ল্যানসেটে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী

লেখাটি বিভাগে প্রকাশিত

দেশের সাধারণ মানুষ কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের সুযোগ পাবে না, আর আমি আমেরিকা থেকে করে আসব বা দেশে মিথ্যা কথা বলে করতে হবে, তা হয় না। আমি ট্রান্সপ্লান্ট করব না।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী

“ডা জাফরুল্লাহ চৌধুরী”- আমাদের বাংলাদেশের চিকিৎসাজগতের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। আমরা তাঁর ব্যাপারে কতটুকুই বা জানি? তাঁর কর্মজগৎ নিয়ে বাংলায় তেমন কোনো ডকুমেন্ট না থাকলেও আন্তর্জাতিক গবেষণা জার্নাল “দ্যা ল্যানসেট” একটি সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখে সেই অভাব পূরণ করে দিয়েছে। বেভারলি স্নেল, আনোয়ার ফজল চৌধুরী এবং লিংকন চেনের মতো গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ডা জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ব্যাপারে যে মতামত দিয়েছিলেন, সেগুলোও উক্ত লেখায় প্রকাশ পেয়েছিল। ল্যানসেটে অ্যান্ডিউ গ্রীন তাঁকে নিয়ে যেই তথ্যবহুল আর্টিকেলটি লিখেছেন, তার ভাবানুবাদ তুলে ধরা হলোঃ

বাংলাদেশের অভিজ্ঞ সার্জন, জনস্বাস্থ্য কর্মী, এবং স্বাস্থ্য ইক্যুইটির চ্যাম্পিয়ন ডা জাফরুল্লাহ চৌধুরী ১৯৪১ সালের ২৭শে ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার রাউজান গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ৮১ বছর বয়সে ঢাকায় ২০২৩ সালের ১১এ এপ্রিল ক্রোনিক কিডনি রোগের জটিলতায় মারা যান। জাফরুল্লাহ চৌধুরী স্ত্রী শিরীন হক, মেয়ে বৃষ্টি চৌধুরী, ছেলে বারিশ হাসান চৌধুরী, চার বোন ও চার ভাইকে রেখে চিরদিনের জন্য না ফেরার দেশে চলে যান।

জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জন্য কোনো চ্যালেঞ্জই অপ্রতিরোধ্য ছিল না। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি গেরিলা যোদ্ধা ও চিকিৎসক হিসেবে যোগদানের জন্য স্নাতকোত্তরের পড়া ছেড়ে দেন। তিনি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন, যা বাংলাদেশে কমিউনিটি স্বাস্থ্য পরিষেবার পুনর্গঠন এবং নারী স্বেচ্ছাসেবকদের সমুন্নত করতে অবদান রেখেছিল।

ওষুধের জন্য ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীগুলো যে দাম নিতো, জাফরুল্লাহ চৌধুরী সেগুলোর বিরোধীতা করেছেন এবং যখন তিনি দীর্ঘস্থায়ী কিডনির রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, তখন বাংলাদেশে কম খরচে কিডনি ডায়ালাইসিসের সার্বজনীন অ্যাক্সেসের পক্ষে কথা বলেছেন। এই বয়োজ্যেষ্ঠ সৈনিকের ব্যাপারে হেলথ অ্যাকশন ইন্টারন্যাশনাল (এইচএআই) এশিয়া প্যাসিফিকের অনারারি কো-অর্ডিনেটর বেভারলি স্নেল বলেন, “কোথাও অন্যায় হলে তিনি সেখানে থাকবেন।”

যদিও ডাক্তার সাহেব ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে ব্যাচেলর অব মেডিসিন এবং ব্যাচেলর অব সার্জারি ডিগ্রী লাভ করেন, তবুও সেই প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার দুর্নীতি প্রকাশে দ্বিধা করেননি। তিনি ১৯৬৪ সালে এমবিবিএস শেষ করেন এবং “জেনারেল এন্ড ভাস্কুলার সার্জারি” বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রীর জন্য যুক্তরাজ্যে চলে যান। কিন্তু তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয় এবং তিনি পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জাতীয়তাবাদী যোদ্ধাদের সাথে যোগ দিতে দেশে ফিরে আসেন।

চৌধুরী সাহেব যেই এইচআই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন, সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক সমাজ কর্মী আনোয়ার ফজল চৌধুরী সাহেবের ব্যাপারে বলেন,“যখন বিপ্লব ঘটেছিল, তখন তাঁকে সবার সামনে থাকতে হয়েছিল।“ জাফরুল্লাহ চৌধুরী এরপর তাঁর চিকিৎসা দক্ষতা কাজে লাগান, আহত যোদ্ধা এবং অসুস্থ উদ্বাস্তুদের চিকিৎসার জন্য একটি ৪৮০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণে ভূমিকা রাখেন। এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে দরিদ্রদের অবস্থা সম্পর্কে খুব স্পষ্ট ধারণা পেতে সাহায্য করেছিল।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর, তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা হাসপাতালটিকে সাভারের গ্রামীণ এলাকায় স্থানান্তরিত করেন, যেটি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়। গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর আবুল হোসেনের মতে,ডাক্তার সাহেব ও তাঁর দল এটিকে বাংলাদেশের গ্রাম্য অঞ্চলের দরিদ্র লোকেদের জন্য একটি পরীক্ষামূলক প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা প্রকল্পে রূপান্তরিত করেছিলেন। মেডিকেল ব্যাক্রগ্রাউন্ড নেই, এমন স্থানীয় নারীদেরকে এই প্রতিষ্ঠানটি নিয়োগ করেছিল, যাদেরকে প্রতিষেধক এবং প্রতিকারমূলক-উভয় ধরণের প্রাথমিক চিকিৎসা শেখানো হয়।

চায়না মেডিকেল বোর্ডের “প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস” লিংকন চেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী সম্পর্কে বলেন, “তিনি সারাজীবন একজন উদ্ভাবক ছিলেন”। তিনি আরও বলেন যে আন্তর্জাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীগুলো সাধারণ ওষুধের দাম নিচ্ছিল, তা বাংলাদেশের গ্রামীণ দরিদ্রদের নাগালের বাইরে ছিল, যা বুঝতে পারে চৌধুরী সাহেব তাঁর নিজস্ব জেনেরিক ওষুধ কোম্পানি স্থাপন করেছিলেন, যেটি ওষুধের দাম কমিয়েছিল। ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী বাংলাদেশ সরকারকে আইন প্রণয়নের পরামর্শ দেন যা অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের কোডিফাই করতে ভূমিকা রাখবে এবং অপ্রয়োজনীয় বা ক্ষতিকারক ওষুধের বিক্রি নিষিদ্ধ করবে। এখানেই শেষ নয়, ডাক্তার সাহেব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে আবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা করার জন্য বলেন এবং ১৯৭৭ সালে সংস্থাটি সেই তালিকা প্রকাশ করেছিল। তিনি ওষুধ বিষয়ে যথেষ্ট অবদান রেখেছিলেন এবং কিছু ক্ষেত্রে পথ প্রদর্শকের ভূমিকা রাখেন।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রকল্প সমন্বয়কের ভূমিকা রাখা জাফরুল্লাহ চৌধুরী ১৯৭৩  সালে একটি গ্রামীণ স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থা চালু করার উদ্যোগ নেন এবং এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সম্প্রসারণের নির্দেশনাও দিয়েছিলেন। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ১৮৭টি স্কুল, সাভারে গণবিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি কারিগরি কলেজ এবং একটি স্বাস্থ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে যতক্ষণ না পর্যন্ত মানুষকে শিক্ষিত করা হবে, ততক্ষণ তাদের অবস্থার উন্নতি করা খুব কঠিন হবে।

চৌধুরী সাহেবের বিশ্বব্যাপীও প্রভাব ছিল। তাঁর কারণেই পিপলস হেলথ মুভমেন্ট (পিএইচএম) এর জন্ম হয়। তাঁর অনেক অবদানের জন্য তিনি ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান “স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার”, ১৯৮৫ সালে র‍্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড এবং ১৯৯২ সালে রাইট লাইভলিহুড অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। এই মহামানব প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং দরিদ্রদের জন্য স্বাস্থ্য অধিকারের ন্যায়বিচার রক্ষায় অগ্রগামী ছিলেন। তিনি সততা ও ক্ষমতার সাথে সত্য কথা বলার এবং একটি উন্নত বিশ্বের প্রতি অঙ্গীকারের সূত্র রেখে গেছেন, যা থেকে আমরা সবাই কিছু না কিছু শিখতে পারি।

লেখাটি 30-বার পড়া হয়েছে।

ই-মেইলে গ্রাহক হয়ে যান

আপনার ই-মেইলে চলে যাবে নতুন প্রকাশিত লেখার খবর। দৈনিকের বদলে সাপ্তাহিক বা মাসিক ডাইজেস্ট হিসেবেও পরিবর্তন করতে পারেন সাবস্ক্রাইবের পর ।

Join 903 other subscribers