এইচআইভি ভাইরাস উদ্ভবের আশ্চর্য ইতিহাস

University of Minnesota Duluth এর ওয়েবসাইট থেকে নেয়া।
পাঠসংখ্যা: 👁️ 1,104

২০২০ বসন্ত-কোয়ার্টারে UCR-এ TA করার সময় শিক্ষার্থীদের বিবর্তন কোর্সে Sharp and Hahn (2011) পেপারটা ডিসকাশন সেকশনে আলোচনা করেছিলাম। তখনো নভেল করোনা ভাইরাস নতুন ছিলো। কিন্তু নভেল করোনা ভাইরাস যেভাবে অতিমারী (pandemic) তৈরি করে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে, সেটা নতুন ছিলো না। প্রায় একশ বছর আগেই এইচআইভি ভাইরাস প্রায় একই প্রক্রিয়ায় সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে গেছে। এই লেখাতে আমরা এইচআইভি ভাইরাস উদ্ভবের ইতিহাসটা জানবো।

বানর থেকে এইচআইভি মহামারীর উদ্ভব

১৯৮১ সালের কথা। বেশ কয়েকজন সমকামী যুবক একটি রহস্যজনক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ঘটনাটা বেশ অবাক করা। কারণ তারা মারা গিয়েছিলেন কিছু ব্যাক্টেরিয়ার সুবিধাবাদী সংক্রমণে। এধরণের সংক্রমণ বেশ দূর্লভ, এসব ব্যাক্টেরিয়া সাধারণত ক্ষতিকর নয়। পরবর্তীতে বোঝা গেলো, একটা ভাইরাসের আক্রমণে আক্রান্ত যুবকদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (অনাক্রম্য ব্যবস্থা বা ইমিউনো সিস্টেম) এতই দূর্বল হয়ে গেছে যে সাধারণত ক্ষতিকর নয় এমন ব্যক্টেরিয়াও রোগ তৈরি করার সুযোগ পেয়েছে। এই রোগটিকে বলা হলো এইডস (অ্যাকুয়ার্ড ইমিউনো ডেফিসিয়েন্সি সিন্ড্রোম) আর যে ভাইরাসের কারণে এই রোগটি হয় তার নাম দেয়া হলো এইচআইভি (হিউম্যান ইমিউনো-ডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস)। 

কয়েক বছর পরে,আফ্রিকাতে ১৯৮৬ সালে, দেখতে শুনতে একই রকম কিন্তু ভিন্ন ধরণের এন্টিজেন বহনকারী এইচআইভি ভাইরাস আক্রান্ত কয়েকজন রোগীর দেখা পাওয়া গেলো । পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেলো, এই এইচআইভি ভাইরাসগুলো এসআইভি (সিমিয়ান ইমিউনো ডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস) এর বংশগতির দিক দিয়ে অনেক জেনেটিক মিল পাওয়া যাচ্ছে। এসআইভি ভাইরাস চিড়িয়াখানায় ম্যাকাক বানরে একই ধরণের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দূর্বল করে দেয়া ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি রোগ করে বলে জানা ছিলো।

এইচআইভি ভাইরাসের ফাইলোজেনেটিক ট্রি
HIV (লাল রঙ) ভাইরাসের সাথে SIV ভাইরাসের জেনেটিক মিল লক্ষ্যনীয়। এইচআইভি-১ শিম্পাঞ্জী থেকে আসা এসআইভি-র সাথে সবচাইতে বেশি মিল। অন্যদিকে এইচআইভি-২ ম্যাকাক ও সুটি-ম্যাঙ্গাবে বানরের থেকে আসা এসআইভি ভাইরাসের সাথে বেশি মিল। ছবি মূল গবেষণাপত্র থেকে নেয়া।

পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা আফ্রিকার অন্যান্য প্রাইমেটদের মাঝে এসআইভি ভাইরাস খোঁজা শুরু করেন। দেখা গেলো, আফ্রিকার বিভিন্ন প্রাইমেট প্রজাতিতে এসআইভি ভাইরাস প্রাকৃতিক ভাবেই থাকে। তারা কোন রোগ তৈরি করে না। বংশগতির জাতিজনিক (ফাইলোজেনেটিক) গবেষণায় এইচআইভি ভাইরাস ও এসআইভির সাথে অত্যন্ত মিল দেখা গেলো। যদিও এইচআইভি মানুষের ক্ষেত্রে রোগ তৈরি করছে। সচরাচর ভাইরাস তার পোষক প্রজাতি পরিবর্তন করে না। বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্ত টানলেন যে কিছু এসআইভি ভাইরাস প্রাইমেট ও মানুষের মাঝে প্রজাতির-বাধা অতিক্রম করেছে। এই প্রজাতি-বাধা অতিক্রম বেশ কয়েকবার ঘটেছে আলাদা আলাদা ভাবে। আসলে এইচআইভি কিন্তু একটি ভাইরাস নয়। এইচআইভির দুইটি বড় দল রয়েছে, এইচআইভি-১ ও এইচআইভি-২। এইচআইভি-১ ভাইরাসরা হলো শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে পাওয়া এসআইভি-র সাথে বেশি সম্পর্কিত। অন্যদিকে এইচআইভি-২ ভাইরাস শুটি ম্যাঙাবে নামক এক ধরনের বানরের মধ্যে পাওয়া এসআইভি-র সাথে বেশি সম্পর্কিত।

একটা খটকা কি আপনার মাথায় এসেছে? এর আগে বলেছি এসআইভি মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাইমেটদের মধ্যে কোন রোগ তৈরি করে না। কিন্তু শুরুতেই বলেছি যে চিড়িয়াখানায় ম্যাকাক বানরের মধ্যে এসআইভি ভাইরাস দিয়ে রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা দূর্বল করে দেয়া রোগ সৃষ্টি করতে দেখা গেছে। এই দুইটা বক্তব্য পরস্পর সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে। আসলে, ম্যাকাক হলো এশিয়ার প্রাইমেট প্রজাতি। এসআইভি ভাইরাস কেবলমাত্র আফ্রিকার প্রাইমেটদের (বানর ও নরবানর) মধ্যেই পাওয়া যায়। সুতরাং ম্যাকাকের মধ্যে যে এসআইভি পাওয়া গেছে, তাদের প্রাকৃতিক পোষক ম্যাকাক নয়।

প্রাইমেট লেন্টিভাইরাসগণ

প্রাইমেটদের মাঝে এইচআইভি বা এসআইভি একটা বড় ভাইরাস পরিবার থেকে এসেছে যাকে বলা হয় লেন্টিভাইরাস। লেন্টিভাইরাসরা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মাঝে দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ করতে পারে। এসব সংক্রমণের একটা অংশ আবার পোষকের মাঝে অন্তঃস্থ হয়ে স্বাভাবিক দশায় পরিণত হতে পারে। তার মানে হলো এ ভাইরাসরা নিজেদের ডিএনএকে পোষকের জননকোষের জিনোমে সংযুক্ত করে দিতে পারে। ফলে তারা মাতা থেকে সন্তানের মাঝে সহজেই ছড়িয়ে যায়। বিভিন্ন প্রাণীর জিনোমে ভাইরাসের ডিএনএ অনুক্রম পাওয়া যায় যাদেরকে অনেক সময় দুর্বল বলা হয় । 

এখন পর্যন্ত এসআইভি ভাইরাস শুধু আফ্রিকার প্রাইমেটদের মধ্যেই পাওয়া গেছে। তার মানে, ইতিহাসের যে মুহূর্তে  আফ্রিকা ও এশিয়ার পুরাতন পৃথিবীর বানরদের বংশ আলাদা হয়ে যায়, তার পরে এসআইভি ভাইরাসের আবির্ভাব। সেটাও প্রায় ৬০-১০০ লক্ষ বছর আগের কথা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব প্রাইমেট প্রজাতির মাঝে কেবলমাত্র এক ধরনের এসআইভি ভাইরাস প্রকারণ (স্ট্রেইন) দেখতে পাওয়া যায়। তবে, মাঝে মাঝে এসকল বানর-নরবানরদের মধ্যেও এসআইভি ভাইরাসের প্রজাতির বাঁধ অতিক্রম করার ঘটনা ঘটে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ সকল প্রজাতি-বাঁধ অতিক্রম মূলত ভাইরাসের জন্য অন্ধগলিতে গিয়ে পৌঁছানোর মতো। কারণ তারা প্রজাতি-বাঁধ অতিক্রম করলেও নতুন প্রজাতির বংশধরদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে না। তবে কখনো কখনো এসকল নতুন ভাইরাস ঐ প্রজাতির বংশধরদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। 

এসআইভি ভাইরাস ও তাদের প্রাকৃতিক পোষক-প্রাইমেটসমূহ। লাল তীর দিয়ে কিভাবে এসআইভি প্রজাতী বাঁধ অতিক্রম করে সেটা দেখানো হয়েছে। মজার ব্যপার হলো শিম্পাঞ্জী নিজেই দুইটি ভিন্ন বানরের কাছ থেকে এসআইভি পেয়েছে, যা পরবর্তীতে মানুষ ও গরিলা প্রজাতীতে সংক্রমিত হয়েছে। ছবিটি মূল গবেষণাপত্র থেকে নেয়া হয়েছে।

এছাড়াও, আমরা মোজাইক ভাইরাস প্রকরণও দেখতে পাই। যখন একই পোষকে দুইটি ভাইরাসের প্রকরণ দিয়ে সংক্রমিত হয়, তখন নতুন ধরনের ভাইরাস তৈরি হতে পারে  এই দুইটি ভাইরাসের জিনোমের একাংশ রিকম্বিনেশন প্রক্রিয়ায় জোড়া লেগে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মোজাইক জিনোম তৈরি হয়।

শিম্পাঞ্জি এসআইভি-র উদ্ভব

জাতিজনিক বৃক্ষের বংশগতির মিল-অমিল পর্যালোচনা থেকে দেখা যায় যে শিম্পাঞ্জিদের মাঝে থাকা এসআইভি ভাইরাস এইচআইভি-১ ভাইরাসের অত্যন্ত নিকটাত্মীয়। শিম্পাঞ্জির কিন্তু দুইটি প্রজাতি রয়েছে: সাধারণ শিম্পাঞ্জি ও বনোবো। আমরা যদি সাধারণ শিম্পাঞ্জিদের মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখা যাবে যে এদর চারটি ভিন্ন ভিন্ন উপপ্রজাতি রয়েছে। এই উপপ্রজাতিগুলো আবার ভিন্ন আফ্রিকার ভিন্ন ভৌগলিক অঞ্চলে আলাদাভাবে বিচরণ করে। এই চারটি উপপ্রজাতি হলো পাশ্চাত্য, নাইজেরিয়া-ক্যামেরুন, মধ্য-আফ্রিকা, ও পূর্ব আফ্রিকা। বিজ্ঞানীরা এসব অঞ্চলের শিম্পাঞ্জিদের মল-নমুনা থেকে নিউক্লিওটাইড অনুক্রম বের করে এসআইভি ভাইরাস চিহ্নিত করেছেন। সিমিয়ান ইমিউনো ভাইরাস মূলত আরএনএ ভাইরাস। তাই এই গবেষণায় তারা রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ পিসিআর নামক একটি প্রক্রিয়া ব্যবহার করেন। দেখা গেলো, চারটির মধ্যে মাত্র দুইটি উপপ্রজাতির মাঝে এসআইভি ভাইরাস দেখা যায়। এরা হলো মধ্য-আফ্রিকা ও পূর্ব-আফ্রিকা।

আফ্রিকাতে শিম্পাঞ্জি (উপরে) ও গরিলা (নিচে) বিভিন্ন উপপ্রজাতির বিস্তার। গোল দিয়ে নমুনা সংগ্রহের স্থান বোঝানো হচ্ছে। হলুদ রঙের গোল দিয়ে দেখানো হচ্ছে কোথায় কোথায় এসআইভি ভাইরাসের নমুনা পাওয়া গেছে। ছবিসূত্র মূল গবেষণাপত্র।

এর মানে কী? সাধারণ শিম্পাঞ্জির চারটির মধ্যে দুইটি উপপ্রজাতির মধ্যে যদি এসআইভি ভাইরাস পাওয়া নির্দেশ করে যে শিম্পাঞ্জি পোষকদের মধ্যে এসআইভি ভাইরাসের সংক্রমণ বেশ সাম্প্রতিক ঘটনা। আরো মজার বিষয় হলো, এই দুই উপপ্রজাতীতে পাওয়া এসআইভি মূলত মোজাইক! অর্থাৎ এরা আসলে দুইটি ভিন্ন এসআইভি ভাইরাসের বংশধারা থেকে এসেছে। আরো গবেষণা থেকে দেখা গেলো যে এই মোজাইক ভাইরাস জিনোমের ৫’-LTR, nif, ও ৩’-LTR অংশ এসেছে লাল-মাথা মাঙ্গাবে (রেড ক্যাপড ম্যাঙ্গাবে) থেকে। জিনোমের অন্যান্য অংশ (vpu, tat, rve, int) এসেছে মোনা-বানর থেকে। কিন্তু, দুইটি ভিন্ন এসআইভি কিভাবে শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে আসলো? আসলে শিম্পাঞ্জিরা প্রায়ই অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শিকার করে। তাদের শিকারের মধ্যে ছোট বানরও থাকে যাদের শিম্পাঞ্জি খেয়ে ফেলে। তাই ধারণা করা হয় এই দুই শিম্পাঞ্জি প্রজাতিতে মূলত শিকার প্রক্রিয়ায় এসআইভির মোজাইক ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হয় (গরিলাও একই এলাকার শিম্পাঞ্জিদের কাছ থেকে এসআইভি পেয়েছে)।

এসআইভি কিভাবে প্রজাতি-বাঁধ পার হয়ে এইচআইভিতে পরিণত হয়

আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে বুশমিট শিকার নামক এক ধরণের চর্চা রয়েছে। বুশমিট শিকারে মানুষজন অদ্ভুত সব প্রাণী শিকার করে বেড়ায়। এর মধ্যে রয়েছে শিম্পাঞ্জি ও অন্যান্য প্রাইমেট। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, গত শতাব্দীর শুরুর দিকে এসআইভি শিম্পাঞ্জি থেকে মানুষে প্রজাতি বাঁধা অতিক্রম করে। সম্ভবত বুশমিট শিকারে রক্ত বা ত্বকের উন্মুক্ত মিউকোসা কলার সংস্পর্শে এসআইভি মানুষে ছড়িয়ে পড়ে ও এইচআইভি-১ হিসেবে বিবর্তিত হয়। অন্যদিকে এইচআইভি-২ এর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিলো। কিন্তু এক্ষেত্রে সুটি-মাঙ্গাবে নামক বানর থেকে এই ঘটনা ঘটে। আফ্রিকাতে সুটি-মাঙ্গাবে  কৃষকদের ফসল নষ্ট করে বলে এদেরকে অনেকটা ক্ষেতের ইঁদুরের মতো প্রতিরোধ করা হয়।

১৯১০ থেকে ১৯৩০ সালের দিকে, মধ্য-আফ্রিকা ছিলো ইউরোপের উপনিবেশ। তখন সেখানে নগরায়ন হওয়া শুরু করেছিলো। এইচআইভি-১ এর একেবারে শুরুর দিকের মহামারি বংশগতির জাতিজনিক বৃক্ষ ও রোগতত্ত্ব গবেষণার মাধ্যমে মধ্য-আফ্রিকার লিওপডভাইল শহরে চিহ্নিত করা হয়েছে। লিওপডভাইল বর্তমানে কঙ্গোর কিনশাসা শহর যা আগে বেলজিয়াম এর উপনিবেশ ছিলো। এই হলো সেই শহর যেখানে এইচআইভি-১ ভাইরাস বিশ্বে মহামারি শুরু করার আগে প্রথম বিবর্তিত হওয়া শুরু করে।


তথ্যসূত্র: Sharp, Paul M., and Beatrice H. Hahn. “Origins of HIV and the AIDS pandemic.” Cold Spring Harbor perspectives in medicine 1.1 (2011): a006841.

বিজ্ঞাপন

আরাফাত রহমান
অণুজীববিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড-এ পিএইচডি গবেষক। যুক্ত আছি বায়ো-বায়ো-১ ও অনুসন্ধিৎসু চক্র বিজ্ঞান সংগঠনের সঙ্গে। আমার প্রকাশিত বই "মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৫) ও "প্রাণের বিজ্ঞান" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৭)।