কী কী প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে এবারের কাতার বিশ্বকাপে?

লেখাটি বিভাগে প্রকাশিত

প্র তি ৪ বছর পর পর মহারণ চলে বিশ্বে। এ মহারণ কোন যুদ্ধ এবং অর্থনীতিকে নিয়ে নয়। বরং ফুটবল নিয়েই এমন মহারণ চলে। বিশ্বমঞ্চে চলমান এ মহারণ বরাবরের মতো এবারো সকল অনলাইন এবং প্রিন্ট মিডিয়ার হট কেক। এটি নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়েছে গ্যালারি থেকে পাড়ার গলিপথ এবং বাসাবাড়িতেও। বিশ্বায়নে এমন এক যুগে আমরা বসবাস করছি যেখানে প্রযুক্তি নিয়ে কোন কথা না উঠলে যেকোন দিক দিয়ে উড়ুক্কু জুতো ধেয়ে আসতে পারে। প্রযুক্তি এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে আমাদের সবার মাঝে!

ফুটবল বিশ্বকাপও বাদ যায়নি প্রযুক্তির ছোঁয়া থেকে। এবারের এ লেখায় সেগুলোকেই মূল উপজীব্য ধরে এগোনোর চেষ্টা করবো। তাহলে চলুন দেখে আসি বিশ্বমঞ্চে ব্যবহৃত কয়েক ধরণের প্রযুক্তি সম্পর্কে :

শীতাতপনিয়ন্ত্রিত স্টেডিয়াম

স্টেডিয়ামগুল তাপ সহনশীল এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রিত।

মধ্যপ্রাচ্যে দিনের বেলার তাপমাত্রা সম্পর্কে হয়তো আর নতুন করে কিছু বলে দিতে হবে না। সেখানকার উচ্চ তাপমাত্রা দর্শক ও খেলোয়াড়দের ভোগাতে পারে- এমন আশঙ্কা আগে থেকেই করেছিল কাতার কর্তৃপক্ষ। তাইতো তারা স্টেডিয়ামগুলোকে করেছে তাপ সহনশীল এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। আর এই প্রযুক্তির নাম দেয়া হয়েছে ড. কুল। যা উদ্ভাবন করেছে কাতার ইউনিভর্সিটি কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং। তবে সব স্টেডিয়ামে প্রয়োজন হচ্ছে না এই ব্যবস্থার। সমুদ্র তীরে অবস্থিত স্টেডিয়ামগুলোর জন্য সমুদ্র তীর হতে পাইপলাইনের মাধ্যমে টেনে আনা হবে বাতাস।

কাম অ্যাপ

আচ্ছা একজন ফুটবলারের কথা কি কখনো ভেবে দেখেছেন? যখন চতুর্দিকে খেলার সময় দর্শকদের হৈ-হট্টগোল শুরু হয় তখন কিভাবে তারা মাথাটা ঠিক রেখে নিজেদের সেরাটা দিয়ে খেলে যান? এজন্য তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবশ্যই প্রশংসা করতে হয়। ফুটবলার এবং তাদের সাথে জড়িত সম্প্রদায়ের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পরিসেবার জন্য কর্তৃপক্ষ নিয়ে এসেছে ‘কাম’ অ্যাপ। যা চালু থাকবে আগামী নারী বিশ্বকাপ এবং নেশন্স কাপেও। আশ্চর্য্যজনক এবং একইসাথে আনন্দদায়ক ব্যাপারটি হচ্ছে এর মাধ্যমে ভক্তরাও নিজেদের মানসিক অবস্থার পরিচর্যার সুযোগ পাবেন।

ফিফা প্লেয়ারস অ্যাপ

ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়দের নিজেদের পারফরম্যান্স সম্পর্কে জানতে এ বিশ্বকাপে যুক্ত হয়েছে ফিফা প্লেয়ারস অ্যাপ। প্রতিটি ম্যাচ শেষে এই অ্যাপটি খেলোয়াদের মাঠের পারফরম্যান্স ও ডেটা অ্যাক্সেস করার সুযোগ দেবে। পাশাপাশি খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের ডেটা সিনক্রোনাইজ করা হবে যাতে ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়রা তাদের নিজেদের পারফরম্যান্স নিজেদের চোখেই দেখে নিতে পারেন। আত্মসংশোধন ও আত্মপর্যালোচনার জন্য এর চেয়ে ভাল উপায় আর কি হতে পারে বলুন?

সেমি অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি

কাতার বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকেই সর্বাগ্রে আলোচনায় থাকার জন্য আত্মগৌরব করতেই পারে এ প্রযুক্তি। তাও আবার টপ ট্রেন্ডিং টিম আর্জেন্টিনাকে নাস্তানাবুদ করার জন্য! সৌদি আরবের বিপক্ষের সেই ম্যাচে ১৩ মিনিটের মধ্যে তিনবার সৌদির জালে বল ঢুকিয়েছিলেন লিওনেল মেসিরা। অথচ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! তিনবারই পড়েছেন তারা অফসাইডের ফাঁদে। এই সেই প্রযুক্তি যা নাস্তানাবুদ করেছিল আর্জেন্টিনা ফুটবলার ও কোটি কোটি ভক্ত-সমর্থকদের। এ প্রযুক্তি ভালোভাবে ব্যবহারের জন্য স্টেডিয়ামে ১২ টি ট্র্যাকিং ক্যামেরা বসানো হয়েছে যার মাধ্যমে প্রত্যেক খেলোয়াড়ের ২৯টি ডেটা পয়েন্ট ট্র্যাক করা সম্ভব হচ্ছে। শুধু তাই নয় অ্যাডিডাসের তৈরি আল রিহলা বলেও লাগানো রয়েছে ট্রাকিং সেন্সর। যা প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার পর্যন্ত কিক পয়েন্ট ও অবস্থানের ডাটা রেকর্ড করতে পারে। একে বলা হয় কালেক্টেড বল টেকনোলজী।

সেমি অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি

খেলার মাঠের কালেক্টেড বল টেকনোলজি ও অপটিক্যাল ট্র্যাকিং সহ সকল দিক বিবেচনায় নেয়া হয় যেকোন সিদ্ধান্ত দেবার ক্ষেত্রে। পাশাপাশি বল নিয়ে অতিক্রম করার সময় খেলোয়াড়ের অবস্থান, তার দেহের বিভিন্ন অঙ্গের অবস্থানও রেকর্ড করে প্রসেস করা হয়। এর জন্য অপারেশন রুমের অ্যালগরিদম ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে আগে থেকে সব রকমের প্রশিক্ষণ দিয়ে রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে তারা তথ্যগুলো বিবেচনা করে অফসাইডের সিদ্ধান্ত দেয়। সিদ্ধান্ত নেবার সঙ্গে সঙ্গেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ম্যাচ অফিসিয়াল ও রেফারিকে জানিয়ে দেওয়া হয়। অফসাইড ট্রিগার হলে ট্র্যাকিং থেকে পাওয়া তথ্য দিয়ে থ্রি ডি অ্যানিমেশন তৈরি করা হয়। ফলে ম্যাচ অফিসিয়ালরা তো বটেই আপনি যদি টিভির স্ক্রিনের সামনে বসা থাকা একজন হয়ে থাকেন ওই মুহুর্তে আপনিও এটি দেখে নিতে পারবেন। মূলত সকল প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা হলেও সিদ্ধান্ত কিন্তু রেফারিই নিয়ে থাকেন। প্রযুক্তিতে রেফারির এমন হস্তক্ষেপ থাকায় একে আধা স্বয়ংক্রিয় বা সেমি অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি নামে নামকরণ করা হয়েছে।

গোললাইন প্রযুক্তি

২০১৪ সাল থেকে দেখা মিলছে এ প্রযুক্তির। বল গোলপোস্টের নির্ধারিত রেখা অতিক্রম করছে কিনা তা যাচাইয়ের জন্য এ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। এ প্রযুক্তির জন্য মাঠে ১৪টি করে আলাদা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা ব্যবহৃত হয়। এ প্রযুক্তি স্বতন্ত্রভাবে কাজ করে। বল গোললাইনের দাগ অতিক্রম করলেই রেফারির স্মার্টওয়াচে তৎক্ষণাৎ সেই তথ্য চলে যায়। ফলে রেফারি সিদ্ধান্ত দ্রুত জানিয়ে দেয়া। পাশাপাশি ভিডিও ও অ্যানিমেশনের মাধ্যমে স্ক্রিনেও দেখানো হয় এ তথ্য। মূলত এ ধরণের প্রযুক্তি চালু হবার পিছনের ঘটনাটা ঘটেছিল ২০১০ সালের আফ্রিকা বিশ্বকাপে। জার্মানির বিরুদ্ধে ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের একটি সুস্পষ্ট গোলকে ঘিরে। সে সময় এটি নিয়ে তুমুল আলোচনা হয়েছিল যার কারণে পরবর্তী বিশ্বকাপ থেকেই ফিফার পক্ষ থেকে এ প্রযুক্তি ব্যবহারের বাপারটি নিশ্চিত করা হয়।

এ আই

এ আই মানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রযুক্তি। ভিআর কিংবা সেমি অটোমেটেড অফসাইডের মতো প্রযুক্তিগুলো মূলত এর অন্তর্গত। খেলার মাঠে কেউ অফসাইড অবস্থায় বল রিসিভ করলে এর মাধ্যমে জেনে যাচ্ছেন রেফারি। চলতি কাতার বিশ্বকাপে এ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে ফিফা।

গোল রেফ

এটি এক ধরণের ড্যানিশ-জার্মান প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি বিতর্কিত বলের গতিপথ নির্ধারণে গোলপোস্টের সঙ্গে চৌম্বকীয় সেন্সর ব্যবহার করে নিখুঁত ছবি প্রদর্শন করে।

খেলার মাঠে ব্যবহৃত নানা প্রযুক্তি রয়েছে। তার মধ্যে যৎ সামান্যই উল্লেখ করেছি। মূলত প্রযুক্তির ব্যবহার এখনো সবক্ষেত্রে এত বিস্তৃত যে এটা নিয়ে আলাদা করে লিখা সম্ভব নয়। চলমান বিশ্বকাপে প্রযুক্তি এসেছে কারো উপর আশীর্বাদ হয়ে আবার আর্জেন্টিনার মতো জনপ্রিয় অনেক দলের উপর এসেছে ‘মরার উপর খরার ঘা’ হয়ে। তা যেভাবেই আসুক ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনের দিনকে এ সকল প্রযুক্তি আরো অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে এ সকল প্রযুক্তি সেটাই মনে করা হচ্ছে।

তথ্যসূত্রঃ

লেখাটি 130-বার পড়া হয়েছে।

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 904 other subscribers