চিকিৎসা বিজ্ঞানকে বদলে দিলো যে ম্যাজিক বুলেট

পাঠসংখ্যা: 👁️ 289

কিছু সন্ত্রাসী আপনার পরিচিত শহরের খুব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হানা দিয়েছে। এরা এতই ভয়ংকর যে, জীবিত অবস্থায় এদেরকে বের করা যাবে না। আর যদি এই সন্ত্রাসীদল বেশকিছু দিন থাকার সুযোগ পায় তাহলে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করে ফেলবে। এখন আপনার হাতে মুক্তির দুটো উপায় আছে। প্রথমত, ওদেরকে দখলকৃত স্থাপনা সহ ধ্বংস করে ফেলা। এক্ষেত্রে এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি সহ আশেপাশের সাধারণ মানুষের প্রানহানির আশংকা আছে। দ্বিতীয় বিকল্পটি হল আক্রমণকারীদের চিহ্নিত করা। তারপর শহরের সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতি এড়িয়ে এদের নিস্ক্রিয় করে ফেলা। নিঃসন্দেহে সবার পছন্দে তালিকায় স্থান পাবে দ্বিতীয়টি।                                            

পল এরলিশ ১৯০০ সালের শুরু থেকেই কেমিক্যাল বা ড্রাগ দিয়ে এমন একটি চিকিৎসার কথা চিন্তা করছিলেন যেখানে রোগাক্রান্ত অঙ্গের ভাল কোষকে এড়িয়ে শুধু রোগ তৈরি কারী জীবাণু কিংবা আক্রান্ত কোষকে ধংস করবে। অনেকটা বন্দুকের ভিতর থেকে বের হয়ে আসা বুলেটের মত

প্রায় একশত বছর আগে ঠিক একই রকমভাবে মানব শরীরের আক্রমণকারী জীবানুর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য একটি নিখুঁত ব্যবস্থার কথা চিন্তা করেছিলেন একজন। তার এই পরিকল্পনাই আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুপুরন শাখা ইমিউনলজির ভিত রচনা করে দেয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানকে বদলে দেয়া এই বিজ্ঞানীর নাম পল এরলিশ। যাকে বলা হয় আধুনিক ইমিউনলজির অন্যতম একজন প্রতিষ্ঠাতা। তার মাধ্যমেই সর্বপ্রথম এন্টিবডি শব্দটির প্রচলন শুরু হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে অভূতপূর্ব অবদান রাখা এই বিজ্ঞানী ১৮৫৪ সালে পোল্যান্ডে জন্ম গ্রহন করেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন শেষে যোগদেন বার্লিনের একটি হাসপাতালে। তবে ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল না।  টিউবারকোলোসিস জীবাণু নিয়ে গবেষণা  করতে গিয়ে একসময় নিজেই আক্রান্ত হন এই রোগে। এরপর বেশ কয়েক বছর রোগমুক্তির আশায় মিশর সহ আরো কয়েকটি দেশ ভ্রমন করেন। ওই সময়গুলোতে তার চিন্তার অন্যরকম বিকাশ ঘটে। তিনি আগ্রহী হয়ে পড়েন ইমিউনিটি নিয়ে গবেষণার করার। সুস্থ হয়ে জার্মানিতে ফিরে এসে প্রতিষ্ঠা করেন নিজের ব্যক্তিগত ছোট একটি ল্যাবরেটরি। সেখানে কাজ শুরু করেন ইঁদুরের ইমিউনিটি তৈরি নিয়ে। ১৮৯১ সালে তাঁর জীবনের মোড় অন্যদিকে ঘুরে যায়।

বিখ্যাত অনুজীব বিজ্ঞানী রবার্ট কচ এর আমন্ত্রনে যোগদান করেন বার্লিন ইন্সটিটিউট অফ ইনফেকশিয়াস ডিজিজে। এই বিখ্যাত বিজ্ঞানী রবার্ট কচকে আমরা সবাই চিনি ব্যাকটেরিওলজির জনক হিসাবে। সেখানে পল এরলিশ কাজ শুরু করেন  আরেক বিখ্যাত বিজ্ঞানী এমিল ভন বেহরিঙের সাথে। তারা যৌথভাবে তৈরি করেন  ডিপথেরিয়া আর টিটেনাসের এন্টিটক্সিন। ইমিউনিটি নিয়ে ধারনার শুরুর সময়টিতে এন্টিবডি শব্দটির প্রচলন ছিল না। বরং বলা হত এন্টিটক্সিন। মজার ব্যাপার হল ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি রবার্ট কচের প্রতি অসম্ভব গুণমুগ্ধ ছিলেন। এই মুগ্ধতা এতটাই ছিল, শুধুমাত্র ল্যাবের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহারের অনুমতি পাবেন এই শর্তে বিনা পারিশ্রমিকে তিনি রবার্ট কচের ল্যাবে যোগ দেন। এমনকি বিজ্ঞানী হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাবার পর অনেকবার এই বিনা পারিশ্রমিকের কাজকে জীবনের সেরা সুযোগ বলে কৃতজ্ঞতা ভরে স্মরণ করেছেন। চার বছর কাজ করার পর ১৮৯৬ সালে পল এরলিশ বার্লিন ইন্সটিটিউট অফ ইনফেকশিয়াস ডিজিজে গড়ে তুলেন এন্টিবডি নিয়ে গবেষণার নতুন শাখা। ভাগ্য সহায় হলে  বিজ্ঞানী এমিল ভন বেহরিঙের সাথে ১৯০২ সালে যৌতভাবে ডিপথেরিয়ার এন্টিবডি আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু তার অবদানকে সমভাবে মুল্যায়ন করা হয়নি তখন।  তবে খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি। ইমিউনোলজিত তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯০৮ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন।

“পল এরলিশ ১৯০০ সালের শুরু থেকেই কেমিক্যাল বা ড্রাগ দিয়ে এমন একটি চিকিৎসার কথা চিন্তা করছিলেন যেখানে রোগাক্রান্ত অঙ্গের ভাল কোষকে এড়িয়ে শুধু রোগ তৈরি কারী জীবাণু কিংবা আক্রান্ত কোষকে ধংস করবে। অনেকটা বন্দুকের ভিতর থেকে বের হয়ে আসা বুলেটের মত।”

বিজ্ঞানী হিসাবে তার সবচেয়ে যুগান্তকারী উদ্ভাবনটি ছিল ম্যাজিক বুলেট তত্ত্ব । পরবর্তীকালে যার উপর ভিত্তি করে ক্যান্সার রোগের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন হয়ে যায়। পল এরলিশ ১৯০০ সালের শুরু থেকেই কেমিক্যাল বা ড্রাগ দিয়ে এমন একটি চিকিৎসার কথা চিন্তা করছিলেন যেখানে রোগাক্রান্ত অঙ্গের ভাল কোষকে এড়িয়ে শুধু রোগ তৈরি কারী জীবাণু কিংবা আক্রান্ত কোষকে ধংস করবে। অনেকটা বন্দুকের ভিতর থেকে বের হয়ে আসা বুলেটের মত। যা শুধু নিদিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর উপর আঘাত করবে। এই চিন্তার উপর ভিত্তি করে একটি নতুন তত্ত্ব দাড় করান।  এর নাম দেন নাম জাওবারকুগে। পরবর্তীতে ১৯০৮ সালে লন্ডনের এক সম্মেলনে এই জার্মান শব্দটির বদলে ব্যবহার করেন ম্যাজিক বুলেট শব্দটি। এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে ১৯০৯ সালে সিফিলিস রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করেন সাল্ভারসান বা কম্পাউন্ড ৬০৬। এটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রথম ম্যজিক বুলেট নামে পরিচিত। যা পরবর্তীতে ক্যান্সার রোগের চিকিৎসায় বহুল ব্যবহত কেমোথেরিপি আবিস্কারের পথ নির্দেশক হিসাবে কাজ করে। এই সাল্ভারসান চিকিৎসা বিজ্ঞানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল ঠিকই। একই সাথে এটা পল এরলিশের ব্যাক্তি জীবনে বয়ে আনে চরম ট্রাজেডি। একসময় দেখা যায় সিফিলিস থেকে সুস্থ হবার পরও সাল্ভারসান গ্রহণকারী আটত্রিশ জন রোগী মারা গিয়েছে। যার জন্য সে সময়কার অনেক বিজ্ঞানী পল এরলিশকে দ্বায়ী করে। এই ঘটনার পরবর্তী বিভিন্ন ঘাত প্রতিক্রিয়ায় এক পর্যায়ে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন। ধারনা করা হয়, দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্যর কারনে ১৯১৫ সালে হার্ট আট্যাকে মারা যান আধুনিক ইমিউনলজির ভিত্তি স্থাপনকারী এই বিজ্ঞানী।

“আধুনিক ইমিউনলজির ভিত্তি স্থাপনকারী বিজ্ঞানী ড. পল এরলিশ ১৯১৫ সালে হার্ট আট্যাকে মারা যান”

তবে তার মৃত্যুর পর থেকে আজ অবধি এ নিয়ে গবেষণা থেমে থাকেনি। যার ফলে সময়ের ধারাবাহিকতায় আবিষ্কৃত হয়েছে মনোক্লোনাল এন্টিবডি। বর্তমানে এই তত্ত্বের মূল উপাদান, কেমিক্যাল বা ড্রাগের সাথে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে এই নিদিষ্ট এন্টিবডিকে। এই এন্টিবডি প্রথমে তার নির্দিষ্ট এন্টিজেনের সাথে যুক্ত হয়। তারপর এন্টিবডির সাথে সংযুক্ত ড্রাগ অথবা কেমিক্যাল এন্টিবডি সমেত ওই কোষকে নিস্ক্রিয় করে ফেলে। ফলে ক্যান্সার কোষ ধ্বংসে ম্যাজিক বুলেটের ক্ষমতা হয়েছে আরো নিখুঁত। এক সময় পল এরলিশকে তার গবেষণায় বরাদ্দকৃত টাকার চেয়ে বেশি খরচ করে ফেলার জন্য সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। কিন্তু তার দেয়া ম্যাজিক বুলেট তত্ত্ব আজ প্রায় একশত বছর পর এসে ঔষদ শিল্পের আর্থিক চিত্র  আমুল বদলে দিয়েছে। যদি টাকার অংক হিসাব করা হয় তাহলে  দেখা যায়, ২০২১ সালে বাংলাদেশী টাকায় শুধুমাত্র  মনোক্লোনাল এন্টিবডি বিক্রির মূল্য ছিল প্রায় নয় লক্ষ বাহাত্তর হাজার কোটি টাকা। এটা নিশ্চিত, পল এরলিশ  একশত বছর আগে যে গাছের বীজ রোপন করেছিলেন তা আজ বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। এতটা হয়ত নিজেও ভাবতে পারেননি। তার দেখানো ধারনার উপর ভিত্তি করে এখনো প্রচুর গবেষণা চলমান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। যার ফলে আগামী দিনের চিকিৎসা ব্যবস্থায় ম্যাজিক বুলেট আরো চমক নিয়ে হাজির হবে তা নিঃসন্দেহে বলাই যায়।        

বিজ্ঞানী পল এরলিশের ম্যাজিক বুলেট

লেখক: পিএচডি রিসার্চার ইন মলিকুলার মেডিসিন, ন্যাশনাল হেলথ রিসার্চ ইন্সটিটিউট, তাইওয়ান

A T M Badruzzaman
I am currently a PhD researcher in Molecular Medicine, Department of Infectious Diseases and Vaccinology, National Health Research Institutes, Taiwan. Before that, I completed my Doctor of Veterinary Medicine (DVM) and MS in Pathology from Sylhet Agricultural University, Bangladesh.