মস্তিষ্ক: মহাবিশ্বের জটিলতম বস্তু

আপনার-আমার দেড় কেজি মস্তিষ্কের মধ্যে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন (কারও মতে ১০০ বিলিয়ন) নিউরন রয়েছে। আপনি গর্ব করে বলতেই পারেন যে মহাবিশ্বের যতটুকু পর্যবেক্ষণ করা এখনো পর্যন্ত সম্ভব হয়েছে, তাতে যত গ্রহাণু পাওয়া গিয়েছে, তার চাইতেও হাজার গুণ বেশি নিউরন আপনার মস্তিষ্কে রয়েছে। এছাড়াও এই ছোট্ট মস্তিষ্কের মধ্যে ৮৫ বিলিয়ন অন্যান্য কোষ ও নিজেদের মধ্যে প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন সংযোগ রয়েছে। কী মনে হয়? আমাদের এই মস্তিষ্ক কি জটিলতার দিক দিয়ে মহাবিশ্বের প্রতিটা প্যাঁচে লুকিয়ে থাকা যেকোনো মজাগতিক বস্তুকে ছাড়িয়ে যেতে পারে? 

২০১২ কি ২০১৩ সালের দিকের গল্প। স্নায়ুবিজ্ঞানী ক্রিস্টফ কচ তার ‘Consciousness: Confessions of a romantic reductionist ‘ বইতে লিখলেন যে মানব মস্তিষ্ক আমাদের দেখা এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে জটিল বস্তু। কিন্তু এই কথার বিপরীতে সান্তা ফে ইনস্টিটিউট এর প্রফেসর ডেভিড ওলপার্ট বলে বসলেন, “এটা মতামত পোষণ করা হাস্যকর যে আমরা মহাবিশ্বের সবচেয়ে জটিল সিস্টেম”। অন্যদিকে কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন যে আমাদের মস্তিষ্ক প্রাণীজগতের সবচেয়ে জটিল অঙ্গ, তবে মহাবিশ্বের সবচেয়ে জটিল সিস্টেম কিনা তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এই কথার যুক্তিস্বরূপ কিছু উদাহরণ দেওয়া হয়। যেমনঃ হাতির মস্তিষ্ক মানুষের চেয়ে বড় এবং সেটি জটিল আবেগ এবং সামাজিক আচরণ প্রদর্শন করতে পারে বলে জানা গিয়েছে। এছাড়াও অক্টোপাসেরও অত্যন্ত উন্নত মস্তিষ্ক রয়েছে, যা ছদ্মবেশ ধারণ এবং সমস্যা সমাধানের মতো অনন্য দক্ষতার প্রকাশ ঘটাতে সক্ষম। তাছাড়া এখানে ডলফিনের কথাও বলা যেত পারে।

অন্যদিকে যারা বলেন যে মস্তিষ্কই বুঝি জটিলতর মহাজাগতিক বস্তু, তাদের যুক্তিগুলো কিন্তু একদম যুতসই আর বেশ শক্তিশালী। কী সেই যুক্তিগুলো? চলুন, একে একে জানা যাক। লেখার শুরুতেই মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ, অন্যান্য কোষ আর বিশাল সংযোগের সংখ্যা তুলে এনেছি। এটা কিন্তু নিছক কোনো পরিসংখ্যান নয়, বরং বড়-সড় একটি যুক্তি। এতো উপাদান এবং কানেকশন যেমন কোনো ডিভাইসের মধ্যে নেই। তেমনি এগুলো দিয়ে যেসব বৈচিত্র্যময় ঘটনা যেভাবে ঘটে, তার কোনো অনুরূপ সিস্টেম কোনো গ্যালাক্সির নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার মধ্যেও ঘটে না। স্নায়ুকোষের তথ্য সরবরাহের গতির কথাই চিন্তা করুন। কোষগুলো প্রতি ঘণ্টায় আনুমানিক ৪০০ কিলোমিটার গতিতে তথ্য বহন করে নিয়ে যায়, যা ল্যাম্বরগিনি ভেনেনো বা সুজুকি হায়াবুসার চাইতেও দ্রুতগামী। এই গতির ফলে তীব্র আলো চোখে পড়লে নিমিষেই চোখ বন্ধ হয়ে যায় কিংবা বাম হাতে মশা বসলে সেকেন্ডের মধ্যেই তা ডান হাতের থাবার শিকার হয়। 

এই যে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন সংযোগ, যার মাধ্যমে মস্তিষ্কের অজস্র সংকেত নিউরনের মধ্যে ভ্রমণ করে,  পাশাপাশি একইসাথে লজিক গেট হিসাবে কাজ করতে পারে। শুধু তা-ই নয়, এটি ১ এক্সাফ্লপের কম্পিউটিং শক্তি উৎপন্ন করে, যা প্রতি সেকেন্ডে ১ কুইন্টিলিয়ন গাণিতিক ক্রিয়াকলাপ সংঘটনের সমান(১ কুইন্টিলিয়ন মানে হলো ১ এর পরে ১৮টি শূন্য)! আর এই কাজ অবিশ্বাস্য দক্ষতার সাথে মাত্র ২০ ওয়াট শক্তি ব্যবহার করেই সম্পন্ন হয়। কিন্তু যদি এই কাজটাই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পিউটারটি করতে যেতো, তাহলে আনুমানিক ২০ মেগাওয়াট শক্তি প্রয়োজন হতো, যা মস্তিষ্কের ব্যবহৃত শক্তির তুলনায় প্রায় ১০ লক্ষ গুণ বেশি!

সম্ভবত এই চমৎকার ব্যাপারটি অনুধাবন করতে পেরেই পদার্থবিজ্ঞানের সাধক মিশিও কাকু বলেছিলেন, “মানুষের মস্তিষ্কে ১০০ বিলিয়ন নিউরন রয়েছে, প্রতিটি নিউরন আবার ১০,০০০ অন্য নিউরনের সাথে সংযুক্ত। আপনার কাঁধে বসা এই জিনিসটি হলো পরিচিত মহাবিশ্বের সবচেয়ে জটিল বস্তু”। কথাটার সত্যতার অজস্র প্রমাণও পাওয়া যায়, যেমনটা পাওয়া গিয়েছিল হিউম্যান ব্রেন প্রজেক্ট এর গবেষণায়। এটি ছিলছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় গবেষণা প্রচেষ্টাগুলির মধ্যে একটি। প্রায় ৫০০ বিজ্ঞানীর সমন্বয়ে পরিচালিত ১০ বছরের এই প্রজেক্টের বাজেট ছিল প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ইউরো। যাহোক, এই প্রজেক্টটির মাধ্যমে প্রায় ২০০টি মস্তিষ্ক-কাঠামোর ত্রিমাত্রিক ম্যাপ তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু তারপরেও মস্তিষ্কের পুরো রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি, উল্টো এর জটিলতাই প্রমাণিত হয়েছিল। 

যদিও মস্তিষ্কের গঠন বোঝা, এর কার্যক্রম বোঝার চাইতে সহজ। কিন্তু শত শত মিলিয়ন ডলার এবং নেতৃস্থানীয় বিজ্ঞানীদের এক দশকেরও বেশি গবেষণার পরও  মস্তিষ্কের গঠন সম্পূর্ণরূপে বর্ণনা করা যায়নি। মস্তিষ্ককে বোঝার ক্ষেত্রে অসাধারণ অগ্রগতি হওয়া সত্ত্বেও, এর বিস্ময়কর জটিলতার মানে হলো আমরা এখনও এর গঠন এবং এটি কীভাবে কাজ করে তা সম্পূর্ণরূপে বোঝার থেকে অনেক দূরে আছি। তাই মস্তিষ্কের অনেক দিক আজও রহস্যময় রয়ে গেছে। যুক্তিযুক্তভাবে সবচেয়ে বড় রহস্য এবং সমাধান করার মতো সবচেয়ে কঠিন সমস্যা হলো স্নায়ু কার্যকলাপ কীভাবে সচেতন অভিজ্ঞতার (Conscious experience) জন্ম দেয়, তা বোঝা।

গল্পের শেষটা এখানেই নয়! বৈদ্যুতিক সংকেত আর দুর্বোধ্য সংযোগের কথা তো হলো, এবার রসায়নের কাহিনী বলতে হয়। আমাদের মস্তিষ্কের মূল অংশ ৩টিঃ অগ্রমস্তিষ্ক (Prosencephalon), মধ্যমস্তিষ্ক (Mesencephalon) এবং পশ্চাৎ মস্তিষ্ক (Rhombencephalon)। এর অগ্রমস্তিষ্কের একটি অংশ হলো ‘হাইপোথ্যালামাস’, যার মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকে ধের ‘প্রভু গ্রন্থি’ বা ‘মাস্টার গ্ল্যান্ড’ খ্যাত ‘পিটুইটারি গ্রন্থি’। এই অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিকে ঘিরেই মূল রাসায়নিক খেলা! 

পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে থাইরোট্রপিন, অ্যাড্রেনোকর্টিকোট্রপিন, ফলিকল স্টিমুলাইজিং হরমোন, অক্সিটোসিন, ভ্যাসোপ্রেসিন বা অ্যান্টি ডাইইউরেটিক হরমোন ইত্যাদি ক্ষরিত হয়। এর ফলে কী হয় না? ডিম্বাণু-শুক্রাণুর উৎপাদন থেকে শুরু করে কিডনি কর্তৃক পানি পুনঃশোষণ, সেক্স হরমোন উৎপাদন থেকে শুরু করে স্তনে দুগ্ধপ্রবাহ সৃষ্টি, কোষীয় শক্তি বিপাক নিয়ন্ত্রণ থেকে সন্তান জন্মদানে সহায়তা-এমন কয়েক হালি কাজে ভূমিকা রাখে শুধুমাত্র পিটুইটারি গ্রন্থি। যদি শুধুমাত্র এই গ্রন্থিটা অকেজো হয়ে যায়, তাহলে দেহের প্রতিটা অঞ্চলের উপরে এর প্রভাব পড়বে। 

পুরো দেহের কথা যখন আসলোই, তখন আরেকটা সাধারণ ব্যাপার বলে ফেলি। মস্তিষ্ক কিন্তু একটা, কিন্তু এই মস্তিষ্ক দিয়ে আমরা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় একসাথে কতকাজ করি, ভেবে দেখেছেন কখনো? এই মুহূর্তে আপনি এই লেখাটা পড়ছেন, থেকে থেকে হয়ত শরীরের কোনো অংশ নাড়াচ্ছেন, দেহের ভেতরে হৃৎপিন্ড লাব-ডাব করছে, কিছু খেয়ে থাকলে পরিপাক চলছে-এসব কিছু একসাথে নিয়ন্ত্রণ করছে ‘মস্তিষ্ক’ বাবাজী। 

এই যে বিদ্যুতের খেলা, রাসায়নিক দ্রব্যের ক্ষরণ কিংবা দেহের মধ্যে সমন্বয়-সবকিছু মস্তিষ্ক যেমন সুচারুরূপে করে, তা কি যেকোনো প্রযুক্তিতে হার মানাতে বাধ্য নয়? আবার এই যে এতসব প্রযুক্তি, হোক সেটা চ্যাটজিপিটি কিংবা ফ্রন্টায়ার-সেই প্রযুক্তিও কিন্তু মানব মস্তিষ্কের ক্রিয়ারই ফল। তাছাড়াও মানুষের স্বপ্ন ও বিবেকের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে মস্তিষ্কের ভূমিকা এখনো অমীমাংসিত বিষয়। এতসব কারণেই আজ থেকে ২৫ বছর আগে, এমনকি ১২-১৩ বছর পূর্বেও মস্তিষ্কের জটিলতা নিয়ে বিজ্ঞানী মহলে যে বিতর্ক ছিল, তা ক্রমেই হ্রাস পেতে শুরু করেছে। 

নিউরোসাইকোলজি কিংবা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান-যেকোনো বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেই একথা মানতে হবে যে মানুষের মস্তিষ্কের কোনো বিকল্প নেই। জন্মের পর থেকেই এই মস্তিষ্ক আপনা-আপনি বড় হতে থাকে, কয়েক টেরাবাইট তথ্য ধারণ করার ক্ষমতা রাখে; কিন্তু কখনো মাথা থেকে খুলে চার্জ দেওয়া লাগে কিংবা দু-চার বছর পর পর কোনো টেকনিশিয়ান দিয়ে রিপেয়ার করা লাগে না। মস্তিষ্কের যা কিছু প্রয়োজন, সেখানে যা কিছু হয়, সবকিছু দেহাভ্যন্তরেই নিখুঁতভাবে ঘটতে থাকে। তাহলে মানবসৃষ্ট কিংবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক সিস্টেম এই রহস্যময় অঙ্গের জটিলতার কাছে হার মানতে বাধ্য নয়? 

রেফারেন্সঃ
১. Is the human brain really the most complex object in the universe?
২. The Staggering Complexity of the Human Brain
৩. Pituitary gland-Encyclopedia Britannica

লেখাটি 166-বার পড়া হয়েছে।


আলোচনা

Responses

  1. Faika Malyat Jaigirdar Avatar
    Faika Malyat Jaigirdar

    khub bhalo laglo pora aro lakhar opakhae roie lam

  2. এই লেখাটি খুবই ভালো লাগার মত একটি লেখা হয়েছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান প্রেমিদের জন্য অনন্য। আপনার আরও লেখার অপেক্ষায় রইলাম।

Leave a Reply

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 903 other subscribers