প্রাণ সৃষ্টির উপাখ্যানঃ কোনটা আগে এলো, প্রোটিন নাকি আরএনএ?

প্রতিটি জীব কোষ দিয়ে তৈরি। তাই কোষকে বলা হয় প্রাণের গাঠনিক একক। এই কোষের ভেতর প্রতিনিয়ত চলতে থাকে নানা রকম ক্রিয়া-বিক্রিয়া। তাই কোষকে বলা হয় রাসায়নিক থলি। কোষ জীবিত থাকে এইসব রাসায়নিক ক্রিয়ার সম্মিলিত কারণেই। আর প্রাণরসায়নের মূল আলোচ্য বিষয়ই হচ্ছে জীবদেহে ঘটে চলা এসব রাসায়নিক ক্রিয়া-বিক্রিয়া। সুতরাং পৃথিবীতে যখন বেজে ওঠে প্রথম প্রাণের স্পন্দন তখনই প্রাণরসায়নের যাত্রা শুরু। প্রথম প্রাণের স্পন্দন মানে প্রথম সেই সরল আদিকোষ যেটি থেকে পৃথিবীর প্রাণবৈচিত্র্য শুরু। পৃথিবীতে কি করে প্রাণ সৃষ্টি হলো এ নিয়ে তর্ক-বিতর্কের শেষ নেই। প্রচলিত আছে নানা হাইপোথিসিস। আপনার চারপাশে যত বৈচিত্র্যের প্রাণ (গাছপালা, মানুষ, ব্যাকটেরিয়া এমনকি ভাইরাস) আছে সবার গাঠনিক মাল-মশলা কিন্তু একই। প্রোটিন, নিউক্লিক অ্যাসিড, শর্করা আর চর্বি। 

সকল প্রাণের প্রধান গাঠনিক উপাদান হচ্ছে প্রোটিন, নিউক্লিক অ্যাসিড, শর্করা আর চর্বি। ছবিসুত্রঃ এআই জেনারেটেড

তাই এগুলোকে বলা হয় প্রধান জৈব অণু। ক্ষুদ্র আণুবীক্ষণিক এককোষী জীব থেকে শুরু করে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন কোষ দিয়ে তৈরি বহুকোষী জীব সবার-ই গাঠনিক একক হচ্ছে কোষ। এই কোষ তৈরি হয় প্রধান জৈব অণুগুলো দিয়ে। আবার জৈব অণু সবকটারই প্রধান মৌলিক উপাদান হচ্ছে কার্বন। তাই পৃথিবীর প্রাণ হচ্ছে কার্বন ভিত্তিক প্রাণ বা কার্বন বেইজড লাইফ। সুতরাং প্রাণ সৃষ্টি হতে হলে প্রকৃতিতে এই জৈব অণুগুলোর উপস্থিতি থাকা চাই। ঠিক যেমন একটা ইমারত বানাতে হলে সিমেন্ট, ইট, বালি, রড লাগে। প্রশ্ন হচ্ছে প্রাণ সৃষ্টির এসব মাল-মশলা কি আগে থেকেই পৃথিবীতে ছিল? এ নিয়ে আছে নানা মুনির নানা মত। কেউ বলছেন প্রাচীন পৃথিবীতে থাকা অজৈব উপাদান থেকেই প্রাকৃতিক উপায়ে সৃষ্টি হয়েছিল জৈব অণুগুলো।  এই ধারণার পক্ষে শক্ত রসদ জোগান দেন আমেরিকান তরুণ গবেষক স্ট্যানলি মিলার এবং নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী হ্যারল্ড ইউরি। যদি তা-ই হয় তাহলে কোনটি আগে সৃষ্টি হয়েছে, প্রোটিন নাকি নিউক্লিক অ্যাসিড? এই প্রশ্নটা অনেকটা “ডিম আগে না মুরগী আগে” ধাঁধার মতন হয়ে যায়। কেননা কোষে নিউক্লিক অ্যাসিড (ডিএনএ/আরএনএ) তৈরি সহ যাবতীয় ক্রিয়া-কলাপ প্রোটিনের সাহায্য ছাড়া হয় না। আবার প্রোটিন তৈরির নকশা থাকে নিউক্লিক এসিডের ভেতর। অর্থাৎ নিউক্লিক এসিডের নকশা ছাড়া প্রোটিন উৎপাদন সম্ভব না।

[restrict]

আবার কেউ বলছেন মহাজাগতিক কোনও ধূমকেতু কিংবা আন্তঃনাক্ষত্রিক কোনো পরিবাহকের (যেমন উল্কা) মাধ্যমে এসব জৈব অণু সৃষ্টির উপাদান পৃথিবীতে এসেছে। কিংবা হতে পারে প্রথম প্রাণটি ছিল কতগুলো সরল ফুটকি, অনেকটা বুদ্বুদ যে-রকম। খুব সম্ভবত এগুলোর চারপাশে চর্বির তৈরি পর্দা ছিল। প্রশ্ন হচ্ছে এই পর্দা কি করে তৈরি হল? আবার আরেকদল মনে করছেন পৃথিবীর প্রথম প্রাণ সৃষ্টি হয়েছে শক্তি উৎপাদনের ধারাবাহিক বিক্রিয়াগুলোর মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ সবার আগে এসেছে শক্তির বিপাক প্রক্রিয়া। এর সাথে খানিকটা সাযুজ্য রেখে এসেছে হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট হাইপোথিসিস। এই অনুকল্প বলে, প্রথম সরল কোষটি শক্তির জোগান পেত সমুদ্রতলের ক্ষারীয় হাইড্রোথার্মাল ভেন্টে থাকা প্রোটনের বৈদ্যুতিক চার্জ থেকে। এই প্রতিটা হাইপোথিসিস নিয়েই কথা বলব একে একে। থাকবে এগুলোর সীমাবদ্ধতাও।

ডারউইনের উষ্ণ পুকুর এবং ইউরি-মিলার এক্সপেরিমেন্ট  

এআই এর কল্পনায় ডারউইন এবং তাঁর উষ্ণ পুকুর

যুগ যুগ ধরে পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টি নিয়ে প্রচলিত আছে নানা কথা-উপকথা। এগুলোর প্রায় সবকটাই অনেকটা এমন যে, কোনো অলৌকিক শক্তি বলে পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়েছে এত এত প্রাণ বৈচিত্র্য। কিন্তু এগুলোর কোনো ভিত্তি প্রমাণ নেই। প্রাণ সৃষ্টি নিয়ে প্রথম বৈজ্ঞানিক অনুকল্প দেওয়ার চেষ্টা করেন চার্লস ডারউইন। ১৮৭১ সালে উদ্ভিদবিদ জোসেফ ডাল্টন হুকারকে লেখা এক চিঠিতে তিনি প্রস্তাব করেন, এক প্রাগৈতিহাসিক উষ্ণ পুকুরের কথা। যেটি প্রাণ সৃষ্টির সকল রাসায়নিক মাল-মশলায় সমৃদ্ধ ছিল। আলো, তাপ আর বৈদ্যুতিক ক্রিয়ায় এইরকম একটি পুকুর থেকেই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে সৃষ্টি হতে পারে প্রাণ। ডারউইনের এই কাল্পনিক উষ্ণ পুকুর যতটা না বিজ্ঞানীদের মনোযোগ কাড়তে পেরেছে তার চেয়েও বেশি বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল তখন। বিষয়টা অনেকটা এমন যে, প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীর সমুদ্র প্রাণ সৃষ্টির জন্যে দরকারি রাসায়নিক উপাদানে সমৃদ্ধ ছিল। এক সময় এসব উপাদান জড়ো হয়ে সৃষ্টি হয় গেলো প্রথম সরল প্রাণ। ১৯২০ সালে তৎকালীন সোভিয়েত বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ওপারিনন্থে এবং ব্রিটিশ জিনতাত্ত্বিক জেবি এস হালডেন, দুজন আলাদাভাবে “আদিম স্যুপ” (primordial soup) নামে হাইপোথিসিস দেন। তাঁদের এই হাইপোথিসিস অনেকটা ডারউইনের ধারণার মতন। ১৯৫৩ সালে আমেরিকান তরুণ গবেষক স্ট্যানলি মিলার এবং নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী হ্যারল্ড ইউরি এক বিখ্যাত গবেষণা করেন। তাঁদের গবেষণা আদিম স্যুপ অনুকল্পের পক্ষে ব্যাপক সমর্থন জোগায়।

হ্যারল্ড ইউরি

মিলার কাচ নলে অ্যামোনিয়া, মিথেন, পানি এবং হাইড্রোজেন গ্যাসের একটা মিশ্রণকে বৈদ্যুতিক ডিসচার্জের (বজ্র্যপাত তৈরি করার জন্যে ) ভেতর চালনা করেন। এরপর এক সপ্তাহ কিংবা তার চাইতে বেশি সময়ের পর মিশ্রণটি পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁরা লক্ষ্য করলেন মিশ্রণটির গ্যাসীয় স্তরে কার্বন মনোক্সাইড এবং কার্বন-ডাই অক্সাইড গ্যাসের মিশ্রণ ছিল। আর পানির স্তরে বিভিন্ন ধরনের জৈব যৌগ যেমন অ্যামাইনো অ্যাসিড, হাইড্রোক্সি অ্যাসিড, অ্যালডিহাইড এবং হাইড্রোজেন সায়ানাইড ছিল। পরবর্তীতে ২০১০ সালে মিলার পুনরায় এই পরীক্ষাটি সম্পাদন করেন। কিন্তু এবার আরও উন্নত কৌশল (হাইপারফরমেন্স লিকিউড ক্রোমাটোগ্রাফি এবং ভর বর্ণালিবীক্ষণ) অবলম্বন করেন। এবার আগের পাওয়া উপাদানগুলোর সাথে হাইড্রোজেন সালফাইড খুঁজে পান যা কিনা আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের সময় তৈরি হয়। এটা ২৩ টি অ্যামাইনো অ্যাসিড এবং ৭ টি অর্গানোসালফার যৌগ সৃষ্টির সম্ভাবনা কে নিশ্চিত করে। অ্যামাইনো অ্যাসিড হচ্ছে প্রোটিন তৈরির বিল্ডিং ব্লক।  জীবদেহ যেমন কোষ দিয়ে তৈরি তেমনি প্রোটিন অ্যামাইনো এসিডের তৈরি। আগেই বলেছি, প্রোটিন হচ্ছে একটি প্রধান জৈব অণু। সুতরাং মিলার এবং ইউরির গবেষণা প্রমাণ করে যে, প্রাকৃতিক ভাবেই প্রাণ তৈরির উপাদান সৃষ্টি সম্ভব। 

স্ট্যানলি মিলার

কিন্তু মিলার ও ইউরি’র গবেষণা নিয়ে সমালোচনাও আছে ঢের। তাঁরা যেই বায়ুমণ্ডলীয় পরিবেশে গবেষণা করেছেন তা প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সাথে সাযুজ্য নয়। তবুও যদি ধরে নিই, তাঁরা অনেকটাই প্রাগৈতিহাসিক বায়ুমণ্ডলের মতন পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছিলেন, কিন্তু তাতেই কি যথেষ্ট? মিলার এবং ইউরি’র গবেষণায় না হয় বোঝা গেলো যে প্রাকৃতিকভাবেই প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীতে প্রোটিন তৈরি সম্ভব। কিন্তু শুধু প্রোটিন দিয়েই তো প্রাণ তৈরি সম্ভব না। একদম একটা সরল প্রাণ তৈরি হতে হলেও তিনটি প্রধান জিনিস লাগবে- কোষের নীলনকশার জন্যে বংশগত উপাদান (ডিএনএ/আরএনএ), কোষের শক্তির আধার এবং এগুলোকে একসাথে ধরে রাখার জন্যে একটা থলে কিংবা পর্দা। বর্তমান পৃথিবীর সকল জীবেই এই তিনটি উপস্থিত আছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে সকল জীবেই এগুলো তৈরি কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস এবং সালফার পরমাণু দিয়ে। সুতরাং জীবন সৃষ্টি হতে হলে এই উপাদানগুলো সঠিক পরিমাণে, সঠিক পরিবেশে একসঙ্গে উপস্থিত থাকতে হবে। প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীতে সত্যিই কি এমন কোনো স্থান থাকা সম্ভব ছিল যেখানে প্রাণ সৃষ্টির সকল উপাদান একসঙ্গে সঠিক অনুপাতে সঠিক পরিবেশে উপস্থিত ছিল? কিংবা বর্তমান পৃথিবী বা বিমূর্ত মহাবিশ্বের কোথাও কি এরকম জায়গার অস্তিত্ব আছে?

তাহলে কি জৈবঅণুগুলো মহাশূন্য থেকে এসেছে? 

আগেই বলেছি, কেউ কেউ মনে করেন প্রাণ সৃষ্টির জন্যে দরকারি জৈবযৌগ গুলো এসছে ধূমকেতু কিংবা আন্তঃনাক্ষত্রিক কোনো পরিবাহকের (যেমন উল্কা) মাধ্যমে। পরে এগুলো মিলে মিশে তৈরি করে প্রধান জৈব অণুগুলো। এই ধারনা “প্যানস্পারমিয়া” নামে পরিচিত। দেখা যায় কিছু উল্কায় ফ্যাটি এসিড অণু পাওয়া গেছে। এটি কোষ পর্দার প্রধান গাঠনিক অণু। আবার ধূমকেতুতে পাওয়া গেছে প্রোটিন তৈরির বিল্ডিং ব্লক অ্যামাইনো এসিড। সুতরাং এমনটা হতেই পারে যে, পৃথিবীতে প্রাণ তৈরির মাল-মশলা নিয়ে এসেছে কোনও মহাজাগতিক পরিবাহক (ধূমকেতু কিংবা উল্কা)।  

তবে এখানেও কথা থেকে যায়। যদি প্রাণ তৈরির জৈবযৌগগুলো মহাশুন্য থেকেই এসে থাকে, তাহলে তা আসতে হবে পর্যাপ্ত পরিমাণে। তাও অপরিবর্তিত অবস্থায়। সেটা কতটুকু সম্ভব এ নিয়ে বিতর্ক আছে। তাছাড়া পৃথিবীর মতন মহাবিশ্বের যেকোন জায়গায় স্বাধীনভাবে জীবনের রসায়ন শুরু হতে পারত। ঘরের মাটিতে কি করে প্রাণের যাত্রা শুরু হল তা সুরাহা করতে পারলে হয়ত বাইরে জীবনের স্পন্দন খোঁজাটা কিছুটা হলেও সহজ হতো।

প্রোটিন আগে না আরএনএ আগে? 

এ নিয়ে তর্ক-বিতর্কের শেষ নেই। বিজ্ঞানীরা কেউ কেউ মনে করছেন আগে প্রাণ তৈরির উপাদানগুলো একে একে সৃষ্টি হয়েছে। পরে ঠিক পরিবেশে কোনো এক মহাজাগতিক সন্ধিক্ষণে এসব উপাদান একসঙ্গে হয়ে সৃষ্টি করেছে প্রথম সরল প্রাণ। অন্য পক্ষ আবার মনে করছেন একটা তৈয়ারি থলে আগে থেকেই ছিল যার ভেতর মৌলিক প্রক্রিয়াগুলো চলত। প্রথম পক্ষের মধ্যেও আবার ভাগ আছে। কেউ কেউ মনে করেন সবার আগে প্রোটিন এসেছে। এই প্রস্তাব সবার সামনে নিয়ে আসেন প্রাণরসায়নবিদ সিডনি ফক্স। তিনি মূলত মিলার আর ইউরি’র পথ ধরেই হাঁটছিলেন। তাঁর মতে মিলার আর ইউরি’র প্রক্রিয়ায় তৈরি অ্যামাইনো এসিডগুলো জড়ো হয়ে ছোট্ট সরল প্রোটিন গঠন করে। জীবদেহে প্রোটিন ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। কোষের সমস্ত প্রাণরাসায়নিক ক্রিয়া-বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে এনজাইম। আর অধিকাংশ এনজাইম হচ্ছে প্রোটিন। ১৯৫০ সালে ফক্স এবং তাঁর গবেষণা দল দেখান যে, কয়েকটি অ্যামাইনো অ্যাসিড জড়ো হয়ে তৈরি করে ছোট্ট প্রোটিনের মতন অণু।

এদের বলা যায় “প্রোটিনয়েড”। এগুলো দেখতে অনেকটা কোষেরই মতন। এমনকি জীবিত কোষের মতন বিভাজিত হতে পারে। রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি বাড়াতে পারে। অ্যালবার্ট লুডভিগ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেফান শিলার এবং তাঁর সহকর্মীরা পাঁচটা অ্যামাইনো অ্যাসিড দিয়ে কতগুলো সরল প্রোটিন তৈরি করেন। এগুলো একসঙ্গে জোড়া লেগে একটা গোলাকার ধারকের মতন গঠন করে। গবেষকরা এগুলোকে সেই আদিম আদিকোষ হিসেবে উপস্থাপন করেন। গবেষকদের দাবি এই ছোট্ট গোল ধারকগুলোর জীবিত কোষের মতন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন এগুলো ডিএনএ’র মতন বড় জৈব অণু ধারণ করতে পারে। আবার দুটো মিলে একটায় পরিণত হতে পারে। এতকিছুর পরেও প্রোটিন হাইপোথিসিস বিজ্ঞানীদের মন কাড়তে পারে নি। কেননা একটা আস্ত সরল জীবিত কোষের মতন হওয়ার জন্যে প্রোটিন মোটেও যথেষ্ট না। 

প্রাণরসায়নবিদ সিডনি ফক্স

আরেকদল মনে করেন সবার আগে এসেছে আরএনএ। ডিএনএ’র মতন এটিও একটি নিউক্লিক অ্যাসিড। ডিএনএ’র জাত ভাই বলা যায়। এই প্রস্তাবটি আসে আরেকটি বিখ্যাত হাইপোথিসিস এর মাধ্যমে। এর নাম “আরএনএ ওয়ার্ল্ড হাইপোথিসিস (RNA world hypothesis)”। আগেই বলেছি, জীবকোষে প্রোটিনের ভূমিকা বলে কয়ে শেষ করা যাবে না। কোষের যাবতীয় ক্রিয়া-বিক্রিয়া এনজাইম ছাড়া অচল। এই এনজাইমের বেশিরভাগই প্রোটিন। কিন্তু কোষে এই প্রোটিন তৈরির নকশা থাকে ডিএনএ’র ভেতর (কিছু ভাইরাসে থাকে আরএনএ’র ভেতর)। অর্থাৎ প্রোটিন তৈরি হয় ডিএনএ’র ছাঁচ থেকে। আবার নতুন ডিএনএ তৈরি হতে প্রোটিন লাগে। প্রোটিন ছাড়া ডিএনএ অনুলিপন (যে প্রক্রিয়ায় নতুন ডিএনএ তৈরি হয়) সম্ভব না। কাজেই, কোনটা আগে এলো, প্রোটিন নাকি ডিএনএ? প্রশ্নটা অনেকটা ডিম আগে না মুরগি আগে ধাঁধার মতন হয়ে যায়। এই ধাঁধার প্যাঁচ অনেকটাই খুলে আসে ১৯৬০ সালে। সে বছর প্রাণরসায়নবিদরা আবিষ্কার করেন আরএনএও নিজে নিজে প্রোটিনের মতন প্যাঁচানো গঠন তৈরি করতে পারে। বিজ্ঞানীরা এবার নড়ে-চড়ে বসলেন। আরএনএ যদি প্রোটিনের মতন বিক্রিয়ার প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে, পাশাপাশি প্রোটিন তৈরির তথ্যও বহন করে, তাহলেই দুয়ে দুয়ে চার মিলে যায়। তখন আরএনএ নিজেই নিজের অনুলিপন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। দরকার হবে না কোনও প্রোটিনের। কিন্তু তখনও এসব কেবল ধারণাই রয়ে যায়। কেননা কেউই আরএনএ’র প্রভাবক গুণ আবিষ্কার করতে পারেননি। 

কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের টমাস চেক এবং তাঁর দল একটি অদ্ভুত আরএনএ আবিষ্কার করলেন যেটার এনজাইমের মতন প্রভাবান ক্ষমতা আছে।

অপেক্ষার অবসান ঘটে ১৯৮২ সালে। কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের টমাস চেক এবং তাঁর দল একটি অদ্ভুত আরএনএ আবিষ্কার করলেন যেটার এনজাইমের মতন প্রভাবান ক্ষমতা আছে। এর নাম হল আরএনএ এনজাইম। এরপর থেকে বিভিন্ন জীবদেহে আরও অনেক আরএনএ এনজাইম আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণাগারেও তৈরি হয় কিছু। এদের আরেকটা নাম হচ্ছে “রাইবোজাইম”। যদিও নীলনকশা হিসেবে আরএনএ ডিএনএ’র মতন অতটা কার্যকরী অণু না। কারণ এর গঠন ডিএনএ’র মতন স্থায়ী না। কিন্তু আরএনএ’র প্রোটিনের মতন প্রভাবন ক্ষমতা থাকায় এমনটা হতেই পারে আদিম পৃথিবীতে প্রোটিনের আগেই এরা এসেছে। কেননা আদিম আরএনএগুলো হয়ত নিজেই নিজের সংখ্যা বাড়াতে পারত। দরকার হতো না কোনো প্রোটিনের। তাই এমনটা হতেই পারে আদিম সরল প্রাণটি ছিল আরএনএ ভিত্তিক প্রাণ। ১৯৮৬ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নবিদ ওয়াল্টার গিলবার্ট “আরএনএ ওয়ার্ল্ড” কথাটির প্রচলন করেন। 

ওয়াল্টার গিলবার্ট

২০০০ সালে আরেকটি বৈপ্লবিক আবিষ্কার ঘটে। কোষের ভেতর প্রোটিন তৈরির কারখানা হল “রাইবোজোম”। বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করলেন রাইবোজোমের ভেতরে প্রোটিন তৈরির মূলে আছে একটি আরএনএ এনজাইমের ভূমিকা। আরএনএ যদি প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে তাহলে নিশ্চিতভাবেই আরএনএ-ই আগে এসেছে, প্রোটিন না। কিন্তু এরপরেও ধোঁয়াশা থেকে যায়। এই সমস্যার একটি আংশিক সমাধান দেন কেমব্রিজের এমআরসি ল্যাবরেটরি অব মলিকুলার বায়োলজির গবেষক জন সাদারল্যান্ড। শর্করা এবং ক্ষার ছাড়াও অন্যান্য সরল অনুও কি করে নিউক্লিওটাইডে পরিণত হতে পারে- তা আবিষ্কার করে তিনি রীতিমতো অবাক হয়ে যান। পরবর্তীতে তিনি এবং তাঁর গবেষক দল এনজাইম ছাড়াই শর্করা এবং ক্ষার জোড়া দেবার প্রক্রিয়া খুঁজে পান। এবং এই শর্করা-ক্ষার কমপ্লেক্সের সঙ্গে ফসফেট জোড়া দিতেও সক্ষম হন। আরএনএ ওয়ার্ল্ড হাইপোথিসিসের পক্ষে বেশ কতগুলো প্রমাণই জোগাড় করতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা। তবে নতুন গবেষণা বলছে, আরএনএ একা সব কাজের কাজী হওয়া সম্ভব না। আরএনএ’র প্রভাবন ক্রিয়া চলতে হলে এটির প্রোটিনের সঙ্গে যুগলবন্দি হতে হয়। কাজেই প্রাণ সৃষ্টি করতে হলে আরএনএ এবং প্রোটিন দুটোকে একসঙ্গেই উপস্থিত থাকতে হবে।

তথ্যসূত্র- 

[/restrict]

সুজয় কুমার দাশ
বিজ্ঞান ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে আছি। পড়াশোনা করছি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগে। প্রকাশিত বই- দ্য মাঙ্গা গাইড টু বায়োকেমিস্ট্রি, দ্য মাঙ্গা গাইড টু মলিকিউলার বায়োলজি, অন্বেষা প্রকাশন; জীব জগতের অজানা গল্প, পুঁথি প্রকাশন।