একই জিনগত তথ্য ব্যবহার করে আমাদের শরীরে এত রকম কোষ তৈরি হয় কীভাবে? ট্রান্সক্রিপশন ও এপিজেনেটিক্স সিরিজে আমরা ধাপে ধাপে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজব। দেখব, কোষ কীভাবে তার জিন ব্যবহার করে, সেই ব্যবহারের নিয়ম কীভাবে ধরে রাখে এবং নিয়ম বদলে গেলে কী ঘটতে পারে।
একই ডিএনএ, ভিন্ন কোষ
একটি স্নায়ুকোষ আর একটি যকৃতের কোষকে পাশাপাশি রাখলে তাদের একই রকম মনে হওয়ার কারণ নেই। একটির কাজ সংকেত আদানপ্রদান, অন্যটি শরীরের নানা রাসায়নিক কাজ সামলায়। চেহারা আলাদা, কাজও আলাদা। অথচ শরীরের অধিকাংশ নিউক্লিয়াসযুক্ত কোষে প্রায় একই ডিএনএ (DNA) থাকে। অর্থাৎ তাদের ভেতরে জিনগত নির্দেশনা প্রায় একই।
তাহলে পার্থক্যটা কোথায়? উত্তর খুঁজতে একটি পরিচিত উদাহরণ ভাবা যাক। একই রান্নার বই দুজনের হাতে দিলেন। একজন সেই বই দেখে পোলাও রান্না করলেন, অন্যজন পায়েস। বইয়ের কোনো পরিবর্তন হয়নি। দুজন শুধু আলাদা নির্দেশনা ব্যবহার করেছেন। কোষের ক্ষেত্রেও মূল ধারণাটা এমন। একই নির্দেশনা কাছে থাকা মানেই সব নির্দেশনা একইভাবে ব্যবহার করা নয়।
জিন থাকা আর জিন ব্যবহার করা আলাদা বিষয়
ডিএনএ’র নির্দিষ্ট কিছু অংশকে আমরা জিন বলি। অনেক জিনে প্রোটিন তৈরির নির্দেশ থাকে। আর প্রোটিন কোষের বহু কাজ করে— কাঠামো তৈরি করা থেকে শুরু করে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটানো ও সংকেত আদানপ্রদান পর্যন্ত।
সব কোষের কিছু সাধারণ প্রয়োজন আছে, তাই অনেক জিন বহু ধরনের কোষেই ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বিশেষ কাজের জন্য প্রয়োজনও আলাদা। স্নায়ুকোষে যে জিনের ব্যবহার বেশি, যকৃতের কোষে সেটির ব্যবহার কম হতে পারে। আবার কোনো জিন এক ধরনের কোষে সক্রিয় থাকলেও অন্য ধরনের কোষে প্রায় নীরব থাকতে পারে। জিনটি হারিয়ে যায়নি; তার ব্যবহার বদলেছে।
বিষয়টি শুধু চালু কিংবা বন্ধ থাকারও নয়। একই জিন থেকে একটি কোষ অনেক বেশি আরএনএ (RNA) তৈরি করতে পারে, অন্যটি কম। কোন জিন কতটা ব্যবহৃত হচ্ছে এই সম্মিলিত ধরন একটি কোষের কাজ ও পরিচয় গড়ে তুলতে সাহায্য করে। একে বলা হয় জিনের প্রকাশ (gene expression) এর ধরন।

কোষ একটি জিন ‘পড়ে’ কীভাবে?
এতক্ষণ বলা হলো, কোষ জিন ব্যবহার করে। কিন্তু ব্যবহার করার অর্থ কী? রান্নার বইয়ের উদাহরণে ফিরি। রান্নাঘরে পুরো বইটি নিয়ে যাওয়ার বদলে দরকারি রেসিপিটি একটি কাগজে লিখে নিলেন। মূল বই যথাস্থানে থাকল, আর অনুলিপিটি কাজে লাগানো হলো।
কোষেও ডিএনএ’র তথ্য ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো আরএনএ তৈরি করা। আরএনএ পলিমারজ (RNA polymerase) নামের একটি এনজাইম ডিএনএ’র নির্দিষ্ট অংশ অনুসরণ করে আরএনএ বানায়। এই প্রক্রিয়ার নাম ট্রান্সক্রিপশন বা transcription। এখানে ডিএনএ নিজে আরএনএ হয়ে যায় না; ডিএনএ’র তথ্য অনুসরণ করে নতুন আরএনএ তৈরি হয়।
প্রোটিন তৈরির নির্দেশ বহনকারী আরএনএ’কে বলা হয় বার্তাবাহক বা মেসেঞ্জার আরএনএ (messenger RNA), সংক্ষেপে এম আরএনএ (mRNA)। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াকরণের পর এটি নিউক্লিয়াস থেকে বের হয়। তারপর রাইবোসোম নামের কোষীয় অঙ্গাণু সেই নির্দেশ পড়ে প্রোটিন তৈরি করে। তবে সব আরএনএ প্রোটিন তৈরির জন্য নয়; কিছু আরএনএ নিজেরাই কোষের গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে।

তবে আরএনএ পলিমারেজ একাই ঠিক করে না কোন জিন থেকে কখন আরএনএ তৈরি হবে। তাকে সাহায্য করে আরও অনেক প্রোটিন। তাদের মধ্যে কিছু ডিএনএ’র নির্দিষ্ট জায়গা চিনতে পারে এবং সেখানে কাজ শুরু করতে সাহায্য করে। সেরকমই এক ধরণের প্রোটিন হলো ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর।
কিন্তু নির্দিষ্ট জায়গা চিনতে পারলেও সেখানে পৌঁছানো সব সময় সহজ নয়।
ডিএনএ’র সব অংশ হাতের কাছে থাকে না
কোষের ভেতরে ডিএনএ খোলা সুতোর মতো পড়ে থাকে না। এর বড় অংশ হিস্টোন নামের প্রোটিনের চারপাশে পেঁচানো থাকে। অনেকটা নাটাইয়ে সুতো পেঁচিয়ে রাখার মতো। হিস্টোনের একটি গুচ্ছ আর তার চারপাশে পেঁচানো ডিএনএ মিলে তৈরি হয় নিউক্লিওসোম। ডিএনএ ও তার সঙ্গে যুক্ত প্রোটিনের এই সংগঠিত ব্যবস্থাকে বলা হয় ক্রোমাটিন। এভাবে লম্বা ডিএনএ কোষের ছোট নিউক্লিয়াসের মধ্যে গুছিয়ে রাখা সম্ভব হয়।

এই গুছিয়ে রাখার ব্যবস্থার আরেকটি ফল আছে। ডিএনএ’র কিছু অংশে প্রয়োজনীয় প্রোটিন সহজে পৌঁছাতে পারে, অন্য অংশে পৌঁছানো কঠিন হয়। ডিএনএ কতটা নাগালের মধ্যে আছে, সেই ধারণাটিই ক্রোমাটিন অ্যাক্সেসিবিলিটি। বিভিন্ন ধরনের কোষে এই নাগাল পাওয়ার ধরনও আলাদা। কিন্তু নাগালের মধ্যে থাকলেই যে কোনো জিন থেকে আরএনএ তৈরি হবে, এমনটা নয়। একটি বইয়ের পৃষ্ঠা খোলা থাকতে পারে; সেটি পড়ার জন্য পাঠকও প্রয়োজন। একইভাবে সহজে ব্যবহারযোগ্য হলেও সঠিক নিয়ন্ত্রক প্রোটিন ও আরএনএ তৈরির যন্ত্রপাতির সমন্বয় দরকার। তাই জিনের কাজ বোঝার জন্য শুধু নির্দেশনা জানলেই হয় না। সেই নির্দেশনা ব্যবহার করার পরিবেশটিও জানতে হয়।
কোষ তার পরিচয় ধরে রাখে কীভাবে?
এখন আরেকটি প্রশ্ন আসে। একটি কোষ বিশেষ কোনো কাজ করতে শুরু করল। কিন্তু সেই কাজের ধরন সে ধরে রাখে কীভাবে? কোষ ভাগ হয়ে নতুন কোষ তৈরি হলে আগের পরিচয়ের কী হয়?
এখানেই এপিজেনেটিক্স গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ডিএনএ’র অক্ষরের ক্রম না বদলিয়েও জিন ব্যবহারের কিছু অবস্থা দীর্ঘ সময় ধরে রাখা যায়। কখনো তা কোষ ভাগ হওয়ার পরও বজায় থাকে। এপিজেনেটিক্সের একটি কেন্দ্রীয় বিষয় হলো এই স্থায়িত্ব, একই জিনগত তথ্যের ওপর ভিন্ন ব্যবহারের গুণাগুণ ধরে রাখা।
এর সঙ্গে যুক্ত একটি ব্যবস্থা হলো ডিএনএ’র নির্দিষ্ট জায়গায় ছোট রাসায়নিক গ্রুপ যোগ করা। পরিচিত একটি উদাহরণ ডিএনএ মিথাইলেশন (DNA methylation)। আবার হিস্টোনের গায়েও রাসায়নিক পরিবর্তন হতে পারে। এসব পরিবর্তন অন্য প্রোটিনের কাজ ও ডিএনএ ব্যবহারের সুযোগকে প্রভাবিত করতে পারে। এগুলোকে বইয়ের বুকমার্কের সঙ্গে তুলনা করা যায়। বুকমার্ক বইয়ের লেখা বদলায় না, কিন্তু কোন অংশে ফিরতে হবে তার নির্দেশক হিসেবে কাজ করে।
অবশ্য কোষের রাসায়নিক চিহ্নগুলো সাধারণ বুকমার্কের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয়। আবার সব চিহ্ন একই কাজও করে না। কোনোটি জিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, কোনোটি জিনটি ব্যবহৃত হওয়ার ফলেও তৈরি হয়। তাই একটি চিহ্ন দেখেই বলা যায় না, সেটিই জিনটিকে চালু করেছে। কোষের এই ‘মনে রাখা’ মানুষের স্মৃতির মতো নয়। এটি অণুর কাজের ধারাবাহিকতা। কোষের পরিচয় ধরে রাখার উপযোগী ব্যবস্থা পরের কোষেও বজায় থাকে। ফলে প্রতিবার কোষ ভাগ হওয়ার পর তাকে একেবারে শুরু থেকে নতুন পরিচয় নিতে হয় না।
পরিচয় কি বদলানো যায়?
পরিচয় ধরে রাখা যায় বলেই যে তা কখনো বদলানো যাবে না, এমন নয়। ২০০৬ সালে কাজুতোশি তাকাহাশি ও শিনিয়া ইয়ামানাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করেন। তাঁরা ইঁদুরের ফাইব্রোব্লাস্ট যোজক টিস্যুর একধরনের কোষ ব্যবহার করেন। পরীক্ষাগারে চারটি নির্দিষ্ট জিন নিয়ন্ত্রক প্রোটিন সংশ্লেষণ করে তাঁরা এসব কোষের কিছু অংশকে ভ্রূণের স্টেম সেলের মতো একটি অবস্থায় নিতে সক্ষম হন।
এই অবস্থায় কোষগুলো আবার বহু ধরনের বিশেষায়িত কোষ তৈরির ক্ষমতা পায়। এদের নাম দেওয়া হয় ইনডিউসড প্লুরিপটেন্ট স্টেম কোষ বা আইপিএসসি (induced pluripotent stem cell- iPSC)। অর্থাৎ পরীক্ষার মাধ্যমে এমন একটি অবস্থা তৈরি করা হয়েছে, যেখানে কোষের পরবর্তীতে আবার ভিন্ন ধরনের কোষ হওয়ার সুযোগ খুলে যায়। পরীক্ষাটির তাৎপর্য শুধু নতুন একধরনের কোষ তৈরি করা নয়। এটি দেখায়, বিশেষায়িত কোষের ভেতরেও অন্য ধরনের কোষ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বহু জিনগত নির্দেশ রয়ে যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় সেগুলো ব্যবহার করা হয় না। নিয়ন্ত্রণের ধরন বদলালে সেই সম্ভাবনার কিছু অংশ আবার কাজে লাগানো সম্ভব।

একই ডিএনএ কিন্তু কোষ বিভিন্ন রকম হয় কি করে?
শুরুতে আমাদের প্রশ্ন ছিল: একই ডিএনএ থাকা সত্ত্বেও কোষগুলো এত আলাদা কেন?
এখন বোঝা যাচ্ছে, কোষের পরিচয় শুধু তার কাছে কোন নির্দেশনা আছে, তার ওপর নির্ভর করে না। কোন নির্দেশনা কতটা ব্যবহার হচ্ছে, কোথায় পৌঁছানো সহজ এবং সেই ব্যবহারের ধরন কতটা স্থায়ী এসবও গুরুত্বপূর্ণ। ট্রান্সক্রিপশন, ক্রোমাটিন ও এপিজেনেটিক নিয়ন্ত্রণ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই পার্থক্য গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
এই নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব শুধু স্বাভাবিক কোষের পরিচয়ে সীমিত নয়। প্রয়োজনীয় জিন নীরব হয়ে গেলে কিংবা ভুল সময়ে অন্য জিন বেশি সক্রিয় হলে কোষের আচরণ বদলাতে পারে। ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগে এমন পরিবর্তন ভূমিকা রাখে।তাই ডিএনএ’তে কী লেখা আছে, সেটি জানা জরুরি। কিন্তু পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নও করতে হয়: “কোষ সেই লেখার কোন অংশ ব্যবহার করছে আর কীভাবে?”
পরবর্তী পর্ব: একটা জিন এর সামনে দরজা আছে
ডিএনএ হিস্টোনের চারপাশে পেঁচানো থাকলে প্রয়োজনীয় প্রোটিন সেখানে পৌঁছায় কীভাবে? সেই প্যাঁচের অবস্থান কি বদলানো যায়? আর জায়গা করে দিলেই কি জিনের কাজ শুরু হয়ে যায়?
পরের পর্বে আমরা দেখব নিউক্লিওসোম, ক্রোমাটিন অ্যাক্সেসিবিলিটি এবং ডিএনএ’কে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার প্রক্রিয়া। তখন বোঝা যাবে, একটি জিনের সামনে ‘দরজা’ থাকার কথাটি কেন বলা যায়—আর উপমাটি কোথায় এসে থেমে যায়।
তথ্যসূত্র:
- Kundaje, A., Meuleman, W., Ernst, J., Bilenky, M., Yen, A., Heravi-Moussavi, A., Kheradpour, P., Zhang, Z., Wang, J., Ziller, M. J., Amin, V., Whitaker, J. W., Schultz, M. D., Ward, L. D., Sarkar, A., Quon, G., Sandstrom, R. S., Eaton, M. L., Wu, Y., . . . Kellis, M. (2015). Integrative analysis of 111 reference human epigenomes. Nature, 518(7539), 317–330. https://doi.org/10.1038/nature14248
- The Transcription of Life: From DNA to RNA, https://kids.frontiersin.org/articles/10.3389/frym.2020.599460
- Oya, S., Takahashi, M., Takashima, K., Kakutani, T., & Inagaki, S. (2022). Transcription-coupled and epigenome-encoded mechanisms direct H3K4 methylation. Nature Communications, 13(1), 4521. https://doi.org/10.1038/s41467-022-32165-8
- Epigenetics: Switching Genes On and Off, https://kids.frontiersin.org/articles/10.3389/frym.2020.554136
- Marstrand, T. T., & Storey, J. D. (2014). Identifying and mapping cell-type-specific chromatin programming of gene expression. Proceedings of the National Academy of Sciences, 111(6), E645-54. https://doi.org/10.1073/pnas.1312523111
- Cerneckis, J., Cai, H., & Shi, Y. (2024). Induced pluripotent stem cells (iPSCs): molecular mechanisms of induction and applications. Signal Transduction and Targeted Therapy, 9(1), 112. https://doi.org/10.1038/s41392-024-01809-0










মতামত জানান