To Catch an AI, Build Another AI

আজকে লিখতে বসে এটা মতলব করেই বসেছি যে, কঠিন ভাষায় কিছু লিখবো না৷ আমার আবার এ ব্যাপারে একটা বদনাম আছে যে, প্রযুক্তি নিয়ে কিছু লিখতে বসলেই সেটাকে কঠিন বানিয়ে বসি। এটার কারণও আছে, টু বি অনেস্ট। কারণটা হচ্ছে, আমি যখন প্রযুক্তির কোনো জিনিস নিয়ে লিখি, তখন মাথায় থাকে যে এই লিখাটা প্রযুক্তি নিয়ে কম জানা মানুষও পড়বে, আবার techy রাও পড়বে। তো, বেশি জার্গন ব্যবহার করলে নন ট্যাকিরা রেগে যাবে, আবার বেশি সরলীকরণ করে ফেললে আবার ট্যাকি নার্ড জনগোষ্ঠী রেগে যাবে। কিন্তু আজকে সিদ্ধান্ত নিয়েছি লিখাটিকে অতিরিক্ত সরলীকরণ করার মাধ্যমে ট্যাকিদেরকে রাগাবো।

তো, যেটা নিয়ে লিখতে বসা, তা সম্পর্কে বলি। আজকে আমরা একটা বিশেষ জাদুকরী ব্যাপার নিয়ে কথা বলবো। প্রযুক্তির জাদু।

শুরুতে আপনাকে আমি দুটো অনুচ্ছেদ দিই। আপনি মন দিয়ে পড়ুন। 

প্রথম অনুচ্ছেদ: পুরো দরবার একদম নিস্তব্ধ। কারোর মুখে যেন কথা ফুটছে না। কারণ চোখের সামনে যা ঘটলো, তা বিশ্বাস করাও কঠিন। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে রাজ্যের বড় বড় বীরেরা ব্যর্থ হয়ে ফিরেছে এবং বিশাল ওই ধনুকটিতে সামান্য টান পর্যন্ত দিতে পারেনি, সেখানে এক অচেনা প্রবীণ লোক এত সহজে এই অসম্ভবকে সম্ভব করে ফেলল! চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এই দৃশ্য দেখে উপস্থিত সকলের মাথায় যেন বাজ পড়ল। তবে কি শেষ পর্যন্ত পেনেলোপির স্বামী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে নিল এক হতদরিদ্র পথিক? ঠিক পরক্ষণেই পুরো দরবারে একটি সন্দেহের ঢেউ খেলে গেল—বহু বছর আগে যুদ্ধক্ষেত্রে হারিয়ে যাওয়া স্বয়ং ওডিসাসই কি তবে বেশ বদলে ফিরে এলেন?

দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ: প্রাসাদের বিরাট হলরুমটি একদম শান্ত হয়ে গেল। কারণ এইমাত্রই সবাই বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করলো যে, এক জীর্ণশীর্ণ বৃদ্ধ বীর ইতিফাসের সেই বিরাট ধনুকটিকে বাঁকিয়ে সেটায় ছিলা পরিয়ে পরপর ১২টি কুঠারের ছিদ্রের মধ্য দিয়ে তীর পাঠালেন! এমনটা কেউ-ই আশা করেনি। রাজ্যের কত কত বীরপুরুষ সে চেষ্টা করলেন—কিন্তু ধনুকটিকে বাঁকানোই সম্ভব হলো না তাঁদের পক্ষে। কিন্তু এই হতদরিদ্র পথিক যেন কোনো দক্ষ সুরকারের মতো বীণার তারে সুর বাঁধার মতো ধনুকটি দিয়ে তীর ছুঁড়লেন। তবে কি পেনেলোপিকে পেতে যাচ্ছে এই জীর্ণশীর্ণ ভিখারি? পরক্ষণেই সবার মনে পড়ল, এই ভিখারিই কি ওডিসাস, যে ১০ বছর আগে যুদ্ধে গিয়ে আর ফিরে আসেননি?

এবার আপনি বলুন তো, উপরের দুটো অনুচ্ছেদের মধ্যে কোনটা মানুষের লিখা আর কোনটা AI এর লিখা?

উত্তরটা পরে দিচ্ছি। তবে আপনাকে এটা স্বীকার করতেই হবে যে, আপনি পূর্ণ নিশ্চয়তা নিয়ে জানেনই না যে কোনটা মানুষের লিখা আর কোনটা এআই এর লিখা। এমনকি, আমার এ লেখাটা আমি লিখেছি নাকি এআই দিয়ে ঘষামাজা করিয়েছি, সেটাও আপনি ধরতে পারবেন না। 

তাহলে উপায়?

তাহলে কি এআই দিয়ে আরামসে রিসার্চ পেপার, বইপত্র ইত্যাদি লিখিয়ে বিশ্বে বিরাট নাম কামানো যেত না?

না, যেত না। 

কারণ, কোনো লিখা এআই লিখেছে নাকি মানুষ লিখেছে, সেটা আমি আপনি বুঝতে না পারলেও “ম্যাশিন লার্নিং” নামক এক জাদুবলে আমাদের বোঝা সম্ভব। কীভাবে আমরা তাহলে কোনো AI generated text ডিটেক্টর বানাতে পারবো, যে কোনো লেখা এআই এর কিনা তা জানাতে পারবে আমাদের?

এটার জন্য আগে আমরা খুব সহজ করে জেনে নিই যে, কীভাবে এআই নিজে লাইনের পর লাইন অর্থবোধক জিনিসপাতি লিখতে পারে। 

ম্যাশিনকে আসলে লিখতে শেখানো হয়েছে পরিসংখ্যান এবং গাণিতিক সম্ভাবনার মাধ্যমে। ব্যাপারটা কিছুটা কীবোর্ডেই আপনি দেখতে পাবেন। যে শব্দের পর যে শব্দ আপনি বেশি ব্যবহার করেন, আপনার কীবোর্ড সেটাই সাজেস্ট করে আপনাকে। তবে বৃহৎ ভাষা মডেল বা LLM এর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরও বড় পরিসরে। একটা এআই মডেল কোটি কোটি লেখা পড়ে শিখেছে যে, কোন বাক্যের পর কোন বাক্য বসিয়ে অর্থবোধক কিছু লিখতে হয়। 

তাকে আপনি ধরুন কয়েক হাজার বাংলা বইপত্র দিয়ে ট্রেন করিয়েছেন। যেখানে কবি-লেখকেরা নানান জায়গায় লিখেছে “আজ আকাশে জমেছে অনেক মেঘ”, “ মেঘে মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ”, “আজ ঢাকা শহরের আকাশ মেঘে মেঘাচ্ছন্ন হয়ে থাকবে সারাদিন”… এভাবে যখন একটা মডেল বার বার একই প্যাটার্ন দেখে শিখবে, তখন সে প্রেডিক্ট করতেও শিখবে যে, কোন শব্দের পরে কোন শব্দ বসার সম্ভাবনা কেমন।

সে শিখে ফেলবে যে, “ আজ আকাশে অনেক…” লিখলে পরের শব্দ “মেঘ” হওয়ার প্রোবাবলিটি অনেক বেশি, কিন্তু “ডোনাল্ড ট্রাম্প” হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। এভাবে প্রতিবারই সে সম্ভাব্য শব্দগুলোর মধ্য থেকে সবচেয়ে বেশি সসম্ভাবনাময় শব্দ চুজ করে করে পুরো লেখা তৈরি করে।

পরবর্তী শব্দ নির্বাচনে এআইয়ের সম্ভাবনা নির্ণয়

একটু নার্ডি টোনে বললে বলবো, এআই একটা শব্দ লেখার পর পরবর্তী পসিবল শব্দটা কি হতে পারে, তার প্রোবাবিলিটি ডিস্ট্রিবিউশন হিসেব করে। ম্যাথেম্যাটিক্সের ভাষায়, এআই এর তৈরি করা লেখাগুলো সাধারণত একটা নির্দিষ্ট low-probability ফাংশনের ‘লোকাল ম্যাক্সিমা’ বা সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনার জায়গায় অবস্থান করে। অর্থাৎ, এআই সবসময়ই সবচেয়ে নিরাপদ আর সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শব্দ বেছে নেয়। 

এতোক্ষণ কী বুঝেছেন জানি না, তবে আশা করি এতোটুকু বুঝেছেন যে, এআই এর লেখার প্রক্রিয়াটা একটা গাণিতিক সম্ভাবনার ছকে বাঁধা থাকে। এবং এই ঝোপটাতেই আমাদের কোপ দেয়ার জায়গা। (ঝোপ বুঝে কোপ দেয়া যাকে বলে)…

যেহেতু এআই নির্দিষ্ট গাণিতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে লিখতে পারবে না, তাই এই গাণিতিক কাঠামোটাকেই চিনে ফেলতে হবে। তাহলেই চিনতে পারবো কোনটা এআই এর লিখা আর কোনটা এআই এর নয়। কিন্তু মানুষ হিসেবে এটা আমরা হয়তো পারবো না। তাহলে কী করা?

উত্তরটা বেশ সহজ! আমরা কেবল আরেকটা এআই বানাবো।

আমরা এমন আরেকটা এআই বানাতে পারি, যেটা ধরতে পারবে যে, কোনো এআই এর লেখার ভেতরের গাণিতিক গঠন ও স্ট্যাটিসটিকাল সিগ্নেচার বা পরিসংখ্যানগত ছাপ কেমন হয়। 

এর জন্য আমাদের প্রয়োজন হবে এআই এর লিখা হাজার হাজার টেক্সট স্যাম্পল আর মানুষের লিখা হাজার হাজার টেক্সট স্যাম্পল। এসব কালেক্ট করার পর আমরা লেবেলিং করে দিবো, কোন লেখাটা এআই এর, আর কোনটা মানুষের। 

তারপর লেখা পড়তে জানে, এমন একটা “এনকোডার” বাছাই করলাম আমরা। এহহে! আবারও জার্গন ছুড়ে মারলাম! আমরা মোটেই চাই না আপনি এ লেখা পড়তে গিয়ে দুর্বোধ্য টার্ম দেখে চলে যান।

এনকোডার কী আবার?

এনকোডার হচ্ছে, একটা বিশেষ ম্যাশিন বা মডেল বা প্রক্রিয়া। যাকে আপনি কোনো টেক্সট দিলে সে, আপনার সে টেক্সট টাকে অর্থ হিসেবে সংরক্ষণ না করে সেটাকে ভেক্টর রিপ্রেজেন্টেশনে রূপান্তর করে। এই রিপ্রেজেন্টেশনের মধ্যে লেখাটার শব্দ, কন্টেক্সট এবং বিভিন্ন শব্দের পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পর্কে ইনফরমেশন থাকে।

ধরুন আপনি কোনো এনকোডারকে দিলেন “আমি ভাত খাই”… সে এটাকে অনেকটা এমন কিছু বানাবে:

(বাস্তবে রিপ্রেজেন্টেশন এমন ছোট কয়েকটা ভেক্টর হয় না। আপনাদের বুঝাতে এই অকাজ করলাম।)

তো, বুয়েটের NLP টিম একটা চমৎকার এনকোডার বানিয়েছে। যার নাম BanglaBERT… বাংলা ভাষায় ক্লাসিফিকেশনের জন্য এই এনকোডারটাকেই আমার সর্বশ্রেষ্ঠ মনে হয়েছে (ব্যক্তিগত মতামত)। এই এনকোডারটা শুধু প্রতিটা শব্দ আলাদাভাবে দেখে না। বরং বাক্যের মধ্যে শব্দগুলার কন্টেক্সট এবং পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করে। তাহলে আমাদের কাজ আরও কমে এলো না?

আমরা তাহলে এই BanglaBERT এনকোডারকে ঘাড় ধরে শেখাবো, বুঝাবো যে এআই কীভাবে লিখে, আর এআই কীভাবে “লিখে না।”

ঐযে বলেছিলাম, আমাদের কাছে হিউজ টেক্সট আছে এআই এবং মানুষের লিখা? সেটাই এখন এই ট্রান্সফরমার এনকোডারকে খাওয়ানো হোক। সে এই লেখাগুলো পড়ে আর নিজে অনুমান করে, “আচ্ছা এইটা কি এআই নাকি মানুষের লিখা?”… সে ভুল করবে, এবং তাকে শুধরেও দেওয়া হবে। এভাবে এই চক্র চলতে থাকে লাখো বার। তাকে কখনোই বলে দেওয়া হবে না যে, “এই ব্যাটা শোন, বেশি এম ড্যাশ ‘—’ দেখলে বা বেশি বিরামচিহ্ন দেখলে বা সঠিক গ্রামার দেখলে বা non ascii স্যাম্বল দেখলে AI flag দিবি”… সে নিজে নিজেই বের করে নেবে কোন কোন ছাপ মানুষ আর AI.. দুই দলকে আলাদা করবে। 

এআই ও মানুষের লেখার মধ্যে শেখা পরিসংখ্যানগত পার্থক্য

একটা সময় পর… প্রপার ডেটা প্রিপ্রসেসিং আর প্রপার ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে আপনার এই মডেল সত্যিই সত্যিই শিখে ফেলতে পারে, এআই আর মানুষের লেখার মধ্যে থাকা সেই সূক্ষ্ম স্ট্যাটিসটিক্যাল প্যাটার্নগুলো। এরপর নতুন কোনো লেখা সামনে ধরিয়ে দিলে, সে বেশ ভালোভাবেই আন্দাজ করে বলতে পারে, এই লেখাটা এআইয়ের লেখা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, নাকি কোনো মানুষের লেখা।

বাস্তব জীবনে আমরা নিজেরাও কি কাছাকাছি এমন কিছুতে পৌঁছাই না? আপনি একজন অভিজ্ঞ জহুরি হলে আপনার সামনে একটা নকল হিরা আর আসল হিরা ধরলে আপনি সহজেই ধরে ফেলতে পারবেন কোনটা আসল আর কোনটা নকল। আপনার এই লেভেলের মাস্টারি কি একদিনেই চলে এসেছে? 

আপনি শত শত দিন শত বার নানান মণি-মুক্তা নিয়ে ঘাটাঘাটি করেই না কেবল আপনার মস্তিষ্ককে ট্রেন করেছেন আসল মণি-মুক্তা চিনতে। তাই না?

ম্যাশিনকে শেখানোর এই জগৎ, অর্থাৎ ম্যাশিন লার্নিংয়েও অনেকটা এমন কিছুই ঘটে। এবং সে শিক্ষা অনেক সময় হয়ে ওঠে আমাদের শেখার চাইতেও নিখুঁত। তাকে দিয়ে সুক্ষ্ম থেকে সুক্ষ্মতম প্যাটার্নও ধরানো যায়। যেটা আমরা নিজেরা পারবো না। এ কারণেই আমাদের এই ভয় অমূলক নয় যে, এআই একদিন আমাদের চাকরি নিয়ে নেবে। এমনকি, চিকিৎসার মতো সেন্সিটিভ ব্যাপারেও কিছু ক্ষেত্রে মানুষের চাইতেও বেশি উৎকর্ষতা অর্জন করে বসছে এআই মডেলগুলো। এইতো গতবছর, মানে ২০২৫ সালে ন্যাচারের একটা গবেষণাপত্র পড়লাম।  গুগলের AMIE নামে একটা মডেল ৩০২ টা চ্যালেঞ্জিং রিয়েল ওয়ার্ল্ড মেডিকেল কেইসে Top 10 accuracy তে চিকিৎসকদের চেয়েও ২৬% বেশি এগিয়ে ছিলো। 

তো, এইযে এআই বিভিন্ন জিনিস এতো নিখুঁতভাবে চিনে ফেলতে পারে, একই রকম লেখা, অথচ সে বলে দিতে পারে কোনটা এআই আর কোনটা মানুষের… এই পুরো ব্যাপারটায় সে আসলে এআই এর লেখায় বা মানুষের লেখায় কোন “ছাপ” বা watermark দেখে চিনতে পারে, এটা আমরা কেউই জানি না। আমরা জানি যে, এআই কীভাবে শেখে, কিন্তু আমরা জানি না, সে আসলে “কী শেখে”… এই ব্ল্যাকবক্সটা নিয়েই এআই এর গডফাদার জেফ্রি হিন্টন নিজেও বেশ সংকিত। যাইহোক, আপনাদের ভেতরে এতো ভয় ঢুকিয়ে নিজের পেটের ভাত মারতে চাই না। এটাই আমার রুটিরুজি। 

এবার শুরুতে দেওয়া অনুচ্ছেদ দুটির ফলাফল জানাই আপনাদের। দ্বিতীয়টা আমার, মানে “মানুষের” লিখা। আর প্রথমটা Gemini, মানে “AI” এর লিখা।

আরও নিশ্চিত হতে চান? চলে যান আমাদের বানানো বাংলাটিউরিং এ: banglaturing.vercel.app

হ্যাঁ, আমরা বাংলা ভাষায় এআই সনাক্তকরণে গবেষণা করেছি এবং এ নিয়ে একটা মডেলও ডেপ্লয় করেছি। নিজেই যাচাই করে আসুন। প্যারাফ্রেজিং এ একটু কম দক্ষ হলেও যেকোনো এআই এর লিখা বা মানুষের লিখা সে ঠিকই সনাক্ত করতে পারে।  

কীভাবে বানালাম সে BanglaTuring? সে জাদুর গল্প অন্যদিন। সেদিন কিন্তু এতোটাও সহজ করে গল্প বলবো না। গল্পের মাঝে নানান মন্ত্র-তন্ত্র চলে আসবে।

ততোদিন Stay hungry, stay foolish…

☕ Support Us