খালি চোখে দেখার মতো ব্যাকটেরিয়া

খালি চোখে দেখার মতো ব্যাকটেরিয়া। ছবিঃ EL PAÍS in English

বই-পত্রে অণুজীবের সংজ্ঞাতে সবসবয় বলা হয়ে এসেছে যে অণুজীব এক ধরণের জীবিত সত্ত্বা, যাদেরকে দেখার জন্য মাইক্রোস্কোপের প্রয়োজন। কিন্তু এখন হয়ত বা এই সংজ্ঞা বদলে ফেলতে হবে। একটি ক্যারিবিয়ান ম্যানগ্রোভ বনে এমন এক ধরণের ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে যারা এই সংজ্ঞার আওতায় পড়ে না। এটি ২ সে.মি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে, অনেকটা চীনা বাদামের উচ্চতার। না, আপনি ভুল শোনেননি। তারের মতো দেখতে এই ব্যাকটেরিয়াটি সাধারণ অণুজীবদের চেয়ে প্রায় ৫০০ গুণ বড়।

ব্যাকটেরিয়াটি গত ফেব্রুয়ারিতে অনলাইনে পোস্ট করা একটি প্রিপ্রিন্টে উন্মোচিত হয়েছিল। এর বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয়েছে Thiomargarita magnifica. যেসব গবেষকেরা এই ব্যাকটেরিয়ার বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করছিলেন, তাদের অনেকেই বিষ্মিত হয়েছেন। আমার মনে হয়, সবচেয়ে বেশি চমকেছেন University of Massachusetts এর অণুজীববিজ্ঞানী ভেরেনা কারভালহো। কারণ তার কাছে পুরো ব্যাপারটা ছিল অবিশ্বাস্য।

২ সে.মি লম্বা ব্যাকটেরিয়া। ছবিঃ India Today

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানী এবং সংক্রামক রোগের গবেষক স্যান দিয়েগো এই আবিষ্কারকে ‘চমৎকার’ আখ্যা দিয়েছেন। কারণ Guadeloupe ম্যানগ্রোভ বন থেকে পাওয়া ‘বিশাল’ আকারের এই ব্যাকটেরিয়াটি ফলের মাছি এবং নেমাটোডের চেয়ে বড়।

গবেষকরা দীর্ঘকাল ধরে জীবদেরকে দুটি গ্রুপে বিভক্ত করেছেন: প্রোক্যারিওট (যার মধ্যে রয়েছে ব্যাকটেরিয়া এবং আর্কিয়া নামক এককোষী জীবাণু-বংশ) এবং ইউক্যারিওটস (যার মধ্যে রয়েছে মানুষ সহ সকল বহুকোষী জীবেরা)। প্রোক্যারিওটদের কোষের জেনেটিক উপাদানগুলো মুক্ত অবস্থায় ভাসতে থাকে।

Guadeloupe Mangrove Forest। ছবিঃ Flickr

কিন্তু এই দৈত্য ব্যাকটেরিয়াটির একটি বিশাল জিনোম ভান্ডার রয়েছে যা অন্যান্য ব্যাকটেরিয়ার মতো কোষের অভ্যন্তরে মুক্ত অবস্থায় ভাসমান নয় বরং এটি একটি ঝিল্লি দ্বারা আবদ্ধ থাকে। তবে এই বৈশিষ্ট্যটা সাধারণত উন্নত জীবদের কোষে মানে ইউক্যারিওটদের কোষে থাকে। কিউশু ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির কম্পিউটেশনাল জীববিজ্ঞানী কাজুহিরো টেকমোটো বলেছেন, এই ব্যাকটেরিয়াটি জটিল কোষের বিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি মিসিং লিঙ্ক হতে পারে।

এতসব বৈচিত্র্য আর রহস্য দেখেই বোধ হয় অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির অণুজীববিজ্ঞানী ফেরান গার্সিয়া বলেছেন, “ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে আমাদের এতদিনের চিন্তা-ভাবনাকে ভেঙে দিচ্ছে।“ বিজ্ঞানী ভোল্যান্ড বলেন, “কোষগুলি এতটা বড় আকৃতিতে অভিযোজিত হওয়ার পেছনের কারণটি হলো এতে করে ব্যাকটেরিয়াটি অধিক পরিমাণ সালফাইড এবং অক্সিজেন ধারণ করতে পারবে, যা তাকে টিকে থাকতে সাহায্য করবে।“

ম্যানগ্রোভ বনে Thiomargarita magnifica কী ভূমিকা রাখতে পারে, সে ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা এখনও তেমন কিছু জানতে পারেননি। আর এটি এত বড়ই হলো কীভাবে সে বিষয়েও চলছে জল্পনা-কল্পনা আর গবেষণা। এসব প্রশ্নের উত্তর যেদিন জনসম্মুখে আসবে, সেদিন হয়ত বা অন্য কোনো লেখা নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হবো। তবে আজকে যাওয়ার আগে পাঠকদের উদ্দেশ্যে একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে চাই, নতুন আবিষ্কৃত এই জীবটিকে কি অণুজীব বলা যাবে?

তথ্যসূত্রঃ This giant bacterium is the largest one found yet

তাহসিন আলম উৎস
লিখতে লিখতে শিখতে চাই। বর্তমানে বিজ্ঞান ব্লগের পাশাপাশি সায়েন্টিয়া সোসাইটি, বিজ্ঞান পত্রিকা, হিগজিনো সায়েন্স সোসাইটি এবং বোসন বিজ্ঞান সংঘ এর সাথে যুক্ত আছি। আমি সেই বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে প্রতিটা সমাজে বিজ্ঞানশিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণের জয়ধ্বনি বাজবে। আর এই লক্ষ্যে বিজ্ঞানের একজন সৈনিক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি।