মস্তিষ্কের কাজ চিন্তা করা নয়

এক সময়ে পৃথিবী দাপিয়ে বেড়াতো এমন সব প্রাণীরা, যাদের কোন মস্তিষ্ক ছিলো না।

এমন একটি প্রাণী ছিলো অ্যাম্ফিওক্সাস। এদেরকে হঠাৎ দেখলে মনে হবে ক্ষুদ্র কোন কীট মনে হবে। তবে ভালোভাবে খেয়াল করলে এর দেহের দুই পাশে মাছের গিলের মতো চিড় দেখা যাবে। ৫৫০ মিলিয়ন বছর আগে অ্যাম্ফিওক্সাস সমুদ্রে ঘুরে বেড়াতো। নিজেদেরকে সামনে ঠেলে দিয়ে এরা চলাচল করতো। আর খাদ্যশিকারের জন্য নিজেদের সমুদ্রতলে ঘাসের মতো বসে থেকে, আরো ক্ষুদ্র প্রাণী কখন এদের মুখের মধ্যে এসে পড়ে, তার অপেক্ষা করতো। স্বাদ-ঘ্রাণ নিয়ে অ্যাম্ফিওক্সাসের কোন বিকার নেই, কারণ এই জীবের আমাদের মতো ইন্দ্রিয় ছিলো না। এদের কোন চোখ ছিলো না, কেবল আলোর পরিবর্তন সনাক্ত করার জন্য কিছু কোষ ছিলো। শব্দ শোনার মতো কোন প্রশ্নই নেই। এর স্নায়ুতন্ত্র প্রায় না থাকার মতোই, এর একদলা স্নায়ু ছিলো বটে, কিন্তু এটাকে মস্তিষ্ক বলা যাবে না। 

অ্যাম্ফিওক্সাস

দুই ইঞ্চি লম্বা কৃমি-আকৃতির অ্যাম্ফিওক্সাসের সাথে মানুষের বিবর্তনীয় যাত্রার সংযোগ কল্পনা করতে আপনাকে হয়তো বেশ কষ্টই করতে হবে।  আপনার  সাথে অ্যাম্ফিওক্সাসের কতই না অমিল। আপনার দেহে কয়েকশ’ হাড়, কতোগুলো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, নাক-কান-গলা-হাত-পা, সর্বোপরি একটা উন্নত মস্তিষ্ক রয়েছে। অন্যদিকে, অ্যাম্ফিওক্সাস প্রাণীটা আসলে একটা পাকস্থলিওয়ালা কাঠি ছাড়া আর কিছুই না। আর এর কোন মস্তিষ্ক নেই। এর কিছু স্নায়ুকোষ আছে যা অন্যান্য কোষের সাথে খুব সরল-উপায়ে সংযুক্ত, যারা সাহায্যে বেচারা কিছু নড়াচড়া করতে পারে। অন্যদিকে আপনার মস্তিষ্ক জটিল যেখানে চিন্তাভাবনা, আবেগ, স্মৃতি, স্বপ্ন কতকিছুই না ঘুরে বেড়ায়।

তবে এই অ্যাম্ফিওক্সাসদের আধুনিক বংশধরদের এখনো দেখা মেলে, যাদের সাথে আমরা মানুষদের সাধারণ পূর্বপুরুষ খুঁজে পাওয়া যাবে। 

বলুন তো মস্তিষ্কের মতো জটিল বস্তুর উদ্ভব কেন ঘটলো? সবাই উত্তর দেবেন চিন্তা করার জন্য। আমরা ধরে নেই, মস্তিষ্কের বিবর্তন হয়েছে নিম্ন-স্তর থেকে উচ্চ-স্তরের দিকে, পোকা-মাকড় থেকে বিভিন্ন প্রাণী হয়ে মানুষ এই ক্রমঅগ্রসরতার দিকে। কিন্তু এই ধারণাটা আসলে ভুল। আসলে, মস্তিষ্কের উদ্ভব চিন্তা করার জন্য নয়। 

[restrict]

অ্যাম্ফিওক্সাসরা এখন থেকে পাঁচশ মিলিয়ন বছর আগে যখন সমুদ্রতলের মাঝে মহাসমারোহে খাওয়াদাওয়ার সরল জীবন-যাপন করছিলো, তখন পৃথিবীতে একটা নতুন যুগ শুরু হয়। বিজানীরা একে বলেন ক্যাম্ব্রিয়ান যুগ। ক্যাম্ব্রিয়ান যুগে একটা নতুন আচরণের উদ্ভব হলো: তা হলো শিকার করা। একটা প্রাণীর মধ্যে অন্য প্রাণীর উপস্থিতি অনুভব করার সক্ষমতা তৈরি হলো। শুধু তাই না, সে প্রাণীটা নিজে থেকে অন্য প্রাণীটিকে গলাধঃকরণ করার ক্ষমতা তৈরি হলো। এমন না যে প্রাণিটি মুখ খুলে অপেক্ষা করছেন যে কখন খাদ্য এসে আপনার মুখে টুপ করে পড়বে। এখন থেকে খাদ্যগ্রহণের কাজটা আগের তুলনায় আরো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটা কর্মে পরিণত হলো। এর সাথে সাথে আরো জটিল সব ইন্দ্রিয়তন্ত্র বিবর্তিত হওয়া শুরু করলো। অ্যাম্ফিওক্সাস অন্ধকার থেকে আলো আলাদা করতে পারতো। কিন্তু এই নতুন প্রাণীরা দেখতে পারে। অ্যাম্ফিওক্সাসদের ত্বকে খুব সরল ধরনের স্পর্শ অনুভূতি ছিলো। কিন্তু এই নতুন প্রাণীদের স্পর্শানুভূতি এমনভাবে বিবর্তিত হলো যে তারা বিভিন্ন বস্তুর কম্পন আলাদা করে চিনতে পারে। 

ক্যাম্ব্রিয়ান যুগে এমন সব প্রাণীদের দেখা যাওয়া শুরু হলো যাদের দেহগঠনের নকশা একদম নতুন ধরনের।

যখন ইন্দ্রিয়তন্ত্রগুলো উন্নত হওয়া শুরু করলো, বেঁচে থাকার জন্য একটা নতুন প্রশ্ন উঠে এলো এই প্রাণীদের জীবনযুদ্ধে। কিছুদুরে যে জিনিসটা দেখতে পাচ্ছি, সেটা কি আমি খেতে পারবো, নাকি এটা আমাকেই খেয়ে পারবে? যেসব প্রাণী এই প্রশ্নের উত্তর একটা ভালোভাবে বের করতে পারলো, তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও  গেলো বেড়ে। অ্যাম্ফিওক্সাস হয়তো প্রাকক্যাম্ব্রিয়ান যুগে নিজেদের পরিবেশে দাপটের সাথে রাজত্ব করে গেছে, কিন্তু তারা বুঝতে পারতো না যে তাদের একটা পরিবেশ আছে চারপাশে। কিন্তু এই নতুন জীবগুলোর সে অনুভুতি ছিলো। 

এই নতুন শিকারী ও শিকারদের আরো একটা নতুন সক্ষমতা ছিলো। এদের চলাচলের ক্ষমতা আগের চাইতে অত্যাধুনিক। অম্যািওক্সাসদের চলাচল ছিলো একদম প্রাথমিক, এরা কোন দিকে নড়াচড়া করছে তার উপর খুব বেশি কর্তৃত্ব এদের ছিলো না। মোটামুটি এলোমেলোই বলা যায়। নতুন জায়গায় যে খাবার খুঁজে পাবে সেটার উপর এদের চলনশক্তি আসলে ভাগ্যের উপরেই ছেড়ে দেওয়া বলা যায়। অন্যদিকে ক্যাম্ব্রিয়ান জগতের নতুন শিকারীদের চলাচলের পদ্ধতি যে নতুন শুধু তাই নয়,  ছিলো সচেতনও, এরা বুঝতে পারতো কোথায় খাবার আছে, কোথায় যেতে হবে।

যখন প্রাণীদের মধ্যে এসব জটিল নড়াচড়া ও ইন্দ্রিয়তন্ত্রের উদ্ভব হওয়া শুরু হলো, তখন প্রাকৃতিক নির্বাচন ঠিক সেই সব প্রাণীদেরকেই আনুকূল্য দিলো যারা এসব কাজ সুদক্ষতার সাথে সম্পন্ন করে। একটা প্রাণী খাবার কোথায় আছে সেটা সনাক্ত করে যদি খাবারের দিকে হেলেদুলে যেতে যেতে খাবার সরেই যায়, তাহলে ওই প্রাণীটা মূল্যবান শক্তি অপচয় করছে। একই ভাবে, তারা যদি এমন কোন সাম্ভাব্য শিকারী থেকে পালিয়ে যেতে চায়, যেটা আসলে তেমন কোন হুমকি ছিলো না, তাহলেও সে শক্তির অপচয় করছে। শক্তি একটা গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। যদি প্রাণী এই সম্পদটা ঠিক সুদক্ষতার সাথে ব্যবহার করতে না পারে, সে নিজেকে ক্রমেই বিপন্ন করে ফেলবে, এবং বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ায় বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

শক্তি ব্যবহারের দক্ষতাকে আমরা একটা বাজেটের সাথে তুলনা করতে পারি। আমরা যদি একটা অর্থনেতিক বাজেটের কথা চিন্তা করি, তাহলে সে বাজেটে আয় বুঝে ব্যয় করার একটি ভারসাম্য থাকতে হবে। ঠিক তেমনি যে কোন প্রাণীর দেহেও একটি জটিল বাজেট রয়েছে। দেহের মাঝে বিভিন্ন সম্পদ যেমন পানি, লবন, গ্লুকোজের আয়ব্যয় হিসাব ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে হয়। দৌড়ানো, কাজ করা ইত্যাদি হলো বাজেট থেকে সম্পদ ব্যবহার করা। অন্যদিকে খাদ্য ও বিশ্রাম দেহের মাঝে সম্পদ যুক্ত ও সংরক্ষণ করার প্রক্রিয়া। একটা প্রাণি যে কাজ করবে (কিংবা করবে না), সেটার একটা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। প্রাণির দেহকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়ে যে সে তার শক্তি-বাজেট ব্যবহার করবে, নাকি সংরক্ষণ করবে। 

আপনি হয়তো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জানেন, যে টাকাপয়সার বাজেট ঠিক মতো মেনে চলার মূল নীতি হলো অনিশ্চিত খরচ আগে থেকেই এড়িয়ে চলতে পারা। অর্থাৎ নিকট ভবিষ্যতে আপনার কি কি জরুরী খরচ করা দরকার হবে, সেটা ঠিক মতো অনুমান করতে পারা। শুধু অনুমান করলেই হবে না, প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর জন্য আপনার পর্যাপ্ত সম্পদ আছে কি না সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। একই কথা কিন্তু দেহের-বাজেটের জন্যেও প্রযোজ্য। ক্যাম্ব্রিয়ানযুগের ওই ক্ষুদ্র জীবদের বেঁচে থাকার জন্য একটা কার্যকর প্রক্রিয়া দরকার, বিশেষ করে যখন আশেপাশে তাকে খেয়ে ফেলবে এমন শিকারী প্রাণী ঘুরে বেড়াচ্ছে। শিকারী প্রাণী বিপদজনকভাবে কাছে আশার আগ পর্যন্ত কি সে অপেক্ষা করবে? আক্রমণ করার আগে কি সে লুকিয়ে থাকেবে? নাকি শিকারী প্রাণী ঝাঁপ দেয়ার মুহুর্ত অনুমান করে সে আগে থেকেই পালানোর চেষ্টা করবে?

মস্তিষ্কের প্রধান কাজ হলো দেহের-বাজেট সমন্বয়।

যখন আমরা বাজেটের কথা বলছি, তা সেটা ব্যক্তিগত আয়ব্যয়ই হোক কিংবা দেহের সম্পদ-বাজেটই হোক, একটা না-দেখা পরিস্থিতি ঘটে যাওয়ার পর কি করবো ভাবার চাইতে সে ঘটনা ঘটার আগে অনুমান করে প্রস্তুতি নিয়ে রাখাই উত্তম। বিষয়টা এমন, মাস শেষে পাওনাদার হঠাৎ টাকা চেয়ে বাসার সামনে এসে তান্ডব তৈরির চেয়ে, আগে থেকে পাওনাদারকে কখন টাকা দিতে হবে সেটার ভবিষ্যতদ্বানী করাটা উত্তম। 

ঠিক তেমনি ক্যাম্ব্রিয়ান যুগের এই নতুন ধরনের জীবদের মধ্যে যারা ঠিকমতো অনুমান করতে পারলো যে সামনে কি ঘটতে যাচ্ছে — কখন শিকারী এসে হামলে পড়বে, নিজের খাবার শিকার করার জন্য কত দ্রুত বেগে খাদ্য-উৎসে যেতে হবে, তারাই কিন্তু বেশিরভাগ সময় এমন সব ভুল করা থেকে বিরত থাকলো যাতে নিজেরা অক্কা না পায়। আর খুব বিপদজনক নয় এমন সব ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে যারা পরবর্তী অনুমান সংশোধন করতে পারলো, তাদের বেঁচে থাকা ও বংশবৃদ্ধি করার সুযোগও গেলো বেড়ে। অন্যদিকে, যাদের অনুমান শক্তি খুব একটা ভালো ছিলো না, তারা নিজেদের দেহের বাজেটকে ঠিকমতো সমন্বয় করতে তো পারলোই না, বরং নিজেরা কম খাদ্য পেয়ে ও শিকারীদের শিকার হয়ে মারা পড়তে লাগলো। যার ফলে এদের বংশবৃদ্ধির সুযোগ গেলো কমে।

দেহের সম্পদ বাজেট করার যে প্রক্রিয়া, তা কেতাবী ভাষায় অ্যালোস্টেসিস নামে পরিচিত। এর অর্থ হলো, দেহের কোন মুহুর্তে কি সম্পদ লাগবে, তা আগে থেকেই ভবিষ্যদ্বানী করে প্রস্তুত করে রাখা। আমাদের ক্যাম্ব্রিয়ান যুগের প্রাণীরা যখন সারা দিন ধরে সম্পদ আরোহন ও ব্যয় করতে লাগলো, নিজেদের পরিবেশে কি ঘটছে তা ঠাহর করে ও ঘোরাঘুরি করে, অ্যালোস্টেসিস প্রক্রিয়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের দেহের বাজেটের সমন্বয় করতে থাকলো। দেহের সম্পদ কমে যাওয়া সমস্যা না, যতক্ষণ পর্যন্ত না নতুন খাদ্য আরোহনের মাধ্যমে তারা সে সম্পদ আবার পূর্ণ করে নিতে পারছে।

তাহলে আবার সেই ক্যামব্রিয়ান যুগে ফেরত চলে যাওযা যাক। আমাদের আগ্রহের কেন্দ্র যে প্রাণীটি, তার ইন্দ্রিয় তাকে খবর দিলো আশেপাশে একটা কিছু নড়ছে। হতে পারে এটা একটা খাবার। এখন প্রাণীটা কি করবে? এটি কি যে জিনিসটা নড়ছে, তার দিকে এগিয়ে যাবে? কিন্তু এই চলন তো শক্তি খরচ করবে, এই শক্তি খরচ করলে কি ঠিক মতো ফলাফল পাওয়া যাবে? যে প্রচেষ্টা তাকে দিতে হবে, সেটা বিফলে যাবে না তো? এটা একটা ভবিষ্যত অনুমান করার প্রক্রিয়া, যেটার জন্য প্রাণীটি তার পূর্ব অভিজ্ঞতা আমলে নিতে পারে, এবং ভালো মন্দ দুই দিকই যাচাই করতে পারে। এই অনুমান করার জন্য কিছু একটা ঘটতে হবে প্রাণীটির মধ্যে। 

ক্যাম্ব্রিয়ান যুগে এই নতুন ধরনের প্রাণীদের একটা প্রজাতী-বিষ্ফোরণ হয়। অনেক নতুন নতুন প্রজাতীর প্রাণী আসতে থাকে বিবর্তনের মাধ্যমে, যাদের দেহ-পরিকল্পনা বেশ জটিল, অনেকগুলো অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, ইন্দ্রিয়, ও দেহতন্ত্র। এতো সব অঙ্গ-তন্ত্র পরিচালানা, ইন্দ্রিয় থেকে আসা নতুন ধরনের তথ্য পর্যালোচানা, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কি ঘটবে সেটার ভবিষ্যাদ্বানী করে পরবর্তী চলন-শিকার-পলায়নের সিদ্ধান্ত নেয়ার একটা নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ। অ্যাম্ফিওক্সাসদের একটা কাঠির মধ্যে পাকস্থলি জাতীয় সরল দৈহিক গঠনে এতো জটিল কিছু ছিলো না। অন্যদিকে, এসব নতুন প্রজাতীর দেহের গঠনে রক্ত-পরিবহণ তন্ত্র, শ্বসন তন্ত্র, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ইত্যাদি নতুন ধরনের জটিল প্রক্রিয়া যুক্ত হচ্ছে। এগুলো কিন্তু দেহের বাজেট হিসেব-নিকাশ করা, বিভিন্ন সম্পদের সমন্বয় করার কাজটা বেশ চ্যালেঞ্জিং করে তোলে। এই নতুন ধরনের দেহের এমন কিছুর দরকার হলো যেটা কিনা বিভিন্ন ধরনের বিশেষায়িত কোষের পানি, রক্ত, লবণের পরিমাণ, অক্সিজেনের ঘনত্ব, গ্লুকোজ, কর্টিসল সহ বিভিন্ন হরমোন ইত্যাদি অজস্র সম্পদের সমন্বয় করতে পারে। এই সমন্বয়টা এমনভাবে হতে হবে যাতে সহজে এসবের ভারসাম্য নষ্ট না হয়, নতুন পরিস্থিতিতে দেহ সঠিকভাবে ভবিষ্যদ্বানী করে আগে থেকেই ব্যবস্থা নিতে পারে। এই প্রাণীদের যে সমাধান দরকার ছিলো, সেটার নামই হলো মস্তিষ্ক।

ক্যাম্ব্রিয়ান যুগ থেকে যে প্রাণীদের দেহ গঠন জটিল হওয়া শুরু করলো শুধু তাই নয়, দেহের আকারও বৃদ্ধি পেতে থাকলো। এ কারণে দেহ-বাজেট নিয়ন্ত্রন করার উদ্দেশে যে স্নায়ুতন্ত্র প্রাক মস্তিষ্ক হিসেবে গঠিত হয়েছিলো, তাদের আকারও বাড়তে থাকলো। কারণ দেহ বড় হওয়ার সাথে সাথে জটিলতাও বাড়তে থাকে, বড় দেহ নিয়ন্ত্রণের জন্য বড় মস্তিষ্ক দরকার হয়। যেমন আপনার-আমার মস্তিষ্কর কথাই ধরা যাক। আমাদের মস্তিষ্ককে ছয় শতাধিক পেশি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, ডজনখানেক হরমোনের পরিমাণ সামঞ্জস্য করতে হয় প্রয়োজনভেদে, মস্তিষ্কের নিজেদের কোষের শক্তির যোগান নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, খাদ্য হজম, রেচন, ইত্যাদি সবকিছুই করতে হয়। সবকিছুই কিন্তু অজ্ঞাতসরে ঘটে, আপনি আমি টের পাই না যে কি কি ঘটছে। 

তাহলে এখন ফেরত যাওয়া যাক পুরনো প্রশ্নে। মস্তিষ্কের উদ্ভব কেন ঘটলো। আসলে এই প্রশ্নটা ভুল। কারণ বিবর্তন প্রক্রিয়ার কোন সচেতন উদ্দেশ্য নেই। তবে আমরা জিজ্ঞেস করতে পারি যে মস্তিষ্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ কোনটা। মস্তিষ্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ সচেতনতা নয়, বিচারশক্তিও নয়, চিন্তাভাবনা বা কল্পনা করা নয়, আবেগি হওয়াও নয়। মস্তিষ্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো এর মালিকের দেহ নিয়ন্ত্রণ করা। অর্থাৎ দেহের যে সম্পদ-বাজেট রয়েছে, তার ভারসাম্য সমন্বয় করা। সামনে দেহের শক্তি-সম্পদের চাহিদা কি হতে পারে, সেটা পূর্বানুমান করে তা যোগানের ব্যবস্থা করা। অর্থাৎ অ্যলোস্ট্যাসিস, যাতে আপনি প্রয়োজনীয় চলাফেরা করার মাধ্যমে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারেন। মস্তিষ্ক আপনার দেহের বিভিন্ন সম্পদ এমনভাবে বিনিয়োগ করে, যাতে আপনি নিজেকে এমন সব কর্মকান্ডে জড়িত রাখেন, যার বিনিময়ে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে এই বিনিয়োগে লাভ হয়। অর্থাৎ আপনি যাতে প্রয়োজনীয় খাদ্য, বাসস্থান, নিরাপত্তা, ভালোবাসা ইত্যাদি পান। যাতে দীর্ঘমেয়াদে আপনি প্রজননের মাধ্যমে নিজের জিনকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দিতে পারেন।

Seven and a Half Lessons About the Brain / Lisa Feldman Barrett

[/restrict]

আরাফাত রহমান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অণুজীববিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া থেকে জেনেটিক্স, জিনোমিক্স ও বায়োইনফরমেটিক্স বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেছি।বর্তমানে ওরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পোস্ট-ডক্টোরাল গবেষক হিসেবে কার্যরত আছি।আমার প্রকাশিত বই "জেনেটিক্স: বংশগতিবিদ্যার সহজপাঠ" (UPL/প্রকৃতি পরিচয়, ২০২২), "মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৫) ও "প্রাণের বিজ্ঞান" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৭)।