গোল গোল গোলক: গোলকের ভুবন [১]


লিখেছেন

লেখাটি বিভাগে প্রকাশিত
কিছু গল্প কিছু অনুধাবনঃ
মানুষের চোখের যে অংশটা নড়াচড়া করে দেখতে সাহায্য করে সে অংশটাকে বাইরে থেকে দেখলে চ্যাপ্টা আকৃতির কিছু একটা বলে মনে হয়। আসলে এটি চ্যাপ্টা নয়, গোলক আকৃতির। এই অঙ্গটিকে বলা হয় অক্ষিগোলক, এটির বেশ খানিকটা অংশ ভেতরের দিকে গ্রোথিত থাকে বলে বাইরে থেকে দেখা যায় না। এই অক্ষিগোলক যদি গোল না হতো তাহলে আমাদেরকে দেখা সংক্রান্ত ব্যাপারে মারাত্মক সমস্যার মুখোমুখি হতে হতো। এটি গোলাকার বলেই চোখকে এপাশ-ওপাশ, উপর-নিচ করা যায়। অক্ষিগোলক যদি গোলাকার না হয়ে অন্য কোনো সরল আকৃতি যেমন ঘনক বা পিরামিডের মতো হতো তাহলে কী বিদঘুটে অবস্থার মাঝেই না পড়তে হতো। সাবলীলভাবে কিছুই দেখতে পেতাম না।
চোখের পরে দেহেরই আরেক অঙ্গ হাঁটুর দিকে নজর দেই। হাঁটুর জয়েন্টগুলোতে যদি লিগামেন্টের উপস্থিতির পাশাপাশি কিছুটা বক্র বা গোলাকার জাতীয় কিছু না থাকতো তাহলে কিন্তু হাটা-চলাতে দারুণ সমস্যা হতো। অন্য কোনো অসুবিধাজনক আকৃতি হলেই পা ভাজ করতে বারোটা বেজে যেতো। পা’কে যদি মাঝামাঝি অবস্থানে ভাজই করতে না পারা গেল তবে কদম ফেলে সামনের দিকে যাবে কী করে? এমন হলে তাসমানীয় পৌরাণিক কাহিনীর প্রথম মানবের মতো দুঃখজনক অবস্থাতে পড়তে হতো।
নক্ষত্রলোকে এক ভয়াবহ যুদ্ধে মইনী নামের একজন দেবতা ড্রোমারডিনার নামের আরেকজন যুদ্ধ-বীর দেবতার কাছে শুচনীয় পরাজয় বরণ করে। মইনী আকাশলোক থেকে ছিটকে তাসমানিয়ার আছড়ে পড়ে। মারা যাচ্ছে, এই ব্যাপারটা উপলব্ধি করে সে তার একটা শেষ শুভ ইচ্ছা পূরণ করতে চাইল, শেষ আশ্রয়স্থলের জন্য একটা ভালো কিছু তৈরি করার চেষ্টা করল। সে সিদ্ধান্ত নিলো মানুষ সৃষ্টি করবে। মরে যাচ্ছে, একটু পরেই দেবতার ক্ষমতা চলে যাবে, এই ভয়ে খুব দ্রুত কাজ করতে লাগল। এই দ্রুততা বা ব্যস্ততার ফলে সে সদ্য সৃষ্টি করা মানুষের পায়ে হাঁটু দিতে ভুলে গেল। পাশাপাশি আরেকটা ভুল কাজ করে ফেলল, মনভোলা হয়ে মানুষের পেছনে লম্বা লেজ লাগিয়ে দিল, অনেকটা ক্যাঙ্গারুর লেজের মতো করে। এর পরপরই সেই দেবতা মারা গেল।

চিত্রঃ তাসমানীয় পৌরাণিক কাহিনীর প্রথম মানব পার্লেভার। প্রথমে যাকে হাঁটুবিহীন অবস্থায় সৃষ্টি করা হয়েছিল। ছবিঃ Dave McKean

এহেন অসুবিধায় প্রথম মানব না পারে বসতে না পারে চলতে। এই অসুবিধায় কান্না আর কান্না করতে লাগল। অনেক কান্নাকাটির পরে বিজয়ী বীর ড্রোমারডিনার তাদের করুণা করে লেজ কেটে দেন ও ভাজ করা যায় এমন হাঁটু জুড়ে দেন।[1] এরপর থেকে মানুষ স্বাভাবিকভাবে বসবাস করছে। এতো প্রাচীনকাল আগের পৌরাণিক কাহিনীর স্রষ্টারাও হাঁটুর প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারটা উপলব্ধি করেছেন।

হাতের বেলায় কনুইয়ের জয়েটে যদি বর্তুলাকার কিছু না থাকতো তাহলে কিছু খেতে চাইলে বিপত্তিতে পড়তে হতো। কনুই ভাজ না হলে হাতকে মাথার চারপাশে সারাদিন ঘুরিয়েও মুখের ধারে কাছে নিতে নেয়া যেতো না। পিঠে চুলকানি ওঠলে তো কষ্টেরই শেষ ছিল না! হাত ভাজ করা না গেলে, হাতকে ঘুরিয়ে নিয়ে আরামসে চুলকানোর শান্তিটাই চলে যেতো।

গোলাকৃতির সুবিধা নিয়ে আরেকবার ভাবা যাক তো, হাস-মুরগীর ডিম পুরোপুরি গোলাকার না হলেও কিছুটা গোলাকার হয়। মুরগীর ডিম যদি ‘কিছুটা গোলাকার’ না হয়ে কতগুলো কোণাওয়ালা ঘনক আকৃতির হতো তবে ডিম পাড়ার সময় মুরগীর বারোটা না বেজে উপায় অন্য কোনো উপায় ছিল? প্রকৃতির মাঝে গোলাকার জিনিসের উপস্থিতির সুবিধা আমরা প্রতিনিয়তই ভোগ করি।
সংজ্ঞায় যাইঃ
গোলক একটি ত্রিমাত্রিক জ্যামিতিক আকৃতি। বইয়ের পাতায় বা কাগজে যে জ্যামিতি চর্চা করা হয় তার সবই দ্বি-মাত্রিক। একটি দ্বিমাত্রিক পৃষ্ঠের উপর ত্রিমাত্রিক কোনো কিছুই আঁকা যায় না। খাতার পাতায় সত্যিকারের গোলক আঁকা সম্ভব নয়। খাতার পাতায় বৃত্ত আঁকা যায়, গোলক আঁকা যায় না। গোলক হচ্ছে ফুটবলের মতো। খাতায় ফুটবল আঁকা যায় না, ফুটবলের আকৃতি দেয়া যায় মাত্র। কলমের ছোঁয়ায় নানা কোণ ও আলোকের কারসাজিতে মোটামুটি একটা আকৃতি ফুটিয়ে তোলা যায়। আমরা কাগজের মাঝে প্রতিনিয়ত যে ছবি দেখি সেগুলো আসলে ত্রিমাত্রিক আকৃতির দ্বিমাত্রিক ছায়া।
বৃত্ত থেকে গোলকের সৃষ্টি, বৃত্তের মাধ্যমে গোলকের পরিচয় পাওয়া যায়। কোনো বৃত্তের ব্যাসকে অক্ষ ধরে নিয়ে, বৃত্তটিকে ঐ ব্যাসের চারদিকে ঘুরালে যে ঘনবস্তুর সৃষ্টি হয় তাকে গোলক বলে। আমরা যদি সহজ সরল দৃষ্টান্তের মাধ্যমে একটি গোলকের সাথে পরিচিত হতে চাই তাহলে একটি গোবেচারা ধরনের উদাহরণ দেখতে পারি। একটি সাইকেলের চাকাকে বৃত্ত হিসেবে ধরে নেই। চাকাতে কেন্দ্র হতে বাইরের দিকে পরিধি পর্যন্ত অনেকগুলো টানা দেয়া থাকে। এগুলোকে বলে স্পোক। স্পোকগুলোর মাঝে থেকে কোনো একটিকে ব্যাসার্ধ ধরে নেই। এই স্পোকের উল্টো দিকে আরেকটি স্পোককে একত্রে ধরে ব্যাস কল্পনা করি। চিত্রে মোটা দাগে ব্যাস ধরে নেয়া হয়েছে।

সুবিধার জন্য ধরে নেই চাকাটি কল্পিত ব্যাসকে কেন্দ্র করে চরকির মতো ঘুরতে পারে। এ ঘূর্ণনের ফলে চাকাটি চারিদিকে যে ক্ষেত্রের সৃষ্টি করবে তাই হল গোলক। আর ত্রিমাত্রিক গোলকের কেন্দ্রটি হবে দ্বিমাত্রিক বৃত্তের কেন্দ্রে। এই কেন্দ্রটিই গোলকের ভরকেন্দ্র।
এই কথাগুলোকে কেতাবি ভাষায় লেখা যায়- বৃত্তকে তার ব্যাসের চারপাশে ঘুরালে যে ঘনবস্তু উৎপন্ন হয় তাকেই গোলক বলে। বৃত্ত থেকে উৎপন্ন গোলক হবে একদম নিখুঁত সুষম গোলক। বৃত্তের ব্যাসই গোলকের ব্যাস, বৃত্তটি চরকির মতো ঘুরে ঘুরে যে জায়গা বা তল দখল করেছে সেটাই গোলকের তল বা ক্ষেত্রফল। বৃত্তের ক্ষেত্রফল πr^2 আর গোলকের ক্ষেত্রফল হবে 4πr^2, আয়তন হবে 4/3 πr^3।

গোলকের প্রতিসাম্যতাঃ

কোনো বস্তুকে যদি মাঝ বরাবর কেটে দুই ভাগ করা হয় এবং ভাগ দুটির প্রতিটিই দেখতে একটি আরেকটির দর্পনীয় প্রতিবিম্বের মতো হয় তাহলে ঐ বস্তুটি প্রতিসম। বেশ কয়েক প্রকারের প্রতিসাম্যতা আছে, যেমন আলোকীয় প্রতিসাম্যতা, অরীয় প্রতিসাম্যতা, মিশ্র প্রতিসাম্যতা ইত্যাদি। জীববিজ্ঞানে প্রাণী সনাক্তকরণ, শ্রেণিবিন্যাসকরণ বিভিন্ন অঙ্গাণুর বিশ্লেষণে প্রতিসাম্যতাকে ব্যবহার হরা হয়। রসায়নে অণুসমূহের আকৃতি ও কেলাসের গঠন ব্যাখ্যা করতে প্রতিসাম্যতার ব্যবহার রয়েছে। পদার্থবিজ্ঞানেও এর প্রচুর ব্যবহার রয়েছে।[2]

গোলকের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর পরিধি বা পৃষ্ঠের যেকোনো বিন্দুই কেন্দ্র থেকে সমান দূরত্বে অবস্থিত। গোলককে যে দিক থেকে ইচ্ছা সেদিক থেকেই কেটে সমান দুই ভাগে ভাগ করা যায়। গোলকের কেন্দ্রকে ছুঁয়ে করা যেকোনো ভাগযুগলই সম বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হবে। কেন্দ্র বরাবর যেকোনো দিক থেকে যেকোনো অবস্থায় গোলক প্রতিসম। এই বৈশিষ্ট্যটি গোলককে বিশেষ অনন্যতা দিয়েছে। গোলকে একই সাথে আলোকীয় প্রতিসাম্যতা ও অরীয় প্রতিসাম্যতা বিদ্যমান। মানব দেহকে মাঝ বরাবর উপর নিচে একবার মাত্র প্রতিসম হিসেবে ভাগ করা যায়। এজন্য মানুষ দ্বি-পার্শ্ব প্রতিসম।

[1] Richard Dawkins, The Magic of Reality: How Know Whats Really True, Free Press, New York, 2011

[2] What Is Symmetry? by Robert Coolman, Live Science, http://www.livescience.com/51100-what-is-symmetry.html

[বাকি অংশ পরবর্তী পর্বে। মোট ৩ পর্বে সমাপ্য। শীঘ্রই ২য় ও ৩য় পর্ব পোস্ট করা হবে।]

লেখাটি 3,015-বার পড়া হয়েছে।

ইউটিউব চ্যানেল থেকে

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য লেখা


নিজের ওয়েবসাইট তৈরি করতে চান? হোস্টিং ও ডোমেইন কেনার জন্য Hostinger ব্যবহার করুন ৭৫% পর্যন্ত ছাড়ে।

আলোচনা

Responses

  1. শাহরুখ পারভেজ সৌরভ Avatar
    শাহরুখ পারভেজ সৌরভ

    গোল (গোলক) আমদের এতো উপকার করছে, আবার পরিক্ষার খাতায় গোল পাইলে খবর আছে। হাহা।
    যাহোক, পোষ্ট থেকে দারুণ একটা জিনিস শিখলাম, দ্বিমাত্রিক কোনো কিছুতে ত্রিমাত্রিক কিছু আঁকা সম্ভব নয়। ধন্যবাদ, সুন্দর পোষ্ট।

    1. খাতায় গোল পেলে খুব সমস্যার কিছু তো নেই! ৮০/৯০/১০০ এই নম্বরগুলো খাতায় থাকলে সবাই বাহবা দিবে। 8-|

  2. তোমার এ লেখাগুলোর বিশেষত্ব হলো তথ্যমূলক আকর্ষণীয় ছবি-র দারুণ ব্যবহার। এজন্য পড়ে যেতে ভালো লাগে। তোমার বাক্য গঠন এতো সুন্দর, সে তুলনায় বানানের ক্ষেত্রে আরো সতর্ক হওয়া প্রয়োজন; শুচনীয়>শোচনীয় ইত্যাদি।

Leave a Reply