পৃথিবীতে পানি এলো কি করে? (শেষ পর্ব)

যদি পৃথিবী সৃষ্টির সময়ে পানির অস্তিত্ব না থাকে, তাহলে অবধারিতভাবেই পানি এসেছিল গঠন প্রক্রিয়া সমাপ্তির পরে। আর এদের পৌঁছে দেয়ার কাজটি করেছিল অজানা কোন মহাজাগতিক অতিথি। শুষ্ক পৃথিবী তত্ত্ব অনুসারে, ডেলিভারি সার্ভিসের সম্ভাব্য তালিকার প্রথম দিকেই আছে বরফ সমৃদ্ধ পাথর বা প্ল্যানেটেসিমালের নাম, যাদের আগমন হতে পারে সৌরজগতের বাইরের অংশ থেকে। উৎপত্তি স্থল আইস লাইন পার হয়ে অনেকটা বাইরে হওয়ায় এদের মধ্যে প্রচুর পরিমাণ বরফের অস্তিত্ব থাকতে পারে। এই প্ল্যানেটেসিমালগুলো পৃথিবীতে আসার পেছনে মূল কলকাঠি নাড়ে সৌরজগতের গ্যাস জায়ান্টগুলো। তাদের গ্র্যাভিটির প্রবল আকর্ষণে সৌরজগত সৃষ্টির সময়কার অবশিষ্ট প্ল্যানেটেসিমালরা যাত্রা করে টেরেস্টিয়াল গ্রহদের দিকে।

সুবিশাল সৌরজগতের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল থেকে বরফ সমৃদ্ধ পাথর বা প্ল্যানেটেসিমালের আগমনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এমন প্রতিটি অঞ্চলেরই রয়েছে আলাদা বিশেষত্ব। পানি রহস্য সমাধানে এদের সম্পর্কে জানার কোন বিকল্প নেই। হয়তো এদের থেকেই কোন এক সময় মহাবিশ্বে বাসযোগ্য গ্রহ খুঁজে বের করার লুকানো সূত্রের হদিশ পাওয়া যাবে। আমাদের সৌরজগতের এমনই এক বিশেষ অঞ্চল হলো কুইপার বেল্ট। এর অবস্থান মূল নক্ষত্র থেকে ৩০-৫০ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট দূরত্বে। অর্থাৎ, সৌরজগতের সর্বশেষ স্বীকৃত গ্রহ নেপচুনের চেয়েও বেশি দূরে। কুইপার বেল্টের সবচেয়ে বিখ্যাত সদস্য হলো বামন গ্রহ প্লুটো। এটি ছাড়াও প্রায় লক্ষাধিক বস্তুর মিলন মেলা এই বেল্টটি। যাদের প্রায় প্রত্যেকের আকার শত কিলোমিটারের উপরে।

কুইপার বেল্ট

কুইপার বেল্ট ঠিক কীভাবে গঠিত হয়েছিল সেটি নিয়ে এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নন বিজ্ঞানীরা। সূর্য থেকে এতটা দূরে গতানুগতিক প্রক্রিয়ায় এদের গঠন অসম্ভব না হলেও বেশ কঠিন। কারণ সেখানকার ডিস্কের ধূলিকণারা বেশ খানিকটা জায়গা নিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে এবং অনেকখানি প্রশস্ত কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে। ফলে উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায় এদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটার ও জোড়া লাগার সম্ভাবনা। এই সমস্যা আরো তীব্র আকার ধারণ করে প্রতিবেশি গ্যাস জায়ান্ট নেপচুনের অযাচিত হস্তক্ষেপে। এর গ্র্যাভিটির দুর্নিবার আকর্ষণে ধুলিকণা ও প্ল্যানেটেসিমালদের গতি অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ, আরো কমে যায় এদের পরস্পরের সাথে জোড়া লাগার সম্ভাবনা। যদি কুইপার বেল্টের বস্তুরা নেপচুনের আগেই গঠিত হতো, তাহলে হয়তো এই উটকো ঝামেলা এড়ানো যেত। কিন্তু সেটিও এক রকম অসম্ভব। এতো সব সমস্যার একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে মাইগ্রেশন তত্ত্ব। খুব সম্ভবত কুইপার বেল্টের বস্তুদের গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল সূর্যের আরো কাছে, যেখানে না চাইতেই কণাদের মধ্যে প্রতিনিয়ত ঘটে তুমুল সংঘর্ষ। পরবর্তীতে ইউরেনাস বা নেপচুনের মত গ্যাস জায়ান্টদের শক্তিশালী গ্র্যাভিটির চক্করে পড়ে ঠাই করে নেয় সৌরজগতের বাইরের অংশে।

কুইপার বেল্টের বিবর্তনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে গ্যাস জায়ান্ট নেপচুনের নাম। এমনকি এর সবচেয়ে বড় উপগ্রহ ট্রিটনও বেল্টের সাবেক সদস্য। সুদূর অতীতে একে চুরি করে নিয়ে এসেছিল নীলাভ গ্রহটি। সেই দুঃখেই হয়তো উপগ্রহটি নেপচুনকে পরিভ্রমণ করে গ্রহের ঘূর্ণনের উল্টো দিক থেকে। যা-ই হোক। কালের বিবর্তনেও বেল্টের বস্তুদের উপরে নেপচুনের খবরদারি এতটুকু কমে নি। এখনও নানা ভাবে তাদের হেনস্তা করে যাচ্ছে গ্রহটি। যদি বেল্টের কোন পাথুরে সদস্য নেপচুনের খুব কাছে চলে আসে, তাহলে গ্র্যাভিটিকে কাজে লাগিয়ে সেটিকে ত্বরান্বিত করে ঠেলে দেয়া হয় সৌরজগতের ভেতরের দিকে। সূর্যের কাছে পৌঁছালে এই বস্তুদের বরফ সমৃদ্ধ দেহ ক্রমশ বাষ্পীভূত হতে থাকে এবং এতে জলীয় বাস্পের তৈরি লেজ সদৃশ আকৃতির সৃষ্টি হয়। তখন এই বস্তুগুলোকে ডাকা হয় ধুমকেতু নামে।    

ঝাড়ুর মত লেজ বিশিষ্ট ধুমকেতুরা রহস্যময় এক মহাজাগতিক বস্তু। এদের কিছু সদস্য সূর্যের পাশ দিয়ে বৃহত্তর উপবৃত্তাকার কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে। ফলে কয়েক দশক বা শতক পর পর এদের দেখা মিলে সৌরজগতের ভেতরের অংশে। বাকি সদস্যরা পথ চলে পরাবৃত্তাকার বা অধিবৃত্তাকার কক্ষপথে। জীবনদশাতে সেগুলো কেবল মাত্র একবারই পদচিহ্ন আঁকে সৌরজগতের গহীনে। অতঃপর মিলিয়ে যায় দিগন্ত সীমায়। নিচের ছবিতে ধুমকেতুর হরেক রকম কক্ষপথ সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়েছে।

ধুমকেতুর কক্ষপথ

প্রাচীনকাল থেকে এযাবৎকাল পর্যন্ত জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রায় হাজার পাঁচেক ধুমকেতুকে আলাদাভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। এতোগুলোর ভিড়ে একটি বিশেষ ধুমকেতু জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। জ্বি পাঠক, ঠিক ধরেছেন। সেটি হলো হ্যালির ধুমকেতু। প্রতি ৭৫-৭৬ বছর পর পর সৌরজগতে দৃশ্যমান হয় এটি। একই ধুমকেতু যে পুনরায় সৌরজগতে ফিরে আসতে পারে সেটি শুরুতে বিজ্ঞানীদের কল্পনাতেও ছিল না। বিষয়টি সর্বপ্রথম লক্ষ্য করেছিলেন ব্রিটিশ জ্যোতির্বিদ এডমণ্ড হ্যালি। ১৬৮২ সালে নিজের পর্যবেক্ষণ করা একটি ধুমকেতুর কক্ষপথের সাথে অতীতের দুইটি (১৫৩১ সালে ও ১৬০৭ সালে দৃশ্যমান) ধুমকেতুর গতিপথের অস্বাভাবিক মিল দেখেই এমন সিদ্ধান্তে আসেন তিনি।

এডমণ্ড হ্যালি

১৭৫৮ সালে সেই ধূমকেতুটির পুনরায় সৌরজগতে আগমনের ভবিষ্যৎবাণী করেন হ্যালি। তবে এর সত্যতা নিজে যাচাই করে যেতে পারেন নি তিনি। ধুমকেতুর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের সময়ের ১৭ বছরের আগেই মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তবে ধুমকেতুটি একেবারেই নিরাশ করে নি। একদম নির্ধারিত সময়েই হাজির হয় পৃথিবীবাসীর দৃষ্টি সীমায়। ১৭৫৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর শৌখিন জ্যোতির্বিদ জোহান পালিটজ জার্মানি থেকে সর্বপ্রথম একে দেখতে পান। ভবিষ্যৎবাণী সত্যি হওয়ায় হ্যালির নামের সাথে মিলিয়ে ধুমকেতুটির নামকরণ করা হয়। সর্বশেষ ১৯৮৬ সালে পৃথিবীর আকাশে একে দেখা গিয়েছিল। ধূমকেতুটি আবার সূর্যের আতিথ্য গ্রহণ করবে ২০৬১ সালে।

শুনতে বেখাপ্পা মনে হলেও হ্যালির ধুমকেতুকে স্থান দেয়া হয় স্বল্প পর্যায়কালের ধুমকেতুদের কাতারে। আসলে মহাজাগতিক স্কেলে ৭৬ বছর কেবল একবার চোখের পলক ফেলার নামান্তর। যে সব ধুমকেতুর পর্যায়কাল দুইশত বছরের কম, তাদের সবাইকেই স্থান দেয়া হয় এই শ্রেণীতে। সাধারণত এই ধরণের অধিকাংশ ধুমকেতুদের আদি নিবাস কুইপার বেল্ট। নেপচুনের গ্র্যাভিটির প্রত্যক্ষ প্রভাবে এরা যাত্রা শুরু করে এবং বৃহত্তর উপবৃত্তাকার কক্ষপথে পরিভ্রমণরত থাকে। অনেকটা সৌরজগতের গ্রহদের মতন। নেপচুন ও কুইপার বেল্ট উভয়েই সূর্যের সাথে একই সমতলে থাকায়, এদের থেকে আবির্ভূত ধুমকেতুরাও সূর্যকে প্রায় একই তলে পরিভ্রমণ করে। তবে ঠিক এই জায়গাতেই পুরোপুরি ব্যতিক্রম হ্যালির ধুমকেতু। এর কক্ষপথ অনেকখানি হেলানো। প্রায় ১৮ ডিগ্রির সমপরিমাণ। পাশাপাশি এটি সূর্যকে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে থেকে (সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহদের তুলনায়) পরিভ্রমণ করে। নিচের ছবিটি দেখলেই বিষয়টি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

হ্যালির ধুমকেতুর হেলানো তল

এইরকম ব্যতিক্রমী গতিপথের দরুন বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে, হ্যালির ধুমকেতুর উৎপত্তিস্থল কুইপার বেল্ট নয়। খুব সম্ভবত এর আগমন হয়েছে সৌরজগতের একদমের শেষ প্রান্তে অবস্থিত এক রহস্যময় এলাকা থেকে। যার নাম ওর্ট ক্লাউড।    

সূর্যের চারদিকে ২২,০০০ থেকে ১০০,০০০ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট পর্যন্ত দূরত্বের এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ওর্ট ক্লাউড। ছোট বড় মিলিয়ে সেখানে থাকা বস্তুদের সংখ্যা ট্রিলিয়নেরও বেশি। এই এলাকার পুরো অংশে সূর্যের গ্র্যাভিটির টানকে নাকচ করে দেয় গ্যালাক্সির বাইরের অংশের গ্র্যাভিটি। ফলে সদস্য বস্তুগুলো কোন দিকেই টান অনুভব করে না। বজায় থাকে পরিপূর্ণ সাম্যাবস্থা। নিচের ছবিতে ওর্ট ক্লাউড, কুইপার বেল্ট ও অ্যাস্ট্রয়েড বেল্টের পারস্পরিক অবস্থান দেখানো হয়েছে।                

ওর্ট ক্লাউড, কুইপার বেল্ট ও অ্যাস্ট্রয়েড বেল্টের পারস্পরিক অবস্থান

মাঝে মধ্যে পার্শ্ববর্তী কোন নক্ষত্রের গ্র্যাভিটির প্রভাবে ওর্ট ক্লাউডের ভারসাম্য অবস্থার সামান্য বিচ্যুতি হতে পারে। তখন কিছু পাথুরে বস্তু যাত্রা শুরু করতে পারে সৌরজগতের ভেতরের অংশের দিকে। এই বস্তুরাই হলো দীর্ঘ পর্যায়কালের ধুমকেতু। এমন একটি ধুমকেতুর নাম কমেট লাভজয়। এর আবিষ্কারক অস্ট্রেলিয়ান শৌখিন জ্যোতির্বিদ টেরি লাভজয়। ২০১৪ সালের আগস্টে ধুমকেতুটিকে শনাক্ত করেছিলেন তিনি। ২০১৫ সালের শুরুতে একে খালি চোখেই দেখতে পেয়েছিল পৃথিবীবাসী। প্রথম দিকে ধুমকেতুটির পর্যায়কাল ছিল প্রায় ১১,০০০ বছর। কিন্তু সৌরজগতে ভ্রমণের সময়ে গ্রহগুলোর গ্র্যাভিটির প্রভাবে এর পর্যায়কাল নেমে আসে ৮,০০০ বছরে।

যে সব ধুমকেতুর একবার পূর্ণ চক্র সম্পন্ন করতে কমপক্ষে দুইশত বছরের বেশি সময় প্রয়োজন পড়ে, তাদের কারোর উৎপত্তিস্থলই কুইপার বেল্ট হতে পারে না। কারণ এহেন কক্ষপথের জন্য বেল্টটির অবস্থান খুব কাছে। দীর্ঘ পর্যায়কালের ধুমকেতুদের উৎস এবং এদের কক্ষপথের অনেকখানি হেলানো তলের কার্যকারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়েই ডাচ জ্যোতির্বিদ জ্যান হেনড্রিক ওর্ট সৌরজগতের শেষ প্রান্তে একটি বিশেষ এলাকার প্রস্তাব করেছিলেন। তার প্রস্তাবনাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫০ সালে। মজার ব্যপার হলো, এর প্রায় ১৮ বছর আগে এস্তোনিয়ান জ্যোতির্বিদ আর্নেস্ট ওপিক ঠিক একই ধরণের প্রস্তাবনা দিয়েছিলেন।

কমেট লাভজয়

কিন্তু সেটি মোটেও সাড়া ফেলতে পারে নি। আসলে ওপিক তার গবেষণা প্রকাশ করেছিলেন তুলনামূলক অখ্যাত একটি জার্নালে। যা কিনা সমসাময়িক জ্যোতির্বিদরা নতুন গবেষণা সম্পর্কে জানার জন্য খুব একটা অনুসরণ করতেন না। পাশাপাশি ওপিকের গবেষণা পত্রের নামকরণও খুব একটা যুতসই হয় নি। সেটির শিরোনাম ছিল এমন, “নোট অন স্টেলার পারটারবেশন অফ নেয়ারবাই প্যারাবলিক অরবিটস”। অন্যদিকে, ওর্টের গবেষণাপত্রের নাম ছিল, “দ্য স্ট্রাকচার অফ দ্য ক্লাউড অফ কমেটস সারাউন্ডিং দ্য সোলার সিস্টেম”। নিজেরাই বিচার করে নিন কোনটা বেশি আকর্ষণীয় ও সহজবোধ্য।

শুরুতে একদমই নজর কাড়তে না পারলেও ইতিহাস ওপিকের অবদান ভুলে যায় নি। সৌরজগতের শেষ প্রান্তের এলাকাটিকে অনেক সময়ে ওপিক-ওর্ট ক্লাউড নামেও ডাকা হয়। অদ্ভুত ব্যপার হলো, কুইপার বেল্টের আবিষ্কার নিয়েও ঠিক একই ধরণের ঘটনা ঘটেছিল। কুইপারের প্রায় আট বছর আগে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে আইরিশ জ্যোতির্বিদ কেনেথ এজওর্থ বেল্টটির অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। তার কাজটিও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে নি। ইতিহাস কেনেথের প্রতিও নির্দয় হয় নি। সম্পূর্ণ আলাদা দুইটি প্রচেষ্টাকে সম্মান জানিয়ে বর্তমানে বেল্টটিকে এজওর্থ-কুইপার বেল্ট নামেও ডাকা হয়।

কেনেথ এজওর্থ

যা-ই হোক। আবার ফিরে আসা যাক হ্যালির ধুমকেতুতে। উৎস হিসেবে কুইপার বেল্টের পরিবর্তে ওর্ট ক্লাউডকে ধরে নিলে এর হেলানো কক্ষপথের যৌক্তিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। সেখান থেকে আসা অধিকাংশ ধুমকেতুর সাধারণ বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন মাত্রায় হেলানো কক্ষপথ। একটু আগে উল্লেখ করা কমেট লাভজয়ের কক্ষপথও প্রায় ৬৪ ডিগ্রি পর্যন্ত হেলানো। কিন্তু সমস্যা হলো, পর্যায়কাল বিবেচনায় নিলে হ্যালির ধুমকেতুর পক্ষে কোনভাবেই ওর্ট ক্লাউডের সদস্য হতে পারার কথা নয়। মাত্র ৭৬ বছর সময়কালের মাঝে সেখান থেকে সূর্যের কাছাকাছি অবস্থানে যাওয়া আসা করা আকাশ কুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়।

অর্থাৎ, ধুমকেতুটি কুইপার বেল্ট ও ওর্ট ক্লাইড উভয়ের জন্যই ব্যতিক্রম। অবশ্য এর উপরে মহাজাগতিক বস্তুদের প্রভাব বিবেচনায় নিলে এই সমস্যার একটি কূলকিনারা করা যেতে পারে। সৌরজগতের গ্রহদের আকর্ষণে ধুমকেতুর কক্ষপথ উল্লেখযোগ্য হারে পরিবর্তিত হতে পারে। এর দরুন অনেকখানি কমে যেতে পারে তাদের পর্যায়কালের মান। যেমনটা আমরা হতে দেখেছি কমেট লাভজয়ের বেলায়। খ্রিস্টপূর্ব ২৬০ অব্দ থেকে বর্তমান পর্যন্ত হ্যালির ধুমকেতুর পর্যায়কাল প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। হয়তো এর আগে সুদূর অতীতে ধুমকেতুটির পর্যায়কালের মান অনেক বেশি ছিল। যা কিনা ওর্ট ক্লাউড থেকে আসা অন্যান্য দীর্ঘ পর্যায়কালের ধুমকেতুদের সাথে মানানসই। শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও এমনটা ঘটা খুবই সম্ভব। এখন পর্যন্ত প্রায় শতাধিক ধুমকেতুতে পর্যায়কাল পরিবর্তনের নিশ্চিত প্রমাণ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। 

প্রিয় পাঠক, নিশ্চয়ই ভাবছেন, ধুমকেতু নিয়ে এতো মাতামাতি করার হঠাৎ কি দরকার পড়লো? আসলে শুষ্ক পৃথিবী তত্ত্ব অনুসারে, পৃথিবীতে পানি পৌঁছানোর খুব চমৎকার মাধ্যম হতে পারে বরফের আড্ডাখান এই ধুমকেতুরা। এদের সাথে সংঘর্ষে খুব সহজেই তৈরি হতে পারে পৃথিবীর বিশালার সব মহাসাগরগুলো।

যদি বিলিয়ন বিলিয়ন বছর আগে সত্যি ধুমকেতুরা পানি নিয়ে এসে থাকে, তাহলে পৃথিবীর পানির সাথে নিশ্চিতভাবেই এদের বরফ তথা পানির গাঠনিক সাদৃশ্য থাকার কথা। কি অবাক হলেন? ভাবছেন, মহাবিশ্বের সব জায়গার পানি তো একই হওয়ার কথা। এদের মধ্যে ভিন্নতা আসবে কীভাবে? আসলে বিষয়টা এমন নয়। মোটা দাগে নিঃসন্দেহে মহাবিশ্বের সব পানিই হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের সমন্বয়ে গঠিত। এদের প্রতি অণুতে থাকে দুইটি হাইড্রোজেন পরমাণু এবং একটি অক্সিজেন পরমাণু। এই হাইড্রোজেন পরমাণুগুলোতেই থাকতে পারে ভিন্নতা। প্রকৃতিতে হাইড্রোজেনের তিনটি আইসোটোপের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রোটিয়াম, ডিউটেরিয়াম এবং ট্রিটিয়াম। প্রথমটিতে কোন নিউট্রন থাকে না। অন্যদিকে, ডিউটেরিয়াম এবং ট্রিটিয়ামে নিউট্রনের সংখ্যা যথাক্রমে এক ও দুই। সাধারণত অধিকাংশ পানিতেই থাকে প্রোটিয়াম আইসোটোপ। খুব সামান্য পরিমাণ পানিতে দেখা মিলে ডিউটেরিয়ামের।

দুইটি ডিউটেরিয়াম পরমাণু সমৃদ্ধ পানিকে বলা হয় হেভি ওয়াটার বা ভারী পানি। আর যদি কোন পানির অণুতে একটি ডিউটেরিয়াম ও একটি প্রোটিয়াম থাকে, তাহলে সেটির নাম হয় সেমি হেভি ওয়াটার। পৃথিবীর পানিতে প্রতি ৬৭০০ টি হাইড্রোজেন পরমাণুর মধ্যে একটি ডিউটেরিয়াম খুঁজে পাওয়া যায়। যদি ধুমকেতুর বরফ তথা পানিতে প্রোটিয়াম-ডিউটেরিয়ামের অনুপাত ঠিক এমনই হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবে পৃথিবীর পানির আদিম ঠিকানা হবে এরা।প্রোটিয়াম-ডিউটেরিয়ামের অনুপাত নিশ্চিতভাবে জানতে হলে আমাদের যেতে হবে ধুমকেতুর রাজ্যে। বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে এরা পানি। তবেই কেবল মিলতে পারে পৃথিবীর পানি রহস্যের সমাধান। কাজটি মোটেও সহজ নয়। কিন্তু অদম্য কৌতূহলের সামনে কখনই টিকতে পারে না কোন বাঁধা। ধুমকেতুর রাজ্যে যেতে এক দুঃসাহসিক অভিযানের পরিকল্পনা করলেন বিজ্ঞানীরা। যার নাম “রোসেটা” ।           

রোসেটা মিশনের ল্যান্ডার ডেলিভারি দেওয়ার সময়ের ছবি

ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির রোসেটা মিশন মহাশূন্যে উড়াল দেয় ২০০৪ সালের মার্চে। গন্তব্য ৬৭পি/চুরুমভ-গেরাসিমেনকো নামের একটি ধুমকেতু। তখন পর্যন্ত কয়েকটি স্পেস মিশন ধুমকেতুর বেশ কাছে দিয়ে উড়ে গিয়েছিল। তবে তাদের কেউই ধুমকেতুর নিউক্লিয়াসকে ঘিরে কক্ষপথ ঘূর্ণায়মান থাকে নি অথবা অবতরণ করার চেষ্টাও করে নি সেগুলোর পৃষ্ঠে। প্রথমবারের মত এই অসাধ্য সাধনে নামে স্পেস মিশন রোসেটা। এর ঐতিহাসিক অবতরণ প্রচেষ্টার জন্য প্রথম পছন্দ ছিল না ৬৭পি/চুরুমভ-গেরাসিমেনকো। মিশন কন্ট্রোলের প্রথম পছন্দ ছিল ৪৬পি/উইরটানেন নামের অন্য আরেকটি ধুমকেতু। ২০০২ সালের শেষ দিকে ঘটা কারিগরি ত্রুটির কারণে বেশ কিছু দিন পিছিয়ে যায় মিশনটি। এহেন অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্বের দরুন সেই ধুমকেতুটি চলে যায় মানুষের নাগালের বাইরে। তখনই নতুন টার্গেট হিসেবে নির্ধারণ করা হয় ৬৭পি/চুরুমভ-গেরাসিমেনকোকে।

একবার পূর্ণ চক্র সম্পন্ন করতে ৬৭পি এর প্রয়োজন পড়ে মাত্র সাড়ে ছয় বছর। স্বল্প পর্যায়কালের এই ধুমকেতুটি একদা কুইপার বেল্টের সদস্য ছিল। কয়েক শতাব্দী আগেও এটি সূর্যের খুব একটা কাছে আসতে পারতো না। সর্বোচ্চ ৪ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট পর্যন্ত ছিল এর দৌড়। সে সময়ে একে পৃথিবী থেকে দেখা যেতো না। তবে ১৮৪০ সালে গ্যাস জায়ান্ট বৃহস্পতির গ্র্যাভিটির প্রভাবে এর কক্ষপথে পরিবর্তন আসে। একই ঘটনা আবারো ঘটে ১৯৫৯ সালে। এভাবে ধুমকেতুটি প্রায় পৃথিবীর কাছাকাছি (১.২৯ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট) পৌঁছাতে সক্ষম হয়। এর ঠিক দশ বছর পরে খুঁজে পাওয়া যায় একে। বার বার বৃহস্পতি দ্বারা সরাসরি প্রভাবিত হওয়ায় ধুমকেতুটিকে অনেক সময়ে “জুপিটার ফ্যামিলি কমেট” নামেও ডাকা হয়।

৬৭পি ধূমকেতু

ধুমকেতু ৬৭পি এর সাথে রোসেটার সরাসরি সাক্ষাৎ হয় মঙ্গল ও বৃহস্পতির মাঝামাঝি অবস্থানে। সূর্য থেকে প্রায় ৩ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট দূরত্বে। এতখানি পথ পাড়ি দেয়া মোটেও সহজ কোন কাজ ছিল না। গ্র্যাভিটিকে কাজে লাগিয়ে দূর যাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি সংগ্রহের জন্য রোসেটাকে পৃথিবীকে তিনবার এবং মঙ্গল গ্রহকে একবার প্রদক্ষিণ করতে হয়েছিল। সর্বসাকুল্যে মোট ৬.৪ বিলিয়ন কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয় মহাকাশযানটি। ধুমকেতুর কাছে পৌঁছাতে এর সময় লাগেছিল প্রায় দশ বছর। গন্তব্যে পৌঁছানোর পর ধুমকেতুর নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ঘুরতে শুরু করে রোসেটা। শুরু করে তথ্য সংগ্রহের কাজ। অন্যদিকে, এর রোবোটিক ল্যান্ডার ফিলাই (Philae) আরম্ভ করে ধুমকেতুর পৃষ্ঠে অবতরণের প্রস্তুতি। ২০১৪ সালের ১২ নভেম্বর প্রায় সাত ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস প্রচেষ্টার পর সেখানে নামতে সক্ষম হয় ফিলাই। পুরো ঘটনাটি ইন্টারনেটে লাইভ সম্প্রচার করা হয়। যার সাক্ষী হয় প্রায় দশ মিলিয়ন মানুষ।

১৬:০২ জিএসটি তে ধুমকেতুর পৃষ্ঠ স্পর্শ করে ফিলাই। কিন্তু এরপরেই ঘটতে শুরু করে অঘটন। কারিগরি ত্রুটিতে ধুমকেতুর পৃষ্ঠে নোঙ্গর করতে ব্যর্থ হয় ছোট্ট প্রোবটি। অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাউন্স করা শুরু করে সেটি। ধুমকেতুর অপেক্ষাকৃত কম গ্র্যাভিটির আকর্ষণকে উপেক্ষা করে প্রোবটি মহাশূন্যে ছিটকে যাওয়ার উপক্রম হয়। সৌভাগ্যক্রমে সেটি হয় নি। ফিলাই শেষ মেষ স্থির হয় ধুমকেতুর পৃষ্ঠেই। তবে আটকানোর জায়গাটি মোটেও সুবিধাজনক ছিল না। ছায়াযুক্ত সেই জায়গাতে পৌঁছাতে পারতো না সূর্যালোক। ফলে সোলার পাওয়ার্ড প্রোবটির ব্যাকআপ ব্যাটারি সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। আর আড়াই দিন পর ফুরিয়ে যায় মূল ব্যাটারিটিও। তখন হাইবারনেশনে চলে যায় প্রোবটি। অবশ্য এর আগেই পূর্ব নির্ধারিত বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ করে ফেলেছিল সেটি। অন্যদিকে, ধুমকেতুর পৃষ্ঠ থেকে উপরে ঘূর্ণায়মান থেকে ক্রমাগত তথ্য সংগ্রহ করে পৃথিবীতে পাঠাতে থাকে রোসেটা। প্রায় দুই বছর পর্যন্ত চলতে থাকে এই প্রক্রিয়া। অবশেষে ২০১৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরে নিয়ন্ত্রিতভাবে রোসেটাকে ধুমকেতুর বুকে ক্রাশ ল্যান্ডিং করানো হয়। এর মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির ইতিহাসের অন্যতম সফল মিশনের। ফিলাই এবং রোসেটা উভয়েরই সমাধি হয় ধুমকেতুর বুকে।

৬৭পি ধুমকেতুর পৃষ্ঠের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে আসার পর প্রথম এর পানির স্পর্শ পেয়েছিল রোসেটা। সেই পানি ঠিক পৃথিবীর পানির মত নয়। এতে ডিউটেরিয়ামের পরিমাণ পৃথিবীর পানির তুলনায় প্রায় তিনগুন। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে ভূমি থেকে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কুইপার বেল্ট ও ওর্ট ক্লাউড থেকে আসা আরো বেশ কয়েকটি ধুমকেতুর পানি বিশ্লেষণ করেও কম বেশি একই ফলাফল পান বিজ্ঞানীরা। সেগুলোর কেবল মাত্র একটিতে পৃথিবীর পানির সমান প্রোটিয়াম-ডিউটেরিয়ামের অনুপাত পাওয়া যায়। সব বিষয় বিচার বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে আসেন যে সূর্য থেকে উৎসের দূরত্ব বাড়ার সাথে সাথে পানিতে ডিউটেরিয়ামের পরিমাণ বাড়তে থাকে। অর্থাৎ, কুপার বেল্ট বা ওর্ট ক্লাউডের মত বিশাল দূরত্ব থেকে পৃথিবীতে পানি আগমনের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। এদের আসতে হবে আমাদের আশেপাশের কোন উৎস থেকে।     

অ্যাস্ট্রয়েড বেল্ট

পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে অলস ভেসে বেড়ানো বরফ সমৃদ্ধ পাথুরে বস্তুদের অন্যতম উৎস অ্যাস্ট্রয়েড বেল্ট। মঙ্গল ও বৃহস্পতির মাঝে অবস্থান করা এই বেল্টের সদস্য সংখ্যা দুই লাখেরও বেশি। এদের অনেকেরই আকার এক কিলোমিটারেরও বেশি। ১৯৭২ সালের জুলাইয়ে পাইওনিয়ার ১০ নামে নাসার একটি প্রোব সর্বপ্রথম অ্যাস্ট্রয়েড বেল্টে প্রবেশ করে। বেল্টের অগনিত পাথুরে বস্তুর যে কোনটির সাথে সংঘর্ষে প্রোবটি নিমিষেই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশংকা করেছিলেন অনেকেই। তবে সব শঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে নিরাপদে বেল্ট অতিক্রম করে সেটি। আসলে বেল্টের গ্রহাণুগুলো একে অন্যের চেয়ে বেশ ভালোই দূরে অবস্থিত। এদের মধ্যবর্তী গড় দূরত্ব কয়েক মিলিয়ন কিলোমিটারের কাছাকাছি।

কুইপার বেল্টের মত অ্যাস্ট্রয়েড বেল্টেরও রয়েছে নিজস্ব বামন গ্রহ। এর নাম সেরেস। এটি ছাড়াও ভেস্টা, প্যালাস, হাইজেইয়া ইত্যাদির মত বেশ কিছু বিশালাকার পাথরের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় সেখানে। এদের প্রত্যেকের আকার ৪০০ কিলোমিটারের বেশি। অ্যাস্ট্রয়েড বেল্টটির অবস্থান সূর্য থেকে এমন এক দূরত্বে যেখানে আরেকটি গ্রহ গঠিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু প্রতিবেশি বৃহস্পতির দাপটে সম্ভব হয় নি সেটি। এর গ্র্যাভিটির আকর্ষণে বেল্টের পাথুরে বস্তুদের মধ্যে সংঘর্ষের গতিবেগ অনেকখানি বেড়ে গিয়েছিল। ফলে থমকে গিয়েছিল এদের জোড়া লাগার প্রক্রিয়া।

বৃহস্পতির পাশ ঘেঁষা অ্যাস্ট্রয়েড বেল্টের পাথরগুলো যথেষ্ট পরিমাণ বরফ সমৃদ্ধ হয়ে থাকে। মাঝে মধ্যেই এদেরকে নিজ কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত করে সূর্যের অভিমুখে যাত্রা করতে বাধ্য করে গ্যাস জায়ান্টটি, যেমনটা আমরা হতে দেখি কুইপার বেল্টে। সেখানে অবশ্য বৃহস্পতির বদলে মূল কলকাঠি নাড়ে আরেক গ্যাস জায়ান্ট নেপচুন। এখান থেকে ছিটকে আসা পাথরগুলো অনেক সময়েই ধুমকেতুতে রূপান্তরিত হলেও অ্যাস্ট্রয়েড বেল্টের সাবেক সদস্যদের বেলায় এমনটা হওয়ার কোন সুযোগ নেই। কারণ এহেন রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় যথেষ্ট পরিমাণ বরফ এদের মাঝে থাকে না। বিজ্ঞানীরা বেল্ট থেকে ছিটকে যাওয়া এই বস্তুদের নামকরণ করেছেন “নেয়ার আর্থ অবজেক্ট”। স্পেস মিশনের জন্য এরা বেশ আকর্ষণীয় লক্ষ্যবস্তু।

রিউগু একটি সি টাইপ গ্রহাণু

পৃথিবীর অনেকটাই সন্নিকটে অবস্থিত হওয়ায় এদের কাছে পৌঁছাতে খুব একটা কাঠ খড় পোড়াতে হয় না। পানির উৎস অনুসন্ধানে এমনই দুইটি লক্ষ্যবস্তুতে আলাদাভাবে দুটি স্পেস মিশনের পরিকল্পনা করেন জাপান ও আমেরিকান বিজ্ঞানীরা। জাপানীদের মিশনের নাম দেয়া হয় হায়াবুসা ২। ২০১৪ সালের ৩ ডিসেম্বর মহাশূন্যে পাড়ি জমায় মিশনটি। এর প্রায় দুই বছর পরে (২০১৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর) যাত্রা করে নাসার মিশন ওসিরিস-রেক্স (OSIRIS-REx)।  জাপানী বিজ্ঞানীরা হায়াবুসা ২ স্পেস মিশনের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে রিউগু (Ryugu) নামের একটি সি টাইপ গ্রহাণু। প্রায় সাড়ে চার মিলিয়ন বছর আগে সৌরজগত সৃষ্টির পরে এই ধরণের গ্রহাণুগুলোতে কালের বিবর্তনে খুব সামান্যই পরিবর্তন হয়েছে। তাই পানি রহস্যের সমাধান সহ সৌরজগতের সৃষ্টির সময়কার নানা তথ্য পাওয়ার উজ্জ্বল সভাবনা রয়েছে এদের মাঝে। অন্যদিকে, নাসার ওসিরিস মিশনের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করা হয় বেনু (Bennu) নামের আরেকটি গ্রহাণু। সেটিও সি টাইপ শ্রেণীভুক্ত।

গ্রহাণু থেকে পৃথিবীতে সরাসরি তথ্য পাঠানোর পাশাপাশি সেখান থেকে নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে আসাও উভয় মিশনের অন্যতম লক্ষ্য। কাজটি মোটেই সহজ নয়। তবে হায়াবুসা ১ এবং রোবটিক ল্যান্ডার ফিলাই এর অবতরণের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে মিশন সফল করার ছক আঁকেন বিজ্ঞানীরা। ২০১৯ সালে হায়াবুসা ২ সফলভাবে গ্রহাণু পৃষ্ঠ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে নির্বিঘ্নে রওনা দেয় পৃথিবীর দিকে। সফলতা পায় ওসিরিস মিশনও। ২০২০ সালে নমুনা সংগ্রহ করে সেটি। হায়াবুসা ২ পৃথিবীতে ফিরে এসেছে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে। অন্যদিকে, ওসিরিস এখনো রয়েছে ফিরতি পথে। সবকিছু ঠিক থাকলে এটি পৃথিবীর মাটি স্পর্শ করবে ২০২৩ সালের শেষ দিকে। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে বেনু নামের প্রাচীন গ্রহাণুটির নমুনা হাতে পাওয়ার। আর রিউগু থেকে পাওয়া নমুনা নিয়ে বিজ্ঞানীদের গবেষণা চলছে পুরোদমে। দেখা যাক পানি রহস্য সমাধানে নতুন কোন আশার কথা শোনাতে পারেন কিনা তারা। 

তথ্যসূত্র-

দ্য প্ল্যানেট ফ্যাক্টরি: এক্সোপ্ল্যানেটস অ্যান্ড দ্য সার্চ ফর আ সেকেন্ড আর্থ, এলিজাবেথ জে টাস্কার

লেখাটি 69-বার পড়া হয়েছে।


আলোচনা

Response

  1. আর্টিকেল টি অনেক লং। আর শিরোনামের আসল রহস্যমূলক উত্তরটা বুঝে উঠতে পারি নি

Leave a Reply

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 906 other subscribers