Share
   
পাঠ সংখ্যা : 163

অবিবাহিত তরুণ-যুবক বয়সের ঘনিষ্ট কোন বন্ধু বা ভাইয়ের কাছে আমাদের একটা সহজাত প্রশ্ন থাকে- “আপনি কি প্রেম করেন?” কিংবা, প্রেম বিষয়টা জানা থাকলে তখন প্রশ্নটি হয়-  “প্রেমিকার সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন চলছে?“। বাসায় বাবা-মা-ভাই-বোনের কুশল জিজ্ঞেস করি।  আবার, বিবাহিত কেউ হলেও জিজ্ঞাসা করি- “সংসার কেমন চলছে?” অর্থাৎ, ঘুরেফিরে আমরা সম্পর্ক সম্পর্কেই জানতে চাই৷ 

ইংরেজীতে একটি প্রবাদ আছে “No man is an island.” যে কথাটি অণুজীবের জন্যও প্রযোজ্য৷ এর অর্থ দাঁড়ায়- কোন অনুজীবের পৃথক অস্তিত্ব নেই৷ বিভিন্ন অণুজীব একত্রভাবেই পরিবেশে বসবাস করে এবং একে অপরের উপর নির্ভর করে৷ ছোট বেলায় সমাজ বইয়ের একটি উক্তির সাথে আমরা পরিচিত হয়েছি যার প্রতিফলন বাকি জীবনকালে আমরা ভালোভাবে উপলব্ধি করতে থাকি। খুবই সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তা হলো- “মানুষ সামাজিক জীব। একা একা বাঁচতে পারে না৷” এ উক্তির অন্তর্নিহিত ব্যাপারটিই হচ্ছে পারস্পারিক-সম্পর্ক ৷ অর্থাৎ, অন্যের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা ব্যতীত বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। সমাজে বসবাসরত শিক্ষক-ছাত্র, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষক, দিন-মজুর কিংবা ব্যবসায়ী নানা ধরণের মানুষের মধ্যকার সম্পর্কটাই হলো এই সমাজের প্রতিষ্ঠা৷ এছাড়া, আমাদের বসবাসরত পৃথিবী কিংবা মহাবিশ্বের অন্যান্য বহু ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করলেই নানা ধরনের সম্পর্ক বোঝা যায়। যেমন: পৃথিবী কিংবা চন্দ্র-সূর্যের নিজ অক্ষে আবর্তনও একধরণের শৃঙ্খলা কিংবা নিজ কক্ষচ্যুত না হবার সম্ভব্য সহজাত সম্পর্ক বিদ্যমান, যা মহাকর্ষ (সৌরজগতের যে কোনো দুটি বস্তুর মধ্যে যে আকর্ষণ বল), অভিকর্ষ (পৃথিবী তার কেন্দ্রাভিমুখে উপরস্থ সকল বস্তুকে আকর্ষণ) ব্যাপার দিয়ে বোঝা যায়। এরকম নানাবিধ সম্পর্ক অতিক্ষুদ্র অণুজীবের মধ্যেও বিদ্যমান । এসকল অনুজীবিয় সম্পর্কের মাধ্যমে টিকে আছে এই পরিবেশের ভারসাম্য (বাস্তুতন্ত্র)। তবে, অনুজীবের সম্পর্ক কিছুটা জটিল ধরণের। একারণেই এর গুরুত্ব বেশি৷ 

দীর্ঘ সময় ধরে ভাবা হতো যে অণুজীবের মধ্যকার সম্পর্ক কেবল পরিবেশের জন্যে ক্ষতিকারক । যাই হোক, গবেষণার সর্বশেষ অগ্রগতি প্রমাণ করেছে যে আমাদের পরিবেশের মধ্যেই বিভিন্ন শ্রেণীর অণুজীব রয়েছে যাদের মিথস্ক্রিয়া (সম্পর্ক) অনুসারে বিভিন্ন জৈবরাসায়নিক পণ্য উৎপাদন করা যায়। যা অণুজীবের ক্ষতিকর দিকগুলি পেছনে ফেলে বরং সম্ভাব্য মূল্যবান অর্থনৈতিক-উৎপাদনের সুযোগকে বিস্তৃত করে। এ কারনেই, আধুনিক বিজ্ঞান বিভিন্ন ধরণের অণুজীবের মিথস্ক্রিয়াকে অন্বেষণের পাশাপাশি বিভিন্ন শারীরিক, রাসায়নিক, জৈবিক এবং জিনগত প্রভাবক যা এই জাতীয় মিথস্ক্রিয়াগুলি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তা নিয়ে গবেষণা করে। অনুজীবের মিথস্ক্রিয়াগুলিতে গুরুত্ব বাড়ার কারণ হলো- চিকিৎসা শিল্প (যেমন: অস্থির ক্ষয়রোগ, প্রদাহজনক পেটের রোগ এবং স্থূলত্ব চিকিৎসা), খাদ্য শিল্প, কৃষি ক্ষেত্র, দূষিত পানির চিকিৎসা ও পরিবেশের উপর এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে । অনুজীব যেমন: ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, শৈবাল, কিছু পরজীবী (প্রোটিস্ট, আর্কিয়া) এবং ভাইরাসের আকার, আয়তন বা পৃষ্ঠের গঠনেও পার্থক্য বিদ্যমান। তাদের একাকী বাস করা অণুজীবের চেয়ে  বরং জটিল বাস্তুতান্ত্রিক জাল তৈরী অবস্থায় দেখা যায়৷ অনেকটা আমাদের সমাজ ব্যবস্থার মতোই। এই সম্পর্কগুলি একই প্রজাতির মধ্যে কিংবা ভিন্ন প্রজাতির মধ্যে অথবা সম্পূর্ণ অন্য গণ ও পরিবারের  মধ্যে হতে পারে তাদের বেঁচে থাকার জন্যে৷ জালের মধ্যকার সম্পর্কগুলিও হতে পারে ইতিবাচক (লাভ বা জয় বা সহযোগিতা), নেতিবাচক (ক্ষতি বা প্রতিযোগিতা) অথবা নিরপেক্ষ যেখানে কোন প্রভাবই নেই৷  

অণুজীবের ইতিবাচক সম্পর্কের ধরণ:

১. Mutualism  বা মিথোজীবিতা:

সহজভাবে পারস্পারিকতা হলো বাস্তুসংস্থানীয়  সহযোগিতা যা এক প্রজাতীর সাথে পৃথক প্রজাতীর অণুজীবের পারস্পরিক সম্পর্ককে বোঝায়। অর্থাৎ, সম্পর্কে অংশগ্রহনকারী সহাবস্থানে থেকে উভয় উপকৃত হয়। এখানে, জড়িত সম্প্রদায়ের সদস্যদের মধ্যে সাধারণত একটি সাধারণ আগ্রহ থাকে । অনেকটা আমাদের নিকটতম প্রতিবেশি কিংবা  কিছুটা প্রেমিক যুগলের ন্যায়। উদাহরণস্বরূপ, লাইকেন নামক একটি জটিল জীবন ব্যবস্থা যেখানে শৈবাল ও ছত্রাকের মধ্যে সহজীবী বা মিথোজীব সম্পর্ক বিদ্যমান৷ এখানে, ছত্রাক, শৈবালকে প্রতিরক্ষা, আর্দ্রতা ও পুষ্টি সরবরাহ করে বিনিময়ে শৈবাল ছত্রাকের শর্করা চাহিদা পূরন করে৷ অর্থাৎ, যেখানে উভয় অণুজীব উপকৃত হয়৷ 

চিত্র: শৈবাল ও ছত্রাকের সিমবায়োটিক সম্পর্ক।   

আবার, ব্যাকটেরিয়া সাধারণত কিছু বিপাকীয় উপাদান সংশ্লেষ করে যা শেষ পর্যন্ত কোষের ঝিল্লি ভেদ করে কোষের বাহিরে বের হয়। এই উৎপাদিত বিপাকের একটি উদাহরণ হ’ল সিডারোফোর (Siderophore)। এগুলি বেশ কয়েকটি ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাকের  দ্বারা উৎপাদিত আণবিক পণ্য। প্রাকৃতিক পরিবেশে অদ্রবণীয় লৌহের (Fe-lll) উপস্থিতি খুবই কম। এজন্য ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধির সময় সহজে খনিজ লৌহ গ্রহন একটি প্রধান সমস্যার কারণ। অণুজীবগুলি এই সীমাবদ্ধতা দূর করার জন্যে নির্দিষ্ট কিছু এনজাইম সংশ্লেষ করে যা কোষের মধ্যকার ফাঁকা স্থানে ত্যাগ করে ও সহজেই লৌহ কোষে প্রবেশ করতে পারে । এখানে, লৌহ সিডারোফোর দ্বারা সংযুক্ত হয় এবং সিডারোফোর-লৌহ যৌগটি ব্যাকটেরিয়ার রিসেপ্টরের সাথে বন্ধন তৈরীর মাধ্যমে লৌহ কোষে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। 

চিত্র:  অণুজীবের পরিবেশ থেকে লৌহ গ্রহন প্রক্রিয়া

 উভয়ে উপকৃত হবার একটি সুন্দর উদাহরণ দেখা যায়, গাজন প্রক্রিয়ায় পাউরুটি তৈরীর সময়। যেখানে, ঈস্ট (Saccharomyces exiguous বা, Candida humilis) এবং ল্যাকটিক এসিড ব্যাকটেরিয়া ( Lactobacillus sanfranciscensis) উভয়ে উপকৃত হবার ঘটনাটি দেখা যায়। ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের মাধ্যমে উৎপাদিত নানা প্রাকৃতিক পণ্যগুলি দরকারী অ্যান্টিবায়োটিক ঔষুধ এবং অ্যান্টিক্যান্সার কেমোথেরাপিউটিক্স ড্রাগ, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা -দমনকারী, কোলেস্টেরল হ্রাসকারী এবং চেতনানাশক ঔষধ ইত্যাদির সমৃদ্ধ উৎস হিসাবে কাজ করে যা নানা চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, কিছু ব্যাকটেরিয়া প্রজাতি যেমন: Staphylococcus epidermidis, ৬-এন-হাইড্রোক্সিএমিনোপিউরিন  উৎপাদন করে যা DNA পলিমারেজ ক্রিয়াকলাপকে বাধা দিয়ে টিউমার বৃদ্ধিকে ব্যাহত করে। 

২. প্রোটো-কোঅপারেশন (Synergism/সহযোগী):

এটি এমন একটি পারস্পরিক সম্পর্ক যেখানে অংশগ্রহণকারীরা  উপকৃত হয়; তবে সম্পর্কটি অত্যাবশকীয় নয় অর্থাৎ, সম্পর্ক ছাড়াও নিজেরাই টিকে থাকতে পারে। অনেকটা আমাদের সমাজের দূরবর্তী প্রতিবেশির মতো। যেমন: নির্জনবাসী কাঁকড়া (Eupagurus prideauxi) ও সামুদ্রিক অ্যানিমোনি (Sea anemone) মধ্যকার সম্পর্ক। কাঁকড়ার মাধ্যমে সামুদ্রিক অ্যানিমোনি তাজা খাবার পায় এবং বিনিময়ে কাঁকড়াটিকে শত্রু থেকে সুরক্ষা দেয়। 

Loading...

 চিত্র: কাকড়া ও অ্যানিমোন প্রানীর মধ্যকার সম্পর্ক 

৩. Commensalism/ সহভোক্তা:

এটি দুটি অণুজীবের মধ্যে এমন ধরণের সম্পর্ক যেখানে একটি প্রজাতি উপকৃত হয় অপর প্রজাতির ক্ষতি বা উপকার না করেই৷ অনেকটা একটি টেবিল ভাগ করে নেওয়া কিংবা গাছের ব্যাঙগুলি গাছকে নিজের সুরক্ষার জন্য ব্যবহার করা৷ এধরণের সম্পর্ক গাজন প্রক্রিয়ায় খাবার উৎপাদনে দেখা যায়৷ বিশেষভাবে, সুইডিশ চিজের উৎপাদন ক্ষেত্রে যেখানে প্রোপিয়োনিক এসিড ব্যাকটেরিয়াগুলি ল্যাকটিক এসিড ব্যাকটেরিয়ার উৎপাদিত ল্যাকটিক এসিড ব্যবহার করে প্রক্রিয়া শুরু করে ৷ আবার, পরাশ্রয়ী উদ্ভিদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, এরা বড় গাছকে সহায়ক হিসাবে ব্যবহার করে বৃদ্ধি পায়। যেখানে, গাছ কে পানি কিংবা খাবারের যোগানদাতা হিসাবে নয় ৷ যেমন: অর্কিড, মস, নেফ্রোলেপসিস, উসনেয়া, শামুকের উপর বাস করা সবুজ শৈবাল, এছাড়া বিভিন্ন প্রাণীর দেহের গহ্বরে বাস করা ব্যাকটেরিয়া ও প্রটোজোয়া। 

অণুজীবের নেতিবাচক সম্পর্কের ধরন:

১. Predation / শিকার প্রক্রিয়া:

বাস্তুতন্ত্রে এই সম্পর্ক অনেকটা “শোষন” শব্দের সাথে জড়িত। যেখানে, শিকারী প্রজাতি অন্য প্রজাতিকে শিকার (হত্যা) করে৷ অনেকটা বাঘ, সিংহ, ভালুকের তৃণভোজী ভক্ষণ করার মত। অণুজীবের মধ্যে এরকম সম্পর্ক দেখা যায় উত্তরপূর্ব স্পেনের একটি লেকে (sulfurous lakes)। যেখানে, Vampirococcus নামক ব্যাকটেরিয়া, ফটোট্রফিক ব্যাকটেরিয়ার (Chromatium spp.) পৃষ্ঠে সংযুক্ত হয়ে বৃদ্ধি ঘটায় এবং বংশবিস্তারের সময় ফটোট্রফিক ব্যাকটেরিয়ার মৃত্যু ঘটে। Bdellovibrio নামক ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রেও একই ধরণের ঘটনা দেখা যায়৷ ব্যাকটেরিয়াটি, কেমোট্রফিক ব্যাকটেরিয়ার পেরিপ্লাজমিক স্থানে প্রবেশ করে ও বংশবিস্তার। অনেকটা আমাদের দেহের ফ্যাগোসাইটেসিস প্রক্রিয়ার ন্যায়।  

চিত্র: Vampirococcus ও Bdellovibrio ব্যাকটেরিয়ার বংশবিস্তার 

আপনি বা একটি জিরাফ যতক্ষণই রোদে দাড়িয়ে থাকেন না কেন রৌদ্রের তাপে শুধু ঘর্মাক্তই হতে পারবেন৷ পাশাপাশি দাড়িয়ে থাকলে রৌদ্রের তাপে উত্তাপ্ত ও তৃষ্ণার্ত হবেন এবং সেজন্য বাস্তুতন্ত্রের উপাদানই ভক্ষণ করতে হবে৷ এ প্রক্রিয়াটি হলো এমনই একটি ব্যাপার৷ আর, যে অণুজীব পুষ্টির জন্যে অন্য অণুজীবের উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল তাদেরকে সহজে “ভোগকারী” বা, “পরভোজী” বলা যায়৷ তবে, সকল প্রাণী, সকল ছত্রাক এবং কিছু ব্যাকটেরিয়াকে এই ভোগকারী বা পরভোজী হিসাবে অভিহিত করা হয়।

 ২. Parasitism / পরজীবিতা:

এ ধরণের সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীর একটি জীব অপর জীবের ক্ষতি সাধন করে নিজে উপকৃত হয়। পরজীবীরা পোষকের সাথে গোপনে অন্তরঙ্গ যোগাযোগ রাখলেও বাইরের বিশ্বের কাছে অদৃশ্য থাকে। পরজীবীগুলিও সাধারণত খুব ছোট থাকে (ব্যতিক্রম যেমন: ফিতাকৃমি)। তাই অনুমান করা  সহজ হতে পারে যে, পরজীবীগুলি যেহেতু সাধারণত অসম্পূর্ণ, তাই তারা মুক্ত-জীবিত প্রাণীর চেয়ে সম্প্রদায়ের বাস্তুশাস্ত্রে কম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু, রোগ বাস্তুশাস্ত্রের ক্ষেত্রে অগ্রগতিগুলি প্রমাণ করেছে যে পরজীবীগুলি কেবল পরিবেশগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ নয়, কখনও কখনও সম্প্রদায় কাঠামোতে মুক্ত-জীবিত প্রজাতির সমান বা তাদের চেয়ে বেশ প্রভাব ফেলতে পারে। 

প্রকৃতপক্ষে পরজীবীতা জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে ধারণার চেয়ে  প্রকৃতিতে বেশি বিস্তৃত, এমনকি পরজীবীগুলি পোষকের আচরণ, সুস্বাস্থ্য এবং পোষক জনসংখ্যার আকারগুলি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কখনও কখনও প্রজাতির মধ্যকার সম্পর্ক, খাদ্য জাল, জীববৈচিত্র্যের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। প্রকৃতিতে ব্যাকটেরিওফায (ভাইরাস) হচ্ছে এ ধরনের সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ৷ এই ফেজ ভাইরাস খাদ্যের-গাজন প্রক্রিয়াতে ব্যাকটেরিয়ার প্রজাতি চিহ্নিত ও কিছু ক্ষেত্রে এনজাইম ও নির্দিষ্ট কিছু উপাদান তৈরীতে ব্যবহৃত হয়। মূলত ফেজ ব্যাকটেরিয়ার সাথে সংযুক্ত হয়ে তার জেনেটিক উপাদান ( DNA/RNA) ব্যাকটেরিয়ার অভ্যন্তরে প্রবেশ করায়। অতঃপর, ব্যাকটেরিয়ার জেনেটিক উপাদান ভাইরাল জেনেটিক উপাদান দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয় এবং পরবর্তীতে নতুন ভাইরাসের সৃষ্টি হয়৷ অনেকটা কাকের বাসায় কোকিলের বাচ্চা তৈরী হবার মতোই ঘটনা ৷ 

চিত্র: ফায ভাইরাসের বংশবিস্তার।

Loading...

এই ধরণের সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে আজকাল জিনোম-সিকুয়েন্সিংও করা হচ্ছে। 

৩. Amensalism / অ্যামেনসালিজম:

দুটি প্রজাতির সম্পর্কের মধ্যে যখন একটি প্রজাতির ক্ষতি হবে কিন্তু অন্য প্রজাতির লাভ কিংবা ক্ষতি কোনটাই হবে না সে সম্পর্কটিই হলো এই অ্যামেনসালিজম। খাদ্যের গাজন প্রক্রিয়ায় কখনো দেখা যায়, গাজনের প্রাথমিক বিপাকের প্রধান উপাদান অ্যালকোহল, কার্বোক্সিলেট অনুজীবের বৃদ্ধিতে বাঁধা প্রদান করে ফলে খাবারে পচন ঘটে। আবার, Chlorella vulgaris নামক অ্যালজি ক্লোরেলিন (অ্যান্টিবায়োটিক) নামক এক ধরণের বিষ উৎপাদন করে যা অন্য শৈবালের জন্যে ক্ষতিকর হিসাবে কাজ করে। আরেকটি উদাহরণ হলো, খাদ্যের গাজন প্রণালীতে ব্যবহৃত ল্যাকটিক এসিড ব্যাকটেরিয়া ব্যাকটেরিওসিন (ব্যাকটেরিয়ানাশক ) নামক উপাদান তৈরী করে যা অন্য ব্যাকটেরিয়াকে ক্ষতি সাধিত করে। আবার, এই ব্যাকটেরিয়াসিন রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায়, খাদ্য সংরক্ষণে (নিসিন, পেডিওসিন) ব্যবহার করা যায়। মনুষ্য সমাজের দুষ্ট লোকের মত প্রজাতির মধ্যেও শত্রুভাবাপন্ন নানা সম্পর্ক দেখা যায়৷ যেমন: রোগ তৈরীকারী C. albicansP. aeruginosa উভয় অণুজীব পুড়ে যাওয়া কিংবা সিস্টিক ফাইব্রোসিস রোগীর থেকে পাওয়া যায়৷ যেখানে, P. aeruginosa নানা ধরণের বিপাকীয় উপাদান (যেমন: pyocyanin)  তৈরী করে যা C. albicans অণুজীবকে মেরে ফেলে কিংবা বাধাগ্রস্ত  করে।

ব্যতিক্রম কিছু সম্পর্ক: 

ছত্রাক যেমন: Candida albicans এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে নানা সম্পর্ক আমরা বর্তমানে আবিষ্কার করতে সক্ষম হচ্ছি৷ কখনো C. albicans আমাদের মুখ গহ্বরে বাসকারী উপকারী অণুজীবের সাথে একত্রে পারস্পারিকতা বজায় রেখে বসবাস করে৷ কিন্তু, একই অনুজীব Pseudomonas aeruginosa ব্যাকটেরিয়ার সাথে প্রতিযোগিতা বা শত্রুভাবাপন্ন সম্পর্ক বজায় রাখে। আবার, এই অনুজীবটিই Staphylococcus aureus ব্যাকটেরিয়ার সাথে সহযোগী (Synergistic)হিসাবে বাস করতে পারে৷ অর্থাৎ, প্রজাতি ভেদে একটি প্রজাতির সম্পর্কের রকমফের দেখা যায়। 

 তবে, সকল সম্পর্কই কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করে৷ যেমন: কোন প্রশাসনিক ব্যক্তি কিংবা সাধারণ ব্যক্তির সাথে আমাদের সম্পর্কের ধরণ একই রকম দেখা যায় না । অণুজীবের ক্ষেত্রেও এসব নির্ভর করে কিছু ফ্যাক্টরের উপর। যেমন: লবণাক্ততা, তাপমাত্রা, অক্সিজেনের উপস্থিতি, pH এর অনুপাত, পুষ্টি উপাদান, নানা রাসায়নিক উপাদান ইত্যাদি৷ 

অনুজীবের নানা ধরণের সম্পর্কের গুরুত্ব: 

চিকিৎসা ক্ষেত্র: ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের নানা সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল থেরাপি সহ, পোষকের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়৷ একক প্রজাতির সংক্রমণগুলির তুলনায় বেশ কয়েকটি প্রজাতির সংমিশ্রণের সংক্রমণে বেশি প্রভাব থাকতে পারে। একটি গবেষণায় দেখা যায়, শ্বসন জনিত নিউমোনিয়া রোগের জন্য দায়ী P. aeruginosa ব্যাকটেরিয়ার এ রোগ তৈরীর সম্ভবনা বৃদ্ধি পায় যদি শ্বাসনালীতে আগে থেকেই Candida spp. ছত্রাকের উপনিবেশ থাকে৷ 

খাদ্য শিল্পে: সূত্রবৎ ছত্রাক, ঈস্ট, ল্যাকটিক এসিড ব্যাকটেরিয়া নানা রকমের গাজন প্রণালীর খাদ্য উৎপাদনে জড়িত৷ ব্যাকটেরিয়া-ছত্রাকের মিলিত ক্রিয়া মদ্য শিল্পে (যেমন:ওয়াইন, বিয়ার) , দুগ্ধ শিল্পে (যেমন: পনির, দৈ),  রুটি শিল্পে, ভিটামিন সংশ্লেষে অবদান রাখে। 

 কৃষিক্ষেত্রে: অনুজীব উদ্ভিদের পুষ্ট সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত সুবিধা হিসাবে গাছের রোগগুলি থেকে সুরক্ষা দেয়৷ বিভিন্ন ধরণের ব্যাকটেরিয়া (যেমন: Pseudomonas, Bacillus) এবং ছত্রাক (Trichoderma) বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান উৎপাদন করে যা গাছের ক্ষতিকারক অন্য ছত্রাক থেকে গাছকে রক্ষা করে৷ 

অণুজীবের নানা ধরণের মিথস্ক্রিয়াই (সম্পর্ক) বাস্তুতন্ত্র তৈরী করে৷ যেখানে, প্রতি ধরণের সম্পর্ক থেকে আমরা বুঝি- কিভাবে অণুজীবগুলি খাদ্য, শক্তি লাভ করে এবং বংশবিস্তার করে ৷ কিছু অণুজীব নিজেদের খাদ্য তৈরী করে আবার কিছু অণুজীব খাবারের জন্যে অন্য অণুজীব ভক্ষণ করে ৷ বাস্তুতন্ত্রে অণুজীবের গুরুত্ব বুঝতে আমরা শুধু অলক্ষে থাকা বিয়োজকের কথা চিন্তা করলেই পারি৷ যারা মৃতদেহ, নানা বর্জ্য পদার্থ ভেঙ্গে পরিবেশে পুষ্টি উপাদান ও নিজেদের জন্যে খনিজ জমা করে। এই সম্পর্ক আমাদের নিজেদের স্বাস্থ্য এবং পুরা পৃথিবীর জন্যেই দরকার। তারা না থাকলে মৃত ধ্বংস স্তুপে পরিণত হত সব জায়গা। আর এই বিয়োজক হিসাবে কাজ করে নানা ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া৷ 

তথ্য সূত্র:

১. Current Trends and Potential Applications of Microbial Interactions for Human Welfare

২. Biological interactions positive-negative interactions ecosystem 

৩. ecological-interactions 

৪. Predatory prokaryotes: predation and primary consumption evolved in bacteria  

৫. ecological-consequences-of-parasitism 

লিঙ্ক: https://bigganblog.org/2021/03/বাস্তুতন্ত্রে-অণুজীবের-ম/

এফ, এম, আশিক মাহমুদ

আমি বর্তমানে 'নোয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়' এ 'মাইক্রোবায়োলজী' বিভাগের স্নাতকোত্তর ২য় বর্ষে অধ্যয়নরত। স্নাতকও একই স্থান থেকে সম্পন্ন করেছি। ইতোপূর্বে, অমর একুশে বইমেলা-২০২০ এ আমার প্রথম বই "ব্যাকটেরিয়ার রাজত্ব" প্রকাশিত হয়েছে৷ বর্তমানে অণুজীববিজ্ঞানের একজন উৎসুক ছাত্র এটাই আমার বড় পরিচয়। নতুন নতুন অবাক করা তথ্য জানতে ভালো লাগে।

4.5 2 ভোট
Article Rating
আলোচনার গ্রাহক হতে চান?
Notify of
guest

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

2 Comments
পুরানো
নতুন সবচেয়ে বেশি ভোট
লেখার মাঝে মতামত
সকল মন্তব্য
2
0
আপনার ভাবনা ও মতামত সাহায্য করবে। মন্তব্য করুন!x
()
x