হোয়াট ইজ ম্যাথমেটিক্স?

লেখাটি , বিভাগে প্রকাশিত

গণিত হলো সেই বিজ্ঞান যা বিভিন্ন বস্তুর আকৃতি-পরিমাণ এবং বিভিন্ন ঘটনা ও উপাত্তের বিন্যাস নিয়ে কাজ করে। আমরা যা করি, আমাদের চারপাশে যা আছে, সবই গণিতের যুক্তি ও প্রয়োগ। এটি মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, সফ্টওয়্যার, স্থাপত্য (প্রাচীন এবং আধুনিক), শিল্প, অর্থনীতি, প্রকৌশল, এমনকি খেলাধুলা সহ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সবকিছুর সাথেই জড়িত।

আজকের ব্লগটিতে আমরা এই গণিত নিয়েই টুকটাক জানার চেষ্টা করবো। আমরা দেখব, কীভাবে গণিতের ক্রমবিকাশ ঘটলো, আজকের দিনের গণিত কেমন আর এই জটিলতম বিষয় আধুনিক যুগে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তো, চলেন, শুরু করা যাক!

যখন থেকে ইতিহাস নথিভুক্ত হওয়া শুরু হলো, তখন থেকেই দেখা গিয়েছে যে প্রতিটি সভ্য সমাজের পুরোভাগে গাণিতিক আবিষ্কার রয়েছে। এমনকি সবচেয়ে আদিম এবং প্রাচীনতম সভ্যতাগুলোও গণিতের কোনো না কোনো বিষয়কে কাজে লাগিয়েছে এবং সেগুলোর চর্চা অব্যহত রেখেছে। আমরা এখন জানি, আদিম উপজাতিরা সূর্যের অবস্থান নির্ণয় এবং শিকারের অবস্থান জানতে ও বিভিন্ন কলাকৌশল প্রয়োগে গণিত ব্যবহার করত।

বিশ্বজুড়ে সমাজের ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি এবং চাহিদার কারণে গণিতের ব্যাপক প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, যার জন্য আরও উন্নত গাণিতিক যুক্তি ও বাস্তব সমস্যার গাণিতিক সমাধানের প্রয়োজন ছিল, যেমনটি গণিতবিদ রেমন্ড এল.ওয়াইল্ডার তার বই “Evolution of Mathematical Concepts”এ উল্লেখ করেছেন। একটি সমাজ যত জটিলতার দিকে অগ্রসর হয়, সেই সমাজে গণিতের চাহিদাও তত বৃদ্ধি পায়।

বেশ কিছু সভ্যতা (চীন, ভারত, মিশর, মধ্য আমেরিকা এবং মেসোপটেমিয়া) গণিতে অবদান রেখেছে, যেটা আমরা আজ জানি। ওয়াইল্ডারের মতে, সুমেরীয়রা, যারা দক্ষিণ ইরাকে বসবাস করত, তারাই প্রথম যারা ৬০ রকম উপায়ের গাণিতিক পদ্ধতি তৈরি করেছিল। জর্জেস ইফরাহ তার “দ্যা ইউনিভার্সাল হিস্ট্রি অফ নাম্বারস” বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে এই পদ্ধতির ভিত্তি ছিল হাতের আঙুলের সাহায্যে গণনা করা। এই পদ্ধতিগুলো থেকেই পাটিগণিতের একটা ভিত্তি রচিত হয়। যার মধ্যে যোগ, গুণ, ভাগ, ভগ্নাংশ এবং বর্গমূলের মৌলিক ফাংশন অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ওয়াইল্ডার ব্যাখ্যা করেছেন যে সুমেরীয়দের এই পদ্ধতি আক্কাদিয়ান সাম্রাজ্যের মধ্য দিয়ে ব্যাবিলনীয়দের কাছে ৩০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দের দিকে পৌঁছে যায়। ৬০০ বছর পরে মধ্য আমেরিকায় মায়া সভ্যতার লোকেরা বিস্তৃত ক্যালেন্ডার সিস্টেম তৈরি করেছিল এবং তারা দক্ষ জ্যোতির্বিজ্ঞানীও ছিল। ঐ সময়ে ভারতে শূন্য ধারণার বিকাশ ঘটে।

সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে, গণিতবিদরা জ্যামিতি নিয়ে কাজ করতে শুরু করেছিলেন, যার মধ্যে রয়েছে ক্ষেত্রফল, আয়তন এবং কোণ বিষয়ক গণনা। তাদের অবদানের ফলে জানা যায় যে জ্যামিতির অনেক ব্যবহারিক প্রয়োগ রয়েছে। এখন বাড়ির নির্মাণ থেকে শুরু করে ফ্যাশন এবং ইন্টেরিয়র ডিজাইন সবকিছুতেই জ্যামিতি ব্যবহার করা হয়। প্রাচীন আমলেও জ্যামিতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল সে ব্যাপারে সামান্য হলেও ধারণা পাওয়া যায় রিচার্ড জে. গিলিংস এর লেখা “Mathematics in the Time of the Pharaohs” বই থেকে। এখানে তিনি বলেন যে মিশরের গিজার পিরামিডগুলি প্রাচীন সভ্যতার জ্যামিতির উন্নত ব্যবহারের অত্যাশ্চর্য উদাহরণ।

জ্যামিতির মতো প্রয়োজনানুসারে বীজগণিতেরও আবির্ভাব ঘটে। ইরানের গণিতবিদ মুসা আল-খাওয়ারিজমি ৮২০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে গুণ ও ভাগ করার দ্রুততর পদ্ধতি, সমীকরণ সমাধানের ৬ টি নিয়ম ইত্যাদি নিয়ে “হিসাব আল জাবর ওয়া আল মুকাবালাহ” নামক বই লেখেন। এর পাশাপাশি তাঁর কাজের ফলে পাটিগণিত ও ত্রিকোণমিতিও সমৃদ্ধ হয়েছিল। যাহোক, ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির অধ্যাপক টম এম অ্যাপোস্টল তাঁর “Introduction to Analytic Number Theory” বইয়ে লিখেছেন যে প্রাচীনকালে গণিতবিদরা বীজগণিতের পাশাপাশি সংখ্যা তত্ত্বের দিকেও নজর দিতে শুরু করেছিলেন, যা পূর্ণ সংখ্যার বৈশিষ্ট্যগুলির সাথে সম্পর্কযুক্ত ছিল।

এই যে বীজগণিতের কথা বললাম, ব্যাবিলনীয় আমলে পাটিগণিতের পাশাপাশি এটার ব্যবহার হতো বিভিন্ন জিনিসপত্রের আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে। ঐ মানুষেরা খাল কাটা, সুদের হিসাব সংরক্ষণ, সম্পদ বণ্টন ইত্যাদি ক্ষেত্রে পাটিগণিত ও জ্যামিতি ব্যবহার করতো। কিন্তু সবচেয়ে মজার কাজটা যেটা ওরা করেছিল, সেটা হলো ডিগ্রী, মিনিট ও সেকেন্ডের প্রচলন। তারাই প্রথম ১টি দিনকে ২৪ ঘণ্টায়, ১ ঘণ্টাকে ৬০ মিনিটে এবং ১ মিনিটকে ৬০ সেকেন্ডে ভাগ করেছিল।

আনুমানিক ৫৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে চর্চা হওয়া গণিতের এমন অনেক অতীত ইতিহাস আছে। সবগুলো এখানে উল্লেখ করছি না, এতে পাঠকদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটতে পারে। এখন একটু আধুনিক কালের কথা বলা যাক।  ১৭ শতকে ইংল্যান্ডে আইজ্যাক নিউটন এবং জার্মানিতে গটফ্রাইড লিবনিজ নিজেরদের মতো করে ক্যালকুলাসের ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। ক্যালকুলাসের বিকাশ তিনটি সময়ের মধ্য দিয়ে গেছে: অগ্রভাগ, বিকাশ এবং সমৃদ্ধি। এরপর গণিতের ধারা মারাত্মক রকম ভাবে প্রভাবিত হয়।

১৯ শতকে এসে গণিত ক্রমশ জটিল হতে শুরু করে। সে সময় কার্ল ফ্রেডরিক গাউস,নিকোলাই ইভানোভিচ লোবাচেভস্কি, জানোস বলিই, বার্নহার্ড রিম্যান সহ আরও অনেকে গণিতের উপরে কিছু মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিলেন। এর ফলে উপবৃত্তাকার জ্যামিতি, কমপ্লেক্স ভেরিয়েবল, হাইপারবোলিক জ্যামিতি, বুলিয়ান অ্যালজেবরা ইত্যাদি বিকশিত হয়। এগুলোর ফলে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কম্পিউটার সায়েন্স সামনের দিকে এগিয়ে যায়।

বিংশ এবং একবিংশ শতাব্দী ছিল গণিতের জগতে এক বিপ্লবের সময়। এ সময় গণিতের বহু পিএইচডি গবেষক একাধিক সেক্টরে তাদের গণিত ভিত্তিক কর্মের কারণে পুরষ্কার লাভ করে। গণিতের এই আধুনিকায়নের ফলে কম্পিউটারের ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়। বর্তমান সময়ের গণিতের ব্যাপারে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এটি ক্রমশ বড় হচ্ছে। কম্পিউটারগুলি গণিতের প্রভাবে আরও শক্তিশালী হচ্ছে এবং বায়োইনফরমেটিক্সে গণিতের প্রয়োগ বেড়েই চলেছে।

এখন প্রশ্ন হলো, গণিতের প্রয়োজনীয়তা কোথায়? এই প্রশ্নের কিছু উত্তর ইতিমধ্যে পাঠকদের পেয়ে যাওয়ার কথা। আধুনিক বিশ্বে ফলিত গণিতের গুরুত্ব কখনো এক শব্দে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। গণিতের আধুনিক ক্ষেত্রগুলির মধ্যে রয়েছে গাণিতিক পদার্থবিদ্যা, কম্পিউটেশনাল জীববিজ্ঞান, মহাকাশ প্রকৌশল, ব্যাংকিং এবং ফিন্যান্স। এ থেকেই বোঝা যায় গণিতের পরিধি ও গুরুত্ব কত ব্যাপক। এখনকার স্মার্টফোন এবং কম্পিউটারগুলো চলে গণিতের উপরে, এমনকি আধুনিক চিকিৎসাও অনেকাংশে গণিত নির্ভর হয়ে গিয়েছে। এছাড়াও আমাদের বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং চিন্তার উন্নয়নেও গণিতের কোনো বিকল্প নেই।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের দেশের অনেক শিক্ষার্থীদের কাছেই এখনো গণিত একটি বিরক্তিকর বিষয়। তবে বিভিন্ন অর্গানাইজেশন এবং ক্লাব এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাচ্ছে। হয়ত অদূর ভবিষ্যতে এদেশের সিংহভাগ ছাত্র-ছাত্রীদের মন থেকে গণিতভীতি দূর হবে এবং আশা করি, গণিতের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে এই বাংলাদেশ আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

তথ্যসূত্রঃ
১. What is mathematics?
২. History of mathematics
৩. What is the importance of mathematics in our daily lives?

(লেখাটির কিছু অংশ ইতিপূর্বে Scientia Society এর ফেসবুক পেইজে প্রকাশিত হয়েছে)

লেখাটি 86-বার পড়া হয়েছে।


আলোচনা

Responses

  1. হাসিব Avatar
    হাসিব

    লেখাটা সুন্দর।

    1. তাহসিন আলম উৎস Avatar
      তাহসিন আলম উৎস

      ধন্যবাদ, শেয়ার করার অনুরোধ থাকলো।

Leave a Reply

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।