স্লাইম-মোল্ডের মস্তিষ্ক-বিহীন বুদ্ধিমত্তা

কখনো কি পুরনো মৃত গাছের পড়ে থাকা গুড়ি বা কান্ডে হয়তো হলুদ রঙের ছোপ চোখে পড়েছে আপনার? কাছে গিয়ে দেখলে মনে হবে ছত্রাক পড়েছে। এদের অনেকেই স্লাইম মোল্ড পরিবারের সদস্য। দেখতে অপ্রয়োজনীয় ছত্রাক মনে হলেও এরা বুদ্ধিমত্তার প্রচলিত সংজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করে।

স্লাইম মোল্ড পরিবারের সবচেয়ে আলোচিত সদস্য বোধ হয় ফাইসারাম পলিসেফালাম (Physarum polycephalum)। আলোচিত হবেই না কেন? এদের নিয়ে জটিল সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে গেছেন। এরা জটিল গোলকধাঁধা সমাধান করতে পারে, খাবারের জন্যে সংক্ষিপ্ততম পথ খুঁজে বের করতে পারে। এমনকি এদের মাঝে এক ধরনের স্মৃতিও রয়েছে। অথচ এদের কোন স্নায়ু বা স্নায়ুতন্ত্র নেই। স্নায়ু ছাড়াও কিভাবে স্লাইম মোল্ডেরা কিভাবে এক ধরনের বুদ্ধিমত্তা প্রদর্শন করে, সেটা এই লেখার বিষয়বস্তু।

স্লাইমমোল্ড যেভাবে গোলকধাঁধা সমাধান করে।

স্লাইম মোল্ডদের দেখতে ছত্রাকের মতো মনে হলেও এরা আসলে প্রোটোজোয়া, এক ধরনের অ্যামিবার মতো জীব। এরা মূলত আর্দ্র, পচে যাচ্ছে এমন ধরনের জৈবপদার্থ পছন্দ করে। এরা প্রোটিস্টা কিংডমের সদস্য। এদের জীবনচক্রে এক-কোষী, বহুকোষী দুই ধরনের পর্যায়ই দেখা যায়। ফাইসেরাম পলিসেফালাম নামক স্লাইম মোল্ডটি তার জীবনচক্রের ভেজিটেটিভ ধাপে বহু-নিউক্লিয়াস সমৃদ্ধ। অনেকগুলো নিউক্লিয়াস থাকলেও এরা কিন্তু এককোষী অবস্থায় থাকে। তাদের এই দশাকে বলা হয প্লাজমোডিয়াম। প্লাজমোডিয়াম খুব সহজেই নিজের আকার পরিবর্তন করতে পারে, অনেকটা যেন মার্ভেলের কোন সুপারহিরো। এরা নিজেদেরকে একটা বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে দিয়ে খাদ্যের সন্ধান করতে থাকে। 

[restrict]

বনজঙ্গলে মাটিতে ঝড়ে পড়া পাতা আর মৃত গাছের কান্ডের মাঝ দিয়ে ফাইসেরাম পলিসেফালাম শিকার খুঁজে বেড়ায় । বিভিন্ন ব্যক্টেরিয়া, ছত্রাকের স্পোর ও অন্যান্য এককোষীদের সন্ধান পেলে এই স্লাইম মোল্ড তার কোষঝিল্লী দিয়ে ঘিরে ফেলে, আর আস্তে আস্তে হজম করতে থাকে (এখন থেকে স্লাইম মোল্ড বলতে ফাইসেরাম পলিসেফালাম বোঝানো হবে)। আগেই বলেছি এই এককোষী স্লাইমমোল্ডটি খুব সহজেই নিজের আকৃতি পরিবর্তন করতে পারে। বনজঙ্গলে এদেরকে দেখে মনে হবে যেন একটা হলুদ রঙের কিঞ্চিত আর্দ্র একটা স্তর লেপে দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে গবেষণাগারে এদেরকে অ্যাগারের প্লেটে কৃত্রিমভাবে চাষ করলে এদেরকে অনেকটা কোরালের মতো শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে বিস্তার করতে দেখা যায়। প্রায় চার দশক আগে যখন জীববিজ্ঞানীরা এদেরকে গবেষণাগারে নিয়ে আসেন, তখন তাদের আগ্রহ ছিলো এরা কিভাবে চলাফেরা করে সেটাা বোঝা। কারণ আমাদের পেশিকোষ আণবিক পর্যায়ে যেভাবে কাজ করে, তার সাথে এদের চলনের অনেকটা মিল পাওয়া যায়। তবে তখনো কেউই ভাবেননি যে এদের মধ্যে বুদ্ধিমত্তার সন্ধান পাওয়া যাবে।

পচে যাওয়া কাঠের গুড়িতে ছড়িয়ে পড়া প্লাজমোডিয়াম স্লাইম মোল্ড। C. Vecchio Photo

এটার পরিবর্তন ঘটে ২০০০-র দশকে। জাপানের হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ে তোশিয়ুকি নাকাগাকি এবং তার সহকর্মীরা স্লাইমমোল্ডকে কেটেছেটে একটা প্লাস্টিকের গোলকধাঁধার মধ্যে বিভিন্ন স্থানে বসিয়ে দেন। দেখাগেলো, এই টুকরো-টুকরো করা স্লাইম মোল্ডটির বিভিন্ন অংশ বড় হয়ে একে অন্যকে খুঁজে নিজেরা সংযুক্ত হয়ে সম্পুর্ন গোলকধাঁধাটি দখল করে ফেললো। এরপর তারা গোলকধাঁধার শুরু ও শেষ এই দুই প্রান্তে খাবার রাখলেন। মাত্র চার ঘন্টা পরে দেখা গেলো এই স্লাইম মোল্ডটিকে দেখা গেলো গোলকধাঁধার অধিকাংলা রাস্তা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে কেবল মাত্র খাবার রাখা এই দুই প্রান্তকে যুক্ত করা সংক্ষিপ্ততম রাস্তায় বেড়ে উঠছে। সংক্ষিপ্ততম পথ খুঁজে বের করার অর্থ হলো স্লাইম মোল্ড এমন একটা রাস্তা বের করছে যাতে তার সবচেয়ে কম সম্পদ ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে!

অক্টোবর রেইড ও তার সহকর্মীগণ আরো একটা গবেষণা করলেন। উদ্দেশ্য হলো ভালোভাবে বোঝা, যে স্লাইম মোল্ড ঠিক কিভাবে এই সংক্ষিপ্ততম পথ খুঁজে বের করছে। স্লাইমমোল্ড যখন গোলকধাঁধায় (কিংবা জঙ্গলের মাটিতে) প্রথম প্রথম ঘুরে বেড়ায়, তখন সে তার রাস্তায় একটা স্লাইম স্তর ফেলে যায়। রেইড লক্ষ্য করলেন, স্লাইম মোল্ড নতুন জায়গা ঘুরে বেড়ার সময়ে আঠালো স্থান পরিহার করে, যেটা সে আগে ঘুরে আসার ফলে রেখে যাওয়া স্লাইম দিয়ে তৈরি হয়েছে। এই বহিকোষীয় স্লাইম একধরণের আঞ্চলিক ল্যান্ডমার্ক হিসেবে কাজ করে, যেটা  পলিসেফালামকে বলে যে: “এখানে না, অন্য জায়গায় যাও, এখানে তুমি আগেই ঘুরে গিয়েছো”! পরবর্তীতে অক্টোবর রেইড প্রমাণ করেন যে পলিসেফালাম মূলত তার এই নিঃসৃত স্লাইমকে একটা ম্যাপ হিসেবে ব্যবহার করে।

পেট্রিডিশে খাদ্যের অনুসন্ধান করছে স্লাইম মোল্ড।

এই প্রোটিস্ট স্থান-সম্পর্কিত আরো জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারে। টোকিওর রেল নেটওয়ার্ক এর ডিজাইনের কার্যকারিতার জন্য সারা পৃথিবীতে বিখ্যাত। দেখা গেছে, আপনি যদি প্রধান প্রধান শহর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানের অনুরূপ জায়গায় (অর্থাৎ একই স্থানাঙ্কে) খাদ্য রাখেন, স্লাইমমোল্ড এদেরকে যুক্ত করে যে নেটওয়ার্ক তৈরি করে সেটা টোকিওর রেল নেটওয়ার্কের সাথে মিলে যায়! একই ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও স্পেইনের হাইওয়ে ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও! তার মানে হলো, এই এককোষী মস্তিষ্ক বিহীন অ্যামিবা জাতীয় প্রাণী বিভিন্ন খাদ্য উৎসর মধ্যে এলোমেলোভাবে সংযোগ তৈরি করে না। বরং এরা একদল মেধাবী ইঞ্জিনিয়ারের মতো কাজ করে। এরা এমন নেটওয়ার্ক তৈরি করে যেটা সবচেয়ে দক্ষ, কার্যকর, এবং সাশ্রয়ী। এদের এই বিশেষত্ত্বে বিম্মিত হয়ে বেশ কিছু গবেষক ও ইঞ্জিনিয়ার তো প্রস্তাব দিয়েই দিয়েছেন যাতে নতুন রাস্তা-ঘাট নির্মানের আগে স্লাইম মোল্ড দিয়ে একটা সিমুলেশন তৈরি করা হয়!

শুধু গোলকধাঁধার সমাধান করা নয়। স্লাইম মোল্ডকে প্রাথমিক পর্যায়ের শিখন-যোগ্যতাও রয়েছে। একটি গবেষণায় স্লাইম মোল্ডকে এমন একটা পরিবেশে রাখা হলো যেখানে কিছুক্ষণ পর পর আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা বদে যায়। কিছুক্ষণ পর এর প্রতিক্রিয়ায় স্লাইম মোল্ডকেও দেখা গেলো নির্দিষ্ট সময় পর পর আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা বদলে যাওয়ার আগেই তাদের আচরণ বদলে নিতে। অর্থাৎ স্লাইম মোল্ডের মাঝে এক ধরনের শিখন ও স্মৃতি দেখা যায়। 

অনুসন্ধানরত স্লাইম

প্রশ্ন হলো, মস্তিষ্ক ছাড়াই কিভাবে স্লাইম মোল্ড এতো জটিল সমস্যার সামাধান করতে পারে? ওদের তো আমাদের মতো স্নায়ু নেই। তবে এরা এককোষী দেহকে এই কাজে ব্যবহার করে।  আপনি এটাকে একটা প্রাগৈতিহাসিক তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা হিসেবে কল্পনা করতে পারেন, যা একটা মাত্র কোষের মধ্যে ঘটছে। কিন্তু অন্যান্য কোষের সাথে এই কোষের পার্থক্য হলো এরা নিজেদের আকৃতি পরিবর্তন করতে পারে। ফলে এ কোষ বিভিন্ন স্থানে পাইপ-আকৃতি তৈরি করে ছড়িয়ে পড়তে পার। স্লাইম মোল্ডের কোষের ভেতরে ক্রমাগত পালস তৈরি হয়। এই পালস কোষের সাইটোপ্লাজমকে বিভিন্ন দিকে প্রবাহিত করতে পারে। যখন কোন অঞ্চলে খাদ্য পাওয়া যায়, তখন সেখানকার সাইটোপ্লাজম প্রবাহের গতি বেড়ে যায়। মুলত ছড়িয়ে থাকা কোষের বিভিন্ন স্থানে ভৌতরাসায়নিক পরিবর্তন ও সংকেত বিনিময়ের মাধ্যমে স্লাইম মোল্ডের শেখা ও সমস্যা সমাধানের ঘটনাটি ঘটে।

আমাদের বুদ্ধিমত্তার সাথে এটার আরেকটা পার্থক্য হলো প্রয়োজনীয় শক্তির পরিমাণ। আমাদের মস্তিষ্ক আসলেই প্রকৃতির একটি অনন্য বিস্ময়। এখানে অজস্র স্নায়ু যেভাবে বিভিন্ন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে স্পাইক তৈরির মাধ্যমে যোগাযোগ করে, প্যাটার্ন সনাক্ত করে সমস্যার সমাধান করে, তার সাথে স্লাইম মোল্ডের কোন তুলনাই চলে না। কিন্তু আমাদের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র বেশ খরুচে, দেহের ২০% শক্তিই চলে যায় এই মস্তিষ্ক চলমান রাখতে। তবে মুল ব্যপারটা হলো, দুইটা পদ্ধতিই কিন্তু কাজ করে। একই সমস্যা সমাধানের জন্য বিভিন্ন জীব বিভিন্ন সমাধান ব্যবহার করতে পারে। এটা জীববিজ্ঞানে একটা বিশেষ ধর্ম যা বার বার দেখা যায়। মস্তিষ্ক ভিত্তিক বুদ্ধিমত্তা হয়তো প্রাণিজগতে জটিলতা ও দক্ষতার শীর্ষে অবস্থান করছে, কিন্তু এটাই একমাত্র সমাধান নয়!

আরো জানতে পড়ুন: How brainless slime molds redefine intelligence | Nature

[/restrict]

আরাফাত রহমান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অণুজীববিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া থেকে জেনেটিক্স, জিনোমিক্স ও বায়োইনফরমেটিক্স বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেছি।বর্তমানে ওরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পোস্ট-ডক্টোরাল গবেষক হিসেবে কার্যরত আছি।আমার প্রকাশিত বই "জেনেটিক্স: বংশগতিবিদ্যার সহজপাঠ" (UPL/প্রকৃতি পরিচয়, ২০২২), "মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৫) ও "প্রাণের বিজ্ঞান" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৭)।