বিজ্ঞান বই নিয়ে আলোচনা : ‘পায়ের নখ থেকে মাথার চুল’

দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা মানেই হালকা চালে কঠিন কিছু; সে কাজটাই তিনি করেছেন তার "পায়ের নখ থেকে মাথার চুল" বইতে, সহজ ভাষায়, কিন্তু বিষয়ের গুরুত্ব না কমিয়েই।

দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা মানেই হালকা চালে কঠিন কিছু; জটিল কোনো আলাপ — হোক তা দর্শনের, সমাজতত্ত্বের কিংবা বিজ্ঞানের — তাকে ভেঙেচুরে পাঠককে গুলে খাওয়ানো। বাংলা ভাষায় জনপ্রিয় বিজ্ঞানসাহিত্যের এই প্রবাদপ্রতিম লেখক এতোযুগ আগেও কী যে অসাধারণ কাজ করে গেছেন, তা টের পাওয়া যায় তার বিজ্ঞানবিষয়ক লেখাগুলো পড়লে। ‘বিজ্ঞান কী ও কেন’ সে বিষয়ে তিনি লিখেছেন, ‘এই দুনিয়ার চিড়িয়াখানা’ আর ‘ক্ষুদে শয়তানের রাজত্ব’-এ রচনা করেছেন প্রাণিবিদ্যা এবং অণুজীববিদ্যার মুখপাত, আবার জৈব ও সামাজিক বিবর্তনকে এক সুতোয় এনে বলেছেন এমন এক গল্প — ‘যে গল্পের শেষ নেই’। সেই ধারারই একটি বই ‘পায়ের নখ থেকে মাথার চুল’

প্রচ্ছদ: পায়ের নখ থেকে মাথার চু্ল

পায়ের নখ আর মাথার চুল — আমাদের দেহের দুই পরিধি, যে পরিধির ভেতর নিরন্তর কাজ করে চলেছে মানবদেহ-নামক স্বয়ংক্রিয়, জটিল এক যন্ত্র। এই যন্ত্রের ভেতর ঘটে চলেছে রকমারি ক্রিয়া-প্রক্রিয়া-বিক্রিয়া। জীববিদ্যার যে শাখা এই ব্যাপারগুলো নিয়ে আলাপ করে,তার নাম ফিজিওলজি — বাংলায় শারীরতত্ত্ব। শারীরতত্ত্ব-বিষয়ক জনপ্রিয়-বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠতম বইটি রচিত হয়েছিলো রুশ দেশে।

লেখক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

ইংরেজিতে বইটির নাম ‘ফিজিওলজি ফর এভরিওয়ান’, লেখক ব. সেরগেইয়েভ, যার চমৎকার বাংলা অনুবাদ হয়েছে ‘শারীরতত্ত্ব—সবাই পড়ো’ নামে। সে বইটি আকারে এবং বিষয়বস্তুতে বৃহৎ। দেবীপ্রসাদের ‘পায়ের নখ থেকে মাথার চুল’ বইটির বিষয়বস্তুও, মোটাদাগে, শারীরতত্ত্ব; তবে বৃহদাকৃতির ক্লান্তি থেকে মুক্ত। এ বইয়ের প্রথম দিকে উঠে এসেছে রক্তের কথা — রক্ত কী ও কেমন, রক্তের ভেতরের বাসিন্দাদের হাল-হক্বিকত, তাদের কায়কারবার,রক্তের গ্রুপিং ইত্যাদি। এরপর লেখক গেছেন খানিকটা পুষ্টিতত্ত্বের আলাপে — আমাদের খাদ্যের উপাদান কী কী, তাদের পুষ্টিগুণ, শোষণ পদ্ধতি, সংশ্লিষ্ট রোগব্যাধি প্রভৃতি। এনজাইম, হরমোন, গ্রন্থিবিদ্যা, স্নায়ুতন্ত্র হয়ে বইটি শেষ হয়েছে শ্বসনের গল্প বলে।

‘পায়ের নখ থেকে মাথার চু্ল’ বইটির একটি পৃষ্ঠা

দেবীপ্রসাদ তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বইটি শুরু করেছেন সাধারণ একটি গল্প দিয়ে, তারপর ধীরে ধীরে প্রবেশ করেছেন মূল বিষয়ে। মূল বিষয় আলোচনা করতে গিয়ে তিনি উদাহরণ হাজির করেছেন ইতিহাস এবং বিশ্বের নানান প্রান্ত থেকে,ব্যবহার করেছেন মজার সব উপমা এবং চমৎকার কিছু ছবি; খামতি রাখেননি হিউমারে’ও। অবাক হতে হয় কীভাবে তিনি শারীরবিদ্যার বুনিয়াদি বিষয়বস্তু থেকে শুরু করে স্বচ্ছন্দে আলোচনা করে গেছেন রীতিমতো উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের জিনিসপত্র এবং এমন চমৎকার সহজ-স্বাদু গদ্যে তা আলোচনা করেছেন যে ষষ্ঠ-কি-সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরও তা বুঝতে অসুবিধে হবার কথা নয়। দেবীপ্রসাদ প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে পাঠককে সর্বক্ষণ সংযুক্ত করে রাখেন বিষয়বস্তুতে, তার লেখার চুম্বকশক্তি এমনই যে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়ে যেতে হয় এবং পড়ে যাওয়া যায় অক্লেশে। ‘সিরিয়াস’ বিজ্ঞান পাঠক হয়তো বইয়ের কিছু জায়গায় অতিসরলীকরণের আপত্তি তুলবেন; তার সাথে সহমত হয়েই বলবো ওটুকু লেখার সহজবোধ্যতার স্বার্থেই করা হয়েছে। ভূমিকা থেকে যেটুকু আন্দাজ করা যায়, দেবীপ্রসাদ প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে বইটি যখন লিখেছিলেন তখন তার একমাত্র প্রণোদনা ছিলো লেখক হিসেবে সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং বইটি তিনি লিখেছিলেন সব শ্রেণীর মানুষের জন্যেই। লেখকের সফলতা স্বীকার করে আজ বলা যেতেই পারে, বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী কিংবা বিজ্ঞানোৎসুক আমজনতা — দেবীপ্রসাদের ‘পায়ের নখ থেকে মাথার চুল’ সকলের জন্যেই অবশ্যপাঠ্য!

পুনশ্চ, বইয়ের ‘তাল পাকাবার রহস্য’ (অ্যাগ্লুটিনেশন-সংক্রান্ত আলাপ) প্রবন্ধটিতে লেখা হয়েছে, “তোমার রক্তের লাল কণায় যদি A জাতের প্রোটিন থাকে তাহলে তোমার রক্তের প্লাজমাতেও থাকবে ওই A জাতের প্রোটিন।” পরবর্তী আলোচনা পড়ে দেখলে অনুমান করা যেতে পারে লাল কণায় এবং প্লাজমাতে যে প্রোটিন থাকার কথা বলা হচ্ছে,আসলে তা (যথাক্রমে) এন্টিজেন ও এন্টিবডি। এই অনুমান যদি সত্যি হয়, তাহলে বলতে হবে এই প্রবন্ধে খানিকটা জ্ঞানবিভ্রাট আছে। মাধ্যমিক শ্রেণীর জীববিজ্ঞান বই অনুসারে কোনো ব্যক্তির লোহিত রক্তকণিকার প্রাচীরে যে এন্টিজেন থাকে, তার সাথে সম্পর্কিত এন্টিবডিটি তার প্লাজমায় থাকতে পারে না। অর্থাৎ কারো রক্তের গ্রুপ A হলে তার লোহিত রক্ত কণিকায় থাকবে A এন্টিজেন এবং প্লাজমায় থাকবে b এন্টিবডি (a নয়!)। সম্ভবত দেবীপ্রসাদের সময়ে আবিষ্কৃত জ্ঞানের সংকীর্ণতা এই ত্রুটির কারণ।

বই: পায়ের নখ থেকে মাথার চুল
লেখক: দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
প্রকাশক: ছায়াবীথি
পৃষ্ঠাসংখ্যা: ৪৮
মূল্য: ১১৪
ব্যক্তিগত রেটিং: ৮/১০

Anirban Maitra
আমি অনির্বান। জন্ম, বেড়ে ওঠা কুষ্টিয়াতে। বর্তমানে পড়াশোনা করছি নটরডেম কলেজে, বিজ্ঞান বিভাগে। প্রিয় বিষয় বং‌শগতিবিদ্যা, বিবর্তন এবং জীবপ্রকৌশল।