ডিএসএন: দূরের মহাকাশযান যেভাবে পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ করে

মহাকাশে রয়েছে অজস্র প্রোব ও মহাকাশযান। এদের সাথে পৃথিবীর অক্ষীয় গতির তাল মিলিয়ে করে যোগাযোগ রক্ষা করা হয় কিভাবে?

পৃথিবীর বাইরে মহাকাশে সূর্য সহ সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রহে উপগ্রহে পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণার জন্য বিভিন্ন রকমের মহাকাশযান বিভিন্ন গ্রহের কক্ষপথে এবং গ্রহের পৃষ্ঠে অবস্থান করছে। এই নভোযানগুলি প্রতিনিয়ত প্রচুর ছবি তুলে চলছে এবং সেই সাথে  প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করছে। 

এই সব তথ্য এবং ছবি কি ভাবে পৃথিবীতে প্রেরণ করে? সবগুলো মহাকাশযান কি তথ্য আলাদা আলাদা ভাবে পাঠায়? কিভাবে এই সব নভোযানের সাথে  যোগাযোগ করা হয়?  

অনেকের মনেই এই বিষয়ে প্রশ্ন আসতে পারে এবং অনেকের এই বিষয়ে জানার আগ্রহ আছে। চলুন জানার চেষ্টা করি কি ভাবে কাজগুলি সম্পন করা হয়।

মহাকাশযানের সাথে এই যোগাযোগ মাধ্যমটার নাম ডিপ স্পেস নেটওয়ার্ক (DSN)। এটি হ’ল নাসার পরিচালিত দৈত্যকার রেডিও অ্যান্টেনার একটি বিন্যাস। এটি বিশ্বের বৃহত্তম এবং সংবেদনশীল বৈজ্ঞানিক টেলিযোগযোগ ব্যবস্থা।

চিত্রঃ ডিপ স্পেস নেটওয়ার্ক স্টেশনগুলির অবস্থান।

দূর মহাকাশ যানের সাথে ২৪ ঘন্টা যোগাযোগ রাখার জন্য পৃথিবীর তিনটি স্থানে (ক্যালিফোর্নিয়ার  গোল্ডস্টোনে, স্পেনের মাদ্রিদে, এবং অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায়) এই ডিশ এন্টেনা গুলো বসানো আছে। কিন্তু তিনটি আলাদা আলাদা স্থান কেন? এর কারণ হলো, পৃথিবী তো ক্রমাগত নিজের অক্ষের চারপাশে ঘুরছে। 

যদি কোন ডিএসএন সাইটের জন্য একটি দূরবর্তী মহাকাশযান দিগন্তের নীচে ডুবে যায়, অন্য একটি ডিএসএন সাইট মহাকাশ যানের সিগন্যাল গ্রহণ এবং যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে।

প্রতিটি ডিএসএন সাইটে বেশ কয়েকটি রেডিও অ্যান্টেনা রয়েছে। যার মধ্যে সবচেয়ে বড়টির ব্যাস ৭০ মিটার, যা একটি ফুটবল মাঠের আকার। এছাড়াও প্রতিটি কমপ্লেক্সে ৩৪ মিটার ব্যাসের অনেকগুলো ছোট অ্যান্টেনা রয়েছে। এই অ্যান্টেনা যে কোন কোণে তাক করা যায়।

চিত্র: গোল্ডস্টোন, ক্যালিফোর্নিয়ার ৭০-মিটার ডিশ।

বিভিন্ন মহাকাশযান এবং পৃথিবীর মধ্যে নিরবিচ্ছিন্ন রেডিও যোগাযোগ স্থাপন করার জন্য অ্যান্টেনাগুলো

বিশেষ ভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। এর বিশাল প্যারাবোলিক ডিশ অ্যান্টেনা এবং অতি-সংবেদনশীল রিসিভার দূরবর্তী মহাকাশযান থেকে আগত খুব দূর্বল রেডিও সংকেত সনাক্ত করতে সক্ষম।

এই অ্যান্টেনাগুলি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, আবার প্রয়োজনে একসাথেও কাজ করতে পারে।এই  অ্যান্টেনাগুলি এমন ভাবে বসানো হয়েছে যে পৃথিবীর অক্ষ ঘূর্ণনের ফলেও কখনো মহাকাশ যানের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হবে না।

দূর মহাকাশযান থেকে আগত রেডিও সংকেত খুব দূর্বল হয় এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে এর সাথে যোগ হয় পৃথিবী, সূর্যসহ মহাবিশ্বের প্রায় সমস্ত বস্তু দ্বারা প্রাকৃতিকভাবে নির্গত (background radio noise) বেতার শব্দ। 

আগত বেতার সংকেতটির সাথে সংকেত পরিবর্ধনকারী শক্তিশালী বৈদ্যুতিক সরঞ্জামগুলির নিজস্ব শব্দ এর সাথে যোগ হয়। এই সব  শব্দের মধ্যে থেকে মহাকাশযান থেকে আগত সঠিক বেতার সংকেতটি গ্রহন করার জন্য ডি এস এন এ বিশেষায়িত রিসিভার রয়েছে।

বাইরের কোন শব্দ যাতে প্রবেশ করতে না পারে সেইজন্য এই গ্রাহক যন্ত্রগুলিকে শূন্যের কয়েক ডিগ্রি উপরে শীতল স্থানে রাখা হয়েছে। এতে করে রিসিভিং সিস্টেমটি অযাচিত আওয়াজ থেকে সঠিক বেতার সংকেতকে আলাদা করতে পারে।

অ্যান্টেনা স্টেশনগুলি প্রতিটি কমপ্লেক্সের সিগন্যাল প্রসেসিং কেন্দ্র থেকে (রিমোটলি) পরিচালিত হয়। এই কেন্দ্রগুলিতে এমন বৈদ্যুতিক সিস্টেম রয়েছে যা অ্যান্টেনাকে নির্দেশ করে এবং নিয়ন্ত্রণ করে, ডেটা গ্রহণ এবং প্রক্রিয়া করে, কমান্ড প্রেরণ করে। কমপ্লেক্সগুলিতে ডেটা প্রক্রিয়া করা হয়ে গেলে, একটি নির্দিষ্ট চ্যানেলে এই ডেটা আরো প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিজ্ঞানী দলগুলিতে বিতরণের জন্য জেপিএলে পাঠানো হয়।

অন্যান্য মহাকাশ সংস্থা যেমন ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি জাপান এরোস্পেস এক্সপ্লোরেশন এজেন্সি  চুক্তির মাধ্যমে ডি এস এন ব্যবহার করে।

Deep Space Network Gets a Boost : Networks Course blog for INFO 2040/CS  2850/Econ 2040/SOC 2090
চিত্র: আমাদের সৌরজগতের অসংখ্য মহাকাশযান ও বিভিন্ন প্রোবের সাথে ডিএসএন বেশ জটিলভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে।

ডি এস এন নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরি (জেপিএল) দ্বারা পরিচালিত হয়,নেটওয়ার্ক অপারেশনস নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, (NOCC) টি নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরীর ২৩০ নাম্বার বিল্ডিং এ অবস্থিত। 

ডি এস এন এ অতীতে অত্যন্ত জটিল সাত ধরনের ডেটা ছিলো এই সাত ধরণের ডেটাপ্রতিটি পৃথক ডিএসএন সিস্টেমের সাথে যুক্ত ছিল।

বর্তমানে নেটওয়ার্ক সরলীকরণ প্রোগ্রামের  অংশ হিসেবে এই সাত ধরনের ডেটা দুটি ডিএসএন সিস্টেমে সংহত করা হয়েছে আপলিংক (আপলিংক ট্র্যাকিং এবং কমান্ড সাবসিস্টেম, ইউপিএল) এবং ডাউনলিংক (ডাউনলিংক ট্র্যাকিং এবং টেলিমেট্রি সাবসিস্টেম, ডিটিটি)।

এই সাত ধরনের ডেটা হল:

  • Frequency & Timing Data Type, F&T, 
  • Tracking Data Type, TRK, 
  • Telemetry Data Type, TLM, 
  • Command Data Type, CMD, 
  • Monitor Data Type, MON, 
  • Radio Science Data Type, RS, 

Very Long Baseline Interferometry Data Type, VLBI.

প্রতি ৫ সেকেন্ডে এই ডেটা আপডেট হয়। ডিএসএন প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা, বছরে ৩৬৫ দিন তার মিশন পরিচালনা করে। 

ডি এস এন ওয়েবসাইটে গেলে আপনি দেখতে পাবেন কোন অ্যান্টেনা কোন মহাকাশ যানের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে, কোন অ্যান্টেনা বন্ধ আছে, কত গতিতে তথ্য আদান প্রদান হচ্ছে, সেই সাথে তথ্য আদান প্রদানের খুটিনাটি সব বিষয় দেখতে এবং জানতে পারবেন।

একই সাথে ডি এস এন রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণে সাহায্য করে এবং এর যাবতীয় তথ্য  বিজ্ঞানীদের কাছে সরবরাহ করে যা সৌরজগত এবং  মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানকে আরো উন্নত করে।

ডিএসএন হল বহু দূরবর্তী গ্রহের চারিপাশে ঘুরতে থাকা মহাকাশযানের যাবতীয় তথ্য যেমন মহাকাশযানের যন্ত্রাংশের অবস্থা, ও এর সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন নির্দেশ প্রধান, অনুসরন, এবং পর্যবেক্ষণের জন্য একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ব্যাবস্থা।

ডি এস এন বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য একটি উন্নত যন্ত্র হিসাবে ব্যবহৃত হয়, রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং চলমান গ্রহাণুর রাডার ম্যাপিং এর কাজে এর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

এই লিংকে ক্লিক করলে, ডিএসএন কার্যক্রম দেখা যায়: DSN Now

তথ্যসুত্রঃ

NASA Solar System Basics

About the Deep Space Network | NASA

NASA’s Deep Space Network Upgraded – Sky & Telescope

ক্যুইজ!

বিজ্ঞান সম্পর্কে আপনি কতোটা জানেন?

নিজেকে বিজ্ঞানপ্রেমী মনে করেন? তাহলে চলুন পরীক্ষা করে দেখা যাক! মাত্র ৫টি প্রশ্নের এই কুইজ দিয়ে মেপে দেখি আপনি কতোটা বিজ্ঞান ভক্ত?