মাধ্যমকে চার্জ নিরপেক্ষ করার জন্য, ওই মাধ্যমে চলে যায়।

এখন, যে পদার্থের তেজস্ক্রিয়তা বেশি, সেই পদার্থ স্বর্ণের পাতের আশেপাশের পরিবেশকে তত বেশি পরিমাণে চার্জিত করতে পারবে। ফলে, স্বর্ণের পাত থেকে বেশি চার্জকে, চার্জ নিরপেক্ষ করার জন্য তাড়াতাড়ি করে চার্জ অন্য মাধ্যমে দৌড়াবে। ফলে, স্বর্ণের পাতের চার্জ কমতে থাকবে আর চার্জ দ্রুত কমার ফলে পাতদ্বয়ের মধ্যের কোণও দ্রুত কমতে থাকবে। আর পদার্থের তেজস্ক্রিয়তা কম হলে, সেটা আশেপাশের পরিবেশকে চার্জিতও করবে কম। ফলে স্বর্ণের পাতগুলোর চার্জ হারানোর হারও হবে কম। ফলে এদের মাঝের কোণও ধীরে ধীরে কমবে।

অর্থাৎ, তেজস্ক্রিয়তা বেশি হলে স্বর্ণপাতদ্বয়ের মধ্যবর্তী কোণ দ্রুত কমে, আর তেজস্ক্রিয়তা কম হলে এই কোণ ধীরে ধীরে কমে। মানে তেজস্ক্রিয়তা বেশি হলে স্বর্ণপাতের চার্জ হারানোর হার বেশি হয়, আর তেজস্ক্রিয়তা কম হলে, চার্জ হারানোর হারও কম হয়। তো, তেজস্ক্রিয় পদার্থ যেহেতু আমরা মূলত পাই বিভিন্ন খনিজ পদার্থ থেকে আর খনিজ পদার্থের উৎস যেহেতু মাটি, তাই মাটি থেকে যত উপরে যাওয়া যায়, ততই তেজস্ক্রিয়তা কমার কথা। অর্থাৎ, স্বর্ণের পাতের মধ্যবর্তী দূরত্ব, কোণ ও কোণ কমার হার মাটি থেকে যত উপরে যাওয়া যায়, ততই কমতে থাকার কথা।

কিন্তু, ১৯১০ সালে, থিওডোর উলফ নামের একজন বিজ্ঞানী আইফেল টাওয়ারের উপরে তার গোল্ড লিফ ইলেকট্রোস্কোপটা নিয়ে যান। আইফেল টাওয়ারের উচ্চতা প্রায় ৩০০ মিটার। সাধারণ ক্যালকুলেশন হিসাবে, মাটির ৩০০ মিটার উপরে গেলে এই তেজস্ক্রিয়তা, মাটির তেজস্ক্রিয়তার মাত্র কয়েক শতাংশের চেয়ে বেশি হওয়ার কথা ছিল না। কারণ, সাধারণ তেজস্ক্রিয়তার জন্য এটা অনেক বেশি দূরত্ব। অধিকাংশ তেজস্ক্রিয় রশ্মিই এই দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে না। কিন্তু, এখানেও অবাক করার মতো একটা ঘটনা ঘটল। ৩০০ মিটার উপরেও তেজস্ক্রিয়তার তেমন পরিবর্তন হলো না। এই ব্যাপারটা তখনকার সময়ের বিজ্ঞানীদের খুবই অবাক করেছিল, কারণ সাধারণত এটা হওয়ার কোন সম্ভাবনাই ছিল না।

১৯১১ সালে অস্ট্রিয়ান পদার্থবিদ ভিক্টর হেস দূরত্বের সাথে গামা রশ্মির তীব্রতার পরিবর্তনের সম্পর্ক বের করার জন্য একটা পরীক্ষা করছিলেন। এই পরীক্ষায় তিনি একটা বেলুনের সাথে একটা তেজস্ক্রিয়তা মাপক ইলেক্ট্রোস্কোপ যন্ত্র বেঁধে সেটাকে উড়িয়ে দেন। ১৯১১ সালে তিনি এই বেলুন এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে ভূমি থেকে সর্বোচ্চ ১১০০ মিটার উঁচুতে পৌঁছাতে সক্ষম হন। এই উচ্চতায় তিনি দেখতে পান যে, ওই উচ্চতায় স্বর্ণের পাতদ্বয়ের চার্জ হারানোর হার আর ভূমিতে স্বর্ণের পাতদ্বয়ের চার্জ হারানোর হারের মধ্যে পার্থক্য খুবই সামান্য। অর্থাৎ, ওই উচ্চতায় তেজস্ক্রিয়তার তেমন পরিবর্তন হয়নি।

এরপর তিনি অনেক চেষ্টা করে ১৯১২ সালে সর্বোচ্চ ৫৩০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত বেলুন পাঠাতে সক্ষম হন। এইবারের ফল আসলো আরো অবাক করার মতো। এবার আগের বারের চেয়ে আরো বেশি হারে স্বর্ণের পাতদ্বয় চার্জ হারাতে লাগল। অর্থাৎ, এইবার তেজস্ক্রিয়তা আগের চেয়ে আরো কয়েকগুণ বেড়ে গেল। কিন্তু, এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। হিসাব অনুযায়ী, ভূমি হতে দূরত্ব বাড়লে তেজস্ক্রিয়তা কমার কথা।

ছবিঃ পরীক্ষার ফলাফল। উচ্চতা বনাম তেজস্ক্রিয়তার লেখচিত্র।

গ্রাফে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, অল্প উচ্চতায় তেজস্ক্রিয়তার তেমন কোন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হচ্ছে না। কিন্তু, উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা অত্যন্তু দ্রুত হারে বাড়তে শুরু করে।

এইখানে তেজস্ক্রিয়তা না কমার কারণ হিসেবে হেস হাই অ্যালটিটিউড রেডিয়েশন (High altitude radiation) নামের একধরনের অজানা তেজস্ক্রিয় রশ্মির নাম উল্লেখ করেন।১৯২৬ সালে বিখ্যাত আমেরিকান বিজ্ঞানী রবার্ট মিলিকান এর নাম দেন কসমিক রে বা মহাজাগতিক রশ্মি। এই আবিষ্কারের জন্য ভিক্টর হেস ১৯৩৬ সালে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত হন।

মহাজাগতিক রশ্মি আসলে কি?

মহাজাগতিক রশ্মি হলো মূলত মহাবিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা, উচ্চশক্তিসম্পন্ন এবং আলোর কাছাকাছি বেগে ছুটে চলা বিভিন্ন কণিকা বা কণিকাগুচ্ছ। বিভিন্ন নক্ষত্র, সুপারনোভা, অ্যাক্টিভ গ্যালাক্টিক নিউক্লিয়াস, গামা রশ্মি বিস্ফোরণ, কোয়াসার, হকিং রেডিয়েশন, ব্ল্যাকহোলের জেট- এগুলো থেকে প্রধানত মহাজাগতিক রশ্মি তৈরি হয়।

মহাজাগতিক রশ্মিকে দুইভাগে ভাগ করা যায়। এগুলো হলো-

১. সোলার এনার্জেটিক পার্টিকল, এদের উৎপত্তিস্থল আমাদের সূর্য।

২. গ্যালাকটিক এবং এক্সট্রা গ্যালাকটিক মহাজাগতিক রশ্মি, এদের উৎপত্তি, সৌরজগতের বাইরে আমাদের গ্যালাক্সি ও গ্যালাক্সির বাইরের বিভিন্ন উৎসে।

সাধারণত, মহাজাগতিক রশ্মি বলতে ২য় ধরনের রশ্মিকেই বুঝানো হয়।  এর কারণ হলো, আমরা যত মহাজাগতিক রশ্মি সম্বন্ধে জানি, এর অধিকাংশই ২য় ধরনের। সূর্য থেকে উৎপন্ন রশ্মির পরিমাণ খুবই কম।

আমাদের পৃথিবীতে যেসব মহাজাগতিক রশ্মি আসে, সেগুলো সাধারণত উৎপন্ন হয় অনেক বেশি শক্তির  ভারী কণা হিসেবে। এগুলোর মধ্যে ৯৯% ই জন্ম নেয় প্রোটন বা আলফা কণা/হিলিয়াম নিউক্লিয়াস হিসেবে। আর মাত্র ১% জন্ম নেয় অন্যান্য ভারী কণা হিসেবে। এমনকি অনেক আন্টিম্যাটারও থাকে এই ধরনের রশ্মিতে। এইসকল ভারী ও উচ্চশক্তিসম্পন্ন কণাকে প্রাথমিক মহাজাগতিক রশ্মি বলে। 

ছবিঃ বায়ু ঝরনা।

এইসকল কণা যখন পৃথিবীতে আসে, তখন এগুলো বাতাসের অণু-পরমাণুর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং অপেক্ষাকৃত কম শক্তির হালকা কণায় পরিণত হয়। এগুলোর মধ্যে মূলত নিউট্রন ও মেসনের প্রাধান্য দেখা যায়। এগুলোকে বলে গৌণ রশ্মি।  প্রাথমিক রশ্মিগুলো বারবার ভেঙে অনেক ক্ষুদ্র গৌণ রশ্মিতে পরিণত হয়। ফলে একটা প্রাথমিক রশ্মি থেকে অসংখ্য গৌণ রশ্মির উৎপত্তি হয়। একটা কণা থেকে এইভাবে অনেক কণা উৎপন্ন হওয়ায় একে দেখতে অনেকটা বাথরুমের শাওয়ারের থেকে ছুটে আসা পানির মতো লাগায় একে বায়ু ঝরনা (air shower)-ও বলা হয়।

ছবিঃ প্রাথমিক কণা ভেঙে অসংখ্য গৌণ কণা তৈরি হচ্ছে।

হেসের পরীক্ষায় প্রাপ্ত রেডিয়েশনই হলো মহাজাগতিক রশ্মি, যেটা উপরের দিকে যত উঠা যায়, ততই বাড়তে থাকে। ফলে উপরের দিকে বায়ুমন্ডল আরো বেশি পরিমাণ আয়নিত হয়, এই রেডিয়েশনের সংস্পর্শে এসে। কারণ, উচ্চশক্তির প্রাথমিক রশ্মিগুলো যখন উপরের দিকের বায়ুমন্ডলে এসে আঘাত হানে, তখন এটি উপরের দিকের বায়ুমন্ডলকে বেশি করে আয়নিত করে। আবার, এই কণাগুলো যত বায়ুমন্ডলের নিচের দিকে আসতে থাকে, ততই এগুলো ভাঙতে থাকে, ততই প্রাথমিক কণা গৌণ কণায় পরিণত হতে থাকে, ততই কণাগুলোর এনার্জি কমতে থাকে। ফলে, আয়নিত করার ক্ষমতাও কমতে থাকে এবং রেডিয়েশনের মাত্রাও কমতে থাকে।

এরপরও, প্রতি সেকেন্ডে আমাদের শরীরের মধ্য দিয়ে প্রায় ১০,০০,০০,০০,০০,০০,০০০ বা ১০০ ট্রিলিয়ন নিউট্রিনো, যা এক ধরনের মহাজাগতিক রশ্মি,  চলে যায়। মানে প্রতিনিয়তই আমরা অসংখ্য মহাজাগতিক রশ্মি দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছি।

এটা বুঝার কি কোন উপায় আছে?

উত্তর হলো, হ্যাঁ আছে। ১৯১১ সালেই চার্লস উইলসন ক্লাউড চেম্বার তৈরি করেন। এতে মূলত পানির বাষ্প বা অ্যালকোহলের বাষ্পের অতিপৃক্ত বা অত্যন্ত ঘন একটা মাধ্যম একটা কাঁচের পাত্রে সম্পূর্ণ আবদ্ধ অবস্থায় থাকে। যখন কোন মহাজাগতিক রশ্মি এর মধ্য দিয়ে যায়, তখন এটি বাষ্পের অণুগুলোকে চার্জিত করে এবং মাধ্যমের মধ্যে একধরনের সূক্ষ্ম দাগ ফেলে। এটা দেখে বুঝা যায় যে একটা মহাজাগতিক রশ্মি এর মধ্য দিয়ে গেছে।

ছবিঃ ক্লাউড চেম্বার দিয়ে মহাজাগতিক রশ্মি শনাক্তকরণ।

যে কণা যত ভারী, সেটি তত মোটা দাগ তৈরি করবে। এই দাগ আসলে কণাটির গতিপথ নির্দেশ করে। কণাটি ওই মাধ্যম দিয়ে যাওয়ার সময় বাষ্পের কণাগুলোকে চার্জিত করে। ফলে বাষ্পের কণাগুলো পরস্পরকে আকর্ষণ করে ও ঘনীভূত হয়ে ক্ষুদ্র পানি বা অ্যালকোহলের ফোঁটায় পরিণত হয়, যেটাকে বাষ্পীয় মাধ্যমে আমরা দাগের মতো দেখতে পাই।

তবে বর্তমানে এই কাজে একধরনের যন্ত্র ব্যবহার করা যার নাম, হাই অ্যালটিটিউড ওয়াটার চ্যারেনকভ ডিটেক্টর (high altitude water cherenkov detector)। এতে মূলত একটা বিশাল পানির ট্যাংকে, ভারী পানি বা D₂O ব্যবহার করা হয়। এখানে, D হলো হাইড্রোজেনেরই একটা আইসোটোপ। এর আণবিক ভর ২ এবং নাম ডিউটেরিয়াম এগুলো মাটি থেকে অনেক উপরে বসানো থাকে।

ছবিঃ হাই অ্যালটিটিউড ওয়াটার চ্যারেনকভ ডিটেক্টর।

যখন কোন মহাজাগতিক রশ্মি এর মধ্য দিয়ে যায়, তখন এই পানিতে এক বিশেষ ধরনের নীল বর্ণের আলো দেখা যায়, যাকে চেরেনকোভ রেডিয়েশন বলে। এর মাধ্যমে মহাজাগতিক রশ্মির উপস্থিতি বুঝা যায়। এছাড়াও, টেলিস্কোপসহ বিভিন্ন পদ্ধতিতে বর্তমানে মহাজাগতিক রশ্মির উপস্থিতি নির্ণয় করা হয়। এখন মনে হতেই পারে যে, এত এত কণা প্রতিনিয়ত আমাদের শরীরের বিভিন্ন কোষের মধ্য দিয়ে গেলেও আমাদের কোন ক্ষতি হচ্ছে না কেন? কারণ হলো, আমাদের শরীরের মধ্য দিয়ে যেসকল মহাজাগতিক রশ্মি যায়, সেগুলো খুবই কম শক্তির হয়ে থাকে। বেশি শক্তির কণা খুব কমই আসে পৃথিবীতে। তবে মাঝেমধ্যে দুই একটা বেশি শক্তির কণা চলে আসতেই পারে। তবে এর জন্য আমাদের তেমন ক্ষতি হয় না।

সফট এরর

মেমোরি চিপে কম্পিউটার যে তথ্য জমা রাখে, সেটি আসলে অনেকগুলো মেমোরি সেল নিয়ে গঠিত। এই মেমোরি সেলগুলো আবার অনেকগুলো ট্রানজিস্টর নিয়ে গঠিত, যেগুলো হলো একপ্রকার সেমিকন্ডাক্টর। তো, একটা মেমোরি চিপে ধরি ২ⁿ বিট তথ্য জমা থাকে। এর মানে হলো, এটাতে ২ⁿ সংখ্যক ট্রানজিস্টর আছে, যেগুলোর প্রত্যেকটাতে ১ বিট তথ্য জমা থাকে।

যখন, কোন সংখ্যা কম্পিউটারে জমা থাকে, সেটা মেমোরি চিপে বাইনারি সংখ্যা হিসেবে জমা থাকে। এখন,কোন ট্রানজিস্টরের মধ্য দিয়ে যদি নির্দিষ্ট ভোল্টের কারেন্ট পাস হয়, তাহলে এতে থাকা বিট চেঞ্জ হয়ে ০ থেকে ১ বা ১ থেকে ০ হয়ে যায়। এখন, কোন কারণে যদি কোন ট্রানজিস্টরের মধ্য দিয়ে ভুলে কারেন্ট পাস হয়, তাহলে কম্পিউটার নিজে নিজেই সেই ট্রানজিস্টরের বিট চেঞ্জ করে দিবে। কারণ, কম্পিউটারের দরকার কারেন্ট, সেটার উৎস কি, সেটা কম্পিউটারের জানা দরকার নাই। কম্পিউটার নির্দিষ্ট ভোল্টের কারেন্ট পেলেই বিট চেঞ্জ করে দিবে। 

এইযে, বিভিন্ন কারণে, ভুলে ট্রানজিস্টরের বিট চেঞ্জ হয়ে যায়, এর ফলে জমা থাকা বিভিন্ন তথ্য, এমনকি কম্পিউটারের বিভিন্ন কমান্ডও চেঞ্জ হয়ে যেতে পারে। এই বিট চেঞ্জ হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে বলে বিট ফ্লিপ আর বিট ফ্লিপের ফলে ঘটা ভুলকে বলে সফট এরর । এর জন্য প্রধানত বিভিন্ন রেডিয়েশনকে দায়ী করা হয়ে থাকে। এমনকি, ওই সেমিকন্ডাক্টর যেসব পদার্থ দিয়ে বানানো হয়, ওইসব পদার্থে যদি সামান্য পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থও উপস্থিত থাকে, তাহলেও এই ঘটনা ঘটতে পারে। এই সফট এররের জন্য অনেক বড় ধরনের দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে।

অলৌকিক ভোটের লৌকিক ব্যাখ্যা

কিছুক্ষণ আগে আমরা যে বেলজিয়ামের ভোটে ভুতুড়ে কান্ড কারখানা দেখেছিলাম, সেটাও আসলে একটা সফট এরর। কেবল এখানে পার্থক্য হলো, সফট এররটা ঘটেছিল একটা মহাজাগতিক রশ্মির কারণে। ধারণা করা হয়, ভোট শেষে যখন সকল প্রার্থীর ভোটের তথ্য কম্পিউটারের মেমোরি চিপের ট্রানজিস্টরে জমা হয়, তখন  কোন একটা বেশি শক্তির মহাজাগতিক রশ্মি এর মেমোরি চিপের মধ্য দিয়ে যায় এবং মেমোরি চিপ তৈরি করার পদার্থের অণুতে উপস্থিত ইলেকট্রনকে ধাক্কা দিয়ে পরমাণুর বাইরে বের করে নিয়ে আসে। এর ফলে ওই ইলেকট্রন ওই মেমোরি চিপের সার্কিটে সামান্য কারেন্ট প্রবাহ তৈরি করে, যেটা ১৩ নাম্বার বিটের তথ্য জমা রাখা ট্রানজিস্টরে জমা থাকা ০ বিটকে চেঞ্জ করে ১ করে দেয়। ফলে, সেখানে বাইনারিতে থাকা ০০০১০০০০০০০১০ নাম্বারটা পরিবর্তিত হয়ে, হয়ে যায় ১০০১০০০০০০০১০। এখন, বাইনারিতে ০০০১০০০০০০০১০ সংখ্যাটা ৫১৪ বুঝালেও ১০০১০০০০০০০১০ সংখ্যাটা বুঝায় ৪৬১০। অর্থাৎ, কেবল ১ টা বিট পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ার ফলে ভোট সংখ্যা বেশি আসে ৪০৯৬ টি।

আর এটা যে একবারই হয়েছে তা না। অনেকবার অনেক ঘটনাতেই এরকম মহাজাগতিক রশ্মির কারণে সফট এররের উদাহরণ দেখা যায়। যেমন, ২০০৮ সালের ৭ অক্টোবর  সিংগাপুর থেকে অস্ট্রেলিয়ার পার্থ-এর দিকে যাওয়ার সময় একটা বিমানের ফ্লাইট কন্ট্রোল কম্পিউটারে একই সমস্যা দেখা দেয়, যার ফলে বিমানটিকে জরুরী অবতরণ করানো হয় এবং বিমানের অনেক যাত্রী আহত হয়। এছাড়াও, রকেটে এই সফট এররের ভয়ে  তিনটা কন্ট্রোল কম্পিউটার ব্যবহার করা হয়, যাতে একটাতে ভুল হলে বাকিগুলো সেই ভুলকে সংশোধন করতে পারে।

পৃথিবীর বাইরে মহাকাশে মহাজাগতিক রশ্মির তীব্রতা আরো বেশি। একারণে আপনারা খেয়াল করবেন যে যখনই কোন মহাকাশ অভিযান পরিচালনা করা হয়, তখন এতে খুবই কম স্টোরেজ রাখা হয় এবং এর যন্ত্রপাতিগুলোও হয় খুবই সহজ সরল প্রকৃতির। কারণ, যন্ত্রপাতি যত জটিল হবে, এদের সার্কিটও হবে তত জটিল। ফলে এতে ব্যবহৃত সেমিকন্ডাক্টরও হবে তত বেশি আর ভুলও হবে তত বেশি। এই ভুল যাতে কম হয়, এইজন্য যথাসম্ভব সহজ সরল ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়। 

এমনকি, আপনার কম্পিউটারেও এর কারণে অনেকসময় বাগ দেখা দিতে পারে, এমনকি পুরো কম্পিউটারও ক্রাশ করতে পারে। তবে এজন্য আমাদের ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই। কারণ এইধরনের ঘটনা খুবই বিরল, এবং বর্তমানে এগুলো প্রতিরোধের জন্য সকল ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রতেই বিশেষ ব্যবস্থা যুক্ত করা থাকে। আশা করি পরেরবার কম্পিউটার ক্রাশ করলে শুধু কম্পিউটার কোম্পানিকে গালাগাল দিবেন না, এই মহাবিশ্বকেও একটু আধটু দিবেন!

তথ্যসুত্র-

লেখাটি 79-বার পড়া হয়েছে।

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 907 other subscribers