বিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার-২০২২

বিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার-২০২২

নোবেল পুরষ্কারের নাম শোনেনি এমন পাঠক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে নোবেল পুরস্কার প্রবর্তনের পর থেকে বিভিন্ন বিজ্ঞানী এ পর্যন্ত নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। নোবেল পুরষ্কারের তিনটি ক্ষেত্র বিজ্ঞান সম্পর্কিতঃ পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এবং চিকিৎসাবিদ্যা। এ বছর কারা কারা এই তিন সেক্টরে নোবেল পেলেন, সেটা নিয়েই আজকের লেখা। চলুন, শুরু করা যাক!

চিকিৎসাবিজ্ঞান ও শারীরতত্ত্ব

করলিনস্কা ইনস্টিটিউটে বহু মানুষের উপস্থিতিতে শারীরতত্ত্বে এ বছর নোবেল বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়। আর এই লরিয়েট হলেন সুইডিশ বিজ্ঞানী সোয়্যান্তে প্যাবো। তিনি হোমো স্যাপিয়েন্স (আধুনিক মানুষ) এর বিলুপ্ত পূর্বপুরুষ নিয়ানডার্থালদের জিনোম সিকোয়েন্স আবিষ্কার করেছেন। বিজ্ঞানী প্যাবো দেখিয়েছেন যে ৭০,০০০ বছর আগে আফ্রিকা থেকে স্থানান্তরের পরে এই বিলুপ্ত হোমিনিন থেকে হোমো স্যাপিয়েন্সের জিন স্থানান্তর ঘটেছে। হোমো স্যাপিয়েন্স ইউরোপ ও পশ্চিম আফ্রিকায় স্থানান্তরিত হওয়ার আগে লম্বা সময় ধরে তারা নিয়ানডার্থালদের সাথে ছিল।

নোবেল লরিয়েট হলেন সুইডিশ বিজ্ঞানী সোয়্যান্তে প্যাবো

পূর্বে তিনি হোমিনিন ডেনিসোভা নিয়েও গবেষণা করেছেন। আধুনিক মানুষের সাথে বিলুপ্ত পূর্বপুরুষদের কী কী জেনেটিক পার্থক্য আছে, সেটাও উঠে এসেছে তারঁ গবেষণার মাধ্যমে। নোবেল কমিটি বলেছেন যে তিনি অসম্ভব কিছু অর্জন করেছেন। বিজ্ঞানী প্যাবোর এই গবেষণা “প্যালিওজিনোমিক্স” নামে বিজ্ঞানের একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। তাঁর আবিষ্কার মানব বিবর্তনের বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিকে আরও মজবুত করেছে।

প্যাবোর জন্ম ১৯৫৫ সালে। তিনি সুইডেনের উপশালা ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করেছেন। এরপর পোস্ট ডক্টরেট রিসার্চ করেন সুইজারল্যান্ডের জুরিখ ইউনিভার্সিটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ায়। বর্তমানে তিনি ম্যাক্স প্ল্যাংক ইন্সটিটিউট ফর এভুলিউশানারি অ্যানথ্রোপোলজিতে কর্মরত। এর পাশাপাশি অধ্যাপনার মাধ্যমে যুক্ত আছেন জাপানের ইন্সটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির সাথেও। মজার বিষয় হলো ঠিক ৪০ বছর আগে ১৯৮২ সালে একই বিভাগে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন তাঁর বাবা বার্গস্ট্রম।

পদার্থবিজ্ঞান

নিউটন-আইন্সটাইনের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছেন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের তিনজন গবেষকঃ অ্যালান অ্যাসপেক্ট(ফ্রান্স), জন এফ ক্লাউসার(যুক্তরাষ্ট্র) এবং অ্যান্টন জেইলিঙ্গার(অস্ট্রিয়া)। তাঁরা মূলত কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কোয়ান্টাম অ্যান্টেঙ্গেলমেন্ট নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। আধুনিক কোয়ান্টাম ইনফরমেশন অনেকাংশেই এই ধর্মের উপর নির্ভরশীল। তাই এই তিন বিজ্ঞানীর গবেষণা পুরো কোয়ান্টাম জগৎকে নতুন করে আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে। তাঁদের গবেষণার ফলে কোয়ান্টাম কম্পিউটার এবং তথ্যপ্রবাহে কোয়ান্টাম নিরাপত্তার বিষয়ে নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, ঠিক একশ বছর আগে ১৯২২ সালে কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়ে কাজ করে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী নিলস বোর।

অ্যাসপেক্ট, ক্লাউসার এবং জেইলিঙ্গার (বাম থেকে ডানে)

অ্যালান অ্যাসপেক্টের জন্ম ১৯৪৭ সালে। তিনি Paris-Sud University থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। জন এফ ক্লাউসারের জন্ম ১৯৪২ সালে। তিনি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। অ্যান্টন জেইলিঙ্গারের জন্ম ১৯৪৫ সালে। তিনি ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেছেন। বুঝতেই পারছেন, তাঁরা কতটা বুড়ো আর অভিজ্ঞ।

রসায়ন

ক্লিক কেমিস্ট্রি এবং বায়োঅর্থোগোনাল কেমিস্ট্রিতে অবদান রাখায় রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ক্যারোলিন আর.বার্টোজি, কোপেনহেগেন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর মর্টেন মেলডাল এবং ক্যালিফোর্নিয়ার স্ক্রিপস রিসার্চ সেন্টারের প্রফেসর কার্ল ব্যারি শার্পলেস।

কোনো বড় সাইজের জৈব রাসায়নিক অণু বানাতে সাধারণত বেশ সময় লাগে আর পদ্ধতিগুলোও বেশ জটিল। প্রফেসর শার্পলেস ভাবলেন যে ভিন্ন কিছু করলে কেমন হয়? তিনি বড় সাইজের অণুর অংশবিশেষ(ব্লক) সহজে তৈরি করলেন এবং এরপর বিশেষ প্রভাবকের উপস্থিতিতে জোড়া লাগিয়ে দিলেন। মজার বিষয় হলো, শার্পলেস এর আগেও একবার ২০০১ সালে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন।

শার্পলেস, বার্টোজি এবং মেলডাল (বাম থেকে ডানে)

আর এই জিনিসটা নিয়ে আরও কাজ করেছেন বার্টোজি এবং মেলডাল। শার্পলেস এবং মেলডাল স্বতন্ত্রভাবে এই পদ্ধতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আবিষ্কার করেন, সেটি হলো কপার ক্যাটালাইজড অ্যাজাইড অ্যালকাইন সাইক্লো-এডিশন। এই গালভরা নামের অর্থ হলো অ্যালকাইন আর অ্যাজাইড (N3 বিশিষ্ট অণু) কপার মূলকের উপস্থিতিতে দ্রুত বিক্রিয়া করে এবং জোড়া লেগে যায়। যেহেতু এটা দ্রুত হয়, তাই একে “ক্লিক বিক্রিয়া” বলা হচ্ছে। আর বার্টোজি দেখিয়েছেন যে কীভাবে জীবকোষের ভেতরে এই ক্লিক বিক্রিয়া ঘটে। আর এর মাধ্যমেই তিনি বায়োঅর্থোগোনাল বিক্রিয়া আবিষ্কার করে ফেলেন।

সামনের দিনে রসায়নের এই গবেষণা মানব শারীরতত্ত্ব ও চিকিৎসার নতুন দ্বার উন্মোচন করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা ভাবছেন।

কার্ল ব্যারি শার্পলেসের জন্ম ১৯৪১ সালে। তিনি স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে জৈব রসায়নে পিএইচডি করেছিলেন। মর্টেন মেলডাল ১৯৫৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি অফ ডেনমার্ক থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর উপরে পিএইচডি করেছিলেন। বার্টোজির জন্ম ১৯৬৬ সালে। তিনি ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলি থেকে পিএইচডি করেছিলেন।

তো, মোটামুটি এই হলো “বিজ্ঞান” খাতে এবারের নোবেলের কাহিনী। খুবই সংক্ষেপে আলোচনা করা চেষ্টা করেছি। আশা করি ভাল্লাগসে। এগুলোর ব্যাপারে বিস্তারিত নিচের লিংকগুলোতে আছে, চাইলে পড়তে পারেন। Goodbye!

তথ্যসূত্রঃ
১. The Nobel Prize in Physiology or Medicine 2022
২. The Nobel Prize in Physics 2022
৩. How entanglement has become a powerful tool
৪. The Nobel Prize in Chemistry 2022
৫. It just says click – and the molecules are coupled together

[এই ব্লগ পোস্টের কিছু অংশ ইতিমধ্যে “Scientia Society” এর ফেসবুক পেইজে প্রকাশিত হয়েছে]

তাহসিন আলম উৎস
লিখতে লিখতে শিখতে চাই। বর্তমানে বিজ্ঞান ব্লগের পাশাপাশি সায়েন্টিয়া সোসাইটি, বিজ্ঞান পত্রিকা, হিগজিনো সায়েন্স সোসাইটি এবং বোসন বিজ্ঞান সংঘ এর সাথে যুক্ত আছি। আমি সেই বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে প্রতিটা সমাজে বিজ্ঞানশিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণের জয়ধ্বনি বাজবে। আর এই লক্ষ্যে বিজ্ঞানের একজন সৈনিক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি।