নিউরোসায়েন্স বনাম রকেট সায়েন্সঃ কোনটির ব্যাপ্তি বেশি এবং বেশি জটিল?

Share
   

যখন লোকজন কোনকিছুকে কত কঠিন বোঝাতে উপমা ব্যাবহার করে তখন নিউরোসায়েন্স বা রকেটসায়েন্সের তকমা দেয়,কিন্তু কোনটি জয়ের দাবীদার?

১। প্রয়োগঃ

নিউরোসায়েন্সঃ নিউরোসায়েন্স হল মস্তিস্ক ও স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে বিজ্ঞান। এর অনেকগুলো উপভাগের মধ্যে কয়েকটা হচ্ছে স্মৃতি প্রক্রিয়াকরণ,মোটর নিয়ন্ত্রন,ভাষা,ও মস্তিস্ক সংক্রান্ত রোগ এবং স্নায়ু বিকলতা। সহজ কথায়,আমরা আমাদের জীবনে যা করি বা দেখি সব কিছুই মস্তিষ্কের মাধ্যমে হয়।

রকেটসায়েন্সঃ রকেট সায়েন্স হল রকেট তৈরি ও মহাকাশে এদের পাঠানো। অনেক কারনেই এদের প্রয়োজন হয় যেমন মহাকাশে টেলিস্কোপ প্রেরণ,স্যাটেলাইট পাঠানো যা টিভি,আবহাওয়া ও সামরিক কাজে লাগানো হয় এবং এর সবকিছুই করা হয় মানবজাতির উন্নতির জন্য।

Loading...

ফলাফলঃ  যদিও মহাকাশ কর্মসূচির ব্যাপকতা অনেক কিন্তু শেষমেশ লাগবে আপনার ওই মস্তিষ্ক ! সুতরাং নিউরোসায়েন্স ট্রফিটা পেয়ে গেল।
২। জটিলতাঃ
নিউরোসায়েন্সঃ যে লোকটা মস্তিষ্ক নিয়ে কাজ করে সে কাজ করছে মহাবিশ্বের সবচেয়ে জটিল একটুকরো বস্তু নিয়ে ! এবং রকেট সায়েন্সের সাথে এর তুলনাটাও যথেষ্ট নয়।

রকেট সায়েন্সঃ পৃথিবী থেকে মহাকাশ থেকে কিছু পাঠানো এমনিতেই অনেক চ্যালেঞ্জিং। আপনি মহাকাশে গিয়ে কিছু সহজেই মেরামত করতে পারবেন না। যার মানে রকেট পাঠানোর আগে সবকিছু আগে থেকেই প্রস্তুত করে রাখতে হবে যা ব্যাপারটাকে আরো কঠিন পর্যায়ে ঠেলে দেয়।
ফলাফলঃ মহাকাশে কিছু পাঠানো বড়ই ঝক্কিঝামেলার কাজ হলেও মস্তিষ্কের অভ্যন্তরের কাজকারবার আপনার কল্পনার চেয়েও কঠিন ! কাজেই জয়মাল্যটা নিউরোসায়েন্সের গলায় !

৩। বিপদঃ
নিউরোসায়েন্সঃ নিউরোসায়েন্স এর গবেষণা প্রয়োগ করা হয় প্রানী ও সেচ্ছাসেবক মানুষদের ওপর। তা করতে গেলে,সতর্ক গাইডলাইন মেনে চলতে হবে। এই ব্যাপারটা মস্তিষ্কের সার্জারির ক্ষেত্রে আরো বেশি প্রযোজ্য,যেখানে সামান্য অসাবধানতা ডেকে আনতে পারে মস্তিষ্কের চূড়ান্ত ও চিরকালের ক্ষতি। নতুন আবিষ্কৃত ঔষধের প্রয়োগও হতে পারে মস্তিস্কের ক্ষতির কারন।তবে তার জন্য রয়েছে আমাদের মাত্রার পর মাত্রার পরিক্ষা-নিরিক্ষা ও সতর্কতা ।

রকেট সায়েন্সঃ  রকেট মনুষ্য তৈরিকৃত শক্তিশালী বিস্ফোরকযুক্ত টিউব যা প্রতিকুল পরিবেশে পাঠানো হয়। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে এবং তা মারাত্মক আকার ধারন করতে পারে।

ফলাফলঃ  নিউরোসায়েন্সে একটা ভুল ডেকে আনতে পারে একজনের মৃত্যু,কিন্তু রকেটের মাধ্যমে মারা যেতে পারে একসাথে অনেক মানুষ। জয়মাল্য প্রাপ্য নিউরোসায়েন্সের।
৪।সহজলভ্যতাঃ
নিউরোসায়েন্সঃ  নিউরোসায়েন্স মস্তিষ্কের সাথে সংশ্লিষ্ট কাজেই আপনার যদি একটা মস্তিষ্ক আর দেহ থাকে,তাই নিউরোসায়েন্সের গবেষণার জন্য যথেষ্ট!
রকেটসায়েন্সঃ যদিও  এখনকার দিনে বাসাবাড়িতে রকেট সহজলভ্য(এবং চাইলে আপনিও বানাতে পারবেন) ও মহাকাশে ভ্রমন কিছুটা নাগালে আসছে তবুও আপনার লাগবে গাদাগাদা টাকা আর যন্ত্রসমাহার যদি “সত্যিকার  রকেটসায়েন্স” নিয়ে কাজ করতে চান !
ফলাফলঃ  যদি একটা বস্তু সারাদিন মাথায় নিয়ে ঘোরেন তার চেয়ে বেশি সহজলভ্য কিছু হয় না ! জয়তু নিউরোসায়েন্স

Loading...

৫। ছবি
নিউরোসায়েন্সঃ আধুনিক নিউরোসায়েন্সে MRI স্ক্যানার ব্যাবহার করা হয় এবং তার মাধ্যমে রঙ্গিন ও চমকপ্রদ সব ছবি পাওয়া যায়। এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মন ও চেতনার কেন্দ্রবিন্দু হল আমাদের মস্তিষ্কই। যদিও মস্তিষ্ক দেখতে আহামরি কিছু না,অনেকটা ওয়ালনাটের সঙ্গে তুলনা চলে।
রকেট সায়েন্সঃ রকেট সায়েন্স আমাদের দিয়েছে মহাকাশ থেকে পৃথিবী,দূরবর্তী তারা ও গ্যালাক্সী ও অন্যান্য গ্রহের পৃষ্ঠের ছবি।

ফলাফলঃ পুরো মহাবিশ্বের ছবি একদিকে আর অন্যদিকে বিশাল ওয়ালনাটের ছবি। কোন তুলনা হয়না আসলে।
৬। জনপ্রিয় সংস্কৃতিঃ

নিউরোসায়েন্সঃ এটা এখন ধীরে ধীরে জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। তবে দুঃখজনকভাবে,এটি হয় খুব সন্দেহজনক উপায়ে যেমন নিউরোমার্কেটিং,কৌশলী সত্য বা চলচ্চিত্র যেমন “Phenomenon”
রকেট সায়েন্সঃ এটি বাস্তবে চর্চা শুরু হওয়ার আগে জনপ্রিয় সংস্কৃতি ছিল না,বরং জনপ্রিয় সংস্কৃতি ও কাল্পনিক গল্পই প্ররোচিত করেছে একে।
ফলাফলঃ  কখনো কি “Phenomenon” সিনেমাটা দেখেছেন? রকেটের গতি এবার বেশী!
৭। প্রচারকঃ

নিউরোসায়েন্সঃ নিউরোসায়েন্সে যদিও অনেক উচু মাপের ব্যক্তিত্ব রয়েছেন,তবে মাথা চুল্কে তাদের নাম মনে করা মুশকিল !

রকেটসায়েন্সঃ গডারড ,কমান্ডার হ্যাডফিল্ড,হেলেন কিনের মতো বাঘা বাঘা সব ব্যাক্তিত্বরা নেতৃত্ব দিয়েছেন এই ক্ষেত্রে। কে যেন বলেছিলেন “এটা একজন মানুষের জন্য একটি ছোট পদক্ষেপ,কিন্তু মানবজাতির জন্য বিশাল এক পদক্ষেপ”? সেটা কি কোন নিউরোসায়েন্টিস্ট  ছিল?  সহজ উত্তর হচ্ছে,”না” ।
ফলাফলঃ  রকেটসায়েন্স বিজয়ী
৮। ছদ্মবিজ্ঞানঃ

নিউরোসায়েন্সঃ মস্তিষ্কের কাজ ও পিছনের বিজ্ঞান আমাদের দেখায় সব ছদ্মবিজ্ঞানের পথ। এমনকি আপনি বিবেচনা করে দেখুন যে সব ছদ্মবিজ্ঞান আসলে মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত এবং সাধারনভাবে দেখলে মস্তিষ্কই এর পেছনে দায়ী !
সাইকিক থেকে টেলিকাইনেসিস অনেক ধরনের রঙ চকচকে ছদ্মবিজ্ঞান গড়া হয়েছে এই পর্যন্ত।
রকেটসায়েন্সঃ  চাঁদে ভ্রমনে অবিশ্বাসীদের সংখ্যা নেহায়েত কম নয় !যদিও এটা নিছক “ষড়যন্ত্র তত্ত্ব” এর সাথে সম্পৃক্ত।
ফলাফলঃ  রকেটসায়েন্স বিজয়ী
চূড়ান্ত ফলাফলঃ ড্র !

Loading...

আহম্মদ উল্লাহ ফয়সাল

আমি ফয়সাল, পড়ছি ঔষধবিজ্ঞান নিয়ে । বিজ্ঞানের প্রতি আন্তরিক টান রয়েছে। বিজ্ঞান নিয়ে যা জানি তা অন্যদেরও জানাতে ইচ্ছে হয়। বিশ্বাস করি বিজ্ঞানের চাবি দিয়ে আমরা মানবজাতিরা খুলতে পারবো মহাবিশ্বের সব রহস্যের দরজা।

You may also like...

২ Responses

  1. লেখাটা মজার লাগলো। তবে বিজ্ঞানের দুটো আলাদা বিভাগের মধ্যে এতো সহজে তফাত টানা যায় কি?

  2. আহম্মদ উল্লাহ ফয়সাল says:

    তফাত টা আসলে আমি টানিনি। বিশ্বনন্দিত ব্রিটিশ দৈনিক “The Telegraph” এ ডিন বারনেট এর লেখার একটা ভাবানুবাদ করেছি। তিনি দেখি দুটোকে ড্র করে দিয়েছেন। আমিও সেটাকে ড্র হিসেবেই রাখলাম !

আপনার মতামত

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: