এক শত্রু নয়, বহু শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ: উদ্ভিদের মাল্টিপল স্ট্রেস নেক্সাসের অদৃশ্য মহাকাব্য

লেখাটি , বিভাগে প্রকাশিত

বাগেরহাটের ধানক্ষেতে এক দুপুর

সময়টা জুন মাসের শেষ সপ্তাহ। কল্পনা করা যাক, উপকূলীয় অঞ্চলের একটি জেলা, বাগেরহাটের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি ধানক্ষেতে দাঁড়িয়ে আছে একটি তরুণ ধানগাছ। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, তপ্ত দুপুরে সে কেবল বাতাসে মৃদু দুলছে। চারদিকে এক প্রশান্তির ছায়া। অথচ এই শান্ত দৃশ্যের আড়ালে তার শরীরের ভেতরে হয়তো চলছে বেঁচে থাকার এক কঠিন লড়াই।

মাটির লবণাক্ততা তার শিকড়ের পানি ও পুষ্টি গ্রহণকে ব্যাহত করছে। আকাশে তীব্র রোদ-তাপমাত্রা প্রায় ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কয়েক সপ্তাহের অনাবৃষ্টিতে মাটিতে পানির প্রাপ্যতা কমে এসেছে। এর সঙ্গে পুষ্টির সীমাবদ্ধতা কিংবা রোগজীবাণুর আক্রমণ যুক্ত হলে একটি ছোট্ট ধানগাছকে একই সময়ে একাধিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। লবণাক্ততা, খরা, তাপদাহ, রোগজীবাণু এবং পুষ্টির সীমাবদ্ধতা। একটি নয়-একসঙ্গে একাধিক শত্রু।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, উদ্ভিদ কি প্রতিটি শত্রুর বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা যুদ্ধ করে? নাকি তার শরীরের ভেতরে এমন এক আন্তঃসংযুক্ত সংকেতব্যবস্থা আছে, যেখানে একাধিক বিপদের বার্তা পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়, সংঘর্ষে জড়ায়, কখনো একে অন্যকে শক্তিশালী করে, আবার কখনো দুর্বল করে দেয়? উদ্ভিদের এই জটিল বাস্তবতা হয়ে উঠেছে আধুনিক উদ্ভিদ বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাক্ষেত্র। গবেষণাগারের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের মতো প্রকৃতির মাঠে সাধারণত একটি মাত্র প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয় না। বরং সেখানে একই সময়ে কিংবা ধারাবাহিকভাবে একাধিক প্রতিকূলতার চাপ মোকাবিলা করতে হয় যা তার বৃদ্ধি, বিপাক ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।

এই লেখায় এই জটিল আন্তঃসম্পর্কের জালকেই আমরা বলব মাল্টিপল স্ট্রেস নেক্সাস বা বহুমাত্রিক স্ট্রেসের সংযোগজাল।

ছবিসূত্র: কমিউনিকেশন বায়োলজি

যখন একটি শত্রুকে আলাদা করে দেখা হতো

দীর্ঘদিন ধরে গবেষণাগারে উদ্ভিদের ভিন্ন ভিন্ন স্ট্রেস নিয়ে গবেষণা হয়ে আসছে। যেমন-গবেষণাগারের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কখনো শুধু খরা, কখনো লবণাক্ততা, কখনো তাপমাত্রা, আবার কখনো রোগজীবাণুর আক্রমণের মুখে উদ্ভিদ কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়-বিজ্ঞানীরা তা গভীরভাবে অনুসন্ধান করেছেন।

এই একক-স্ট্রেসভিত্তিক গবেষণা আমাদের অসাধারণ সব ফলাফল দিয়েছে। আমরা জেনেছি খরার সময় কীভাবে অ্যাবসিসিক অ্যাসিড বা এবিএ (Abscisic acid- ABA) সংকেত সক্রিয় হয়, লবণাক্ততায় কীভাবে বিষাক্ত সোডিয়াম ও উপকারী পটাসিয়াম আয়নের ভারসাম্য বদলে যায়, উচ্চ তাপমাত্রায় কীভাবে প্রোটিন, নিউক্লিক এসিড ও কোষীয় কাঠামোর সুরক্ষা ব্যবস্থা অর্থাৎ এন্টি-অক্সিডেন্টসমূহ সক্রিয় হয় এবং রোগজীবাণুর আক্রমণে কীভাবে উদ্ভিদের প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক সাড়া দেয়।

কিন্তু ফসলের মাঠ কোনো নিয়ন্ত্রিত গবেষণাগার নয়। সেখানে প্রতিকূলতাগুলো সবসময় একা আসে না। খরার সঙ্গে তাপদাহ দেখা দিতে পারে। লবণাক্ততার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে পানির সংকট। পরিবেশগত চাপ বদলে দিতে পারে উদ্ভিদ ও রোগজীবাণুর মধ্যকার সম্পর্ক। আবার পুষ্টির সীমাবদ্ধতা দুর্বল করে দিতে পারে উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও প্রতিরক্ষা।

কখনো একটি স্ট্রেস শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি এসে হাজির হয়। কখনো একাধিক চাপ একই সময়ে উদ্ভিদকে ঘিরে ধরে। আর এখানেই শুরু হয় আসল জটিলতা।

কারণ দুটি বা তিনটি স্ট্রেস একসঙ্গে উপস্থিত হলে উদ্ভিদের প্রতিক্রিয়া সবসময় তাদের পৃথক প্রতিক্রিয়ার সরল যোগফল হয় না। একটি স্ট্রেস অন্যটির প্রভাব বাড়িয়ে দিতে পারে, কমিয়ে দিতে পারে, কিংবা তাদের পারস্পরিক ক্রিয়া থেকে জন্ম নিতে পারে নতুন ধরনের শারীরবৃত্তীয় ও আণবিক প্রতিক্রিয়া।

উদ্ভিদের শরীরে এক ‘জৈব ইন্টারনেট’

যুদ্ধের প্রথম আঘাতটি আসতে পারে মাটির নীচে- শিকড়ে।

মাটিতে লবণের ঘনত্ব বেড়ে গেলে কিংবা পানির প্রাপ্যতা হঠাৎ কমে গেলে শিকড়ের কোষগুলো দ্রুত সেই পরিবর্তন অনুভব করতে পারে। কোষঝিল্লিতে থাকা বিভিন্ন সেন্সর ও আয়ন চ্যানেলের কার্যকলাপ বদলে যায়। আর কোষের ভেতরে শুরু হয় একের পর এক সংকেতের প্রবাহ।

এই সংকেতব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভাষা হলো ক্যালসিয়াম আয়ন (Ca²⁺)।প্রতিকূলতার ধরন ও তীব্রতার ওপর নির্ভর করে কোষের ভেতরে Ca²⁺-এর ঘনত্বে স্থানিক ও সময়ভিত্তিক বিশেষ পরিবর্তন তৈরি হতে পারে। অনেকটা বিপদের একটি সাংকেতিক ‘স্বাক্ষর’। কোষ সেই সংকেতকে শনাক্ত করে পরবর্তী প্রতিরক্ষা ও অভিযোজনমূলক প্রতিক্রিয়া সক্রিয় করতে পারে।

কিন্তু ক্যালসিয়াম একা কাজ করে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রিয়্যাক্টিভ অক্সিজেন স্পিসিস বা আরওএস (Reactive Oxygen Species- ROS), বৈদ্যুতিক সংকেত, হরমোন এবং হাইড্রোলিক পরিবর্তন।

একসময় আরওএস-কে মূলত কোষের জন্য ক্ষতিকর উপজাত হিসেবে দেখা হতো। অতিরিক্ত আরওএস সত্যিই কোষের লিপিড, প্রোটিন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় আরওএস একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সংকেতবাহী অণু হিসেবেও কাজ করে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, Ca²⁺ ও ROS পরস্পরকে প্রভাবিত করতে পারে। এর সঙ্গে বৈদ্যুতিক ও হাইড্রোলিক সংকেত যুক্ত হয়ে উদ্ভিদের এক অংশে সৃষ্টি হওয়া বিপদের খবর দূরের টিস্যুতেও পৌঁছে দিতে পারে। শিকড় যদি প্রথমে লবণাক্ততা বা পানির সংকট অনুভব করে, তার প্রতিক্রিয়া তাই শুধু শিকড়েই সীমাবদ্ধ থাকে না। বিভিন্ন আন্তঃসংযুক্ত সংকেতপথের মাধ্যমে সেই তথ্য পাতাসহ পুরো উদ্ভিদের শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমকে প্রভাবিত করতে পারে।

সহজ ভাষায় বললে, বিপদের মুহূর্তে উদ্ভিদের শরীরের ভেতরে যেন সক্রিয় হয়ে ওঠে এক অসাধারণ ‘জৈব ইন্টারনেট’।

সমস্যা শুরু হয় যখন শত্রুরা দল বেঁধে আসে

এবার কল্পনা করুন, মাটির নিচে লবণাক্ততার চাপ, চারদিকে পানির সংকট, আর ওপরে উচ্চ তাপমাত্রা-সব একসঙ্গে শুরু হলো। পানির ঘাটতিতে উদ্ভিদ পানি হারানো কমাতে পত্ররন্ধ্র বা স্টোমাটা আংশিকভাবে বন্ধ করে দিতে পারে। কিন্তু এরও একটি মূল্য আছে। স্টোমাটা বন্ধ হলে পাতার ভেতরে কার্বন ডাই-অক্সাইডের প্রবেশ কমে যায়, ফলে সালোকসংশ্লেষণ ব্যাহত হতে পারে।

একই সময়ে অতিরিক্ত তাপ ক্লোরোপ্লাস্টের আলোকসংবেদনশীল যন্ত্রপাতি ও বিপাকীয় প্রক্রিয়ার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। আর লবণাক্ততা যোগ করে অসমোটিক চাপ এবং সোডিয়াম ও ক্লোরাইড আয়নজনিত বিষক্রিয়ার আরেকটি স্তর। ফলে উদ্ভিদের কোষে একসঙ্গে বদলে যেতে থাকে পানির ভারসাম্য, আয়নের সাম্যাবস্থা, শক্তির প্রবাহ এবং জারণ অবস্থা। প্রতিকূলতা তীব্র হলে আরওএস-এর উৎপাদনও বেড়ে যেতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো-এই আরওএস (ROS) কার বার্তা বহন করছে? খরার? তাপদাহের? নাকি লবণাক্ততার?

উত্তর হলো-একে সবসময় এত সহজে আলাদা করা যায় না। কারণ একাধিক স্ট্রেসের সংকেত উদ্ভিদের কোষে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন পথে চলে না। বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের পথ পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়, একে অন্যকে প্রভাবিত করে এবং কখনো নতুন ধরনের সম্মিলিত প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

ক্যালসিয়াম আয়ন (Ca²⁺), আরওএস (ROS), ম্যাপ কাইনেজ (MAP kinase) বা ম্যাপকে সিগনালিং ক্যাসকেড (MAPK signaling cascade), বিভিন্ন উদ্ভিদ হরমোন এবং অসংখ্য ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর (transcription factor) এই জটিল যোগাযোগব্যবস্থার অংশ।

এটি কোনো একটি কেন্দ্রীয় ‘সুপার কম্পিউটার’ নয়। বরং পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত অসংখ্য যোগাযোগকেন্দ্রের এক বিশাল নেটওয়ার্ক। একটি সংকেত আরেকটির শক্তি বাড়াতে পারে। কোনোটি আবার অন্য সংকেতকে দুর্বল করে দিতে পারে। একই সংকেতপথ একটি পরিস্থিতিতে উদ্ভিদকে রক্ষা করলেও ভিন্ন স্ট্রেস-সমন্বয়ে তার ভূমিকা বদলে যেতে পারে। এই জটিল প্রক্রিয়াকেই বিজ্ঞানীরা বলেন স্ট্রেস সিগনালিং ইন্টিগ্রেশন এন্ড ক্রসটক (Stress signal integration and crosstalk)।

আর এখানেই মাল্টিপল স্ট্রেস নেক্সাস-এর আসল রহস্য।

উদ্ভিদের ‘ওয়ার রুম’: বাঁচতে হলে যখন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়

একাধিক বিপদের সংকেত যখন উদ্ভিদের কোষে একসঙ্গে প্রবাহিত হতে থাকে, তখন শুরু হয় আরও কঠিন এক সমন্বয়। উদ্ভিদকে শুধু বিপদ শনাক্ত করলেই চলে না। তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়-সীমিত পানি, শক্তি ও পুষ্টি কোথায় ব্যয় করা হবে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে উদ্ভিদের হরমোন ও বিভিন্ন সংকেত নেটওয়ার্ক।

খরা ও পানির সংকটে অ্যাবসিসিক অ্যাসিড বা এবিএ (Abscisic Acid- ABA) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি পত্ররন্ধ্র নিয়ন্ত্রণ, পানি সংরক্ষণ এবং স্ট্রেসে সাড়াদানকারী বিভিন্ন জিন-এর কার্যক্রম পরিবর্তনের মাধ্যমে উদ্ভিদকে প্রতিকূলতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে।

অন্যদিকে স্যালিসাইলিক অ্যাসিড বা এসএ (Salicylic Acid- SA), জেসমনিক অ্যাসিড বা জেএ (Jasmonic Acid- JA) এবং ইথাইলিন (Ethylene) রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন জৈবিক ও পরিবেশগত চাপের প্রতিক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কিন্তু এই হরমোনগুলো আলাদা আলাদা সুইচের মতো কাজ করে না। তারা একে অন্যের সঙ্গে কথা বলে। কখনো সহযোগিতা করে। কখনো বিরোধে জড়ায়। কখনো একটি সংকেত অন্যটির কার্যক্রম কমিয়ে দেয়।

আর তখন উদ্ভিদের সামনে দাঁড়ায় এক কঠিন সমীকরণ— বৃদ্ধি, নাকি প্রতিরক্ষা? পানি সংরক্ষণ, নাকি সালোকসংশ্লেষণ? তাৎক্ষণিক বেঁচে থাকা, নাকি ভবিষ্যতের বৃদ্ধি ও প্রজনন?

এই সিদ্ধান্তগুলো কোনো একটি হরমোন একা নেয় না। ক্যালসিয়াম আয়ন, আরওএস, ম্যাপকে সিগনালিং, এবিএ, এসএ, জেএ, ইথাইলিন এবং বিভিন্ন ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর-এর পারস্পরিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে তৈরি হয় একটি সমন্বিত প্রতিক্রিয়া। জনপ্রিয় বিজ্ঞানের ভাষায় এই জটিল নেটওয়ার্ককেই আমরা উদ্ভিদের ‘ওয়ার রুম’ বলে কল্পনা করতে পারি।

এখানে কোনো সরল ‘জীবন না মৃত্যু’ বোতাম নেই। বরং উদ্ভিদ তার সীমিত সম্পদ ক্রমাগত পুনর্বণ্টন করে। কোনো জিনের কার্যক্রম বাড়ে, কোনোটি কমে। স্টোমাটার আচরণ বদলায়। বৃদ্ধি সাময়িকভাবে ধীর হতে পারে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট (যেমন- সিএট (CAT), এসওডি (SOD), পিওডি (POD), এপিএক্স (APX)) প্রতিরক্ষা সক্রিয় হয়। আবার রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার অগ্রাধিকারও বদলে যেতে পারে।

এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যই নির্ধারণ করে-একাধিক প্রতিকূলতার মুখে একটি উদ্ভিদ শুধু টিকে থাকবে, নাকি সেই প্রতিকূলতার মধ্যেও উৎপাদন ধরে রাখতে পারবে।

এক যোগ এক কেন সবসময় দুই নয়?

মাল্টিপল স্ট্রেস নেক্সাস-এর সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকগুলোর একটি হলো-এখানে সাধারণ যোগফলের নিয়ম সবসময় খাটে না। ধরা যাক, একটি উদ্ভিদ খরার মুখে পড়লে তার বৃদ্ধি ও সালোকসংশ্লেষণ কমে যায়। আবার আলাদাভাবে তাপদাহও তার শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমে বাধা বা চাপ সৃষ্টি করে।

তাহলে খরা ও তাপদাহ একসঙ্গে এলে কী হবে? সহজ হিসাব বলবে- দুই স্ট্রেসের ক্ষতি যোগ হয়ে যাবে। কিন্তু উদ্ভিদের জীববিজ্ঞান এত সরল নয়।একাধিক স্ট্রেস একসঙ্গে উপস্থিত হলে তাদের পারস্পরিক প্রভাব হতে পারে অ্যাডিটিভ (additive), সিনারজিস্টিক (synergistic) অথবা অ্যান্টাগোনিস্টিক (antagonistic)।

কখনো দুটি স্ট্রেসের সম্মিলিত প্রভাব তাদের পৃথক প্রভাবের কাছাকাছি যোগফল তৈরি করে। আবার কখনো একটি স্ট্রেস উদ্ভিদকে এমনভাবে দুর্বল করে দেয় যে দ্বিতীয় স্ট্রেসের আঘাত আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এটিই synergistic interaction।

অন্যদিকে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি স্ট্রেসের কারণে আগে থেকেই সক্রিয় হওয়া প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরবর্তী আরেকটি স্ট্রেসের ক্ষতি আংশিকভাবে কমিয়ে দিতে পারে। তখন দেখা দিতে পারে অ্যান্টাগোনিস্টিক মিথস্ক্রিয়া কিংবা ক্রস টলারেন্স-এর মতো প্রতিক্রিয়া। আরও জটিল বিষয় হলো-একই দুটি স্ট্রেসের ফলাফলও সবসময় এক রকম হয় না।

কোন স্ট্রেসটি আগে এসেছে, কতদিন স্থায়ী হয়েছে, উদ্ভিদের বৃদ্ধির কোন পর্যায়ে আঘাত করেছে এবং সংশ্লিষ্ট জাতটির জিনগত বৈশিষ্ট্য কী-এসবের ওপর সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া বদলে যেতে পারে।

অর্থাৎ, এক যোগ এক কখনো দুই। কখনো দুইয়ের চেয়েও বেশি। আবার কখনো দুইয়ের চেয়েও কম।

এটাই কম্বাইন্ড বা সমন্বয়কৃত স্ট্রেস বায়োলজি-এর অদ্ভুত গণিত।

ভবিষ্যতের ফসল কেমন হবে?

গত কয়েক দশকের গবেষণা আমাদের খরা-সহনশীল, লবণাক্ততা-সহনশীল, তাপ-সহনশীল কিংবা রোগপ্রতিরোধী ফসল উদ্ভাবনের অসাধারণ বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে।

কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে সামনে এসেছে আরও কঠিন একটি প্রশ্ন-

ল্যাবরেটরিতে একটি নির্দিষ্ট স্ট্রেসের বিরুদ্ধে সফল একটি ফসল বাস্তব মাঠের বহুমাত্রিক প্রতিকূলতার মধ্যেও কি একইভাবে টিকে থাকতে পারবে?

কারণ ভবিষ্যতের একটি ধানগাছকে হয়তো শুধু খরা মোকাবিলা করতে হবে না। একই মৌসুমে তাকে তাপদাহ, লবণাক্ততা, পুষ্টির সীমাবদ্ধতা কিংবা রোগজীবাণুর চাপেরও মুখোমুখি হতে হতে পারে। কোনো কোনো প্রতিকূলতা আসবে একসঙ্গে। কোনোটি আসবে একটির পর আরেকটি।

ফলে ভবিষ্যতের ফসল উন্নয়নের লক্ষ্য শুধু সিঙ্গেল স্ট্রেস টলারেন্স-এ সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রয়োজন হবে বাস্তব পরিবেশে মাল্টি স্ট্রেস রিসাইলেন্স বোঝা এবং উন্নত করা। এই কাজটি সহজ নয়।

ভবিষ্যতের গবেষণায় নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষাগারের পাশাপাশি বাস্তব মাঠের জটিল পরিবেশে ফসলের প্রতিক্রিয়া মূল্যায়ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। জিনোমিক্স, ফেনোমিক্স, জিন সম্পাদনা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং পরিবেশগত তথ্য বিশ্লেষণকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা খুঁজবেন এমন জিনগত বৈশিষ্ট্য ও নিয়ন্ত্রণ নেটওয়ার্ক, যা উদ্ভিদকে পরিবর্তনশীল একাধিক প্রতিকূলতার মধ্যেও উৎপাদন ধরে রাখতে সাহায্য করবে।

ভবিষ্যতের ‘সুপার ক্রপ’ তাই এমন কোনো অলৌকিক উদ্ভিদ হবে না, যে সব ধরনের স্ট্রেসকে সম্পূর্ণ পরাজিত করবে। বরং সেটি হবে এমন একটি ফসল, যা প্রতিকূল পরিবেশ দ্রুত অনুভব করতে পারবে, বিভিন্ন সংকেতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ঘটাবে, সীমিত সম্পদ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করবে এবং চাপের মধ্যেও গ্রহণযোগ্য ফলন ধরে রাখতে পারবে।

এটাই আগামী দিনের মাল্টি স্ট্রেস রিসাইলেন্ট ক্রপ (Multi-Stress Resilient Crop)

আবার সেই বাগেরহাটের প্রত্যন্ত ধানক্ষেতে

এবার আবার ফিরে যাই বাগরেহাটের সেই ধানক্ষেতে। বিকেলের আলো নেমে এসেছে। তরুণ ধানগাছটি এখনো বাতাসে দুলছে। বাইরে থেকে তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই, তার প্রতিটি কোষে কত অসংখ্য সংকেত ছুটে চলছে- Ca²⁺এর ওঠানামা, ROS-এর বার্তা, হরমোনের পারস্পরিক কথোপকথন, জিনের সক্রিয়তা আর বিপাকীয় সূক্ষ্ম পুনর্বিন্যাস। সে কোনো একটি শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করছে না।

সে একটি পরিবর্তনশীল পৃথিবীর বহুমাত্রিক পরিবেশগত চাপের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। বাগেরহাটের সেই নিঃশব্দ ধানক্ষেত তাই শুধু একটি ফসলের মাঠ নয়; এটি ভবিষ্যতের কৃষির এক জীবন্ত পরীক্ষাগার। এখানেই খরা, তাপ, লবণাক্ততা, পুষ্টির সীমাবদ্ধতা ও রোগজীবাণুর মতো বিভিন্ন চাপ পরস্পরের সঙ্গে মিশে তৈরি করছে নতুন সব বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন।

আগামী দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তাই হয়তো আর শুধু এটি নয়— “একটি ফসল কতটা খরা-সহনশীল?”

বরং প্রশ্নটি হবে-

“একটি পরিবর্তনশীল পৃথিবীর বহুমাত্রিক প্রতিকূলতার মধ্যেও সে কতটা ভালোভাবে টিকে থেকে ফসল দিতে পারে?”

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই লুকিয়ে আছে উদ্ভিদের মাল্টিপল স্ট্রেস নেক্সাস-এর অদেখা রহস্য। আর সেই রহস্য উন্মোচনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে আমাদের ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তার গল্পও।

তথ্যসূত্র:

লেখাটি 0-বার পড়া হয়েছে।

ইউটিউব চ্যানেল থেকে

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য লেখা


নিজের ওয়েবসাইট তৈরি করতে চান? হোস্টিং ও ডোমেইন কেনার জন্য Hostinger ব্যবহার করুন ৭৫% পর্যন্ত ছাড়ে।

আলোচনা

Leave a Reply