আপনাদের জন্য একটি চমৎকার সুখবর আছে। অগণিত সমান্তরাল মহাবিশ্বের ভিড় থেকে আমরা এমন একজন করিম বকশিকে খুঁজে বের করেছি, যে এই মুহূর্তে অসম্ভব সুখী। চলুন, কিছুক্ষণের জন্য আমরা সেই সুখী মহাবিশ্বের সুখী করিম বকশির জীবনে উঁকি দিয়ে আসি।
করিম বকশির দীর্ঘদিনের আকুল প্রস্তাবে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেছে লিলি জামান। আজ তাদের সুন্দর দাম্পত্য জীবনের প্রথম দিন। সকালের নাশতা সেরে করিম বকশি অফিসের উদ্দেশ্যে তৈরি হলেন। মনে মনে একটা জম্পেশ পরিকল্পনা সাজিয়ে রেখেছেন তিনি। আজ সন্ধ্যায় লিলিকে নিয়ে ধানমন্ডির এক চমৎকার রেস্টুরেন্টে ডিনার করতে যাবেন। দিনটি তাদের কাছে খুব বিশেষ, তাই অফিস থেকে আজ একটু দ্রুতই ব্যাংক থেকে বেরিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।
ব্যাংকে পা রাখতেই এক অদ্ভুত থমথমে পরিবেশ অনুভব করলেন করিম বকশি। ম্যানেজার সাহেব হন্তদন্ত হয়ে তার দিকে এগিয়ে আসলেন। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, চোখেমুখে এক অজানা আতঙ্ক। গলাটা যতটা সম্ভব নামিয়ে তিনি বললেন, “বকশি সাহেব, একটা বড় ঝামেলা হয়ে গেছে। আপনাকে এখনই একবার নিচে যেতে হবে। আমার আবার এখন একটা জরুরী মিটিং পড়ে গেছে।”
করিম বিনয়ী সুরে বললেন, “জি স্যার, বলুন। কী কাজ?”
ম্যানেজার চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললেন, “আমাদের মেইন ভল্ট রুমটার কথা মনে আছে? গ্রাউন্ড ফ্লোরেরও নিচে, একদম তলানিতে। মাইনাস টু ফ্লোরে। সকাল থেকে সেখানকার মোশন সেন্সরগুলো পাগল হয়ে গেছে। অনবরত সিগন্যাল দিচ্ছে যে ভেতরে কেউ আছে।”
করিম কিছুটা অবাক হয়ে বললেন, “কিন্তু ওটা তো একদম নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ে ঢাকা। সেখান থেকে সিগন্যাল কেন আসবে?”
“সেটাই তো রহস্য! ভল্টে যাওয়ার প্রতিটি চেকপোস্ট লক করা, কোনো দরজা খোলা হয়নি। অথচ ভেতর থেকে সেন্সরগুলোর সিগনাল আসছে। সিসি ক্যামেরাগুলোও অদ্ভুতভাবে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে, সবখানে শুধু স্ট্যাটিক নয়েজ। বকশি সাহেব, আমি আপনাকে এক্সেস দিচ্ছি। সাথে গার্ড রমজান আর আজিজকে নিয়ে যান। একবার গিয়ে দেখে আসুন আসলে ওখানে কী ঘটছে।”
করিম বকশি যখন লিফট থেকে -২ ফ্লোরে পা রাখলেন, তখন চারপাশের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। করিডোরের ফ্লুরোসেন্ট বাতিগুলো এক অদ্ভুত ছন্দে কাঁপছে। যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি বিদ্যুতের প্রবাহকে শুষে নিচ্ছে। হলওয়ের শেষ মাথায় ভল্ট ঘরের ভারী ইস্পাতের দরজা, লাল হরফে লেখা: “অনুমোদিত স্টাফ ব্যতীত প্রবেশ নিষেধ।”
কার্ড পাঞ্চ করতেই যান্ত্রিক ঘড়ঘড় শব্দে দরজা খুলে গেল। পেছনের গার্ড রমজান ফিসফিসিয়ে বললো, “স্যার, ভেতরে ডাকাত-টাকাত থাকতে পারে। আগে আমি আর আজিজ ঢুকি, আপনি পেছনে থাকেন।”
করিম বকশি সরে দাঁড়াতেই রমজান আর আজিজ অস্ত্র উঁচিয়ে ভেতরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ঠিক সেই মুহূর্তেই কানে তালা লাগানো এক বিকট শব্দ হলো। কোনো বিস্ফোরণ নয়, বরং মনে হলো মহাকাশের বিশাল কোনো শূন্যতা থেকে বাতাস শুষে নেওয়া হচ্ছে। ভেতরের আলো নিমেষেই নীলচে হয়ে গেল।
করিম বকশির বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা যেন কামারের হাতুড়ি পেটাচ্ছে। কোনো গুলির শব্দ নেই, কোনো চিৎকার নেই। শুধু এক অশুভ নিস্তব্ধতা। কয়েকবার কাঁপাকাঁপা গলায় ডাকলেন, “রমজান? আজিজ? কী হয়েছে ভেতরে?”
ওপাশ থেকে কোনো সাড়া নেই। নিজের ভয়ের সাথে লড়াই করে শেষমেশ ভেতরে ঢুকলেন করিম বকশি। আর ঢুকেই যা দেখলেন, তা দেখার জন্য এই মহাবিশ্বের কোনো মানব মস্তিস্ক প্রস্তুত ছিল না।
ঘরের মাঝখানে যেখানে ভল্টটি থাকার কথা, সেখানে কোনো বস্তু নেই। আছে শুধু কুচকুচে কালো এক গোলক। এক অবর্ণনীয় অন্ধকার, যা চারপাশের আলোকেও যেন দুমড়ে-মুচড়ে ভেতরে টেনে নিচ্ছে। করিম বকশি শিউরে উঠে দেখলেন, রমজানের দেহটা আর মানুষের মতো নেই। তার শরীরটা আক্ষরিক অর্থেই নুডলসের মতো লম্বা আর সরু হয়ে গেছে।
ভীষণ আতঙ্কে বকশি দেখলেন, রমজানের মাথাটা ফ্লোরের কাছে স্থির হয়ে আছে, কিন্তু তার পা দুটো সেই অন্ধকার গোলকের দিকে কয়েকশ ফুট লম্বা সুতোর মতো প্রসারিত হয়ে যাচ্ছে। সবচাইতে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, রমজান মরেনি। সে স্থির চোখে বকশির দিকে তাকিয়ে আছে, তার মুখটা এক অন্তহীন যন্ত্রণায় হা হয়ে আছে, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না।
রমজানের সেই লম্বাটে লালচে শরীরটা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছে। করিম বকশি জ্ঞান হারিয়ে ফেলার মতো অবস্থায় পৌঁছালেন। যখনই তিনি পাগলের মতো রমজানকে টেনে ধরতে সামনে পা বাড়ালেন, ঠিক তখনই অন্ধকারের আড়াল থেকে আজিজের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর ভেসে আসলো, “কাছে যাবেন না স্যার! এক পা-ও না! এই দাগটার কাছেই যাবেন না স্যার। এটা থেকেই শুরু হয় এই অন্ধকার রাক্ষসের রাজত্ব।”
করিম বকশি বললেন, “কোন দাগটা?”
যেই আজিজ পায়ে দাগটা দেখাতে যাবে, করিম বকশির চোখের সামনেই আজিজের পা-টা রবারের মতো প্রসারিত হয়ে কয়েক ফুট লম্বা হয়ে গেল, যেন কোনো অদৃশ্য নোডলস! মুহূর্তের মধ্যেই আজিজের পুরো অস্তিত্ব সেই ঘনীভূত অন্ধকারের গোলকটির পেটে সেঁধিয়ে গেল।
রমজান আর আজিজ দুজনেই এখন এই অন্ধকার দানবটার এক কোণায় স্থির হয়ে আছে। তাদের শরীর ছিঁড়ে লম্বা হয়ে যাচ্ছে, লালচে আভায় তারা ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে মহাকালের গর্ভে। করিম বকশি আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করলেন না। মরণভয়ে চিৎকার দিয়ে তিনি দৌড়ে দরজার দিকে গেলেন। কিন্তু পৌঁছানোর আগেই এক প্রচণ্ড শব্দে ভারী ইস্পাতের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ হয়ে গেল!
তিনি পিঠ ঠেকিয়ে দিলেন দরজায়। সামনে তাকিয়ে দেখলেন, সেই অন্ধকার গোলকটা স্থির নয়, ওটা প্রচণ্ড গতিতে নিজের অক্ষের ওপর ঘুরছে। আর ঘোরার সাথে সাথে চারপাশের স্থান এবং কালকে আক্ষরিক অর্থেই দুমড়ে-মুচড়ে নিজের সাথে পেঁচিয়ে নিচ্ছে। মানুষের সাধারণ চেতনা দিয়ে এই বিভীষিকা অনুভব করা অসম্ভব। বকশি অনুভব করলেন, তার চারপাশের বাতাস, আলো, এমনকি তার নিজের শরীরের অণু-পরমাণুগুলোও যেন সেই দানবীয় টানে নড়ে উঠতে চাইছে।
ভল্ট রুমের এক কোণায় কুঁকড়ে বসে রইলেন তিনি। ভয়ের আতিশয্যে তার দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে। বারবার দরজায় লাথি মারলেন, চিৎকার করলেন, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন, প্রায় পাঁচ ঘণ্টা কেটে গেছে। ব্যাংকের লোকজনের ওপর প্রচণ্ড রাগ হলো তার। পাঁচটা ঘণ্টা পার হয়ে গেল, অথচ কেউ উদ্ধার করতে এল না?
ক্ষোভ আর মরিয়া ভাব থেকে শেষবারের মতো দরজায় এক প্রচণ্ড লাথি বসালেন করিম বকশি। আশ্চর্যভাবে, এবার দরজাটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল। বকশি হকচকিয়ে গেলেন। সেই রাক্ষুসে গোলকটার দিকে শেষবার আতঙ্কে তাকিয়ে তিনি প্রায় টলতে টলতে বাইরে বেরিয়ে এলেন।
কিন্তু করিডোরে পা রাখতেই তার শিরদাড়া দিয়ে হিমস্রোত বয়ে গেল। পুরো ফ্লোরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। দু-একটা বাল্ব টিমটিম করে জ্বলছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলো মৃতপ্রায়। চারদিকের দেয়ালে পলেস্তারা খসে পড়ছে, ফ্লোরে জমে আছে ইঞ্চিখানেক পুরু ধুলো। পেছন ফিরে ভল্ট রুমের দরজার দিকে তাকাতেই বকশির কলিজা শুকিয়ে গেল! যে মজবুত ইস্পাতের দরজা একটু আগে চকচক করছিল, সেখানে এখন পুরু জং ধরেছে! মরিচা ধরা লোহা ক্ষয়ে গেছে বলেই তার শেষ লাথিতে ওটা ভেঙে পড়েছে।
পুরো জায়গাটা যেন এক পরিত্যক্ত ধ্বংসস্তূপ। এই পাঁচ ঘণ্টায় কী এমন ঘটে গেল যে সব বদলে গেল? বকশি পাগলের মতো সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে গ্রাউন্ড ফ্লোরে উঠে এলেন। কিন্তু উপরে উঠে যা দেখলেন, তাতে তার পায়ের তলার মাটি সরে গেল।
সামনে কোনো ব্যাংক নেই। নেই সেই পরিচিত কাউন্টার বা গার্ডের টেবিল। পুরো বিল্ডিংটা রূপান্তরিত হয়েছে এক বিশাল শপিং মলে। আধুনিক কাঁচের দেয়াল, উজ্জ্বল নিয়ন আলো আর সারি সারি খাবারের দোকান। ব্যাংকের নামগন্ধও কোথাও অবশিষ্ট নেই।
কোথায় চলে এসেছেন? রাস্তার দিকে তাকিয়ে বুঝলেন, এ রাস্তাটা তার ব্যাংকের সামনেরই রাস্তা। তিনি বুঝতে পারছেন না কী হলো, কিন্তু এতোকিছু ভাবার সময় নেই। তাড়াতাড়ি একটা গাড়ি ডেকে বাসার এড্রেসে চলে গেলেন। তার এপার্টমেন্ট যে বিল্ডিংয়ে ছিলো, সেটাও অদ্ভুতরকম পুরোনো লাগছে!
তার এই মুহুর্তে নিজের কৌতূহলকে প্রশ্রয় দেয়া ঠিক হবে না। চারপাশে কী চলছে, সে ব্যখ্যা তিনি অল্পক্ষণে বের করতে পারবেন না। এ মুহুর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ হচ্ছে লিলির খোঁজ নেয়া। দরজায় নক করতেই এক লোক দরজা খুললো। করিম বকশি আবারও ভয়ে, বিস্ময়ে সরে গেলেন। কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কে?”
করিম বকশি বললেন, “আমি এই এপার্টমেন্টে থাকি, আমার স্ত্রী লিলিকে নিয়ে। আপনি কে? এখানে কী করেন?”
লোকটা কপাল কুঁচকে বললেন, “লিলি? লিলি জামান? আপনি উনার কী হোন?”
“আমি ওর হাজবেন্ড, করিম বকশি। আজ ব্যাংকে এক দূর্ঘটনায় ভল্ট রুমে আটকে গিয়েছিলাম। আর আপনি কে? আমার এপার্টমেন্টে কী? লিলি কোথায়?”
“লিলি কোথায় মানে? উনি তো বারো বছর আগেই মারা গেছেন ক্যান্সারে! প্রায় ২১ বছর আগে উনার হাজবেন্ড করিম বকশি ব্যাংকে গিয়ে আর কখনও ফিরে আসেন নি।”
করিম বকশি চেঁচিয়ে বললেন, “কী বলেন? ফাজলামো করেন? আমিই করিম বকশি! লিলিকে ডাকুন নাহয় পুলিশ ডাকবো। ট্রাস্ট মি, আমি এই ঝামেলায় যেতে চাচ্ছি না।”
লোকটা শান্ত গলায় বললো, “আমি বুঝতে পারছি না, আপনিই করিম বকশি কিনা। কিন্তু আপনি যেই হোন, আপনার ঝামেলা সামলাতে চাই না। এই এপার্টমেন্ট আমার বাবা কিনে নিয়েছিলো লিলি জামানের কাছ থেকে। ক্যান্সারের চিকিৎসায় সব বিক্রি করেও শেষ রক্ষা হলো না ভদ্রমহিলার।”
করিম বকশি উন্মত্ত পশুর মতো নাকে-মুখে সর্বশক্তি দিয়ে ঘুষি চালাতে চাইলেন, কিন্তু সামনের লোকটা ক্ষিপ্রতায় সরে দাঁড়ালো। ঘুষিটা লোকটার কানের পাশ দিয়ে গিয়ে সজোরে দেয়ালে লাগল। হাড় চুরমার হওয়ার মতো যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠলেন করিম বকশি। লোকটা পেছন থেকে তাকে জাপটে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল, “প্লিজ শান্ত হোন ভাই! আমি এখানে রক্তারক্তি চাই না। আমি সত্যি জানি না আপনি কে, কিন্তু লিলি জামানের শেষ দিনগুলোতে প্রফেসর বজলুর পরিবারই তার দেখাশোনা করতো। আপনি দয়া করে উনাদের সাথে যোগাযোগ করুন। আপনাকে তাদের নতুন ঠিকানা দিই, প্লিজ চলে যান এখান থেকে।”
বিহ্বল বকশি ঠিকানামতো প্রফেসর বজলুর দরজায় গিয়ে যখন নক করলেন, তার ভেতরটা তখনো কাঁপছে। দরজা খুলল এক মধ্যবয়সী নারী। চেনা চেনা মুখ, কিন্তু বয়সের ভারে অনেকটা বদলে গেছে। বকশি অস্ফুট স্বরে বললেন, “মাহিরা? তুমি… তোমাকে এমন লাগছে কেন?” প্রফেসর বজলুর সেই ছোট্ট মেয়েটি আজ প্রৌঢ়ত্বের দোরগোড়ায়।
মাহিরার পেছনে এসে দাঁড়াল এক দীর্ঘদেহী জাপানিজ ভদ্রলোক। তীক্ষ্ণ চোখ, চুলে রুপালি আভা। এই মুখ করিম বকশির চেনা। ইশিগামী সেনকু! একাডেমিয়ার সেই বিস্ময় বালক, যাকে সবাই ‘ড. স্টোন’ বলে ডাকত। খুব কম বয়সেই একাডেমিয়ায় জায়গা করে নিয়েছিলো। ডজনখানেক ভাষায় যার অনর্গল দখল।
“মাহিরা? সেনকু? এসব কী হচ্ছে? লিলি কোথায়? প্রফেসর সাহেব কোথায়?” করিম বকশির কণ্ঠে কান্নার সুর।
সেনকু কোনো কথা না বলে তাকে হ্যাঁচকা টানে ঘরের ভেতর নিয়ে এল। সোফায় বসিয়ে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “আমি যা আশঙ্কা করেছিলাম, ঠিক তা-ই হয়েছে। তখন আমার কথা কেউ শোনেনি, এমনকি সেনসেই বজলুও না। এর মাঝেই প্রফেসর মারা গেছেন, লিলি জামানও না ফেরার দেশে চলে গেছেন। বকোশি সান, আপনি এমন এক সময় ফিরে এসেছেন যখন সব বড্ড দেরি হয়ে গেছে।”
পৃথিবীর সমস্ত ক্ষোভ আর হাহাকার চেপে বকশি আর্তনাদ করে উঠলেন, “সেনকু, আমাকে বলো কী হয়েছে! আমি হাত জোড় করছি তোমার কাছে…”
সেনকু দাঁড়িয়ে গেলো। “বকোশি সান। আপনি একুশ বছর ধরে ওই ভল্ট রুমে আঁটকে ছিলেন!”
“মা-মানে? আমার চেয়ে সময়জ্ঞান কার বেশি হবে? আমি প্রতিটা সেকেন্ডের হিসেব রেখেছি। পাঁচ ঘণ্টার বেশি হয়নি।”
সেনকু ঝুঁকে এলো করিম বকশির দিকে, “বকোশি সান, Einstein warned us about that… মহাকর্ষ যেখানে দানবীয়, সময় সেখানে স্থবির। আপনি যে ভল্টে ঢুকেছিলেন, তার ঠিক নিচে জ্যান্ত হয়ে উঠেছিল এক ক্ষুদ্রকায় অথচ ভয়াবহ এক ব্ল্যাক হোল। আপনার ওই পাঁচ ঘণ্টা ছিল পৃথিবীর একুশ বছর!” তারপর সোজা হয়ে পায়চারি করতে করতে বললো, “আপনার এ ঘটনার ব্যখ্যা খুঁজতে আমাদের আগে বুঝে নিতে হবে কিছু ব্যাপার।”
সেনকু শান্ত গলায় বলল, “বকোশি সান, আপনি হয়তো ভাবছেন আপনার সাথে কোনো অলৌকিক কিছু ঘটেছে। কিন্তু সত্যটা এর চেয়েও অনেক বেশি গাণিতিক এবং জটিল। আপনার জন্য যা পাঁচ ঘণ্টা ছিল, পৃথিবীর জন্য তা ছিল ২১ বছর। এই বিশাল সময়ের পার্থক্যের কারণ কোনো জাদু নয়, বরং মহাবিশ্বের জ্যামিতি।”
করিম বকশি মাথা তুললেন। তার চোখ লাল হয়ে আছে। তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন, “জ্যামিতি? পাঁচ ঘণ্টা আর ২১ বছরের মধ্যে জ্যামিতি কোথা থেকে এল সেনকু?”
সেনকু ড্রয়ার থেকে একটা কলম বের করে টেবিলের ওপর রাখল। “আপনার পুরো ব্যাপারটি বুঝতে এবং আপনার এ অবস্থার একটা সমাধানে আসতে, আমরা আজকে মহাবিশ্বকে আরও নীবিড়ভাবে জানবো। আমরা মহাবিশ্বকে যেভাবে দেখি, মহাবিশ্ব আসলে তেমন নয়। আমরা মনে করি সময় সবার জন্য সমানভাবে বয়ে চলে, কিন্তু আইনস্টাইন আমাদের শিখিয়েছেন যে সময় আর স্থান একে অপরের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। আপনি যে ভল্ট রুমে ছিলেন, সেখানে মহাকর্ষের এক প্রবল দানবীয় উপস্থিতি ছিল। আর সেই মহাকর্ষই আপনার সময়কে ধীর করে দিয়েছিল।”
৪.১ নিউটন বনাম আইনস্টাইন: বল নাকি জ্যামিতি?
করিম বকশি কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে বললেন, “মহাকর্ষ? নিউটন তো বলেছিলেন মহাকর্ষ হলো একটা অদৃশ্য টান বা বল। পৃথিবী সূর্যকে টেনে ধরে রেখেছে, তাই আমরা ছিটকে যাচ্ছি না। এই টানের কারণে সময় কেন বদলে যাবে?”
সেনকু একটু হাসল। “নিউটনের ধারণা প্রায় ৩০০ বছর ধরে রাজত্ব করেছে। স্যার আইজ্যাক নিউটন তার বিশ্বজনীন মহাকর্ষ সূত্র দিয়ে আমাদের শিখিয়েছিলেন:

এখানে F হলো মহাকর্ষ বল, M আর m হলো দুটি বস্তুর ভর এবং r হলো তাদের মধ্যবর্তী দূরত্ব। নিউটন মনে করতেন মহাকর্ষ হলো একটি ‘Action at a distance’, অর্থাৎ একটি বস্তু কোনো মাধ্যম ছাড়াই অন্য বস্তুকে তাৎক্ষণিকভাবে নিজের দিকে টেনে নেয়। কিন্তু এখানেই একটা বড় সমস্যা ছিল। যদি হঠাৎ করে সূর্য মহাবিশ্ব থেকে উধাও হয়ে যায়, তবে নিউটনের সূত্র অনুযায়ী পৃথিবী মুহূর্তের মধ্যে তার কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হবে। কিন্তু আইনস্টাইন জানতেন, মহাবিশ্বে কোনো তথ্যই আলোর গতির চেয়ে দ্রুত যেতে পারে না। সূর্যের আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড সময় নেয়, তাহলে মহাকর্ষ কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে কাজ করবে?”
সেনকু কফির কাপটা হাতে নিয়ে টেবিলের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সরালো। “আইনস্টাইন ১৯০৭ সালে তার জীবনের সবচেয়ে ‘সুখী চিন্তাটা’ করলেন। তিনি উপলব্ধি করলেন, মহাকর্ষ আসলে কোনো আলাদা ‘বল’ নয়। একে বলা হয় ইকুইভ্যালেন্স প্রিন্সিপাল বা সমতুল্যতা নীতি। ধরুন, আপনি একটি লিফটের ভেতর আছেন এবং লিফটটি মহাশূন্যে 1g ত্বরণে উপরের দিকে ত্বরান্বিত হচ্ছে। আপনার মনে হবে আপনার পায়ের নিচে মেঝের চাপ বাড়ছে এবং আপনি নিচের দিকে আটকে আছেন। এই যে অনুভূতি, এটি কি মহাকর্ষের কারণে নাকি গতির কারণে? আপনি পার্থক্য করতে পারবেন না। এ নিয়ে একটু পরে বিস্তারিত বলবো।”
করিম বকশি মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। সেনকু চালিয়ে গেল, “আইনস্টাইন বললেন, মহাকর্ষ আর ত্বরণ আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। নিউটন যেখানে মহাকর্ষকে একটা অদৃশ্য হাত বা রশির মতো টান হিসেবে দেখেছিলেন, আইনস্টাইন সেখানে দেখলেন মহাবিশ্বের জ্যামিতিক পরিবর্তন। তিনি প্রমাণ করলেন যে, কোনো ভারী বস্তু তার চারপাশের পরিবেশকে বদলে দেয়। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে কারণ সূর্য তাকে টেনে ধরে রেখেছে তা নয়, বরং সূর্য তার চারপাশের জ্যামিতিকে এমনভাবে বাঁকিয়ে দিয়েছে যে পৃথিবী সেই বাঁকা পথেই চলতে বাধ্য হয়।”
করিম বকশি জিজ্ঞেস করলেন, “তার মানে তুমি বলতে চাইছ মহাকর্ষ কোনো শক্তি নয়, বরং এটা একটা পথের ধর্ম?”
সেনকু মাথা নাড়ল। “ঠিক তাই। নিউটনের ধারণা ছিল অনেকটা জাদুকরী টানের মতো, যার কোনো ব্যাখ্যা নেই। আর আইনস্টাইন আমাদের দেখালেন মহাকর্ষ হলো স্থান ও সময়ের এক অদ্ভুত জ্যামিতিক খেলা। এই খেলা বুঝতে হলে আমাদের বুঝতে হবে সেই অদৃশ্য চাদরকে, যাকে আমরা স্পেস-টাইম বলি।”
৪.২ স্থান-কালের চাদর ও বক্রতা
করিম বকশি মাথা নিচু করে বসে আছেন। তার মাথার ভেতর তখন নিউটনের বাতিল হয়ে যাওয়া অদৃশ্য বল আর আইনস্টাইনের জ্যামিতিক ব্যাখ্যার যুদ্ধ চলছে। মহাকর্ষ যদি জ্যামিতিই হয়, তবে সেই জ্যামিতির কারণে তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান ২১টি বছর কীভাবে চুরি হয়ে গেল, তা তার কাছে এখনও এক অমিমাংসিত ধাঁধা।
সেনকু এবার তার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ঘরের এক কোণে রাখা বিছানা থেকে একটি বড় চাদর টেনে নিয়ে সে করিম বকশির দিকে এগিয়ে দিল।
“বকোশি সান, উঠে দাঁড়ান। চাদরের ওই দুই কোণা শক্ত করে ধরুন তো,” সেনকু নির্দেশ দিল।
করিম বকশি যন্ত্রচালিতের মতো উঠে চাদরের দুই কোণা ধরলেন। সেনকু অপর দুই কোণা ধরে চাদরটিকে শূন্যে টানটান করে মেলে ধরল।
সেনকু শান্ত কণ্ঠে বলতে শুরু করল, “এই টানটান চাদরটাকে মহাবিশ্বের ক্যানভাস হিসেবে কল্পনা করুন। নিউটন ভাবতেন মহাবিশ্বের মঞ্চটা স্থির, আর সময় হলো একটা ঘড়ি যা সবার জন্য সমানভাবে টিকটিক করে। কিন্তু আইনস্টাইনের শিক্ষক হারমান মিনকাওস্কি এক যুগান্তকারী ধারণা দিলেন। তিনি দেখালেন, সময় আর স্থান আলাদা কিছু নয়। তারা মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতা, এই তিন মাত্রার সাথে সময় নামের চতুর্থ মাত্রাকে বুনে তৈরি হয়েছে এই চাদর। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ফোর-ডাইমেনশনাল স্পেস-টাইম কন্টিনিয়াম বা চতুর্মাত্রিক স্থান-কালের চাদর।”

করিম বকশি চাদরটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। সেনকু আবার বলল, “সমতল বা সমান্তরাল স্থান-কালে দুটি ঘটনার মধ্যকার দূরত্বের গাণিতিক সমীকরণ হলো:

এখানে ds হলো স্পেস-টাইম ইন্টারভাল, যা মহাবিশ্বের সব দর্শকের কাছে ধ্রুবক। আর সমীকরণের ওই dt অংশটিই হলো সময়। অর্থাৎ এই চাদরের প্রতিটি সুতোর বুননে সময় জড়িয়ে আছে।”
করিম বকশির মনের ভেতরে এবার একটা প্রশ্ন মাথা তুলল। তিনি সমীকরণটার দিকে চোখ রেখে বললেন, “কিন্তু সেনকু, এই সমীকরণটা এলো কোথা থেকে? সাধারণ দূরত্বের হিসেব তো আমি বুঝি, স্কুলে পিথাগোরাস পড়েছি। কিন্তু এখানে সময়ের সামনে ওই বিয়োগ চিহ্নটা কেন? আর ds ধ্রুবক কেন?”
সেনকু একটু থামল। তারপর টেবিল থেকে একটা কাগজ তুলে নিয়ে তাতে দুটো বিন্দু আঁকল।
“বকোশি সান, চলুন একদম গোড়া থেকে শুরু করি।
আমাদের এই ত্রিমাত্রিক জগতে দুটি বিন্দুর মধ্যবর্তী দূরত্ব বের করতে আপনি যে পিথাগোরাস ব্যবহার করেছেন, সেটা হলো:

এখানে dx, dy, dz হলো দুই বিন্দুর মধ্যে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতার পার্থক্য। এই দূরত্ব ধ্রুবক। আপনি যেদিক থেকেই মাপুন না কেন, মান একই থাকবে। এটাই হলো আমাদের চেনা ইউক্লিডীয় জ্যামিতি।”
করিম বকশি মাথা নাড়লেন। “এটুকু বুঝি।”
“কিন্তু সমস্যা হলো,” সেনকু কণ্ঠ গম্ভীর করে বলল, “আইনস্টাইন দেখালেন এই স্থানের দূরত্ব সবার জন্য সমান নয়। আপনি যদি খুব দ্রুত চলেন, আপনার কাছে দৈর্ঘ্য সংকুচিত মনে হবে, সময় ধীর হয়ে যাবে। অর্থাৎ dx বা dt একা একা আর ধ্রুবক নয়। তাহলে মহাবিশ্বে ধ্রুবক জিনিসটা কী?”
সেনকু কাগজে লিখতে লিখতে বলল, “আইনস্টাইন আবিষ্কার করলেন এক অদ্ভুত সত্য। সময়কে যদি আলোর গতিবেগ c দিয়ে গুণ করে একটা ‘দূরত্ব’ বানানো যায়, তাহলে মহাবিশ্বের যেকোনো পর্যবেক্ষকের কাছে এই রাশিটি সবসময় একই থাকে:
(স্থানের দূরত্ব)2 – (সময়ের দূরত্ব)2 = ধ্রুবক “
করিম বকশি সমীকরণটার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকালেন। “কিন্তু বিয়োগ কেন? স্থানের তিনটি মাত্রা যোগ হলো, আর সময় বিয়োগ হলো কেন?”
সেনকু সামান্য হাসল। সে চাদরটি আরেকবার টান দিয়ে বলল, “এটাই সবচেয়ে সুন্দর প্রশ্ন। ব্যাপারটা হলো আপনার গতির একটা মোট ‘বাজেট’ আছে বকোশি সান। আপনি যদি স্থির বসে থাকেন, আপনার সেই পুরো বাজেট খরচ হয় সময়ের দিকে এগিয়ে যেতে। আর আপনি যদি স্থানের ভেতর দিয়ে দ্রুত চলতে শুরু করেন, সময়ের দিকে আপনার খরচ কমে আসে, অর্থাৎ আপনার সময় ধীর হয়ে যায়। স্থান আর সময় এভাবে একে অপরের সাথে একটা বিনিময়ের সম্পর্কে বাঁধা। এই বিনিময়ের কারণেই সমীকরণে একটা বিয়োগ চিহ্ন বসে। একেই বিজ্ঞানীরা বলেন সিগনেচার।”
সেনকু কাগজে ধাপে ধাপে লিখতে লাগল:
ds2=(স্থানের দূরত্ব)2 – (সময়ের দূরত্ব)2
=(dx2+dy2+dz2)−(c×dt)2
= −c2dt2+dx2+dy2+dz2
“এই সমীকরণের বিয়োগ চিহ্নটি হলো মহাবিশ্বের জ্যামিতিক ভারসাম্য। সাধারণ জ্যামিতিতে দুটি মাত্রা যোগ হয়, কিন্তু স্পেস-টাইমে সময় কেন বিয়োগ হয় জানেন? কারণ সময় আর স্থান একে অপরের পরিপূরক। বিয়োগ চিহ্নটি নিশ্চিত করে যে, আপনি স্থানের দিকে যতই গতি বাড়ান না কেন, আপনার মোট গতিপথ অর্থাৎ ds কখনও আলোর বেগকে অতিক্রম করতে পারবে না। এটি এক ধরণের মহাজাগতিক ট্রাফিক পুলিশ। এই ds কেই বলে স্পেস-টাইম ইন্টারভাল। এই সমীকরণটার ভাষ্য এটাই, আপনি দ্রুত চললে আপনার dx বাড়বে, কিন্তু dt কমে আসবে। ধীরে চললে উল্টোটা হবে। কিন্তু তারা সবসময় এমনভাবে একে অপরকে ব্যালেন্স করবে যাতে ds এর মান কখনো না বদলায়।”
করিম বকশি ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন। এবার সমীকরণটা তার কাছে আর শুধু গণিতের অঙ্ক নেই, এটা মহাবিশ্বের একটা গভীর নিয়মের ছবি।
এই পর্যায়ে সেনকু টেবিল থেকে একটি ভারী গোলাকার পেপারওয়েট নিয়ে টানটান চাদরটির ঠিক মাঝখানে ছেড়ে দিল। ভারী বস্তুর ভারে টানটান চাদরটি মাঝখানে অনেকটা দেবে গেল। পেপারওয়েটের চারপাশের চাদরের সমতল জ্যামিতি মুহূর্তেই একটি বক্র রূপ ধারণ করল।
সেনকু মুচকি হেসে বলল, “দেখলেন তো কী হলো? ভারী বস্তুটা তার চারপাশের সমতল চাদরকে বাঁকিয়ে দিল। মহাবিশ্বেও ঠিক এটাই ঘটে। মহাবিশ্বে যেখানেই ভর বা এনার্জি আছে, সেটা তার চারপাশের স্থান-কালের চাদরকে এভাবেই বাঁকিয়ে দেয়। ভর যত বেশি হবে, চাদর তত বেশি দেবে যাবে। আর এই বক্রতা বা ডেবে যাওয়ার কারণেই জ্যামিতি বদলে যায়। তখন ওই সমতল স্পেস-টাইমের সমীকরণ আর কাজ করে না। তখন স্পেস আর টাইমের অংশগুলোর সাথে কিছু গুণনীয়ক যুক্ত হয় যাকে আমরা বলি মেট্রিক টেনসর । এই টেনসরই নির্ধারণ করে চাদরটা কোথায় কতটা বাঁকা।”
করিম বকশি এবার কিছুটা বুঝতে পারছেন। তিনি বললেন, “তার মানে ভর থাকলে এই চাদরটা আর সোজা থাকে না। কিন্তু এর সাথে মহাকর্ষের কী সম্পর্ক?”
সেনকু ড্রয়ার থেকে একটা ছোট মার্বেল বের করে চাদরের এক প্রান্তে রাখল। এরপর সেটাকে আলতো করে সামনের দিকে ঠেলে দিল। মার্বেলটি সোজা পথে না গিয়ে, ওই পেপারওয়েটের কারণে তৈরি হওয়া ঢালু গর্তের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে পেপারওয়েটের দিকে গিয়ে আছড়ে পড়ল।
“বকোশি সান, মার্বেলটার দিকে খেয়াল করুন। পেপারওয়েটটি কি মার্বেলটাকে কোনো অদৃশ্য হাত দিয়ে টেনেছে? না! মার্বেলটি শুধু তার সামনে থাকা স্থান-কালের বাঁকা পথটি অনুসরণ করেছে। সে চেষ্টা করেছে সবচেয়ে সোজা পথ বা জিওডেসিক ধরে চলতে, কিন্তু চাদরটি বাঁকা থাকায় তার পথটি বৃত্তাকার হয়ে গর্তের দিকে নেমে গেছে। এই যে জ্যামিতিক বক্রতার কারণে মার্বেলের পথ বেঁকে যাওয়া এবং গর্তের দিকে পড়ে যাওয়া, এটাই হলো মহাকর্ষ! মহাকর্ষ কোনো টান নয়, এটি স্থান-কালের বক্রতা।”
করিম বকশির বুকটা এবার ধক করে উঠল। লিলি জামানের মুখটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। তিনি কাঁপা গলায় বললেন, “আমার ২১ বছর… আমার জীবনের ২১টা বছর কীভাবে হারিয়ে গেল সেনকু? এই চাদরের সাথে তার কী সম্পর্ক?”
সেনকুর চোখের দৃষ্টি এবার নরম হলো। সে পেপারওয়েটটার দিকে আঙুল নির্দেশ করে বলল, “ভর স্থান-কালকে বাঁকায়, আর স্থান-কাল বেঁকে যাওয়ার মানে হলো, সেখানে শুধু স্থানেরই বিকৃতি ঘটে না, সময়েরও বিকৃতি ঘটে। চাদরটি যত গভীরে দেবে যাবে, সেখানে সময়ের প্রবাহ তত ধীর হয়ে যাবে। এটাকে আমরা বলি গ্র্যাভিটেশনাল টাইম ডায়ালেশন।”
সেনকু কাগজটায় দ্রুত একটি সমীকরণ লিখল:

“এখানে dtoutside হলো বাইরের পৃথিবীর সময়, আর dtinside হলো সেই দেবে যাওয়া গর্তের ভেতরের সময়। আর রুটের ভেতরের অংশটি হলো বক্রতার পরিমাণ। মনে করুন আমাদের সেই স্পেস-টাইম ইন্টারভালের কথা, যেখানে ds সবার জন্য ধ্রুবক থাকে। তীব্র মহাকর্ষের গর্তে dt ছোট হয়ে আসে, আর বাইরের জগতে তখন বিশাল সময় কেটে যায়, কারণ মহাবিশ্বকে ওই ds এর ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। সাধারণ গ্রহ নক্ষত্রের বক্রতা খুব সামান্য, তাই সময়ের পার্থক্য আমরা টের পাই না। কিন্তু আপনি যে ভল্ট রুমে আটকে ছিলেন, তার ঠিক নিচে কোনো এক অজানা কারণে অবিশ্বাস্য ভরের একটি বস্তু বা মিনি ব্ল্যাক হোল তৈরি হয়েছিল। তার মহাকর্ষ এতই তীব্র ছিল যে, ভল্ট রুমের স্থান-কালের চাদরটা একটা অসীম গর্তের মতো তীব্রভাবে দেবে গিয়েছিল।”
করিম বকশি স্তব্ধ হয়ে শুনছেন।
সেনকু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আপনার ভল্ট রুমের নিচে থাকা ওই দানবীয় ভরের কারণে রুটের ভেতরের অংশটির মান প্রায় শূন্যের কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। ফলে বাইরের পৃথিবীর ২১ বছর, যা প্রায় এক লক্ষ চুরাশি হাজার ঘণ্টার সমান, তা ওই তীব্র মহাকর্ষের জ্যামিতিক গর্তে সংকুচিত হয়ে আপনার কাছে মাত্র ৫ ঘণ্টায় পরিণত হয়েছিল। আপনার কাছে যা ছিল ৫ ঘণ্টার অপেক্ষা, পৃথিবীর জ্যামিতিতে তা ছিল ২১ বছরের মহাজাগতিক দীর্ঘশ্বাস।”
৪.৩ জিওডেসিক
করিম বকশি চাদরের ওপর রাখা সেই পেপারওয়েট আর মার্বেলটির দিকে ইশারা করে বললেন, “সেনকু, তোমার কথা মেনে নিলাম যে মহাকর্ষ কোনো বল নয়। কিন্তু নিউটন তো নিখুঁতভাবে হিসেব করে দেখিয়েছিলেন যে গ্রহগুলো সূর্যের চারদিকে উপবৃত্তাকার পথে ঘোরে। যদি কোনো অদৃশ্য টান না-ই থাকে, তবে এই গ্রহগুলো কেন ওই নির্দিষ্ট কক্ষপথেই ঘোরে? তারা সোজা বেরিয়ে যায় না কেন?”
সেনকু আলতো করে হাসল। সে জানত এই প্রশ্নটি আসবেই। “খুব চমৎকার প্রশ্ন বকোশি সান। এর উত্তর লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের জ্যামিতিক অলসতার মধ্যে। প্রকৃতি সবসময় সবচেয়ে সহজ এবং সংক্ষিপ্ত পথ বেছে নিতে পছন্দ করে। একেই আমরা বলি জিওডেসিক।”

সে চাদরের ওপর আবার আঙুল বোলাল। “সমতল কাগজে দুটি বিন্দুর মধ্যে সংক্ষিপ্ততম পথ হলো একটি সরলরেখা। কিন্তু যখনই আপনি কাগজটাকে বাঁকিয়ে দেবেন, তখন ওই দুই বিন্দুর মধ্যে সরলরেখা আর সংক্ষিপ্ততম থাকে না। বক্র তলে যে পথটি সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত, তাকেই বলা হয় জিওডেসিক।”
সেনকু সামনের কাগজে একটি সমীকরণ লিখল:

করিম বকশি সমীকরণটার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকালেন। “এই δ চিহ্নটা কী? আর পুরো সমীকরণটা ঠিক কী বলছে?”
সেনকু কাগজে একটি বক্ররেখা আঁকল, তারপর তার পাশে আরও কয়েকটি আঁকাবাঁকা রেখা।
“বকোশি সান, এই সমীকরণটি আসলে প্রকৃতির এক চরম মিতব্যয়িতার প্রকাশ। একে বলা হয় প্রিন্সিপাল অফ লিস্ট অ্যাকশন। চলুন ভেঙে দেখি।
ধরুন, মহাকাশে A থেকে B বিন্দুতে যাওয়ার অনেকগুলো কাল্পনিক পথ আছে।” সেনকু কাগজে আঁকা রেখাগুলো দেখাল। “এই প্রতিটি পথের মোট স্পেস-টাইম ইন্টারভাল যদি হয় S, তবে:

খুব একটা গভীরে যেতে চাইলেও যাচ্ছি না। আপাতত আপনাকে বেসিক ইনসাইট দেয়ার চেষ্টা করা যাক। যেন বুঝতে পারেন, জেনারেল রিলেটিভিটি আসলে আপনাকে কী বলতে চায়। উপরে এখানে এই ∫ মানে হলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ds যোগ করে পুরো পথটির মোট দৈর্ঘ্য বের করা। এটা অনেকটা এভাবে ভাবুন, আপনি যদি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যান, তবে রাস্তার প্রতিটি ছোট ছোট অংশ যোগ করলে মোট দূরত্ব পাবেন। এখানেও ব্যাপারটা তাই, শুধু রাস্তাটা স্থান-কালের ভেতর দিয়ে।”
করিম বকশি মাথা নাড়লেন। “এটুকু বুঝলাম। কিন্তু δ চিহ্নটা?”
“এটাই আসল কথা।” সেনকু কলমটা ঠোঁটে ঠেকিয়ে একটু ভাবল। “ধরুন আপনি পাহাড়ের চূড়ায় একটি বল রেখেছেন। বলটি কি থাকবে? থাকবে না, গড়িয়ে পড়বে। কেন? কারণ চূড়াটি হলো সর্বোচ্চ অবস্থান, সেখানে বলের উচ্চতার পরিবর্তনের হার শূন্য, কিন্তু এটি অস্থিতিশীল। এবার ভাবুন উপত্যকার তলদেশে। সেখানেও পরিবর্তনের হার শূন্য, কিন্তু এখানে বলটি স্থিতিশীলভাবে বসে থাকে। ক্যালকুলাসে বলি, এটাই মিনিমা।
δ চিহ্নটি ঠিক সেই কাজটাই করে, শুধু পথের ক্ষেত্রে। δS=0 মানে হলো, আপনি যদি আসল পথ থেকে সামান্য ডানে বা বামে সরে যান, তাহলে পথের মোট দৈর্ঘ্যে কোনো পরিবর্তন আসে না। এই শর্তটি পূরণ করে একমাত্র সেই পথ, যেটা সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত, অর্থাৎ জিওডেসিক।”
সেনকু লিখল:

“প্রকৃতি এই শর্তটি এমনিতেই মেনে চলে। কোনো বস্তুকে বাধ্য করতে হয় না। সূর্যের চারপাশে বাঁকা স্থান-কালে পৃথিবীর জন্য সবচেয়ে ‘স্বাভাবিক’ পথটিই হলো সেই উপবৃত্তাকার কক্ষপথ। পৃথিবী সোজা যেতে চাইছে, কিন্তু ‘সোজা’ মানেই বদলে গেছে।”
করিম বকশি একটু থেমে বললেন, “তার মানে এই সমীকরণটাই দিয়েই কক্ষপথ বের করা যায়?”
“হ্যাঁ। তবে সেটার জন্য একটু গভীরে যেতে হবে।” সেনকু আবার লিখতে শুরু করল।
“আমরা জানি সমতল স্থানে স্পেস-টাইম ইন্টারভাল হলো:

কিন্তু বাঁকা চাদরে এটা হয়:

এখানে g_μν হলো সেই মেট্রিক টেনসর যার কথা আগে বলেছিলাম, যে চাদরের বক্রতা নির্ধারণ করে। এখন আমরা যদি এই ds-কে δ∫ds=0 শর্তে বসিয়ে সমাধান করি, যেটাকে অয়লার-ল্যাগ্রাঞ্জ পদ্ধতি বলে, তাহলে একটি বিখ্যাত সমীকরণ পাই:

এই Γ চিহ্নটিকে বলে ক্রিস্টোফেল সিম্বল। এটাই হলো মহাকর্ষের গাণিতিক শরীর। যদি মহাকর্ষ না থাকত, স্থান-কাল একেবারে সমতল হতো, তাহলে =0 হয়ে যেত এবং সমীকরণটা দাঁড়াত:

এটা হলো সরলরেখার সমীকরণ। কোনো বাঁকানো নেই, কোনো টান নেই। কিন্তু যেখানেই ভর আছে, সেখানেই শূন্য নয়, আর বস্তু ওই জটিল সমীকরণ মেনে এমন পথে চলে যেটা আমাদের চোখে বাঁকা, কিন্তু স্থান-কালের জ্যামিতিতে সে নিজের জন্য একদম সোজা।”
করিম বকশি বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
সেনকু কলমটা নামিয়ে রেখে বলল, “বকোশি সান, আপনি ওই ৫ ঘণ্টা কোনো বলের চাপে পার করেননি। আপনি শুধু স্থান-কালের এই জ্যামিতি মেনে নিজের অজান্তেই মহাবিশ্বের সবচেয়ে স্বাভাবিক পথটি পার করেছেন। আপনার জন্য যেটা ছিল δS=0-এর পথ, পুরোপুরি মসৃণ আর স্বাভাবিক, সেই একই পথ বাইরের পৃথিবীর জ্যামিতিতে ছিল ২১ বছর লম্বা।”
করিম বকশি বললেন, “আচ্ছা, আমাকে আজিজ বলছিলো, একটা নির্দিষ্ট লাইনের ভেতর যেন না আসি। কিন্তু যে-ই ও তার পায়ে ইশারা করছিলো লাইনটা, অমনি লাইনের কাছে ওর পা চলে যাওয়ায় ও স্প্যাগেটির মতো হয়ে গিয়েছিলো। এই লাইনের ব্যাপারটা ঠিক বুঝিনি।”
সেনকুর মুখভঙ্গি মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল। ঘরের আলোটা যেন একটু কমে এল। সে করিম বকশির খুব কাছে এসে বসে বললো, “এর জন্য আমাদের ব্ল্যাকহোলকে জানতে হবে। এতক্ষণ আমরা যা আলোচনা করেছি বকোশি সান, তা ছিল সাধারণ ভর নিয়ে। পৃথিবী বা সূর্যের মতো বস্তু স্থান-কালকে খুব সামান্যই বাঁকায়। একে আমরা বলতে পারি মৃদু ঢেউ। কিন্তু মহাবিশ্বে এমন কিছু দৈত্য আছে, যারা স্থান-কালকে শুধু বাঁকায় না, বরং একে ছিঁড়ে ফেলার উপক্রম করে। সেখানে জ্যামিতির সাধারণ নিয়মগুলো ভেঙে পড়ে। সময় সেখানে থমকে দাঁড়ায়, আর স্থান হয়ে যায় অসীম লম্বা।”
সেনকু থামল। করিম বকশি রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছেন।
সেনকু নিচু স্বরে বলল, “আমরা এখন সেই অন্ধকারের দিকে যাব যেখানে আলোও বন্দি হয়ে পড়ে। আমরা আলোচনা করব ব্ল্যাক হোল নিয়ে। আপনার ভল্ট রুমের নিচে লুকিয়ে থাকা সেই দানবটির আসল পরিচয় জানতে হলে আমাদের বুঝতে হবে সোয়ার্জশাইল্ড মেট্রিক আর ঘটনা দিগন্তের রহস্য। আপনি কি প্রস্তুত সেই অন্ধকারের অন্দরমহলে প্রবেশ করতে?”

করিম বকশি কোনো কথা বললেন না, শুধু বুঝতে পারলেন তার বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠছে।
(চলবে…)










মতামত জানান