জীববিজ্ঞানের পাঠ্যবই খুললেই আমরা খুব পরিচিত একটি ধারণার মুখোমুখি হই: ডিএনএ (DNA) থেকে এম আরএনএ (mRNA), আর এম আরএনএ থেকে প্রোটিন। এটিই সেন্ট্রাল ডগমা, জীবনের তথ্যপ্রবাহের মূল সূত্র। আজ আমরা জানি, ডিএনএ-তে লেখা থাকে নির্দেশনা, আরএনএ সেই নির্দেশনার বার্তা বহন করে, আর প্রোটিন সেই নির্দেশনাকে বাস্তবিক রূপ দেয়। কিন্তু জীবনের এই ভাষা পড়ার ইতিহাস এত সরল রেখায় শুরু হয়নি। বরং আশ্চর্যের বিষয়, জীবনের তথ্য বোঝার প্রথম বড় সাফল্যগুলোর একটি এসেছিল ডিএনএ নয়, বরং প্রোটিন থেকে।
এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেন ফ্রেডরিক স্যাঙ্গার। যিনি প্রোটিন সিকুয়েন্সিং এর জন্য নোবেল পুরুষ্কারে ভূষিত হন। পরবর্তীতে ডিএনএ সিকোয়েন্সিংয়ের জন্যও নোবেল জেতেন তিনি। ইনসুলিন নামের একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনের অ্যামিনো অ্যাসিড ক্রম নির্ণয় করে তিনি দেখিয়ে দেন প্রোটিন কোনো এলোমেলো রাসায়নিক জট নয় বরং প্রোটিনেরও নির্দিষ্ট ভাষা আছে, নির্দিষ্ট ক্রম আছে, নির্দিষ্ট গঠন বা স্ট্রাকচার আছে।

আমরা সহজেই বলি, প্রোটিন হলো অ্যামিনো অ্যাসিডের চেইন। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে বিষয়টি এত পরিষ্কার ছিল না। তখন অনেক বিজ্ঞানী প্রোটিনকে অত্যন্ত জটিল, অনির্দিষ্ট, কিছুটা এলোমেলো অণু হিসেবে ভাবতেন। কেউ কেউ মনে করতেন, প্রোটিন হয়তো নির্দিষ্ট রাসায়নিক গঠনের বদলে প্রায় কলোয়েডের মতো আচরণ করে; বড়, জটিল, কিন্তু সুনির্দিষ্ট ক্রমহীন। জৈব অণু হিসেবে প্রোটিনের গুরুত্ব জানা ছিল, কিন্তু প্রোটিনের ভেতরে তথ্যবহুল ক্রম আছে কি না, তা নিশ্চিত ছিল না।
এই জায়গাতেই স্যাঙ্গারের কাজ যুগান্তকারী। তিনি এমন একটি প্রশ্ন করেন যা সহজ শোনালেও তখন অত্যন্ত কঠিন ছিল: একটি প্রোটিনে অ্যামিনো অ্যাসিডগুলো ঠিক কোন ক্রমে সাজানো থাকে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিনি বেছে নেন ইনসুলিন। ইনসুলিন অপেক্ষাকৃত ছোট প্রোটিন, কিন্তু জীববিজ্ঞানে ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর গুরুত্ব বিশাল। এটি রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, আর ডায়াবেটিসের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ইনসুলিনের আকার তুলনামূলক ছোট হওয়ায় সেটি বিশ্লেষণের জন্য সুবিধাজনক ছিল, কিন্তু “ছোট” মানেই সহজ নয়। সেই সময়কার প্রযুক্তি দিয়ে একটি প্রোটিনের অ্যামিনো অ্যাসিড ক্রম পড়া ছিল ধৈর্য, কৌশল, এবং রাসায়নিক বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষা।

স্যাঙ্গারের পদ্ধতির মূল সৌন্দর্য ছিল তাঁর ধাপে ধাপে এগোনো। তিনি পুরো ইনসুলিন অণুকে একসঙ্গে পড়তে যাননি। বরং প্রথমে বুঝতে চেয়েছেন প্রোটিনের কোন প্রান্ত কোথায়, কোন অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে চেইন শুরু হচ্ছে, তারপর কীভাবে চেইনটিকে ছোট ছোট অংশে ভেঙে প্রতিটি অংশের ক্রম জানা যায়। এই কাজে তিনি ব্যবহার করেন একটি রাসায়নিক পদার্থ, ১-ফ্লুরো-২,৪-ডাইনাইট্রোবেঞ্জিন বা FDNB-এফডিএনবি। এটি পরে “স্যাঙ্গার’স রিএজেন্ট” নামে পরিচিত হয়।
এফডিএনবি এর কাজ ছিল অ্যামিনো অ্যাসিড চেইনের নাইট্রোজেন টার্মিনাল (N-terminal) চিহ্নিত করা। সহজ করে বললে, প্রোটিন চেইনের একটি শুরু আছে এবং একটি শেষ আছে। এফডিএনবি সেই শুরুর প্রান্তে থাকা অ্যামিনো অ্যাসিডকে রাসায়নিকভাবে ট্যাগ করতে পারত। তারপর প্রোটিন ভেঙে দিলে দেখা যেত কোন অ্যামিনো অ্যাসিডটি চেইনের শুরুতে ছিল। এটি ছিল যেন একটি লম্বা বাক্যের প্রথম অক্ষর চিহ্নিত করার মতো। কিন্তু শুধু প্রথম অক্ষর জানলেই তো পুরো বাক্য জানা যায় না। তাই স্যাঙ্গারকে আরও অনেক ধাপ এগোতে হয়েছে।
তিনি ইনসুলিনকে বিভিন্ন রাসায়নিক ও এনজাইমের সাহায্যে ছোট ছোট পেপটাইড খণ্ডে ভাঙেন। প্রতিটি খণ্ডে কয়েকটি অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে। এরপর সেই খণ্ডগুলোর গঠন বিশ্লেষণ করে তিনি বুঝতে চেষ্টা করেন কোন খণ্ডের সঙ্গে কোন খণ্ডের মিল আছে, কোথায় তারা ওভারল্যাপ করে, এবং কীভাবে পুরো প্রোটিন চেইনটি সাজানো। এটি ছিল একধরনের জৈবরাসায়নিক জিগস পাজল। আপনি যদি একটি বাক্যকে বিভিন্ন জায়গা থেকে কেটে ছোট ছোট অংশ করেন যেমন “জীবনের”, “নের ভাষা”, “ভাষা পড়া” তাহলে ওভারল্যাপ দেখে আপনি মূল বাক্যটি গঠন করতে পারেন। স্যাঙ্গারও প্রোটিনের ক্ষেত্রে তাই করেছিলেন, তবে অক্ষরের বদলে ছিল অ্যামিনো অ্যাসিড।

ইনসুলিনের ক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। এটি একটিমাত্র সরল চেইন নয়; ইনসুলিনে দুটি পলিপেপটাইড চেইন থাকে, এ-চাইন (A-chain) এবং বি-চেইন (B-chain)। এই দুটি চেইন আবার ডাইসালফাইড বন্ড দিয়ে যুক্ত থাকে। স্যাঙ্গারকে শুধু অ্যামিনো অ্যাসিডের ক্রমই জানতে হয়নি; তাঁকে বুঝতে হয়েছে কোন চেইন কোথায়, কোন অংশের সঙ্গে কোন অংশ রাসায়নিক বন্ধনে যুক্ত। অর্থাৎ কাজটি ছিল শুধু “লাইন ধরে অক্ষর পড়া” নয়, বরং ভাঁজ করা, সংযুক্ত, রাসায়নিকভাবে জটিল একটি অণুকে খুলে তার অভ্যন্তরীণ মানচিত্র তৈরি করা।
এই গবেষণার ফলাফল ছিল অসাধারণ। স্যাঙ্গার দেখালেন, ইনসুলিনের অ্যামিনো অ্যাসিডগুলো নির্দিষ্ট ক্রমে সাজানো। এই ক্রম একরকম পুনরাবৃত্তিযোগ্য এবং জীববৈজ্ঞানিকভাবে অর্থপূর্ণ। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো পরিষ্কারভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো যে একটি প্রোটিনের নির্দিষ্ট প্রাইমারি স্ট্রাকচার থাকে। আজ আমরা প্রোটিনের প্রাইমারি স্ট্রাকচার বলতে অ্যামিনো অ্যাসিডের ক্রম বুঝি। কিন্তু এই ধারণাটিকে শক্ত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দেওয়ার অন্যতম বড় কৃতিত্ব স্যাঙ্গারের।
এখন প্রশ্ন হতে পারে, প্রোটিনের প্রাইমারি স্ট্রাকচার বোঝা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল? কারণ প্রোটিনের কাজ তার গঠনের ওপর নির্ভর করে। কোন অ্যামিনো অ্যাসিড কোথায় আছে, কোন অংশ হাইড্রোফিলিক মানে পানি-আকর্ষী, আবার কোন অংশ হাইড্রোফোবিক পানি-বিকর্ষী, কোথায় কি ধরনের চার্জ (পজেটিভ, নেগেটিভ অথবা নিউট্রাল) আছে, কোথায় রাসায়নিক বিক্রিয়ার সম্ভাবনা আছে এসবই প্রোটিন কীভাবে ফোল্ড বা ভাঁজ হবে এবং কীভাবে কাজ করবে তা নির্ধারণ করে। ইনসুলিনের সিকোয়েন্স জানা মানে শুধু একটি হরমোনের রাসায়নিক তালিকা জানা নয়; বরং বোঝা যে জীবনের কার্যকর অণুগুলো কতটা সুনির্দিষ্টভাবে নির্মিত।প্রোটিন সিকুয়েন্সিং আবিষ্কারের জন্য স্যাঙ্গার ১৯৫৮ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান। তাঁর নোবেলজয়ী কাজের মূল গুরুত্ব ছিল ইনসুলিনের গঠন নির্ণয়, বিশেষত প্রোটিনের অ্যামিনো অ্যাসিড সিকোয়েন্সকে পরীক্ষামূলকভাবে প্রতিষ্ঠা করা। ফলে প্রোটিন রসায়নের একটি নতুন যুগের সূচনা হয়।

স্যাঙ্গারের কাজ আরও একটি গভীর প্রশ্ন সামনে আনে: যদি প্রোটিনের অ্যামিনো অ্যাসিড ক্রম নির্দিষ্ট হয়, তাহলে সেই ক্রমের নির্দেশনা কোথা থেকে আসে? এখানেই তাঁর প্রোটিন সিকোয়েন্সিং পরবর্তী আণবিক জীববিজ্ঞানের ভিত্তি শক্ত করে। যদিও এই লেখার আলোচ্য বিষয় ডিএনএ সিকোয়েন্সিং নয়, তবুও স্যাঙ্গারের প্রোটিন অনুক্রমকরণ জীবনের ভাষা বোঝার ইতিহাসে একটি সেতু তৈরি করে। প্রোটিনের নির্দিষ্ট ক্রম দেখেই বিজ্ঞানীরা আরও দৃঢ়ভাবে ভাবতে শুরু করেন কোষে নিশ্চয়ই এমন কোনো তথ্যভাণ্ডার আছে যা এই ক্রম নির্ধারণ করে, যা হচ্ছে ডিএনএ। ডিএনএ সিকুয়েন্সিং-এও স্যাঙ্গারের অবদান ছিল যা পরবর্তী কোন লেখায় আলোচনা করা হবে।
আজ প্রোটিন সিকোয়েন্সিং অনেক উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে করা যায়। ম্যাস স্পেকট্রোমেট্রি, স্বয়ংক্রিয় এডম্যান ডিগ্রেডেশন, প্রোটিওমিক্স এসব প্রযুক্তি এখন গবেষণাগারে প্রচলিত। কিন্তু স্যাঙ্গারের সময় প্রতিটি ধাপ ছিল হাতে করা, ধীর, পরিশ্রমী, এবং ব্যাখ্যাভিত্তিক। সেখানে ভুলের সুযোগ ছিল অনেক, কিন্তু স্যাঙ্গারের পদ্ধতি ছিল অসাধারণ যত্নশীল। তার কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বড় আবিষ্কার সবসময় বড় যন্ত্র দিয়ে শুরু হয় না; কখনো শুরু হয় একটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন, একটি ভালো রাসায়নিক কৌশল, আর দীর্ঘ সময় ধরে করা নিখুঁত পরীক্ষার মাধ্যমে। এবং অবশ্যই দীর্ঘ অধ্যবসায়ের মাধ্যমে।
তথ্যসূত্র:
- The Nobel Prize in Chemistry 1958. NobelPrize.org. Nobel Prize Outreach 2026. Wed. 17 Jun 2026.
- Sanger, F. (1945). The free amino groups of insulin. Biochemical Journal, 39(5), 507–515. DOI: 10.1042/bj0390507.
- Sanger, F., & Tuppy, H. (1951). The amino acid sequence in the phenylalanyl chain of insulin. 2. The investigation of peptides from enzymic hydrolysates. Biochemical Journal, 49(4), 481–490. DOI: 10.1042/bj0490481.
- Sanger, F., & Thompson, E. O. P. (1953). The amino acid sequence in the glycyl chain of insulin. 1. The identification of lower peptides from partial hydrolysates. Biochemical Journal, 53(3), 353–366. DOI: 10.1042/bj0530353.
- Ryle, A. P., Sanger, F., Smith, L. F., & Kitai, R. (1955). The disulphide bonds of insulin. Biochemical Journal, 60(4), 541–556.
- MRC Laboratory of Molecular Biology. 1958: Fred Sanger.
- Fredrick Sanger.







Leave a Reply