সাভানার গল্প

লেখাটি , বিভাগে প্রকাশিত

দুটো সিংহী বুঝে গিয়েছে যে আশেপাশেই ছোট্ট একটা বাচ্চা জেব্রা লুকিয়ে বসে আছে। ওরা বিনোদনের জন্য শিকার করে না। এই শিকারই হবে তাদের পেটের খোরাক। কিন্তু সিংহীরা এক নিমিষেই শিকারকে হত্যা করে না, বরং কিছুটা সময় নেই। এদের কোনো তাড়াহুড়ো নেই। তারা ঐ ছোট্ট জেব্রাকে যত্ন করছে। কিন্তু বাচ্চাটা জানে না যে কী হতে চলেছে, তবে আন্দাজ করতে পারছে যে এখানে থাকাটা মোটেও ভালো হবে না। তাই এদিক-সেদিক না তাকিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। যদি সিংহীর তেমন ক্ষুধা না লাগে, তাহলে এই যাত্রায় পালাতে সক্ষম হবে। আবার সিংহীর চাহিদার উপর ভিত্তি করে উলটো ঘটনাও ঘটতে পারে।

এভাবেই তৃণভোজী ও ক্ষীণকায় প্রাণীরা এই অঞ্চলে জীবনযাপন করে। তারা ভেবে রাখে যে যেকোনো মুহূর্তেই তাদেরকে পড়তে হতে পারে রাক্ষসী শিকারির থাবার নিচে। কখনো বা কিছু শিকারি নিজেই হয়ে যায় শিকার।বলছিলাম পৃথিবীর মোট স্থলভাগের ২০% স্থান দখল করে থাকা এক বিশেষ ধরনের বায়োমের কথা, যেখানে দুনিয়ার বিশাল সব প্রাণীরা আস্তানা গেড়েছে। জানি না, ঐ প্রাণীগুলো এই বিশাল জায়গাকে কী বলে, তবে আমরা মানুষেরা ভালোবেসে অথবা স্বার্থের বশে এই অঞ্চলের নাম দিয়েছি ‘সাভানা বায়োম’। এই বিশাল অঞ্চলটি আসলে বেশ কিছু প্রায় একই ধরনের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের সমষ্টি।

পরিচয়, পরিবেশ ও আবহাওয়া

সাভানা কী, এটা কীভাবে অনেকগুলো অঞ্চলের সমষ্টি সেটা বুঝার আগে আমাদেরকে বুঝতে হবে যে বায়োম বলতে আসলে কী বুঝায়। মনে করুন, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া আর দক্ষিণ এশিয়ায় এমন কিছু অঞ্চল আছে, যেই অঞ্চলগুলো বাস্তুতান্ত্রিকভাবে একই। মানে এই অঞ্চলগুলোর জলবায়ু, পরিবেশ, উদ্ভিদ-প্রাণী-সব মোটামুটি (পুরোপুরি একই হবে, এমন বলাটা ভুল) একই ধাঁচের। আপনি এই অঞ্চলগুলোকে একসাথে একটা ‘বায়োম’ বলতে পারবেন। অণুজীবদের মধ্যেও এরকম বায়োম হয়, তবে আজকের গল্পটায় সেই কথাটা না বলি। যাহোক, বায়োম আসলে বেশ কয়েক ধরনের হতে পারে। আমাদের আজকের গল্পের ‘সাভানা বায়োম’ও এরকমই একটি গুরুত্বপূর্ণ বায়োম।

আচ্ছা, তাহলে এখন প্রশ্ন হলো এই সাভানা বায়োম আসলে কোন অঞ্চলগুলো নিয়ে গঠিত? আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, মধ্য-আমেরিকা, দক্ষিণ-আমেরিকা এবং দক্ষিণ-এশিয়ার কিছু অঞ্চল নিয়ে এই বায়োম নিয়ে গঠিত। মজার বিষয় হলো এই সাভানাতে যেমন তৃণভূমি রয়েছে, তেমনি ফাঁকে ফাঁকে আছে বিভিন্ন কাষ্ঠল বৃক্ষও। এখানকার আবহাওয়া ঋতু অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। আর্দ্র ঋতুতে আবহাওয়া সাধারণত উষ্ণ থাকে এবং সেখানে ৫০ ইঞ্চি পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে আবহাওয়া অত্যন্ত গরম হয়ে যেতে পারে এবং প্রতি মাসে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ মাত্র চার ইঞ্চি হতে পারে৷ উচ্চ তাপমাত্রা এবং হালকা বৃষ্টিপাতের এই সমন্বয় সাভানাকে উদ্ভিদের সমাহারের দিক দিয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ করে তুলেছে।

উদ্ভিদের কথা

আচ্ছা, গাছ-টাছের কথা যখন আসলোই, তখন সাভানা বায়োমের উদ্ভিদ নিয়ে কিছু গল্প করা যাক। এতক্ষণে তো একটা বিষয় বুঝেছেন যে সাভানার পরিবেশ বেশিরভাগ সময়ই শুষ্ক থাকে এবং সেখানে পানির প্রাপ্যতা অতটাও ব্যাপক না। কিন্তু সাভানাতে জন্মানো ঘাস এবং গাছগুলি এই অবস্থার সাথে ভালোমতোই খাপ খাইয়ে নিয়েছে। আসলে অভিব্যক্তির ধারায় যারাই টিকেছে, তারাই সেখানে অভিযোজিত হয়ে থেকে গেছে। আর্দ্র ঋতুতে পর্যাপ্ত পানি থাকায় ঘাসগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং শুষ্ক মৌসুমে তারা বাদামি হয়ে যায়। কিছু গাছ তাদের শিকড়ে পানি জমা করে রাখে এবং শুধুমাত্র আর্দ্র মৌসুমে এদের পাতা উৎপাদিত হয়। এতে করে অত্যধিক গরমের সময় যখন পরিবেশে পানির পর্যাপ্ততা থাকে না, তখন পাতা না থাকায় (পাতা সাময়িকভাবে কাজে না লাগা পানিকে প্রস্বেদনের মাধ্যমে বাইরে বের করে দেয়) দেহের মধ্যে অতিরিক্ত পানি ধরে রাখা সম্ভব হয়।

বাওবাব গাছ

সাভানার পরিবেশে খুব বেশি আগুন লাগে বলে কিছু কিছু ঘাস মাটির খুব কাছাকাছি অবস্থান করার মতো অভিযোজিত হয়েছে। এছাড়াও কিছু গাছ আগুন-প্রতিরোধী সক্ষমতা অর্জন করেছে। সাভানার উদ্ভিদগুলো মধ্যে রয়েছে বন্য ঘাস, গুল্ম, মোটা কান্ডযুক্ত বাওবাব গাছ (Adansonia digitata), বাবলা গাছ, শক্ত পাম (Borassus), ক্যান্ডেলাব্রা গাছ ইত্যাদি।

প্রাণীদের সম্মেলন

উদ্ভিদের মতো সাভানাতে রয়েছে বিচিত্র ধরনের প্রাণীদের বসবাস। কীভাবে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকা যায়, কোন পরিস্থিতিতে কী করতে হবে-এগুলো এসব প্রাণীরা তাদের বাবা-মা, ভাই-বোনদের মাধ্যমে শিখে থাকে। আর এই প্রক্রিয়া চলছে লাখ-লাখ বছর ধরে। বিখ্যাত চিতা এবং হাতি থেকে শুরু করে স্বল্প পরিচিত পিগমি ফ্যালকন পর্যন্ত- বহু আকর্ষণীয় ও হিংস্র প্রাণী এখানে বসবাস করে, যারা নিজেদের জীবনকে এই বায়োমের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। শুরুতেই বলেছিলাম যে সাভানা আসলে বড় বড় তৃণভোজী বন্যপ্রাণী, কিছু ক্ষীণকায় পশু এবং এদের ঘাড় মটকে খাওয়া শিকারিদের আবাসস্থল।

গ্রান্ট’স গ্যাজেল

এখানে এক ধরনের শিংওয়ালা প্রাণী পাওয়া যায়, যারা আসলে এক ধরনের হরিণ। এদেরকে বলা হয় গ্রান্ট’স গ্যাজেল। এরা মূলত তৃণভোজী। প্রাণীগুলো চারণভূমির ঘাস, ঝোপঝাড়ের ভেষজ উদ্ভিদ ইত্যাদি খেয়ে থাকে। তবে আর্দ্র মৌসুমে লম্বা ঘাস এবং কখনো কখনো ফলও খেয়ে থাকে। মজার বিষয় হলো, এরা দীর্ঘ সময় পানি পান না করে সুস্থ থাকতে পারে। এছাড়াও রয়েছে ‘ক্যারাকেল’, যারা আসলে বন্য বিড়াল। এরা সাধারণত নিশাচর। মাঝারি আকৃতির এসব প্রাণীদের চোখে এক ধরনের পর্দা (Eyelid) থাকে, যেটি তাদের চোখকে সূর্যের তীব্র আলো থেকে রক্ষা করে। এরাও গ্রান্ট’স গ্যাজেলদের মতো পানি পান না করে দিব্যি কয়েকদিন কাটিয়ে দিতে পারে।

ক্যারাকেল

বায়োমটির এখানে-সেখানে লুকিয়ে আছে দ্রুত গতির চিতা, যারা ঘণ্টায় প্রায় ৭০ মাইল বেগে দৌড়ে আপনার ঘাড়ের উপর এসে পড়তে সক্ষম। তাদের দেহের রং পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে অভিযোজিত হয়েছে, যার ফলে সহজেই এরা শিকার করতে পারে। তাছাড়াও সাভানাতে রয়েছে ৮ ইঞ্চিরও কম আফ্রিকাল পিগমি ফ্যালকন, যারা আফ্রিকার সবচেয়ে ছোট শিকারি পাখি (Raptor)। এখানেই শেষ নয়, ওখানে আরও আছে বিভিন্ন ডকুমেন্টারি ও মুভি-কার্টুনে দেখতে পাওয়া আফ্রিকান হাতি, যারা তাদের বিশাল কানের মাধ্যমে শরীর থেকে অতিরিক্ত তাপ বর্জন করতে পারে। এছাড়াও রয়েছে সিংহ ও জেব্রা, যাদের গল্প শুরুতেই বলেছি। রয়েছে ব্লু ওয়াইল্ডবিস্ট, হায়না, শকুন, জিরাফের মতো বৈচিত্র্যময় প্রাণীরা, যারা সময়ের সাথে ঐ পরিবেশে নিজেদেরকে মানিয়ে নিয়েছে, বানিয়েছে নিজেদের ঘর।

বিপর্যয় ও করণীয়

অন্যান্য বায়োমের মতো সাভানারও রয়েছে কিছু স্বতন্ত্র বাস্তুতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু দিন যত গড়াচ্ছে, এই বায়োমও তত বেশি ঝুঁকির মুখে পড়তে চলেছে। বাণিজ্যিক ফায়দা হাসিলের জন্য কালো গন্ডারের মতো বেশ কিছু বন্যপ্রাণী প্রচুর পরিমাণে শিকার করা হয়। এছাড়াও আফ্রিকান ব্ল্যাকউডের মতো উদ্ভিদ ও ফসল সংগ্রহ করার হারও দিন দিন বাড়ছে বলে এসব জীবগুলো বিপন্ন হওয়ার পথে। আর এর ফলে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার পেছনেও এগুলো প্রভাবক হিসেবে ভূমিকা রাখছে। তাছাড়া খরা, মরুকরণ, কার্বন নিঃসরণ ইত্যাদি কারণেও সাভানা বায়োমের অঞ্চলগুলো ব্যাপক রকম ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে, যেগুলো ব্যাখ্যা করা শুরু করলে পুরো এক খণ্ড বই লিখে ফেলা সম্ভব।

এখন এতসব কিছু হয়ে যাবে, আর আমরা চেয়ে চেয়ে দেখব? মানুষ হিসেবে তো এটা লজ্জাজনক। এ কারণে বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদেরা সাভানা বায়োমের সংরক্ষণের দিকে বেশ নজর দিচ্ছেন। আমি যখন এই প্রবন্ধটি লিখছি, তখন আফ্রিকাতে ‘সাভানা কনজারভেশন প্রোগ্রাম’ চলছে। পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন এবং বিভিন্ন দেশে সরকার শিকার ও বন্যপ্রাণীর অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। অনেক দেশই চোরাশিকারকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে এর প্রতিরোধে আইন প্রণয়ন করেছে। এসব ব্যবসায়ী ও শিকারীদেরকে কারাগারে প্রেরণ অথবা অর্থদণ্ড প্রদানের মাধ্যমে বন্যপ্রাণীদের অনেকখানি সুরক্ষা প্রদান করা সম্ভব। এছাড়াও জঙ্গলে যেন আমাদের ভুলে যেখানে-সেখানে আগুন না লেগে যায়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ অবশ্য এটা নিয়ে কাজ করছে।

পরিবেশ বাঁচাতে হবে
পরিবেশ বাঁচাতে হবে

টেকসই চাষ বা কৃষি পদ্ধতি সাভানাকে রক্ষা করার আরেকটি উপায়। অল্প জায়গা ব্যবহার করে বেশি ফসল উৎপাদন এক্ষেত্রে অনেক জরুরি। এছাড়াও গৃহপালিত প্রাণীদেরকে সাভানার উন্মুক্ত চারণভূমিতে নিয়ে খাবার না খাইয়ে বাইরের খাবার সরবরাহ করলে একদিকে যেমন উদ্ভিদকূলের সংখ্যা হ্রাস ঠেকানো সম্ভব, অন্যদিকে গৃহপালিত এবং বন্য প্রাণীদের মধ্যে প্রতিযোগিতাও দূর করা যাবে। এতে করে ঐ বায়োমটিকে পরিবেশের বিশৃঙ্খলার সাক্ষী হতে হবে না। আর সব থেকে জরুরি যে ব্যাপারটি বলো হলো না, তা হলো জনসচেতনতা। যেকোনো কিছুকে বাঁচাতে হলে নিজে সচেতন হতে হবে, সচেতন করতে হবে অন্যদেরকেও।

শেষ কথা

আচ্ছা, সবকিছু নিয়েই একটা প্রাথমিক ধারণা হলো। কিন্তু সাভানার নদ-নদী নিয়ে তো কথা হলো না। হাঙর-ডলফিন এগুলোকে কি বঞ্চিত করা হলো না? এই প্রশ্নের উত্তর হলো, “না”। কারণ সাভানা একটি স্থলজ বায়োম। এটি শুধুমাত্র স্থলভাগ নিয়েই গঠিত, জলজ অংশ এই বায়োমের অধীন নয়। তবে বিভিন্ন জলরাশি এই বায়োমের সাথে যুক্ত থাকে, যেগুলো ওখানকার জীবদের জন্য অপরিহার্য।

তো, আজকে এমন একটি বিষয় নিয়ে কথা হলো, যেটি আমাদের দুনিয়ার বড় একটি অংশ, কিন্তু আমাদের অনেকেরই অজানা। আসলে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন পরিবেশে এমন সব বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদ-প্রাণীর বসবাস, যা যেকোনো কৌতূহলী ব্যক্তিকেই আশ্চর্যান্বিত করবে। আর এদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা পরিবেশগুলোও কেমন জানি অদ্ভুত, যেখানে লুকিয়ে আছে হাজারো রহস্য। সাভানাও পৃথিবীর এমনি একটি বিশাল জীবভূমি।

তথ্যসূত্রঃ

লেখাটি 51-বার পড়া হয়েছে।

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 904 other subscribers