স্থূলতা নাকি খাবারের ধরন – কোনটি ক্যান্সারের আসল কারণ?


লিখেছেন

লেখাটি বিভাগে প্রকাশিত

একসময় ক্যান্সার সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান ছিলো খুবই সামান্য, ইন্টারনেটে তথ্যও ছিলো সীমিত। কিন্তু সম্প্রতি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা AI ভিত্তিক কন্টেন্ট এর খাতিরে আমরা দিনদিন স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে উঠছি এবং একইসাথে জানতে পেরেছি অতিরিক্ত ওজন ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। কিন্তু স্থূলতা মানেই কি ক্যান্সারের ঝুঁকি? একই ওজনের দু’জন ব্যক্তির ক্যান্সারের ঝুঁকি কি একই? সব ধরনের চর্বিজাতীয় খাবারই কি শরীরের জন্য সমান ক্ষতিকর? 

সাম্প্রতিক এক গবেষণা অনুসারে, উত্তর হলো ‘না’। গবেষকদের মতে, খাবারে বিদ্যমান চর্বির ধরনই ঠিক করে দেয় এটি আমাদের শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে নাকি আরও দূর্বল করে দিবে। তাই এখন কতটুকু খাবার খাচ্ছি বা কতটুকু ওজন বাড়ছে তার বদলে কি খাচ্ছি সেটাই আসল পার্থক্য গড়ে দিচ্ছে! [১] 

গবেষণা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার আগে জেনে নিই, শরীরের ওজন বাড়লে ঠিক কি এমন ঘটে যা ক্যান্সারকে আমন্ত্রণ জানায়? 

১. অতিরিক্ত ওজন শরীরের ফ্যাট টিস্যুর (adipose tissue) কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায় এবং পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাবে মেটাবলিক স্ট্রেস সৃষ্টি করে। এ অবস্থায় এ টিস্যু প্রদাহ সৃষ্টিকারী রাসায়নিক (যেমন: TNF-alpha, IL-6, ROS) নির্গত করে। যা সুস্থ কোষের ডিএনএ কে ক্ষতিগ্রস্ত করে ক্যান্সার সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ তৈরী করে। [২]

২. শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থায় NK Cell ও CD8+ T Cell নামক বিশেষ কিছু পাহারাদার কোষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শরীরে ক্যান্সার কোষ দেখা দিলেই তারা শনাক্ত করে ধ্বংস করে। কিন্তু স্থূলতার ফলে কোষগুলোর কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং তারা ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে পারে না।[৩,৪]

৩. স্থূলতার কারণে হওয়া বিভিন্ন মেটাবলিক পরিবর্তন ক্যান্সার কোষগুলোকে দ্রুত বিভাজিত ও টিউমারে পরিণত হতে সাহায্য করে। শরীরের বাড়তি চর্বি এতে জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। [৫]

গবেষণার বিস্তারিত 

বিজ্ঞানীরা গবেষণাটি পরিচালনার জন্য ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়েছেন। ইঁদুরগুলোকে বিভিন্ন দলে ভাগ করে ১২ সপ্তাহ ধরে উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ানো হয়। এর মধ্যে ছিলো: butter (মাখন), lard (শুকরের চর্বি), beef fat (গরুর চর্বি) এর মতো প্রাণীজ চর্বি এবং পাম অয়েল, অলিভ অয়েল ও নারিকেল তেল এর মতো উদ্ভিজ্জ চর্বি। সবগুলো খাবারের ক্যালোরির পরিমাণ ছিল সমান, যাতে একইরকম স্থূলতা থাকে। অর্থাৎ, প্রাণীজ চর্বি খেয়ে একটি ইঁদুর যতটা মোটা হবে, উদ্ভিজ্জ চর্বি খেয়েও অন্য ইঁদুরটি ঠিক ততটাই মোটা হবে। কিন্তু যখন তাদের শরীরে ক্যান্সারের টিউমার পর্যবেক্ষণ করা হলো, তখন দেখা গেল একই পরিমাণ ক্যালোরি ও স্থূলতা থাকা সত্ত্বেও ভিন্ন ধরনের চর্বি শরীরে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। অর্থাৎ, শুধু ওজন বৃদ্ধি নয়, বরং আমরা কোন উৎস থেকে চর্বি খাচ্ছি সেটাই আসল। [১] 

ফলাফল: স্থূলতা একই, কিন্তু পরিণতি ভিন্ন হয় কেন? 

গবেষকদের মতে, প্রাণীজ চর্বি খাওয়া ইঁদুরদের শরীরে টিউমার অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে বেড়েছে। অন্যদিকে, উদ্ভিজ্জ চর্বি খাওয়া ইঁদুরগুলো সমান মোটা হওয়া সত্ত্বেও তাদের টিউমারের আকার ছিল অনেক ছোট, প্রায় সাধারণ খাবার খাওয়া ইঁদুরের মতোই। এছাড়া উভয়ক্ষেত্রে রক্তে সুগারের মাত্রা ও কার্যকারিতা একই ছিলো। 

অর্থাৎ, শরীরের মেদ যতটা না ঝুঁকির সৃষ্টি করে, তার চেয়ে বেশি করছে রক্তে মিশে থাকা প্রাণীজ চর্বির কণাগুলো।

আরও দেখা যায়, দুইজন ব্যক্তির ওজন ও BMI এক হলেও, তাদের ক্যান্সারের ঝুঁকি আলাদা হতে পারে। একজন যদি প্রাণীজ চর্বি খান, তবে তার রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে; অন্যদিকে উদ্ভিজ্জ চর্বি গ্রহণকারী ব্যক্তি স্থূল হওয়া সত্ত্বেও ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এগিয়ে থাকবেন।

তাহলে, প্রাণীজ চর্বি খেলে কেন ক্যান্সার বাড়ে আর উদ্ভিজ্জ চর্বিতে কেন নয়?  

বিজ্ঞানীরা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে কোষগুলোকে রেখে এর উত্তর খুঁজে পেয়েছেন:

রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, প্রাণীজ চর্বি তে কার্বন চেইন তুলনামূলক দীর্ঘ। প্রাণীজ চর্বি খাওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে শরীরে CAR18:0 (Long Chain Acylcarnitine) নামক রাসায়নিক অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এটি শরীরের প্রধান রক্ষক NK Cell ও CD8+ T Cell এর উপর বিষের মতো কাজ করে, এদের ভেতরে থাকা মাইটোকন্ড্রিয়াকে আক্রমণ করে টিউমার ধ্বংস করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। 

এছাড়া প্রাণীজ চর্বি ইঁদুরের এই কোষগুলোর ভেতরে জমে তাদের ক্যান্সার কোষকে শনাক্ত করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। 

বিপরীতে, উদ্ভিজ্জ চর্বি রক্তে ওই বিষাক্ত উপাদান তৈরি করে না। ফলে স্থূলতা থাকলেও রোগ-প্রতিরোধী কোষগুলোর মেটাবলিজম ঠিক থাকে, তারা সক্রিয়ভাবে ক্যান্সার কোষকে ধ্বংস করতে পারে। এছাড়া উদ্ভিজ্জ চর্বি খেলে শরীরে বিশেষ প্রোটিন c-Myc সচল থাকে, যা ক্যান্সার কোষকে চিনতে সাহায্য করে। NK, CD8+ cell IFN gamma আগের চেয়ে বেশি তৈরী করে।  

গবেষকরা পুনরায় এক বিশেষ ধরনের ইঁদুর ব্যবহার করেন, যাদের শরীরে কোনো NK বা T cell ছিলো না। এগুলোকে যখন প্রাণীজ ও উদ্ভিজ্জ তেল দেওয়া হলো, তখনও উভয়ক্ষেত্রে সমানভাবে টিউমার বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ উদ্ভিজ্জ তেল সরাসরি টিউমার কমায় না, বরং শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সচল রাখে। 

গবেষণার গুরুত্ব ও বাস্তব প্রয়োগ

গবেষণাটি প্রচলিত স্বাস্থ্য সচেতনতার ধারায় আমূল পরিবর্তন এনেছে। এই গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, 

১. স্থূলতার চেয়েও বিপজ্জনক হতে পারে আমাদের ভুল খাদ্যাভ্যাস।

২. ভবিষ্যতে ক্যান্সারের চিকিৎসায় শুধু বিভিন্ন থেরাপির ওপর নির্ভর না করে, রোগীর খাদ্যতালিকা কেমন হবে তা সাপোর্টিভ থেরাপি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। [৬,৭]

৩. ব্যক্তিগত পুষ্টিবিদ্যার ধারণা: গবেষণায় দেখানো হয়, মানুষভেদে শরীরের বিভিন্ন মেটাবলিক প্রক্রিয়া আলাদা। তাই একজন ব্যক্তির রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সচল রাখতে কোন ধরণের চর্বি সহায়ক হবে, তা এখন বৈজ্ঞানিকভাবে নির্বাচন করা সম্ভব।

বাংলাদেশের প্রাসঙ্গিকতা

বর্তমানে বাংলাদেশে স্থূলতা ও ক্যান্সারের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে [৮]। এই গবেষণার ফলাফল হতে পারে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। আমাদের সংস্কৃতিতে বিরিয়ানি, তেহারি, ঘি-মাখন সমৃদ্ধ খাবারের ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের খাবারে ও দৈনন্দিন ব্যবহারে যদি প্রাণীজ চর্বির ব্যবহার কমিয়ে ভালো মানের উদ্ভিজ্জ চর্বির ব্যবহার করা যায়, তবে মরণব্যাধি ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকটা কমিয়ে আনা যাবে।

তথ্যসূত্র: 

[১] Kunkemoeller, B., Prendeville, H., McIntyre, C., Temesgen, A., Loftus, R. M., Yao, C., Dyck, L., Sinclair, L. V., Rollings, C., Douglas, A., Pernes, G., Mitchelson, K. A. J., Harmon, C., Raverdeau, M., Ward, R., Kane, H., Kline, J., O’Brien, K. L., Brennan, M., … Lynch, L. (2025). The source of dietary fat influences anti-tumour immunity in obese mice. Nature Metabolism, 7(8), 1630–1645. https://doi.org/10.1038/s42255-025-01330-w

[২] Andersen, C. J., Murphy, K. E., & Fernandez, M. L. (2016). Impact of obesity and metabolic syndrome on immunity. Advances in Nutrition (Bethesda, Md.), 7(1), 66–75. https://doi.org/10.3945/an.115.010207

[৩] Holvoet, P. (2012). Stress in obesity and associated metabolic and cardiovascular disorders. Scientifica, 2012, 205027. https://doi.org/10.6064/2012/205027 

[৪] Turbitt, W. J., Buchta Rosean, C., Weber, K. S., & Norian, L. A. (2020). Obesity and CD8 T cell metabolism: Implications for anti-tumor immunity and cancer immunotherapy outcomes. Immunological Reviews, 295(1), 203–219. https://doi.org/10.1111/imr.12849 

[৫] Hopkins, B. D., Goncalves, M. D., & Cantley, L. C. (2016). Obesity and cancer mechanisms: Cancer metabolism. Journal of Clinical Oncology: Official Journal of the American Society of Clinical Oncology, 34(35), 4277–4283. https://doi.org/10.1200/JCO.2016.67.9712 

[৬] Liu, B., Zhou, H., Tan, L., Siu, K. T. H., & Guan, X.-Y. (2024). Exploring treatment options in cancer: Tumor treatment strategies. Signal Transduction and Targeted Therapy, 9(1), 175. https://doi.org/10.1038/s41392-024-01856-7 

[৭] Mittelman, S. D. (2020). The role of diet in cancer prevention and chemotherapy efficacy. Annual Review of Nutrition, 40(1), 273–297. https://doi.org/10.1146/annurev-nutr-013120-041149 

[৮] Das, S., Hossen, M. S., Barek, M. A., Islam, M. S., Rashid, M. A., Haque, M., & Kundu, R. (2026). Exploration of the obesity researches in Bangladesh: A scoping review with 76 studies. Health Science Reports, 9(2), e71833. https://doi.org/10.1002/hsr2.71833 







বিজ্ঞান নিউজলেটার

যুক্ত হোন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞান নিউজলেটারে!
আমরা সাপ্তাহিক ইমেইল নিউজলেটার পাঠাবো। 
এ নিউজলেটারে বিজ্ঞানের বিভিন্ন খবরাখবর থাকবে। থাকবে নতুন লেখার খবরও।


Loading

লেখাটি 0-বার পড়া হয়েছে।

ইউটিউব চ্যানেল থেকে

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য লেখা


নিজের ওয়েবসাইট তৈরি করতে চান? হোস্টিং ও ডোমেইন কেনার জন্য Hostinger ব্যবহার করুন ৭৫% পর্যন্ত ছাড়ে।

আলোচনা

Leave a Reply

বিজ্ঞান অভিসন্ধানী: পঞ্চাশ জন বিজ্ঞান লেখকের লেখা নিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই ই-বুকটি। আপেক্ষিকতা তত্ত্ব থেকে শুরু করে ডিএনএর রহস্য, গণিত, এমনকি মনোবিজ্ঞানের মতো বিশাল বিষয় ব্যাপ্তির পঞ্চাশটি নিবন্ধ রয়েছে দুই মলাটের ভেতরে।
বিজ্ঞান অভিসন্ধানী: আপেক্ষিকতা তত্ত্ব থেকে শুরু করে ডিএনএর রহস্য, গণিত, এমনকি মনোবিজ্ঞানের মতো বিশাল বিষয় ব্যাপ্তির পঞ্চাশটি নিবন্ধ রয়েছে দুই মলাটের ভেতরে। ।