শারীরতত্ত্ব এবং মেডিসিনে নোবেল ২০২২ 

এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্যের মতই আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন স্যাপিয়েন্সদের ভাবিয়ে এসেছে এতকাল। আর সেটা বুদ্ধিমান হোমো স্যাপিয়েন্সদের নিজেদের উদ্ভব বিষয়ে। এখানে স্যাপিয়েন্স বলতে আলাদা করে কেবল হোমো স্যাপিয়েন্সদেরকেই বোঝাচ্ছি। কেননা এই ধরিত্রীতে স্যাপিয়েন্সরা আসলে একা ছিল না। পৃথিবীর মাটিতে হেঁটে বেড়াতো হোমো গণের আরও কিছু সদস্য। তাদের মধ্যেই দুটো আলাদা স্বতন্ত্র প্রজাতি হচ্ছে হোমো নিয়ানডার্থাল আর হোমো ডেনিসোভান। তারা আমাদের-ই জ্ঞাতি ভাই ছিল। আজ থেকে তিন লাখ বছর আগে আধুনিক মানুষ তথা স্যাপিয়েন্সদের আবির্ভাব ঘটে প্রাচীন আফ্রিকায়। নিয়ানডার্থালদের উদ্ভব তারও এক লাখ বছর আগে। অর্থাৎ চার লাখ বছর আগে। ইউরোপ আর পশ্চিম এশিয়ার বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত তারা। স্যাপিয়েন্সরা আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাত্রা শুরু করে সত্তর হাজার বছর আগে। সেখান থেকে তারা ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র বিশ্বে। 

এবছর শারীরতত্ত্বে নোবেল জেতেন সুইডিশ জিনতত্ত্ববিদ সোয়ান্তে প্যাবো।

স্যাপিয়েন্সরা নিয়ানডার্থালদের সংস্পর্শে আসে ইউরেশিয়ায়। হাজার হাজার বছর তারা একসাথে বসবাস করে এই অঞ্চল জুড়ে। এমনকি তাদের মধ্যে প্রজননের ঘটনাও ঘটে। এভাবে নিয়ানডার্থাল আর স্যাপিয়েন্সদের মধ্যে জিন এর বিনিময় হয়। কিন্তু আমরা তথাকথিত আধুনিক মানুষেরা তাদের মনে রাখি নি। সে যাই-ই হোক! নিয়ানডার্থালরা তাদের আত্মীয়তার ছাপ রেখে গেছে আমাদের ডিএনএ তে। জিনোম সিকোয়েন্সিং এর কল্যাণে আজ ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়েছে নিয়ানডার্থালদের সাথে আমাদের আত্মীয়তার প্রমাণাদি। তবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে কেবল স্যাপিয়েন্সদের জিনের ভাষা পাঠোদ্ধার-ই যথেষ্ট নয়। সেজন্যে দরকার ছিল নিয়ানডার্থালদের জিনোম সিকোয়েন্সিং করা।

স্যাপিয়েন্সরা আফ্রিকা থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র বিশ্বে। স্যাপিয়েন্সরা নিয়ানডার্থালদের সাথে মিলিত হয় পশ্চিম ইউরেশিয়ায়। আর ডেনিসোভানদের সাথে মিলিত হয় পূর্ব ইউরেশিয়ায়। গবেষণা বলছে দীর্ঘসময় একসাথে বসবাস করা কালীন সময়ে তাদের মধ্যে প্রজনন এর ঘটনাও ঘটে।

কিন্তু নিয়ানডার্থালরা এখন বিলুপ্ত। সুতরাং এক্ষেত্রে একমাত্র ভরসা তাদের প্রাগৈতিহাসিক ফসিল গুলো। হাজার হাজার বছরের সেসব ফসিল থেকে ডিএনএ উদ্ধার করে সিকোয়েন্সিং করাটা মোটেও সহজ কারবার নয়। আর সেই অসাধ্য-ই সাধন করেছেন সুইডিশ জিনতত্ত্ববিদ সোয়ান্তে প্যাবো। তবে শুধু নিয়ানডার্থালদের জিনোম-ই নয়। স্যাপিয়েন্সদের আরেক জ্ঞাতি ভাই হোমো ডেনিসোভানদের জিনোমের ভাষাও উদ্ধার করেন তিনি আর তার গবেষণা দল। এভাবেই পেলিওজিনোমিক্স (পুরাজিনোমবিদ্যা) নামে বিজ্ঞানের সম্পূর্ণ নতুন একটি শাখার জন্ম হয় তার হাত ধরে। এতসব কীর্তির স্বীকৃতি স্বরুপ এবছর শারীরতত্ত্বে নোবেল জেতেন তিনি। 

নিয়ানডার্থালদের জিনোম রহস্য উদঘাটন

১৯৯০ সালের শেষদিকে বিজ্ঞানীরা মানুষের প্রায় সম্পূর্ণ জিনোমের-ই সিকোয়েন্স করে ফেলেন। নিয়ানডার্থালদের জিনোম রহস্য উদঘাটনে জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করার ইচ্ছা সোয়ান্তের প্রথম থেকেই ছিল। কিন্তু খুব শীঘ্রই তিনি এ বিষয়ে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জটা বোঝতে পেরেছিলেন। সময়ের সাথে সাথে ডিএনএ এর রাসায়নিক গঠন পরিবর্তিত হয়। হাজার বছরের ব্যবধানে নিয়ানডার্থালদের ফসিলে থাকা ডিএনএ এর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। তাছাড়া ডিএনএ গুলো ব্যাকটেরিয়া আর সমসাময়িক মানুষদের ডিএনএ দিয়ে কলুষিত ছিল। সমস্যা সমাধান কল্পে প্যাবো নিয়ানডার্থালদের জিনোম রহস্য উদঘাটনে একটা নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন। পরবর্তীতে তিনি মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি নিয়ানডারথালদের মাইটোকন্ড্রিয়ার ডিএনএ নিয়ে কাজ করবার সিদ্ধান্ত নেন। বলে রাখা ভালো কোষে কেবল নিউক্লিয়াসেই ডিএনএ থাকে না। মাইটোকন্ড্রিয়ায়ও ডিএনএ থাকে। 

হাজার বছরের ব্যবধানে নিয়ানডার্থালদের ফসিলে থাকা ডিএনএ এর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে।

নিজের উদ্ভাবন করা পদ্ধতি দিয়ে চল্লিশ হাজার বছরের পুরোনো একটি নিয়ানডার্থাল হাড়ের ফসিল থেকে প্রাপ্ত মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ এর সিকোয়েন্সিং করেন। এটাই ছিল সম্পূর্ণ আলাদা কোন স্বতন্ত্র হোমিনিন এর প্রথম জিনোম সিকোয়েন্সিং।

মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ জীবের খুব কম পরিমাণ জিনোমিক তথ্য ধারণ করে। তাই এবার প্যাবো সিদ্ধান্ত নেন নিয়ানডার্থালদের কোষের নিউক্লিয়াসে থাকা ডিএনএ এর জিনোম রহস্য উদঘাটন করার। জার্মানির লিপজিগে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইন্সটিটিউটে বসে সোয়ান্তে প্যাবো এবং তার গবেষণা দল মিলে উদ্ভাবন করলেন জিনোম সিকোয়েন্সিং এর নতুন কৌশল। সেই কৌশল ব্যবহার করে ২০১০ সালে প্রথম তারা নিয়ানডার্থালদের সম্পূর্ণ জিনোম রহস্য উন্মোচন করেন। গবেষণালব্ধ ফলাফল বলে যে, নিয়ানডার্থাল এবং আধুনিক হোমো স্যাপিয়েন্সদের সাধারণ পূর্বপুরুষ আট লাখ বছর আগে বসবাস করত। নিয়ানডার্থালদের জিনোমের সাথে সবচাইতে বেশি মিল পাওয়া যায় ইউরেশিয়ায় বসবাস করা স্যাপিয়েন্সদের জিনোমের সাথে। আফ্রিকান সমসাময়িক স্যাপিয়েন্সদের জিনোম এর সাথে এতটা মিল পাওয়া যায় নি। তার মানে ইউরেশিয়ায় বসবাস কালে স্যাপিয়েন্স আর নিয়ানডার্থালরা পরস্পরের সাথে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছিল। গবেষণা বলে ইউরোপ আর এশিয়ার আধুনিক মানুষদের জিনোমের এক থেকে চার শতাংশ এসেছে নিয়ানডার্থালদের জিনোম থেকে। 

ডেনিসোভা গুহায় হোমো ডেনিসোভানদের আগমন

২০০৮ সালে দক্ষিণ সাইবেরিয়ার ডেনিসোভা গুহায় একটা আঙ্গুলের হাড়ের ফসিল খুঁজে পাওয়া যায়। ফসিলটা চল্লিশ হাজার বছরের পুরনো। সোয়ান্তে এবং তার গবেষণা দল ফসিলে থাকা ডিএনএ এর জিনোম সিকোয়েন্স করেন। প্যাবো অবাক হয়ে লক্ষ করলেন, ফসিলটার জিনোম নিয়ানডার্থাল এবং আধুনিক মানুষদের জিনোম থেকে আলাদা।

ডেনিসোভা গুহায় প্রাপ্ত ফসিল সংগ্রহের কাজ চলছে।

এভাবেই প্যাবো ডেনিসোভা গুহায় হোমো গণের সম্পূর্ণ নতুন আরেকটা সদস্যের সন্ধান পান। ডেনিসোভা  গুহার নামে নাম দেয়া হয় হোমো ডেনিসোভান। আধুনিক মানুষেরা যখন আফ্রিকা থেকে যাত্রা শুরু করে ইউরেশিয়ায় তখন দুইটা স্বতন্ত্র হোমিনিন বসবাস  করত। পশ্চিম ইউরেশিয়ায় হোমো নিয়ানডার্থাল আর পূর্ব ইউরেশিয়ায় হোমো ডেনিসোভানরা। স্যাপিয়েন্সরা ডেনিসোভানদের সাথেও প্রজননে লিপ্ত হয়েছিল। আর সেজন্যেই দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আধুনিক মানুষদের জিনোমের ছয় শতাংশ এসেছে ডেনিসোভানদের থেকে। 

পুরাজিনোমবিদ্যা  

সোয়ান্তে প্যাবো তার অসাধারান গবেষণার মাধ্যমে প্যালিওজিনোমিক্স নামে  বিজ্ঞানের সম্পূর্ণ নতুন এক স্বতন্ত্র শাখার জন্ম দিয়েছেন। প্যাবো এবং তার গবেষণা দল মিলে স্যাপিয়েন্সদের কয়েকটি হোমিনিন এর জিনোম সিকোয়েন্স সম্পন্ন করেন। আধুনিক মানুষের বিবর্তনের ইতিহাস জানতে এই গবেষণা মৌলিক ভূমিকা রাখে। আধুনিক মানুষদের শরীরে থাকা অন্য হোমিনিন সদস্যদের জিনের প্রভাব সম্পর্কে বেশ ভালো ভাবে ধারণা পাওয়া যায় এই গবেষণা থেকে। উদাহরণস্বরুপ ডেনিসোভানদের থেকে পাওয়া EPAS1 জিন উঁচু ভুমিতে টিকে থাকতে ভূমিকা রাখে। বর্তমানে অধিকাংশ তিব্বতিদের ডিএনএ-তেই এই জিন এর উপস্থিতি আছে। অন্যদিকে নিয়ান্ডার্থাল জিন বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। ২০২০ সালে প্যাবো এবং তার গবেষণা দল আবিষ্কার করেন যে, যাদের জিনোমে নিয়ানডার্থালদের জিন প্রকারণের উপস্থিতি আছে তাদের ক্ষেত্রে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ অন্যদের থেকে তীব্রতর হতে পারে।   

সোয়ান্তে প্যাবো নিয়ানডার্থাল এবং ডেনিসভানদের ফসিল থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে জিনোম সিকোয়েন্স সম্পাদন করেন। পাশের ফাইলোজেনেটিক ছবিটি স্যাপিয়েন্স এবং অন্য হোমিনিনদের মধ্যে বিবর্তনীয় সম্পর্ককে প্রদর্শন করে।

আধুনিক স্যাপিয়েন্সরা জটিল শিল্প-সংস্কৃতি, সভ্যতা গড়ে তুলেছে। সেই সাথে তারা উদ্ভাবন করেছে নতুন নতুন আধুনিক প্রযুক্তি। তারা সাগর-মহাসাগর পাড়ি দিয়ে বিশ্ব ভ্রমণ করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। নিয়ানডার্থালরাও স্যাপিয়েন্সদের মতো বড় মস্তিষ্কের অধিকারি ছিল। ছিল পেশী বহুল দেহ। তারাও সেসময় তাদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ব্যবহার করত। কিন্তু স্যাপিয়েন্সদের মত তাদের প্রযুক্তিজ্ঞান উন্নত হয় নি। আর এসবই স্যাপিয়েন্সদের অন্যদের থেকে অন্যন্য করেছে। কিন্তু এর পেছনে জিনগত কারণটা কি? কেন স্যাপিয়েন্সরা অন্য হোমিনিনদের থেকে আলাদা? প্যাবো এবং তার দল আধুনিক মানুষদের জিনোম এ কিছু সাধারণ জিন প্রকারণ এর উপস্থিতি খুঁজে পেয়েছেন। এই প্রকারণ গুলো নিয়ানডার্থালদের জিনোমে অনুপস্থিত। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখনো এই প্রকারণ গুলোর সাথে মানুষের শিল্প চর্চা, জটিল সমাজ-সংস্কৃতি গড়ে তুলবার সম্পর্ক এর হদিস পান নি। সোয়ান্তে প্যাবো কাজ করে যাচ্ছেন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে।     

পরিশেষে সোয়ান্তে প্যাবো এবং তার গবেষণা দলকে অভিনন্দন আর কৃতজ্ঞতা। তাদের এই চমৎকার উদ্ভাবনের জন্যে আমরা জানতে পেরেছি অন্য হোমিনিন সদস্যদের সাথে আমাদের সম্পর্কটা কোথায়। তাদের থেকে আমরা ঠিক আলাদা কোন দিক থেকে।   

সূত্রঃ

Sujoy Kumar Das
বিজ্ঞান ব্লগের নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে আছি। পড়াশোনা করছি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগে।