এবার যুদ্ধ হবে আলঝেইমারের সাথে?

নতুন একটি ওষুধ আলঝেইমার রোগের কারণে হওয়া মানসিক অবনতিকে সাময়িকভাবে প্রতিহত করতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন। ১৭ জুলাই আমস্টারডামের আলঝেইমারস অ্যাসোসিয়েশন ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্সে উপস্থাপিত তথ্য এবং একই দিনে JAMA-তে প্রকাশিত তথ্য বলছে যে ডুনানেম্যাব নামক ওষুধটি দেড় বছরের ব্যবধানে বার্ধক্যজনিত আলঝেইমারের ফলে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা ৩৫% কমাতে সক্ষম হয়েছে।

“ইউএস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন” লেকানেম্যাব (লেকেম্বি) নামের আরেকটি ওষুধের সম্পূর্ণ অনুমোদন দেওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরে দেখা যায় ওষুধটি আলঝেইমার রোগের বৃদ্ধি ও প্রভাবকে থামিয়ে দিচ্ছে। গত গ্রীষ্মে অ্যাডুকানুম্যাব (অ্যাডুহেলম) নামের আরও একটি অনুরূপ ওষুধ খুব দ্রুতই অনুমোদন পেয়েছিল। তবে এই ওষুধগুলো লাস্ট স্টেজের রোগীদের ক্ষেত্রে অতটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেনি, যতটা প্রথম স্টেজের রোগীদের ক্ষেত্রে পেরেছিল।

আচ্ছা, এই যে আমি আলঝেইমারের কথা বলতেসি, এটা যে কী জিনিস, সেটা কি আপনি জানেন? “থর” খ্যাত হলিউড অভিনেতা ক্রিস হেমসওরথ এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। একে একটি স্নায়বিক অবক্ষয়জনিত রোগ বলা যায়, যা মানুষের স্মৃতি ভুলিয়ে দিতে পারে বা স্মৃতিবিভ্রমের কারণ হতে পারে। অনেকের মতো ডিমেনশিয়ার একটি ধরণ। সাধারণত ৬৫ বছর বা তার চেয়েও বেশি বয়সীদের আলঝেইমার রোগটি হয়ে থাকে। তবে অল্প বয়সীদেরও এ রোগ হতে পারে। রোগটি বাড়তে থাকলে ধীরে ধীরে রোগীর অবস্থার অবনতি হয়ে সে মারা যায়।

এবার আসুন, আমরা আমাদের আজকের আলোচনায় আসি। উপরে যেই ওষুধগুলোর কথা বললাম, ওগুলো আসলে সরাসরি অ্যামাইলয়েডকে টার্গেট করে প্রতিক্রিয়া দেখানো শুরু করে। এই অ্যামাইলয়েড আবার কী? এটি এক ধরণের স্টিকি প্রোটিন, যা মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর মাঝখানে জমা হয়ে মস্তিষ্কের কোষগুলোর কার্যকারিতা নষ্ট করে। এটা আলঝেইমারের একটি বৈশিষ্ট্য। যেহেতু ওষুধগুলো এই প্রোটিনের মাতব্বরি আটকাতে পারবে, তার মানে হলো রোগীর স্নায়বিক কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা আছে। একটি পরীক্ষায় দেখা যায়, যারা ডুমানেম্যাব গ্রহণ করেছিল, তাদের মধ্যে মানসিক অবক্ষয় মানে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা ৬০% পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।

লাস ভেগাসের নেভাডা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিদ জেফ্রি কামিংস বলেছেন, “আমি মনে করি এটি সত্যিই একটি সাগর পরিবর্তনের মতো ব্যাপার।“ তার মতে এটি চিকিৎসাজগতের একটি ব্রেকথ্রু। এই ওষুধের উন্নয়ন হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৬৭ লাখ আলঝেইমার রোগী নতুন আশা খুঁজে পাবে। কিন্তু এখানে একটা বাধা আছে। এই ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। শুধু তা-ই নয়, এগুলো বেশ ব্যয়বহুল হতে পারে। একারণে ওষুধগুলি সবার জন্য নয়।

ম্যাব পরিবারের সদস্যরা অর্থাৎ ডুনানেম্যাব, লেকানেম্যাব এবং অ্যাডুকানুম্যাব হলো মনোক্লোনাল এন্টিবডি। মনোক্লোনাল এন্টিবডি বলতে ঐ ধরণের কৃত্রিম এন্টিবডিকে বোঝানো হয়, যা আমাদের শরীরের অ্যান্টিবডির ক্লোন। যাহোক, এই এন্টিবডিগুলো একটা কাজ করে। মস্তিষ্কে এরা ঢুকে অ্যামাইলয়েড প্লেকের নির্দিষ্ট অংশে সংযুক্ত হয়ে যায়। এরপর অন্যান্য ইমিউন কোষকে আহ্বান করে, যাতে তারা সবাই মিলে যেন আলঝেইমারের জন্য দায়ী আবর্জনাগুলোকে পরিষ্কার করে ফেলতে পারে। এই ওষুধটি মস্তিষ্ক থেকে অ্যামাইলয়েডের মোট পরিমাণের প্রায় ৯০% পরিষ্কার করে ফেলতে পেরেছে।

সাম্প্রতিক ক্লিনিকাল ট্রায়ালগুলি বলছে যে এই পরিষ্কারের কাজটি মানসিক সুবিধা প্রদান করে। এগুলোই প্রমাণ করে যে অ্যামাইলয়েড প্লেকগুলো আলঝাইমার রোগের একটি মূল অংশ, যাকে “অ্যামাইলয়েড হাইপোথিসিস” বলা হয়। আগে অ্যামাইলয়েড নিয়ে কারও অতো মাথাব্যাথা ছিল না। কিন্তু সেন্ট লুইসের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির নিউরোলজিস্ট এবং নিউরোসায়েন্টিস্ট এরিক মুসেইকের মতে এসব অ্যামাইলয়েডকে “নির্দোষ দর্শক (innocent bystander)” বলা যায় না। তার মতে এই প্লেগুলি বের করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই ওষুধগুলোরর কোনটাই রোগকে পুরোপুরি থামায় না। তবে সেগুলো কিছু অতিরিক্ত সময়ের জন্য রোগীর মানসিক অবক্ষয়কে আটকে দিতে পারে। কিন্তু এই ওষুধগুলো এখনো সব শ্রেণির মানুষের উপর বৃহত্তর পর্যায়ে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি। এখনও অবধি ওষুধগুলো এমন লোকদের ক্ষেত্রেই সফলতা পেয়েছে, যারা আলঝেইমার রোগের হালকা লক্ষণ বহন করছে। তীব্র আলঝেইমার রোগীরা এ থেকে উপকৃত হবে বলে বিজ্ঞানীরা আশা করছেন না।

মস্তিষ্কের স্ক্যানিং বা একটি সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড পরীক্ষার মাধ্যমে মস্তিষ্কে অ্যামাইলয়েড আছে কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। এরপর ক্লিনিক্যালি ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। আবার কারও অটোইমিউন ডিজঅর্ডার থাকলে, তার জন্য এই ওষুধ উপযুক্ত নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে APOE4 জিন বহনকারী রোগীরা ওষুধের ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। এজন্য একজন ব্যক্তির সঠিক তথ্য না জেনে বা ঠিকমতো মস্তিষ্ক পরীক্ষা না করে “ম্যাব” পরিবারের কাউকে তার দেহে ঢুকানো মোটেও ঠিক হবে না।

আচ্ছা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা যখন আসলোই, তখন এ ব্যাপারে একটু খোলাখুলি কথা বলা যাক। এক্ষেত্রে দু’টি মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছেঃ মস্তিষ্ক ফুলে যাওয়া এবং রক্তপাত। ডুনানেম্যাবের সাম্প্রতিক ট্রায়ালে তিনজন রোগী মারা গেছে। যাদেরকে এই ওষুধ প্রয়োগ করা হয়েছে, তাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো লক্ষণ ছাড়াই মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা এবং খিঁচুনি দেখা গিয়েছে।

ঝামেলা এখানেই শেষ নয়। একটু আগে যেই অ্যামাইলয়েডের কথা বলেছিলাম, সেই অ্যামাইলয়েডগুলো রক্তনালীর প্রাচীরে থাকতে পারে। এই অ্যামাইলয়েডগুলো অপসারণ করা হলে রক্তনালির স্থিতিশীলতা কমে যেতে পারে এবং রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে। এই ওষুধগুলি রক্তচাপের পরিবর্তন, জ্বর এবং ঠান্ডা লাগার মতো ঝামেলাও বাঁধায়ে দিতে পারে। মুসেইকের মতে এই ওষুধগুলো অপ্টিমাইজ করলে ধীরে ধীরে ভালো এবং আরও ভালো হবে।

এবার সম্ভাবনার কথায় আসি। ম্যাসাচুসেটসের বোস্টনের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের নিউরোলজিস্ট রেইসা স্পারলিং ইতিবাচক ফলাফলগুলিকে “খুবই উৎসাহজনক” বলে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতে পুরো বিষয়টি সঠিক দিকেই যাচ্ছে। এখন যদি ডুনানেম্যাব নিয়ে ঠিকঠাক গবেষণা চালানো এবং এর রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং ফাংশনাল চরিত্র সম্পর্কে বিস্তারিত জানা সম্ভব হয়, তবে এটা বার্ধক্যের অভিশাপ আলঝেইমারকে হয়ত পরাস্ত করতে পারবে। আর সে আশাই করছেন বিজ্ঞানীরা।

এ বিষয়ে আপনি কী ভাবছেন? আপনার মতামত কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না কিন্তু। আর ব্লগপোস্টটা শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন আপনার বিজ্ঞানবন্ধুদের মাঝে!

রেফারেন্সঃ
১. New Alzheimer’s drugs are coming. Here’s what you need to know
২. Alzheimer’s drug donanemab helps most when taken at earliest disease stage, study finds

লেখাটি 71-বার পড়া হয়েছে।

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 907 other subscribers