শূন্য থেকে সরলরেখা: সরলরেখার বীজগাণিতিক ব্যবচ্ছেদ।। শেষ পর্ব

লেখাটি বিভাগে প্রকাশিত

সরলরেখার সমীকরণ

আমি শুরু করছি সমীকরণ বানানো। গেট সেট গো!

মনে করো, আমার কাছে y অক্ষের ছেদক (c) আর ঢাল দেওয়া আছে। এখন আমি সরলরেখার সমীকরণ বের করব। সাধারণত, স্থানাঙ্ক ব্যবস্থায় যদি একটা সরলরেখা দেওয়া থাকে তাহলে আমরা বলতে পারি, সেটার ঢাল কত, y ও x অক্ষকে কোথায় ছেদ করল, ভুজ আর কোটিগুলোর সম্পর্ক। কিন্তু আমাদের যদি নির্দিষ্ট কিছু তথ্য দেওয়া থাকে তখন সেটা থেকে ভূজ আর কোটি মধ্যে সম্পর্ক বের করে সমীকরণ তৈরি করতে হয়। আর সেই সমীকরণ দিয়ে চিত্র না এঁকেও বলা যায় সরলরেখা সম্পর্কে। 

এটাই সমীকরণের মাহাত্ম্য। আমার এক বন্ধু এসে আমাকে বলল, “তোকে আমি একটা সরলরেখার ঢাল আর y অক্ষের ছেদক দিলাম, এখন পারলে আমাকে দেখা রেখাটা x অক্ষের কোন বিন্দুতে ছেদ করে ”। এখন এই সমস্যা থেকে বের হওয়ার জন্য আমি কী করব?

সরলরেখার সমীকরণ বের করব। 

চিত্র-১

আমি তো জানি না আমার বন্ধু আমাকে কী কী তথ্য দেবে। আমি ধরে নিই যে, y অক্ষের ছেদক c, আর ঢাল m , এইটুকু তথ্য দিলো। যেহেতু y অক্ষের ছেদক c, তাই আমি একটা বিন্দু পেলাম (0, c) আর এই সরলরেখার বিন্দুগুলোর প্রতিনিধি P(x, y) আরেকটা বিন্দু পেলাম। যেহেতু আমি জানি ঢাল m । তাহলে এই দুই বিন্দুর ঢাল বের করলেই আমরা সমীকরণ পাব। চিত্র-১ থেকে আমরা ঢাল বের করব। ডায়াগ্রামে আমি সুন্দরভাবে তথ্যগুলো বসিয়েছি। তারপর P(x, y) বিন্দু থেকে x অক্ষে লম্ব টেনেছি, (0, c) বিন্দু থেকে x অক্ষের সমান্তরালে লম্ব টেনেছি। 

ঢাল সম্পর্কে জানার সময় দেখেছি, 

ঢাল = Δy/Δx 

A কোণের সাপেক্ষে Δy হলো লম্ব আর Δx হলো ভূমি। 

অর্থাৎ, ঢাল = লম্ব/ভূমি = tanθ 

আমরা দেখতে পাচ্ছি, স্থানাঙ্ক ব্যবস্থায় এমন একটা সমকোণী ত্রিভুজ তৈরি হয়েছে। এখন যদি আমি এখান থেকে tanθ বের করি, তাহলেই ঢাল পেয়ে যাব। (কারণ ত্রিভুজটার লম্ব y – c হলো Δy আর ভূমি হলো x যেটা Δx ) 

অতএব, ঢাল, 

m = (y – c)/x 

⇨ y = mx + c 

y = mx + c এটাই আমাদের সমীকরণ। একটু বলেছিলাম না, সমীকরণের জন্য ঢাল লাগবে, এখন বোঝা যাচ্ছে ব্যাপারটা! আমরা সাধারণত y = mx + c দেখলে বলি c কেন y অক্ষের ছেদক। x অক্ষের ছেদক হলে কী হতো? x অক্ষের ছেদক হলে কিছুই হতো না, শুধু সমীকরণটা চেঞ্জ হতো। আমি c কে x অক্ষের ছেদক ধরে আরেকটা সমীকরণ বানাতে পারি।

চিত্র-২

∴ ঢাল, m = y/(x – c)

⇨ y = m(x – c)  

(x যেহেতু ধনাত্মক দিকে আর c ঋণাত্মক দিকে, 

তাই x – c, বিন্দুগুলোতে তাকাও)

যদি c, x অক্ষের ছেদক হয়, তাহলে সমীকরণ y = mx + c, সবই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করছে। 

আমার বন্ধুর কথা মনে আছে?

সে বলেছিল x অক্ষের ছেদক বের করতে হবে। সেটা কীভাবে করব? 

এটা পাঠকের ওপর ছেড়ে দিলাম।

বিন্দু ও ঢাল থেকে সরলরেখার সমীকরণ নির্ণয়

আমার কাছে যদি ঢাল আর রেখার ওপর একটা বিন্দু দেওয়া থাকে, তাহলে সমীকরণ কীভাবে বের করব?

ধরে নিচ্ছি, ঢাল হলো m আর বিন্দুটা (x, y) । এখন গ্রাফ আঁকি। কেউ চাইলে কেউ চাইলে বিন্দু থেকে ঢাল বের করে সমীকরণ বের করতেও পারবে। আমি চিত্রটা দেখিয়ে দিচ্ছি, বুঝতে সুবিধা হবে। 

চিত্র-৩

ঢাল, m = (y –  y₁)/(x  –  x₁) 

⇨ (y  –  y₁) = m(x –  x₁)

এখানে (y  –  y₁) = m(x –  x₁) হলো আমাদের সমীকরণ। 

একটা জিনিস আবারো বলি, সাধারণত দুইটা বিন্দু দেওয়া থাকলে সহজেই একটা নির্দিষ্ট সরলরেখার সমীকরণ পাওয়া যায়। আমাদের কাছে সবসময় দুইটা বিন্দু থাকে না। তাই আমরা P(x, y) কে একটা আদর্শ বিন্দু হিসেবে ধরে নিই। তারপর কাজ করি।

দুইটি বিন্দু থেকে সমীকরণ নির্ণয়

এখন আমাকে দুইটা বিন্দু দিয়ে বলল, সমীকরণ বের করতে। যারা এতক্ষণ ধরে পড়ছ, নিশ্চয়ই বলবে, আমি তো কষ্ট করে রেখাটা আঁকতেই পারি। কেন সমীকরণ বানাব? গণিতবিদরা এতই অলস যে এই চিত্রটাও তাঁরা আঁকবে না! তাঁরা সবকিছুর সমীকরণ বা বীজগাণিতিক রূপে বিশ্বাসী। চলো দেখি, দুইটা বিন্দু থাকলে কী করা যায়। 

ধরি বিন্দু দুইটা (x₁, y₁) আর (x₂, y₂) । কেউ ভাবতে পারেন এই দুইটার ঢাল বের করলেই তো হবে। না, হবে না। কারণ এই দুইটার ঢাল বের করলেই তো আর বৈশিষ্ট্যগুলো বলা যাবে না। তাই P(x, y) কে লাগবেই। কারণ আমরা যেহেতু সমীকরণ বের করছি, সমীকরণের কিছু নিয়ম মানতে হবে। যেমন, দুইটা বহুপদী সমান চিহ্ন দিয়ে যুক্ত থাকবে। কখনো এক পক্ষে বহুপদী, অন্য পক্ষে শুন্যও হতে পারে। 

তাই আমাদের তিনটা বিন্দু থেকে দুইটা ঢাল বের করে সমান চিহ্ন দিয়ে যুক্ত করতে হবে। কারণ একটা সরলরেখার বিন্দুগুলোর ঢাল সবসময় সমান। 

চিত্র-৪

  (y – y₁)/(x – x₁) = (y₁ – y₂)/(x₁ – x₂)

⇨ (y – y₁)(x₁ – x₂) = (x – x₁)(y₁ – y₂) 

⇨ (y – y₁)/(y₁ – y₂) = (x – x₁)/(x₁ – x₂)

(y – y₁) ÷ (y₁ – y₂) = (x – x₁) ÷ (x₁ – x₂) এটাও একটা সমীকরণ। 

রেখার সমীকরণ কিন্তু এই অল্প কয়েকটা না। আরও অনেক ধরনের হতে পারে। আমার এই লেখাটার উদ্দেশ্য হলো সরলরেখার সমীকরণকে অনুভব করানো। এটা যে ভয়ের কিছু না, সেটা বুঝানো। শুধু সরলরেখা না, আমাদের জীবনও আসলে নির্ভর করে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। কিন্তু সেটা হতে হবে শুদ্ধ। দৃষ্টিভঙ্গিতে গোঁজামিল হলে সমীকরণের মতো জীবনও ওলটপালট হয়ে যাবে!

পুনশ্চঃ গণিতের সবচেয়ে সুন্দরতম জিনিসের মতো মধ্যে একটা হলো সরলরেখা বা রেখা। রেখা তৈরি হয় বিন্দু দিয়ে, যার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা কিছুই নেই। অথচ এই শূন্য জিনিসগুলো মিলে একটা দৈর্ঘ্য তৈরি করছে, যা একটা সরলরেখা!

প্রথম দুই পর্বের লিংকঃ

তথ্যসূত্রঃ

https://youtu.be/_QFkRcAN1x0
  • প্রাণের মাঝে গণিত বাজে: জ্যামিতির জন্য ভালোবাসা—সৌমিত্র চক্রবর্তী 
  • ইউক্লিড ও এলিমেন্ট — আসিফ

লেখাটি 60-বার পড়া হয়েছে।

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 904 other subscribers