মোজেসরাস: মাসট্রিক্টের শিকারী লিজার্ড

পাঠসংখ্যা: 👁️ 137

কোনো গল্পে যখন অদ্ভুত ধরনের ভয়ংকর কোনো শিকারী প্রাণীর কথা ফুঁটে ওঠে, আমাদের শুধু গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায় না, বরং ভয়ে হয়তো মুখও লুকিয়ে ফেলি। আর যদি সেই ভয়ংকর প্রাণীটা হয় সমুদ্রের? বা অ্যামাজনের কোনো জলাভূমির? “Open water”, “Deep rising”, “Jaws”, “Deep Blue sea” টাইপের মুভিগুলো ছোটোবেলায় অনেক প্রিয় ছিলো। মুভিগুলোতে দেখানো সামুদ্রিক মনস্টার দেখে শিহরিত হন নি এমন মানুষ কমই আছেন। HBO, Star movies-এ নিয়মিত এরকম একটা না একটা মুভি দেখানো হতো। এই মুভিগুলোর ভালো লাগার কারণ গভীর সমুদ্রে, পানির নিচে লুকিয়ে থাকা রহস্য, দানবাকৃতির প্রাণী। পানির নিচের দুনিয়া বরাবরই একটু ভয়ংকর, রহস্যময়।

আজকে কোনো মুভির মনস্টার না, ৮২-৬৬ মিলিয়ন বছর আগে আমাদের এই পৃথিবীতে বাস করত এমন এক সামুদ্রিক দানবের গল্প বলব। মোজেসর (Mosasaur)। একে মেসোসর ডাইনোর সাথে গুলিয়ে ফেলবেন না। সর্বমোট ৩৮ টি গণের প্রাণীকে মোজেসর বলে সম্বোধন করা হয়। এদের অনেক গ্রুপ এবং সাবগ্রুপে বিভক্ত করা হয়েছে। তবে বৃহত্তম আকৃতির মোজেসর গুলো মোজেসরাস গণের অন্তর্ভুক্ত। তাই আমরা মোজেসরাস নিয়ে মুল আলোচনায় থাকব।

জুরাসিক ওয়ার্ল্ডের মোজেসর

ক্রিটেশাস যুগের শেষ দিক (ক্যাম্পানিয়ান এবং মাসট্রিকটিয়ান স্টেজ চলছে)। এই মোজেসরাস গণের প্রাণীরা সমুদ্রে রাজত্ব করছে তখন। আসলে মোজেসরাস কোনো নির্দিষ্ট প্রজাতির নাম না, গণের নাম, এই বিষয়টির প্রতি খেয়াল রাখবেন। এই গণের অন্তভুর্ক্ত অনেকগুলো স্পিশিজের সন্ধান, ফসিল পাওয়া গিয়েছে।১৭৬৪ সালে এই প্রাণীর কঙ্কালের এক টুকরো মানুষের হাতে আসে, মাসট্রিক্টের নিকটবর্তী পাহাড় মাউন্ট সেইন্ট পিটারের নিচে ভূগর্ভস্থ চুনাপাথরের আকরিক থেকে। তখন এই প্রাণীটিকে মনে করা হয় কোনো তিমি মাছের মতো বড় প্রাণী। সেভাবেই এই ফসিলের বর্ণনা দিয়ে তখন আমজনতার সামনে তুলে ধরা হয় মোজেসরাসকে।

A species of big breathing fish

মোজেসরাস ফসিল
A species of big breathing fish

আসলে মোজেসরাস কোনো মাছ ছিলো না। আমরা যদি এর ক্লাসিফিকেশনের দিকে নজর দেই তবে এদের বর্গ (order) ছিলো স্কুয়ামাটা আর শ্রেণী (class) ছিলো রেপটিলিয়া। অর্থাৎ এরা ছিলো সরীসৃপ প্রাণী, আপনার বাসার দেয়ালে ঘুরে বেড়ানো টিকটিকিও কিন্তু সরীসৃপ। স্কুয়ামাটা সরীসৃপ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত সবথেকে বড় বর্গ। মোজেসরাস নামকরণের দিকে যদি আমরা নজর দেই তবে দেখব, মোজেসরাস অর্থ-“Lizard of the Meuse River.” আমরা একটু আগে যে মাসট্রিক্ট শহরের কথা বললাম সেটা এই মিউস নদীর কাছে অবস্থিত। যা হোক, ফসিলের সন্ধান ও আবিষ্কারের ক্রমধারায় এরপর মোজেসর প্রাণীদের অনেক ফসিল পেয়েছি আমরা।

ক্রিটেশাস যুগের শেষ দিকে এসে মোজেসর প্রাণীরা অর্জন করেছিলো সবথেকে ভয়ংকর সামুদ্রিক শিকারী প্রাণীর উপাধি। ক্রিটেশাস যুগে অ্যাগিয়ালোসর নামে এক প্রকার জলজ লিজার্ড এই পৃথিবীতে নিজেদের জানান দিতো। এই অ্যাগিয়ালোসর থেকেই মোজেসর প্রাণীরা বিবর্তিত হয়েছে– এমন প্রমাণ মেলে। অ্যাগিয়ালোসরের সময়কালে আরও দুইটি ভয়ংকর শিকারী প্রাণীর দাপট প্রকৃতিতে ছিলো। ইকথায়োসর এবং পাইলোসর। এরা ছিলো ওই সময়ের সবথেকে দাপুটে শিকারী প্রাণী। কিন্তু ক্রিটেশাস যুগের শেষে যখন অ্যাগিয়ালোসর থেকে মোজেসর আলাদা হচ্ছিলো তখন এরা বিলুপ্ত হয়ে যায়। টুরোনিয়ান- মাসট্রিকটিয়ান স্টেজে। ফলে মোজেসররা হয়ে উঠে সময়ের সবথেকে ভয়ানক শিকারী প্রাণী। আমরা সিনেমায় শার্ক/হাঙর কে দেখেছি মানুষ শিকার করতে, আমরা তাতেই ভয় পেয়ে যাই, কিন্তু মোজেসরাসরা (বৃহত্তম আকৃতির মোজেসর, সবথেকে অধিপত্য বিস্তারকারী শিকারী মোজেসর প্রজাতিগুলো এই গণের) নিজেদের খাদ্য তালিকার প্রথমেই রেখেছিলো এই হাঙরদের। তারা হাঙর, সী টারটাইল, বনি ফিস, সেফালোপডস এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি খেতো। সবথেকে ভয়ানক বিষয় হলো, এই শিকারী গণের প্রাণীরা নিজেদেরই জ্ঞাতী ভাই অর্থাৎ অন্যান্য গণের অন্তর্ভুক্ত মোজেসরদের খাদ্য হিসেবে শিকার করতো। এই কারণে বর্তমান গবেষকরা মোজেসরাসদের শুধু মোজেসরদের মধ্যেই নয় বরং ঐ সময়ের ইকো সিস্টেমের সব থেকে ভয়ানক শিকারী প্রাণীর আসনে বসিয়েছে।

মোজেসরাস থ্রিডি মডেল
3-D model

মোজেসরাস গণের প্রাণীরা আকারে নয় মিটারের থেকে বেশি লম্বা হতো। অর্থাৎ এই গণের সকল প্রাণীই নয় মিটার থেকে দৈর্ঘ্যে বড়। সাধারণত ১০-১৮ মিটার হতে পারে এরা। মোজেসর প্রাণীদের সব থেকে নিকট আত্মীয়দের মধ্যে রয়েছে আমাদের পরিচিত গুইসাপ বা মনিটর লিজার্ড এবং কমোডো ড্রাগন। মোজেসর প্রাণীদের সাথে এদের স্কালের অনেক মিল পাওয়া যায়। এদের লেজ ছিলো অনেক লম্বা এবং ইকথায়োসরের মতো লেজের প্রান্ত ছিলো কিছুটা বাঁকা (down curved). সব ধরনের মোজেসর প্রাণীদের চোয়ালে চার ধরনের দাঁত ছিলো। উপরের চোয়ালে ছিলো তিন ধরনের দাঁত-

১) প্রিম্যাক্সিলারি টিথ
২) ম্যাক্সিলারি টিথ
৩) টেরিগয়েড টিথ

আর নিচের চোয়ালে এক ধরনের দাঁত। ডেন্টারি টিথ। মোজেসরাসদের চোয়াল ছিলো কিছুটা শঙ্কু আকৃতির, এরা তাদের ঘাড়ের নমনীয়তার জন্য চোয়াল সামনে-পিছনে সাবলীলভাবে নড়া-চড়া করতে পারতো। এই সাবলীল মুভমেন্ট তাদের শিকার ধরতে সাহায্য করতো। দুই পাটি চোয়ালের বিশেষ ব্যবস্থার কারণে তারা বড় কোনো শিকার ধরার সময় নিজেদের নিন্ম চোয়াল অনেক বেশি বিস্তৃত করতে পারতো।

মোজেসরাসের দাঁত

সব মোজেসর প্রাণীদের আকার-আকৃতি যেমন এক নয়, তেমনই প্রজাতিভেদে মোজেসরাস গণের অন্তর্ভুক্ত প্রাণীদের শারীরিক গঠনে ছোটোখাটো পার্থক্য দেখাই যায়। তবে কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা এই গণের প্রাণীদের আলাদা করেছে। এদের দাঁতের এনামেলের পরিধি কিছুটা প্রিজম আকৃতির। দাঁত এমন ভাবে সজ্জিত, শিকার একবার চোয়ালের গহ্বরে প্রবেশ করলে গলাধঃকরণ পর্যন্ত যতই চেষ্টা করুক নিজেকে মুক্ত করতে পারেনা। মোজেসরাস গণের সরীসৃপদের দাঁত সবথেকে শক্ত এবং বড় বিবেচনা করা হয়। তবে কিছু প্রজাতির (Conodon, Lemonnieri) দাঁত এত শক্তিশালী না। কাটিং এজের ক্ষেত্রেও প্রজাতি ভেদে বৈচিত্র্য চলে আসে। কিছু প্রজাতির দাঁতের কাটিং এজ খাঁজ কাটা, কিছু প্রজাতির আবার মসৃণ। মজার বিষয় হলো, কিছু প্রজাতির প্রাণীতে একই সাথে মসৃণ, খাঁজকাটা উভয় ধরনের দাঁতই পাওয়া যায়। মোজেসরাস গণের প্রাণীদের ডেন্টাল ফর্মুলা দেখলে আমরা দেখব- (২. ১২-১৬. ৮-১৬)|(১৪-১৭). এর অর্থ, উপরের চোয়ালে রয়েছে ২ টি প্রিম্যাক্সিলারি টিথ, প্রজাতিভেদে বা কখনো কখনো প্রাণিভেদে ১২-১৬ টি ম্যাক্সিলারি টিথ, ৮-১৬ টি টেরিগয়েড টিথ। আর নিচের চোয়ালে থাকে ১৪-১৭ টি ডেন্টারি টিথ।

মোজেসরাসদের ফসিল থেকে প্রাপ্ত টিস্যু নিয়ে করা গবেষণার ফলাফল থেকে বেরিয়ে আসে, এদের মেটাবোলিক তথা বিপাকের হার বর্তমানে পাওয়া স্কুয়ামাটা সরীসৃপদের তুলনায় অনেক বেশি। এদের বিপাকের হার লেদারব্যাক সী টারটল আর ইকথায়োসরসের মাঝামাঝি পর্যায়ের। লেদারব্যাক সী টারটল জীবন্ত টারটলদের মধ্যে বৃহত্তম এবং বর্তমানের সকল সরীসৃপদের মধ্যে ভরের দিক থেকে চতুর্থ।

মোজেসরাস প্রাণীরা ছিলো এন্ডোথার্মিক, উষ্ণ রক্তের প্রাণী। এই বৈশিষ্ট্য স্কুয়ামেট সরীসৃপদের মধ্যে দেখা যায় না, এই বৈশিষ্ট্য মোজেসরাসদের অনন্য করেছে আর টিকে থাকতে অনেক বেশি সাহায্য করেছে। এন্ডোথার্ম শব্দের দুইটি অংশ- “এন্ডোন” এবং “থার্ম।” এন্ডোন অর্থ অভ্যন্তরীণ (within), থার্ম অর্থ তাপ (heat). এন্ডোথার্মিক প্রাণীরা উষ্ণ রক্তবিশিষ্ট, এরা এদের দৈহিক তাপমাত্রার ভারসম্য (বিপাকীয় ক্রিয়ার জন্য উপযোগী তাপমাত্রা) রক্ষা করে চলতে পারে। এদের দেহের আভ্যন্তরীণ বিভিন্ন রাসায়নিক ক্রিয়ায় যে শক্তি উৎপন্ন হয় এরা তার উপর নির্ভরশীল, পরিবেশের তাপমাত্রার উপর না। যার ফলে প্রচন্ড ঠান্ডা পরিবেশে এন্ডোথার্মিক প্রাণীরা টিকে থাকায় সুবিধা পায়।

এন্ডোথার্মিক হওয়ার কারণে মোজেসরাস প্রাণীরা যে সুবিধা পেয়েছিলো তার অন্যতম হলো অ্যান্টার্কটিকার মতো সাবপোলার এলাকায় টিকে থাকা যখন সমুদ্রের তাপমাত্রা বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম তাপমাত্রায় পতিত হতো (৪°-৫° সেলসিয়াস, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ০° বা তারও কম)। তাদের স্ট্যামিনা অনেক বেশি ছিলো, অনেক বড় এলাকা জুড়ে ঘুরে বেড়াতো আর শিকার করতে পারতো। ফলে প্রতিকূল পরিবেশে (অতি নিন্ম তাপমাত্রায়) যখন অন্য প্রাণীরা বা অন্যান্য স্কুয়ামেটরা খাদ্যাভাবে ভুগতো তখন মোজেসরাসরা বাঙালিদের মতো পেট ভরে খেয়ে দেয়ে সুখনিদ্রায় চলে যেতো।

মোজেসরাস প্রাণীদের লম্বা লেজ এবং প্যাডলের মতো অঙ্গ তাদের অতি দ্রত সাঁতার কাটতে সহায়তা করতো, ঘন্টায় প্রায় ৩০ মাইল। এদের শরীরের স্কাপুলা, হিউমেরাস ছিলো পাখা আকৃতির; রেডিয়াস এবং আলনা ছিলো খাটো। এদের চোখ ছিলো মাথার দুই পার্শ্বে, আকারে অনেক বড়, প্রাপ্ত ফসিলে চোখের সকেট এবং স্ক্লেরোটিক বলয়ের আকার দেখে বড় চোখের ধারণা পাওয়া যায়। এদের দৃষ্টিশক্তি ভালো হলেও মাথার দুই পার্শ্বে চোখ হওয়ায় বাইনোকুলার ভিশন (ত্রিমাত্রিক ইমেজ তৈরীর ক্ষমতা) তৈরী বাঁধাগ্রস্থ হতো। বরং এরা অনেক বিস্তৃত এলাকা জুড়ে পরিবেশের দ্বিমাত্রিক ছবি দেখতো। স্কালের দুই পাশে চোখ হওয়ায় এরা একই সাথে নিজেদের দুইপাশের অনেকখানি পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন থাকতে পারতো।

মোজেসরাসদের রিপ্রোডাকশন সিস্টেম নিয়ে খুব নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও তাদের কঙ্কালের গঠন এবং অন্যান্য বিষয়ের গবেষণা থেকে ধারণা করা হয় এরা স্তন্যপায়ীদের মতো প্রজনন ঘটাতো। অর্থাৎ দেহের ভিতরে ভ্রূণ গঠিত হতো এবং সন্তান প্রসব অবদি দেহের ভিতরেই বেড়ে উঠতো। এর স্বপক্ষে জোড়ালো প্রমাণ হিসেবে গবেষকদের হাতে রয়েছে মোজেসরয়েড পরিবারের গর্ভবতী এক সদস্যের ফসিল যার সাথে দুইটি মোজেসর প্রাণীর ভ্রূণ ফসিলও পাওয়া যায়।

আমরা এর আগেই মোজেসরাসদের খাদ্যাভ্যাস দেখেছি। মোজেসর প্রাণীদের এত শক্তি-সামর্থ্য থাকার পরও একটা দুর্বলতা ছিলো। সেটা তাদের ঘ্রাণশক্তি। এই ঘ্রাণশক্তির দুর্বলতা খুব কম দেখা যায় শিকারী প্রাণীদের মধ্যে। এই দুর্বলতা থাকার পরও মোজেসরাসরা এত শক্তিশালী ও ভয়ংকর শিকারী হয়েছেলো তাদের দ্বিমাত্রিক দৃষ্টিশক্তির কারণে, তারা প্রকৃত পক্ষে বেশিরভাগ সময়ই সমুদ্র পৃষ্ঠের কাছাকাছি অবস্থানে শিকার করতো যার ফলে তারা শিকরকে সহজে শনাক্ত করতে পারতো।

মোজেসরাসদের শিকারের ব্যাপারে আরেকটি ইন্টারেস্টিং তথ্য রয়েছে। একটি বৃহৎ আকৃতির নওটিলয়েড (nautiloid; বৃহৎ আকৃতির সেফালোপডস) ফসিল পাওয়া গিয়েছে। তার দেহে দুই ধরনের কামড়ের চিহ্ন, একটি কামড়ের বাইট ফোর্স তুলনামূলক কম, আরেকটির বেশি; দুইটাই মোজেসরাস প্রাণীর। এই তথ্যের ভিত্তিতে দুইটি সম্ভাব্য হাইপোথিসিস দাঁড় করানো যায়।

১) নওটিলয়েড টিকে কাবু করার জন্য প্রথমে তাকে হালকা কামড় বসিয়েছে একটি মোজেসরাস। কিন্তু কামড় সহ্য করেও নওটিলয়েড টি মোজেসরাসের চোয়াল থেকে কোনোভাবে ছাড়া পেয়েছে। তাই পুনরায় আরও শক্তিশালী কামড় বসিয়েছে।

২) দুইটা পৃথক মোজেসরাস। একজন প্রাপ্তবয়স্ক, শক্তিশালী। অপরজন ইয়ং, বালক। কমবয়সী মোজেসরাসটির বাইট ফোর্স অনেক কম। আর প্রাপ্তবয়স্ক মোজেসরাসটির বাইট ফোর্স বেশি।

প্রথম হাইপোথিসিসটির ভিত্তি নাই তেমন। কারণ কামড় দুটি থেকে সৃষ্ট চিহ্ন বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, চোয়ালের আকারে ভিন্নতা রয়েছে। কম বাইট ফোর্সের কামড় অপেক্ষাকৃত তরুণ মোজেসরাসের চোয়ালের। তাহলে দ্বিতীয় হাইপোথিসিসের পক্ষে বেশ জোরালো প্রমাণ আর যুক্তি আসলো। কিন্তু এখান থেকে আরেকটি অনুসিদ্ধান্ত তথা আরেকটি হাইপোথিসিস গবেষকদের নাড়া দিলো। আসলে প্রাপ্তবয়স্ক মোজেসরাসটি মাতা আর তরুণ মোজেসরাসটি তার সন্তান। মা তার সন্তানকে শিখাচ্ছে কিভাবে শিকার করতে হয়; মা যেনো তার সন্তানকে শিখাচ্ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি অঞ্চলে পাওয়া টারটল বা বনি ফিশই নয় শুধু, প্রয়োজনে বিকল্প খাবার হিসেবে সেফালোপডসও শিকার করা যাবে।

এই হাইপোথিসিসের পক্ষে আরও জোরালো যুক্তি হতে পারে এমন; আগেই দেখেছি মোজেসর প্রাণীরা অন্য মোজেসর প্রাণীদের খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। সম্ভাবনা ছিলো তরুণ, দুর্বল মোজেসরাসটির প্রাপ্তবয়স্ক, সবল মোজেসরাসের খাদ্যে পরিণত হওয়ার; তা হয়নি। তবে তারা হয়তো একই প্রজাতির; একই প্রজাতির মোজেসরাস একে অপরকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে না। তাহলে অন্তত এমন হওয়া উচিত খাদ্য নিয়ে ধ্বস্তাধস্তি; কারণ আপনি আর আরেকজন যখন একই শিকারের পিছনে লাগবেন তখন বিবাদ হবে স্বাভাবিক। কিন্তু এমন কোনো আলামত পাওয়া যায় নি। তাই গবেষকরা এই বিষয়টাকে “প্যারেন্টাল কেয়ার” হিসেবে দেখছেন; সকল যুক্তি-প্রমাণ এই হাইপোথিসিসকে সমর্থনও করছে। সামনে হয়তো আরও আলামত পাওয়া যাবে যা এই বিষয়ের উপর আলোকপাত করবে আমাদের।

যেহেতু খাদ্য নিয়ে প্রতিযোগিতার কথা তুললাম, সেহেতু মোজেসরাসদের আরও দুইজন প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেই। টাইলোসরাস (tylosaurus) এবং প্রগন্যাথোডন (prognathodon). এই দুইটি প্রাণীও মোজেসর প্রাণী। আকার-আকৃতি এবং শিকারের দিক থেকে এদের অবস্থান মোজেসরাসদের পরেই। টাইলোসরাস আকারে প্রায় ৪০ ফিট এবং প্রগন্যাথোডন আকারে প্রায় ৩৯ ফিট লম্বা হতে পারতো। তাদের খাদ্য তালিকাও ছিলো মোজেসরাসদের মতোই বিভিন্ন সামুদ্রিক সরীসৃপ, প্রাণী। খাদ্য তালিকা একই হওয়ায় এই তিন গণের প্রাণীদের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা চলবে সেটাই স্বাভাবিক; এই প্রতিযোগিতার প্রমাণও মেলে ফসিলে প্রাপ্ত বিভিন্ন সংঘর্ষের চিহ্ন দেখে।

এবার একটু ভিন্ন টপিকে কথা বলা যাক। কিভাবে বুঝলাম তাদের খাদ্য তালিকা একই রকম ছিলো বা কোন মোজেসরের কি খাদ্য তালিকা?

১) বিভিন্ন ফসিল বিভিন্ন সময়ে পাওয়া যায় যেগুলো হয়তো মোজেসররা শিকার করেছে, মেরে ফেলেছে, কিন্তু খায় নি বা আংশিক খেয়েছে। সেগুলোর উপর দাঁতের চিহ্ন দেখে।

২) মোজেসরদের ফসিলের সাথেই অনেক সময় বিভিন্ন প্রাণীর স্কাল পাওয়া যেতে পারে। এরকম একটাই উদাহরণ আছে জানা। ৭৫ মিলিয়ন বছর আগের একটা মোজেসরাসের ফসিল পাওয়া গিয়েছে যার সাথে প্রাণীটির পাকস্থলীর বিভিন্ন খাদ্য উপাদান, খাদ্যাবশেষও ফসিল হয়ে গিয়েছে। এই খাদ্য উপাদানগুলো বিশ্লেষণ করে প্রায় ১ মিটার লম্বা মাছের দেহাবশেষ শনাক্ত করা হয় যা ঐ খাদক মোজেসরাসটির স্কাল থেকেও লম্বা। মোজেসরাসটি আকারে ছোটো ছিলো, ৬৬ সেমি মতো দৈর্ঘ্য তার। এই বিশ্লেষণ থেকে মোজেসরাসের খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি আরেকটা বিষয় জানা যায়- তারা ম্যাক্রোফ্যাগাস। নিজেদের শরীরের থেকেও বড় আকৃতির খাদ্য ভক্ষণে সক্ষম।

৩) এবার আসি মোজেসরদের খাদ্যাভ্যাস জানার সবচেয়ে উপযোগী পন্থায়। কার্বন-১৩ ডেটিং। উচ্চ পরিমাণে লিপিড থাকে এমন খাদ্য খাদকের শরীরে কার্বন-১৩ আইসোটপের পরিমাণ কমায়। অর্থাৎ কোনো খাদকের ট্রপিক লেভেল অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাদ্য গ্রহণের ব্যাস্তানুপাতিক। মোজেসরদের ফসিলে এই কার্বন-১৩ আইসোটপের পরিমাণ অনেক কম। যা প্রমাণ করে মোজেসররা বিভিন্ন সামুদ্রিক টারটল, বনি ফিশ আর সরীসৃপকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতো। এইসব খাদ্যে লিপিডের পরিমাণ অনেক বেশি।

মোজেসরাস সর্বকালের সর্ববৃহৎ সামুদ্রিক সরীসৃপ ছিলো না। তার থেকে বৃহৎ সামুদ্রিক সরীসৃপ শাসট্যাসরাস (Shastasaurus)। কিন্তু শাসট্যাসরাস মোজেসরাসের মতো এতো ভয়ংকর শিকারী ছিলো না। তাই তারা সমুদ্রে ত্রাস সৃষ্টি করতে পারে নি মোজেসরাসের মতো। এই মোজেসরাসের বাসস্থান উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকা হতে শুরু করে এশিয়া, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়ায় বিস্তৃত ছিলো। হাঙ্গেরীতে স্বচ্ছ পানির মোজেসরাসও বাস করতো।

মোজেসরাসদের বিলুপ্তি ঘটে K-Pg ইভেন্টে যা K-T ইভেন্ট নামেও পরিচিত। K-Pg দ্বারা বুঝায় ক্রিটেশাস-প্যালিওজিন সীমা এবং K-T দ্বারা বুঝায় ক্রিটেশাস-টারশিয়ারি সীমা। এই সময়ে শুধু সমুদ্রের বাদশাহ মোজেসরই না, পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো সেই সময়ের পৃথিবী রাজত্ব করা সব প্রাণীরা। এই লিস্টে রয়েছে ডাইনোসর, নানারকমের স্তন্যপায়ী, টেরোসর, পাখি, উদ্ভিদ প্রভৃতি। কী হয়েছিলো এই সময়কালে? কী কারণে পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে গেলো এত প্রাণ?এই নিয়ে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব হলো, “আলভারেজ তত্ত্ব”। পিতা লুই আলভারেজ ও পুত্র ওয়াল্টার আলভারেজ এই তত্ত্ব প্রদান করেন। তারা বলেন ঐ ইভেন্টে ১০-১৫ কিমি ব্যাসের একটি উল্কা বা গ্রহাণু পৃথিবীতে আঘাত হানে; হতে পারে সেটা কোনো ধুমকেতু। ফলে পৃথিবীর পরিবেশের ভারসম্য পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। পরবর্তীতে ৯০ এর দশকে মেক্সিকো সাগরের উপদ্বীপ ইউকাটানে ১৮০ কিমি চওড়া উল্কা খাদ আবিষ্কৃত হয়; চিকসুলাব উল্কা খাদ। এছাড়া ঐ সময়ের আগ্নেয়োচ্ছ্বাস, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিও কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

মোজেসরাস ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে অনেক প্রিয় তার প্রধান কারণ এরা সামুদ্রিক। সমুদ্রের নিচে টিকে থাকা, বাস করা, রাজত্ব করা প্রাণীগুলো মিলিয়ন বছর আগের হোক বা বর্তমানের, আমার কাছে তারা রহস্যময়। সমুদ্রের নিচে রাজত্ব করা এই গিরগিটি সম্পর্কে জানার পর আপনার বাসায় হেঁটে বেড়ানো গিরগিটি বা বাগানে থাকা মনিটর লিজার্ডের প্রতি হয়তো আকর্ষণ বাড়বে। মোজেসরাস নিয়ে আর্টিকেলের এই তথ্যবহুল অংশ শেষ করব একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে। মোজেসরাস গণের মধ্যে বৃহত্তম আকৃতির মোজেসর পাওয়া গেছে Mosasaurus hoffmanni প্রজাতির।

What if?

আর্টিকেলের এই অংশে একটু নিজের চিন্তা প্রকাশ করব। এই অংশের ধারণা জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেল “What if” থেকে মাথায় আসছে। ঐ চ্যানেলে উল্লেখিত একটি ইন্টারেস্টিং মতামতের সাথে আমার নিজস্ব কিছু আইডিয়া তুলে ধরলাম এই অংশে:

১) আমরা জেনেছি মোজেসরাসদের মধ্যে প্যারেন্টাল কেয়ারিং এর বিষয় ছিলো। কেমন হতো যদি প্যারেন্টাল কেয়ারিং ছাড়াও মোজেসরাস দল বেঁধে আক্রমণ করত? ওয়ান ভার্সেস ওয়ান যুদ্ধে মোজেসরাস মেগালোডন শার্কের তেমন কোনো ক্ষতি করতে পারবে না ঠিক; কিন্তু ৫০-৫৮ ফুট লম্বা সদস্যবিশিষ্ট এক দল মোজেসরাস ইতিহাসের যে কোনো ভয়ানক বা বৃহত্তম সামুদ্রিক প্রাণীকেই হারাতে পারতো সহজে।

২) What if এর থিওরি অনুসারে, মোজেসরাস প্রাণীরা যদি কোনো ভাবে K-Pg ইভেন্ট সার্ভাইভ করতে পারতো তবে মেগালোডন শার্ক হয়তো সমুদ্রের রাজত্ব পেতো না। কারণ, মোজেসরাসদের অন্যতম খাদ্য ছিলো শার্ক। মেগালোডন শার্ক তরুণ অবস্থাতেই মোজেসরাসদের খাদ্যে পরিণত হয়ে অচিরে নিজেদের অস্তিত্ব হারাতো।

৩) ঘ্রাণশক্তি প্রখর হলে আরও অনেক প্রজাতির প্রাণী মোজেসরাসদের খাদ্য তালিকায় শামিল হতো। তাদের শিকারের দক্ষতা বৃদ্ধি পেতো।

৪) প্রথম পয়েন্টে বলেছি মেগালোডন শার্ক আর মোজেসরাসের ওয়ান ভার্সেস ওয়ান যুদ্ধে মেগালোডন জিতবে। এর অন্যতম কারণ মেগালোডনের দাঁত পাঁচ সারি যেখানে মোজেসরাসের দাঁত দুই সারি। আবার মেগালোডন শার্ক সাইজে এত বড় যে মোজেসরাস তার চোয়ালে কখনোই মেগালোডনকে তেমনভাবে আটকাতে পারবে না। এজন্য মেগালোডনকে আহত করা কঠিন। হয়তো পাখনা বা প্যাডলের মতো কোনো অংশকে ভেঙে ফেলতে পারবে মোজেসরাস যেখানে মেগালোডন শার্ক একটা মোজেসরাসের অবস্থা দফারফা করতে পারে। কিন্তু একটা মজার বিষয় এই দুই প্রাণীর সামর্থ্য তুলনা করার সময় সবখানে উপেক্ষা করা হয়েছে। মেগালোডন শার্কের সাঁতারের গতি ১৮ কিমি প্রতি ঘন্টা যেখানে মোজেসরাসের গতি ৩০ মাইল প্রতি ঘন্টা (তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া)। অর্থাৎ, মোজেসরাসের গতি প্রায় ২.৬৮ গুণ। এবার ভাবুন। কেউ আপনার তেমন কোনো ক্ষতি করতে পারলো না, তবে আপনার আঙুলের একটা নখ উপড়ে দিয়ে বা আঙুল ভেঙে দিয়ে ভোঁ দৌড় দিলো, আপনি তাকে ধরতেই পারলেন না। কে জিতবে? দেখেন ভাই, অপু ভাইয়ের ভাষায়, “মোজেসরাস জিতলে কি আমি ফাচ টাকা পাবো?” তবু স্পিডের বিষয়টা মাথায় রেখে যতবার আমি মেগালোডন শার্ক আর মোজেসরাসের যুদ্ধের কথা কল্পনা করেছি, মোজেসরাস জিতেছে শুধু তার এই স্পিডের জন্য।

যা হোক, K-Pg বিলুপ্তির সময়কাল মোজেসরদের জন্য সার্ভাইভ করা সম্ভব ছিলো না। কিছু সামুদ্রিক লেদ্যারব্যাক কচ্ছপ আর কুমির ছাড়া ঐ সময়ের রাজত্ব করা তেমন কোনো প্রাণী টিকে থাকতে পারেনি৷ পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে নাম লিখিয়েছে ইতিহাসের পাতায়।

মোজেসরাস বনাম মেগালোডন

তথ্যসূত্রঃ

১) https://en.wikipedia.org/wiki/Mosasaurus
২) https://en.wikipedia.org/wiki/Mosasaur
৩) https://www.britannica.com/animal/mosasaur
৪) https://www.fossilguy.com/…/reptile/mosasaur/index.htm
৫) https://youtu.be/5mnb4PppvmE
৬) https://en.wikipedia.org/wiki/Megalodon
৭) https://en.wikipedia.org/wiki/Cretaceous-Paleogene_extinction_event
৮) https://youtu.be/zxFHw0p50Xg

প্রজেশ দত্ত
বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহ, ভালোবাসার জন্ম সেই ২০১৪ সালে। অভিজিৎ রায়ের হাত ধরে। তার "ভালোবাসা কারে কয়" বইটা এখনো আমার কাছে বাংলা ভাষায় লিখিত সবথেকে প্রিয় বিজ্ঞান বিষয়ক বই। আমি প্রজেশ দত্ত, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যন্ত্রকৌশল বিভাগে অধ্যয়নরত রয়েছি। প্রকৌশল নিয়ে পড়াশুনা করলেও আমার সবথেকে প্রিয় বিষয় বিবর্তন, মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান। এজন্য ২০১৯ এ লেখালেখিতে পদার্পনের পর যত প্রবন্ধ লিখেছি প্রায় সবগুলো এই ধারার। বর্তমানে বিজ্ঞানব্লগে লেখালেখি ছাড়াও ব্যাঙের ছাতার বিজ্ঞান গ্রুপের মডারেটর হিসেবে অবদান রাখছি।