করোনাভাইরাস ভ্যাক্সিনঃ খরগোশ আর কচ্ছপের গল্পের পরিণতি কাম্য নয়

পাঠসংখ্যা: 👁️ 348

এই লেখাটি যখন লিখছি তখন করোনার ভ্যাক্সিন আবিস্কার অনেক এগিয়ে গেছে। ইউকে তাদের নাগরিক দের ভ্যাক্সিন দেয়া শুরু করতে নীতিগত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। সারাবিশ্বের দিন রাত পরিশ্রম করে যাওয়া বিজ্ঞানীদের এই কর্মযজ্ঞ এককথায় অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে। পাশাপাশি ভ্যাক্সিন আবিস্কারের জন্য স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় যে সময় প্রয়োজন তার থেকেও অনেক কম সময়ে ভ্যাক্সিনের ছাড়পত্র পাবার বিষয়টি নানা কারনে শংকা ও সমালোচনার জন্ম দিচ্ছে। করোনাভাইরাস সারাবিশ্বের আনাচে কানাচে পৌঁছে যাবার কারনে ভ্যাক্সিন এর চাহিদাও সর্বোচ্চ সীমায়। জনবহুল দেশ হওয়াতে বাংলাদেশের নাগরিক দের জন্য ভ্যাক্সিন পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে চলছে তোড়জোড়।

এ পর্যন্ত বিশ্বের যারা করোনার জন্য মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের মধ্যে বয়স্ক জনগোষ্ঠি একটি বিশাল অংশ, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে যেখানে মানুষের গড় আয়ু অনেক বেশী। পাশাপাশি মৃতদের আশি শতাংশের বেশী এক বা একাধিক অন্যান্য জটিল দূরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত ছিলেন, যেমন ডায়বেটিস, হার্টের সমস্যা, ব্লাড প্রেশার, কিডনির সমস্যা, ক্যান্সার ইত্যাদি। তাই বার্ধক্য এবং অন্যান্য ব্যধি করোনাভাইরাসে মৃত্যুর পিছনে বড় নিয়ামক হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আর ঠিক এই কারনেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং অন্যন্য দের সুপারিশ মতে সামনের সারির যোদ্ধা, বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা এবং অন্যান্য ব্যধি আছে এমন ঝুকিপূর্ণ ব্যক্তিদের টিকা প্রদান তালিকার সামনের দিকে রাখতে বলা হয়েছে। ভাইরাসে এবং টিকার উপাদান গুলোর ভিতর কি ধরনের মিল বা অমিল আছে সেটা জানলে আমরা টিকার সম্ভাব্য ঝুঁকিও বুঝতে পারবো। ভাইরাস যেমন সুস্থ, কম বয়সীদের বেশী কাবু করছেনা, তেমনি টিকাও তাদের জন্য সহনীয় হবার সম্ভাবনাই বেশী। কিন্তু বয়স্ক এবং অসুস্থ দের ক্ষেত্রে টিকার আলাদা ঝুঁকি টা কেমন হতে পারে এবং সে ব্যাপারে আসলে আমরা কতটা তথ্য উপাত্ত নিতে পেরেছি সেটিই এই লেখার মূল বিষয়।

আমরা ইতিমধ্যে অনেকেই জানি করোনাভাইরাসের উপরিভাগে যেই কাঁটার মত প্রোটিন থাকে সেটি আমাদের শরীরে কোষে এসিই-২ (ACE2) নামক রিসেপটর এর সাথে সংযুক্ত হয়। এর ফলে ঐ রিসেপ্টর কে নিয়ে সে ভিতরে ঢুকে যায়। ভিতরে যাবার পর ভাইরাস বংশ বিস্তার করে নতুন ভাইরাস তৈরী করে। কিন্তু ভিতরে ঢোকার সময় এই এসিই-২ নিয়ে যাবার কারনে শরীরে এসিই-২ এর ঘাটতি তৈরী হতে থাকে। অল্প বয়সীদের ক্ষেত্রে ধারণা করা হচ্ছে এই ঘাটতি শরীর পূরণ করতে সক্ষম। কিন্তু বয়স্ক, পুরুষ এবং অসুস্থ দের ভিতর আগে থেকেই কোষের উপরে এই রিসেপ্টর তুলনামূলক কম থাকে। ফলে ভাইরাস আক্রমণ করলে তা আরো কমে যেতে থাকে। এই রিসেপ্টর এক প্রকার এনজাইম যা এঞ্জিওটেনসিন ২ কে ভাংতে সাহায্য করে। ভাইরাসের জন্য আমাদের এসিই-২ এর পরিমাণ কমতে থাকায় এঞ্জিওটেনসিন ২ বেশী মাত্রায় বেড়ে যায় এবং শরীরে ভয়াবহ উপসর্গের দিকে নিয়ে যায় (চিত্র-১)।

প্রশ্ন হলো ভাইরাসের সাথে ভ্যাক্সিনের কোথায় মিল? এটা বুঝতে হলে অল্প কথায় ভ্যাক্সিন এর উপাদান কি সেটা দেখতে হবে। যে উপায়েই ভ্যাক্সিন তৈরী হোক, সর্বশেষ উপাদান হিসাবে শরীরে যেদি উপস্থিত থাকে সেটি হলো ভাইরাসের উপরিভাগের কাঁটার প্রোটিন। ভ্যাক্সিনে সত্যিকারের ভাইরাসের বংশ বিস্তার করার কোন উপাদান উপস্থিত থাকেনা। তবে কাঁটার প্রোটিন টা কয়েকটা ভাবে থাকতে পারে। শুধু কাঁটা গুলো থাকতে পারে, অথবা ডিএনএ বা আর এন এ ভ্যাক্সিনে আমাদের শরীর ঐ কাঁটা গুলো তৈরী করে দেয়। আরেকটি উপায় হচ্ছে অন্য ভাইরাসের খোলসে করোনার কাঁটা বসিয়ে দেয়া। অথবা আস্ত করোনাভাইরাস কে নিস্ক্রিয় করে ফেলা অথবা বংশবিস্তারের দূর্বল করে ফেলা। উপরের যে উপায়েই হোক কাঁটার প্রোটিন ই মূলত আমাদের ইমিউন সিস্টেম কে বুঝাতে সক্ষম হয় যে করোনার কাঁটা বা বহিরাগত কিছু এসেছে। তখন আমাদের শরীর এর জন্য প্রতিরক্ষা বাহিনী তৈরী করে ফেলে যাকে আমরা এন্টিবডি বলি। পরে যখন শরীরে সত্যি ভাইরাস প্রবেশ করে তখন আগে থেকে তৈরী হওয়া এন্টিবডি ভাইরাসের কাঁটা কে চিনে ফেলে এবং অন্যান্য ব্যবস্থার সাহায্যে নিস্ক্রিয় করে ফেলে। তারমানে ভ্যাক্সিন এর মূল উপাদান আসলে ভাইরাসের কাঁটা এবং সাধারণভাবে ভ্যাক্সিন এ ভাইরাসের বংশবিস্তার সহায়ক আর এন এ না থাকায় ভাইরাসের বংশবিস্তার জনিত ক্ষতি নেই বললেই চলে।

তাহলে ভ্যাক্সিন কিভাবে বয়স্ক  বা অসুস্থ দের সম্ভাব্য ঝুঁকির কারন হতে পারে? গবেষণা তথ্য বলছে সার্স করোনাভাইরাস অথবা এবারের নতুন করোনাভাইরাস সার্স-কভ-২ এদের শুধু কাঁটা অথবা কাঁটা যদি অন্য কোন ভাইরাসের উপরে বসানো হয় তাহলে আসল ভাইরাসের মতই আমাদের কোষে যুক্ত হতে পারে এবং ভিতরে চলে যেতে পারে। এর অর্থ হচ্ছে, মূল ভাইরাসের আর এন এ না থাকলেও শুধু কাঁটা এসিই-২ এ যুক্ত হতে পারে এবং এসিই-২ কমিয়ে দিতে পারে। আর এসিই-২ কমে যাওয়া মানেই এঞ্জিওটেনসিন-২ বেড়ে ভয়াবহ শারীরিক ঝুঁকি তৈরী হওয়া (চিত্র-১)।

চিত্র ১- সার্স-কভ-২ এবং ভ্যাক্সিন এর মাধ্যমে বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের শরীরে গুরুতর উপসর্গ তৈরী হবার তুলনামূলক ছবি।

এ পর্যন্ত মানবদেহে যতগুলো ভ্যাক্সিনের পরীক্ষা হয়েছে স্বাভাবিক ভাবে সেখানে সুস্থ মানুষের সংখ্যা বেশী ছিল এবং অধিক বয়স্ক ও অসুস্থ দের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বা যেটুকু করা হয়েছে সেটা অত্যন্ত কম সারা পৃথিবীর বয়স্ক ও অসুস্থ দের অনুপাতে। এর অর্থ হচ্ছে করোনাভাইরাসে সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা অংশের মানুষের উপর ভ্যাক্সিনের প্রভাব এখনো বিস্তারিত ও পর্যাপ্ত ভাবে জানার কোন সুযোগ পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি যাদের উপর পরীক্ষা করা হয়েছে তাদের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া গুলো যেমন জ্বর, ব্যথা, খারাপ লাগা এগুলো দেখা হয়েছে, শরীরে এন্টিবডি তৈরী হচ্ছে কিনা সেটা দেখা হচ্ছে। কিন্ত তাদের এঞ্জিওটেনসিন ২ কতটা বাড়ছে সেটা দেখা হচ্ছেনা। অন্তুত প্রকাশিত প্রবন্ধ গুলোয় তেমন কোন তথ্য আসেনি। তাই স্বাভাবিক ভাবে সারাবিশ্বে বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের যদি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভ্যাক্সিন দেয়া হয়, তাদের নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ব্যাপারে বিশ্লেষণ সত্যিকার অর্থে পর্যাপ্ত নয় এবং কিছুটা অবহেলিত। খুব স্বাভাবিক ভাবেই তাই শংকা জাগে খরগোশের গতিতে ভ্যাক্সিন মানবকল্যাণে প্রয়োগ করতে যেয়ে আমরা করোনার সবচে ক্ষতির স্বীকার অংশকে আবার না ঝুঁকিতে ফেলে দিই। বিজ্ঞান ভাগ্য কে তেমন পাত্তা না দিলেও ভাগ্যজোরে যদি আমরা তেমন প্রতিক্রিয়া থেকে বেঁচে যাই তো ভালো কথা। নাহলে দূর্ভাগ্যজনক ভাবে হয়তো ঐ প্রবাদ টিই সত্যি হয়ে যেতে পারে, “ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না”।

[কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ এই লেখার পিছনে চিন্তা, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এবং তথ্য উপাত্ত দিয়ে সমান ভাবে কাজ করে যাবার জন্য মাহমুদুর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক, মেডিকেল বায়োটেকনোলজি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস এবং মারুফ হাসান, সহযোগী অধ্যাপক, বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং, মিলিটারি ইন্সটিটিউট অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলোজি এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।]

তথ্যসূত্রঃ আরো বিস্তারিত জানার জন্য এই রেফারেন্স গুলো সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

  1. Callaway E. The race for coronavirus vaccines. Nature. 2020;580:576-7.
  2. Wallentin L, Lindback J, Eriksson N, Hijazi Z, Eikelboom JW, Ezekowitz MD, et al. Angiotensin-converting enzyme 2 (ACE2) levels in relation to risk factors for COVID-19 in two large cohorts of patients with atrial fibrillation. European heart journal. 2020.
  3. Rahman MM, Hasan M, Ahmed A. Potential detrimental role of soluble ACE2 in severe COVID-19 comorbid patients. Reviews in Medical Virology. 2021; https://doi.org/10.1002/rmv.2213
  4. Luo L, Fu M, Li Y, Hu S, Luo J, Chen Z, et al. The potential association between common comorbidities and severity and mortality of coronavirus disease 2019: A pooled analysis. Clinical cardiology. 2020.
  5. Ou X, Liu Y, Lei X, Li P, Mi D, Ren L, et al. Characterization of spike glycoprotein of SARS-CoV-2 on virus entry and its immune cross-reactivity with SARS-CoV. Nat Commun. 2020;11(1):1620.
  6. Ramasamy MN, Minassian AM, Ewer KJ, Flaxman AL, Folegatti PM, Owens DR, et al. Safety and immunogenicity of ChAdOx1 nCoV-19 vaccine administered in a prime-boost regimen in young and old adults (COV002): a single-blind, randomised, controlled, phase 2/3 trial. Lancet. 2020.

আসিফ আহমেদ
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিনের সহযোগী অধ্যাপক। বিজ্ঞানচর্চায় আত্মনির্ভরশীল এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন, যেখানে দেশীয় গবেষণা মানুষের সবথেকে জরুরি চাহিদাগুলো মেটাতে সমর্থ হবে। এছাড়া বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান গবেষণাধর্মী লেখা সহজবোধ্য ভাবে ছড়িয়ে দেবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।