ভাস্করাচার্য ও গণিতের অমর কীর্তি ‘লীলাবতী’

লেখাটি বিভাগে প্রকাশিত

সেই প্রাচীনকালে সংখ্যার অভ্যুদয় থেকে শুরু করে অদ্যাবদি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মহারহস্য ব্যাখ্যায় গণিতের যে সদর্প বিচরণ, সেই গণিত নামক মহীরুহের বিকাশে বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতা আজকের গণিতবিদদের জন্য ভিত্তি রচনা করে দিয়েছে। গণিতের উৎকর্ষ সাধনে মিশরীয়, ব্যাবিলনীয়, মেসোপটেমিয়ান, চৈনিক প্রভৃতি সভ্যতার অবদান যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি দশমিক সংখ্যা পদ্ধতি, সর্বপ্রথম শূন্যের ব্যবহার এবং পাটিগণিতের উন্মেষ সাধনে ভারতবর্ষের গণিতবিদদের অবদান উল্লেখযোগ্য। আর্যভট্ট, ব্রহ্মগুপ্ত, ভাস্করাচার্য, বরাহ মিহিরের মতো পণ্ডিতগণের নিরলস ও ঐকান্তিক গণিত তপস্যার ফলে শাস্ত্রীয় গণিতের কলেবর সমৃদ্ধ হয়।

ভারতবর্ষের দ্বাদশ শতাব্দীর (জন্ম ১০৩৬ শকাব্দ বা ১১১৪ খ্রিষ্টাব্দে) এক মহান গণিতবিদ ভাস্করাচার্যের Magnum Opus খ্যাত ‘সিদ্ধান্তশিরোমণি’ শীর্ষক মহাগ্রন্থটি লীলাবতী, বীজগণিত, গোলাধ্যায় ও গ্রহগণিত – এই গ্রন্থ চতুষ্টয়ের সম্মিলনে রচিত। তন্মধ্যে তেরো পরিচ্ছদে খণ্ডায়িত চপল কাব্যময় ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত লীলাবতী গ্রন্থটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এর কিংবদন্তী আখ্যানের জন্য। লীলাবতী শব্দের আভিধানিক অর্থ লীলায়িত চঞ্চল ভঙ্গিমাযুক্ত, গুণসম্পনা। কথিত আছে, ভাগ্যগণনায় অকালবৈধব্যযোগ প্রতীয়মান হওয়ায় চিরকাল অনূড়া থাকার অযাচিত ক্লেশমোচনে ভাস্করাচার্য দুহিতা লীলাবতীর নামে সিদ্ধান্তশিরোমণির প্রথম গ্রন্থ নামকরণের সিদ্ধান্তে উপনীত হন। আর কাব্যের সুষমা-লালিত কমনীয়তা ধরা পড়ে ‘চঞ্চলাক্ষি’, ‘বালকুরঙ্গলোলনয়নে’ প্রভৃতি সম্বোধনে। ফলে একে গণিতের মহাকাব্য বললে বোধ করি অত্যুক্তি হবে না।

“যারা লীলাবতী তাদের গলায় আঁকড়ে ধরেছেন তাদের জন্য এই পৃথিবীতে আনন্দ এবং সুখ প্রকৃতই উদ্ভাসিত হচ্ছে – ভগ্নাংশ, গুণন এবং সূচকের সুশৃঙ্খল সরলীকরণে সুসজ্জিত, সমাধানের মতো বিশুদ্ধ ও নিখুঁত আর বচনামৃতের মতই মনোহর।”

‘লীলাবতী’ গ্রন্থের উপসংহারে গ্রন্থকার
‘লীলাবতী’ গ্রন্থের প্রচ্ছদ (চিত্র সূত্রঃ amazon)

লীলাবতী গ্রন্থে আটটি মৌলিক গাণিতিক প্রক্রিয়া (পরিকর্মষ্টক) – যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ, বর্গ, ঘন, বর্গমূল এবং ঘনমূলের পাশাপাশি অনুপাত-সমানুপাত, বিপরীতক্রিয়া, সুদকষা, ভগ্নাংশ ও প্রগমন ইত্যাদি বিষয় আলোচিত হয়েছে। এমনকি গুণনেরই ছয়টি বিশেষ পদ্ধতি –স্বরূপ, তৎস্থ, বিভাগ, খণ্ড, স্থান এবং ইষ্ট ছাড়াও কোনো একটি টীকায় সবক্‌ নামক একটি পদ্ধতির অবতারণা করা হয়েছে। নিম্নে সবক্ গুণন এবং বর্গ নির্ণয়ের পদ্ধতি দেখানো হলো।

সবক্ গুণন

এ পদ্ধতির গুণনকে সাধারণত লীলাবতী গুণন বলে আখ্যায়িত করা হয়। এছাড়া জালি গুণন (Lattice Multiplication), ইতালিয়ান পদ্ধতি, চৈনিক পদ্ধতিসহ আরও কিছু নামে নামকরণ করা হয়। আমরা সাধারণত যে পদ্ধতির গুণনে অভ্যস্ত, তার সাথে সবক্‌ পদ্ধতির তেমন কোনো পার্থক্য নেই, শুধু দ্বিতীয় পদ্ধতিতে ‘হাতে রাখার’ ঝামেলা নেই। একটি উদাহরণের মাধ্যমে পদ্ধতিটি ব্যাখ্যা করা যাক। ধরি ৪৮১৬ এবং ৫৯২ এর গুণফল নির্ণয় করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রথমে ৪ × ৩ ম্যাট্রিক্স আকারের (প্রথম সংখ্যা চার এবং দ্বিতীয় সংখ্যা তিন অঙ্কবিশিষ্ট বিধায়) একটি গ্রিড টেবিল নিতে হবে। গ্রিডের প্রতিটি সেলকে কর্ণ বরাবর দুইভাগ করতে হবে। এবার ৪৮১৬ সংখ্যাটিকে গ্রিডের উপরে প্রতিটি কলাম বরাবর বাম থেকে ডানে এবং ৫৯২ কে গ্রিডের ডানে উপর থেকে নিচে প্রতিটি সারি বরাবর  স্থাপন করতে হবে। এরপর প্রতিটি সেলে উপরের কলাম বরাবর অঙ্ক এবং ডানের সারি বরাবর অঙ্কের গুণফল লিখতে হবে। অঙ্কদ্বয়ের গুণফল একাঙ্ক হলে কর্ণের উপরে শূন্য এবং নিচে অঙ্কটি বসবে। আর যদি গুণফল দুই অঙ্কের হয়, তবে দশকের অঙ্ক কর্ণের উপরে এবং এককের অঙ্ক কর্ণের নিচে অবস্থান করবে। এরূপে ৪ × ৩ বা ১২টি অঙ্ক জোড়ার গুণফল সম্পন্ন করতে হবে। 

সবক্‌ বা লীলাবতী গুণন

এবার যোগের পালা। যোগ করতে হবে কর্ণ বরাবর এবং লিপিবদ্ধ করতে হবে গ্রিডের বামে ও নিচে। প্রথমে নিচের ডানদিকের (দক্ষিণ-পূর্ব) কর্ণ থেকে শুরু করতে হবে। ক্রমান্বয়ে উপরে বামদিকের (উত্তর-পশ্চিম) কর্ণ পর্যন্ত হিসাব করতে হবে। নিচ থেকে কোনো কর্ণ বরাবর সমষ্টি যদি দশ বা ততোধিক হয়, তবে তার এককের অঙ্ক ঐ কর্ণ বরাবর লিখে দশকের অঙ্ক উপরের কর্ণের সমষ্টির সাথে যোগ করতে হবে। সর্বাপেক্ষা নিচের এবং সর্বাপেক্ষা উপরের কর্ণদ্বয়ে সর্বদা একটি করে অঙ্ক থাকবে। নিচের কর্ণের যোগফল হবে উক্ত অঙ্কটিই। আলোচ্য গুণফলে সর্বনিম্নের কর্ণের যোগফল ২। এর উপরের কর্ণের যোগফল (৪+১+২) বা ৭। এরপর (০+৫+৯+০+৬) বা ২০। এখন এই ২০ এর ০ বসবে উক্ত কর্ণ বরাবর, আর ২ উপরের কর্ণের সাথে যোগ হবে। উপরের কর্ণের যোগফল (৩+৫+০+২+১+৮)+২ বা ২১। আগের নিয়মানুযায়ী এককের অঙ্ক ১ বসবে এই কর্ণে, আর দশকের ২ উপরের কর্ণের সাথে যোগ হবে। এইভাবে প্রত্যেকটি কর্ণের সমষ্টি নির্ণয় করতে হবে। পরিশেষে আলোচ্য সংখ্যাদ্বয়ের গুণফল নির্ণয়ে বামদিকে উপর থেকে নিচে এবং নিচে বাম থেকে ডানের অঙ্কগুলোকে পরপর লিখতে হবে, যা চিত্রে তীর চিহ্ন দ্বারা নির্দেশ করা হয়েছে। আমাদের আলোচ্য গুণফল হচ্ছে ২৮৫১০৭২।

লক্ষণীয় বিষয় এই যে, গুণনের ক্রম পরিবর্তন করলেও গুণফল একই থাকে, অর্থাৎ গুণফলে কোনো পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না। নিচের চিত্রে ব্যাপারটি দেখানো হলো।

গুণনের ক্রম পরিবর্তনেও গুণফল একই থাকে

লীলাবতী গুণন পদ্ধতিতে দশমিক সংখ্যারও গুণ করা যায়। এক্ষেত্রে গুণনের নিয়ম একই, শুধু গুণফলে দশমিক বিন্দুটি যথাযথ স্থানে স্থাপন করতে হয়। গুণনের সংখ্যাদ্বয়ের দশমিক বিন্দু বরাবর উলম্ব এবং আনুভূমিক রেখা আঁকতে হবে। এরপর এই রেখা দুইটি গ্রিডের যে বিন্দুতে ছেদ করবে, ঐ বিন্দুতে অঙ্কিত কর্ণ বরাবর গুণফলে দশমিক বিন্দু স্থাপন করতে হবে। নিচের চিত্রে ৪.৮১৬ এবং ৫.৯২ এর গুণফল দেখানো হলো।

দশমিক সংখ্যার লীলাবতী গুণন

চিত্র থেকে স্পষ্ট, ৪.৮১৬ × ৫.৯১ = ২৮.৫১০৭২।

বর্গ নির্ণয়

কোনো সংখ্যা $x$ এর বর্গ নির্ণয়ে আমরা বীজগণিতের $x^2 – y^2 = (x+y) (x-y)$ সূত্রটি ব্যবহার করতে পারি। এক্ষেত্রে $y$ এমনভাবে নির্বাচন করতে হবে যেনো $(x+y)$ দশ বা একশো বা এক হাজারের গুণিতক হয়। এতে গুণনের সুবিধা পাওয়া যায়। নিচের সমীকরণটি লক্ষ্য করি।

$$x^2=x^2-y^2+y^2=(x+y) (x-y)+y^2$$

উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক। ধরি ৬৭ এর বর্গ নির্ণয় করতে হবে। স্পষ্টত, ৬৭ এর সাথে ৩ যোগ করলে যোগফল ৭০ হয়, যা ১০ এর গুণিতক সংখ্যা। এক্ষেত্রে $x=$ ৬৭ এবং $y=$ ৩। সুতরাং

৬৭২  = (৬৭ + ৩) (৬৭ – ৩) + ৩ = (৭০ × ৬৪) + ৯ = ৪৪৮০ + ৯ = ৪৪৮৯

নিচের ফ্লো চার্টের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি আরও সহজবোধ্য হবে।

বর্গ নির্ণয়ে ‘লীলাবতী’ কৌশল

অর্থাৎ ৬৭ এর সাথে ৩ যোগ ও বিয়োগ করে যে সংখ্যা দুইটি পাওয়া যাবে তাদের গুণফলের সাথে ৩ যোগ করলেই ৬৭ এর বর্গ পাওয়া যাবে।

গণিতকে বলা হয় বিজ্ঞানের রানি। আজকের দুনিয়ার যত প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, তার প্রায় সবকিছুর মূলে রয়েছে গণিতের অবদান। আর প্রাচীনকাল থেকে সেই গণিতের উৎকর্ষ সাধনে ভারতবর্ষের গণিতবিদদের অবদান অনস্বীকার্য। ভাস্করাচার্য (ভাস্কর দ্বিতীয় নামেও পরিচিত) ‘লীলাবতী’ গ্রন্থে সংস্কৃত ভাষায় তনয়া লীলাবতীর সাথে কথোপকথনের ছলে গণিতের যে নিয়ম বর্ণনা করেছেন, তা বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এছাড়া গ্রন্থটি পাটিগণিতের পাঠ্যবই হিসেবে প্রচলিত ছিলো দীর্ঘকাল। ‘লীলাবতী’ গণিতের জগতে এক অসামান্য কীর্তি। পাঠকদের জন্য জানিয়ে রাখছি, ‘লীলাবতী’ গ্রন্থটি বাংলায় অনূদিত হয়ে অনুপম প্রকাশনী কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে। অনুবাদ ও সম্পাদনার কাজটি করেছেন গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ক জনপ্রিয় লেখক সৌমেন সাহা। আগ্রহী পাঠকগণ ‘লীলাবতীর’ সুরলালিত্যে মোহাবিষ্ট হবেন নিশ্চয়ই।

সৌমেন সাহা অনূদিত ও সম্পাদিত ‘লীলাবতী’ গ্রন্থের প্রচ্ছদ

তথ্যসূত্র

  • ভাস্করাচার্য ও লীলাবতী, বিশ্বনাথ দাস; নিবোধত, রজতজয়ন্তী বর্ষ, ২য় সংখ্যা, জুলাই – আগস্ট ২০১১
  • Lattice multiplication; WIKIPEDIA
  • গণিতের ম্যাজিকঃ গণিতের রাজ্যে স্বপ্নের রাজকন্যা “লীলাবতী”; Mrinal Edu
  • মানসাঙ্কের চমকপ্রদ কৌশল; বিজ্ঞান ব্লগ
  • Secrets of Mental Math; Arthur Benjamin & Michael Shermer
  • ৭৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে শকাব্দ গণনা শুরু হয়। সম্রাট বিক্রমাদিত্যের পৌত্র  সম্রাট শালিবাহন ৭৮ খ্রিষ্টাব্দে শকদের পরাজিত করেন। সে হিসেবে খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৭৮ বিয়োগ করলে শকাব্দ পাওয়া যায়।

লেখাটি 92-বার পড়া হয়েছে।

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 904 other subscribers