ওই দেহ-পানে চেয়ে পড়ে মোর মনে, যেন কত শত পূর্ব-জনমের স্মৃতি। সহস্র হারানো সুখ আছে ও নয়নে, জন্মজন্মান্তরের যেন বসন্তের গীতি।
রবি ঠাকুরের স্মৃতি কবিতার এই লাইনগুলো সকলেরই পরিচিত। সবারই কখনো না কখনো এই কথাগুলো আপন মনে হয়তো বেজে ওঠে। কিন্তু এই সুখ-দুঃখের স্মৃতি, আনন্দ, প্রেম, বিরহ, ব্যথা, ঈর্ষা কিংবা স্বপ্ন— এ সমস্তই তো খুলির ভেতরকার অঙ্গটার কারসাজি। কল্পনা আর সৃজনশীলতার মূল উৎসও এটি। শুধু কি তাই? দৃষ্টি থেকে শুরু করে হৃদস্পন্দন, নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস কিংবা ঘুম চক্র, অঙ্গ সঞ্চালন প্রভৃতি দেহের যাবতীয় নানা কর্মকাণ্ড চলছে মস্তিস্কের ইশারায়। দেড় কিলো ওজনের এই অঙ্গটি কত কী করে চলেছে চোখের পলকে। কিন্তু কীভাবে? মানুষের এই প্রশ্ন বহু পুরাতন।
অনেক কাল আগে থেকেই বিস্ময়কর এই অঙ্গটাকে বোঝার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে আসছেন গবেষকরা। সফলতা আসতে শুরু করে বিংশ শতাব্দীতে এসে। এ সময় শরীরের নানা কাজের পেছনে মগজের নানা অংশের কারসাজিটা ধরতে সক্ষম হন বিজ্ঞানীরা। মগজাস্ত্রকে বোঝাপড়ায় এ এক অমূল্য মাত্রা যোগ করে বটে, তবে পদ্ধতিগুলো ছিলো অসম্পূর্ণ। ফলে নির্দিষ্ট কোনো স্নায়ুকোষ সরাসরি কোনো অনুভূতি বা আচরণের পেছনে দায়ী কি না— সেটা ঠিক করে ঠাওরানো সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তাই মস্তিস্কের যে ছবিটি বিজ্ঞানীরা মানসপটে দেখতেন তা তখনো ছিল ঝাপসা। অসংখ্য খুঁটিনাটি তথ্যের অভাব ছিল স্পষ্ট।
প্রায় ন’ হাজার কোটি স্নায়ুকোষ আছে মানব মস্তিষ্কে। এই সব স্নায়ুকোষ নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলে অবিশ্বাস্য জটিল নিউরাল নেটওয়ার্ক। তাই এর কার্যক্রম ঝা চকচকে করে বোঝা এত সহজ কাজ নয়। তবু বিজ্ঞানীরা মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকেন না। এই অসাধ্য সাধন করার স্বপ্ন যারা দেখতেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আরেক দিকপাল বিজ্ঞানী- ফ্রান্সিস ক্রিক। ক্রিক ১৯৫৩ সালে ডিএনএ-র দ্বি-সূত্রক কাঠামো আবিষ্কারের জন্য নোবেল জেতেন। এর কয়েক দশক বাদে মানব চেতনার পেছনে মৌলিক কার্যপদ্ধতি অনুসন্ধানে মন দেন তিনি। জীবন্ত মস্তিষ্কের কোনো নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে কীভাবে সক্রিয় করা যায় তার একটি নতুন পথ ভাবলেন ক্রিক। স্নায়ুকোষগুলো নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে সিন্যাপ্সের মধ্য দিয়ে। চোখের পলকে এক স্নায়ুকোষ থেকে অন্য স্নায়ুকোষে সংকেতের আদান-প্রদান চলে। ক্রিক ভাবলেন স্নায়ুকোষের এই দ্রুত গতির সঙ্গে তাল মেলাতে আলোর ব্যবহারই হবে সবচেয়ে আদর্শ। কোনভাবে যদি এদের আলোর প্রতি সংবেদনশীল করে তোলা যায়, তবেই হয়তো স্নায়ুর কর্মকাণ্ডকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

তখনকার সময়ে ক্রিকের এই ভাবনা অবাস্তব মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা ছিল দূরদর্শী। তাঁর এই ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিয়েই চলতি বছর মেডিসিনে নোবেল জিতলেন কার্ল ডেইসারোথ, পিটার হেগেম্যান এবং গেয়র্গ নাগেল। স্নায়ুকোষের কার্যক্রম পরখে এক চমৎকার মলিকুলার সুইচ আবিষ্কারের জন্য এ পুরষ্কার পান তাঁরা। এই সুইচ আলোর প্রতি সংবেদনশীল। আলোর সহায়তায় বিজ্ঞানীরা এখন ইচ্ছেমতো মস্তিষ্কের কোনো নিউরাল নেটওয়ার্ক চালু বা বন্ধ করতে পারেন। এমনকি হারিয়ে যাওয়া কোনো স্মৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে, অনুভূতি সৃষ্টি করতে, নির্দিষ্ট আচরণ পরিচালনা করতে এবং বিভিন্ন মানসিক ও স্নায়বিক রোগের সঙ্গে জড়িত নিউরনগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন এই ত্রয়ী বিজ্ঞানীর কল্যাণে।
আলো আর জেনেটিক্স এর সমন্বয়ে কোনো কোষে কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণের এই কৌশলকে বলা হয় অপ্টোজেনেটিক্স। এই বিদ্যা মগজ নিয়ে আমাদের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, স্নায়ুতন্ত্র কীভাবে দেহের অন্যান্য অংশ—যেমন হৃৎপিণ্ড ও পরিপাকতন্ত্রের বিভিন্ন কোষের সঙ্গে যোগাযোগ করে, সে বিষয়েও আলো ফেলেছে এই প্রযুক্তি। আর এই পুরো বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল একজন গবেষকের অফুরান কৌতূহল থেকে। তিনি হলেন মার্টিনস্রিডের ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর বায়োকেমিস্ট্রির বিজ্ঞানী পিটার হেগেম্যান। নব্বই দশকের শুরুর দিকে তিনি খুব সরল একটা প্রশ্ন করেছিলেন- ক্ল্যামাইডোমোনাস (Chlamydomonas) নামে এককোষী সবুজ শৈবালটি কীভাবে আলোর প্রতি এত দ্রুত সংবেদনশীলতা দেখায়?

আলোর প্রতি সংবেদনশীলতার জন্য এই শৈবালটি বিজ্ঞানীদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত। পেট্রি ডিশের দ্রবণে একে মেশালে পুরো তরল সবুজে ছেয়ে যায়। এরপর এই দ্রবণে আলো ফেললে দেখা যায় সবুজ আভাটি ধীরে ধীরে আলোর উৎসের দিকে যেতে থাকে। এর কারণ দ্রবণে থাকা শৈবাল আলোর দিকে সাঁতরে যায়। এদের আইস্পট কোষে কমলা বর্ণের একটি বিন্দু দিয়ে এরা আলোর উপস্থিতি টের পায়। এই কমলা বর্ণের বিন্দুর ভেতরে থাকে আলো ধরা এক অণু বা রেটিনাল।
হেগেম্যান শৈবালের এই আইস্পট নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান শুরু করলেন। অতি ক্ষুদ্র ইলেক্ট্রোডের সাহায্যে তিনি পরখ করে দেখেন এই বিশেষ শৈবালটিতে আলো পড়লে কী ধরনের তড়িৎ সংকেত তৈরি হয়। আলোর প্রতি এর দ্রুত প্রতিক্রিয়া হেগেম্যানকে বিস্মিত করে। আলো পড়বার এক মিলিসেকেন্ডেরও অর্ধেক সময়ে তড়িৎরাসায়নিক মিথস্ক্রিয়া শুরু হয়। জৈবিক সিস্টেমে আলোর এমন প্রভাব এটাই নতুন নয়। যেমন মানুষের চোখে আলো পড়লেও কয়েকটি ধাপ শেষে জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়া সক্রিয় হয়। এর একদম শেষ ধাপে একটি প্রোটিন আয়ন চ্যানেল কাজ করে। এর ভেতর দিয়ে নানারকম আয়ন চলাচল করে তড়িৎরাসায়নিক সংকেতের সৃষ্টি করে। মানব চোখে এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে ১০ মিলিসেকেন্ড লাগে। অর্থাৎ আলোক সংবেদনশীল অন্যান্য সিস্টেমের তুলনায় ক্ল্যামাইডোমোনাস বিশ গুণ দ্রুত সাড়া দেয়। কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব হয়?
হেগেম্যানের অনুমান করেন যে, ক্ল্যামাইডোমোনাসের আলোক সংবেদনশীলতার এই প্রক্রিয়াটি নিশ্চয়ই অনেক সরল— যেজন্যে এটি এত দ্রুত কাজ করে। নব্বই দশকের গোড়ার দিকে তিনি হাইপোথিসিস দেন যে, এই বিশেষ শৈবালটিতে একটি প্রোটিন একই সঙ্গে আলো শোষণ ও আয়ন ট্রান্সপোর্টার হিসেবে কাজ করে। তাঁর এই প্রস্তাবে বিজ্ঞানীদের অনেকেই সন্দেহ পোষণ করেন। কারণ আলোর প্রতি সংবেদনশীল কোনো আয়ন চ্যানেল তখনও আবিষ্কৃত হয়নি।
কিন্তু হেগেম্যান পিছু হটলেন না। নিজের অনুমানে দম কতদূর তা পরখ করতে নেমে পড়লেন। ক্ল্যামাইডোমোনাস শৈবালে আলোক সংবেদনশীল প্রোটিনটি আলাদা করার চেষ্টা শুরু করলেন। কাজ যারপরনাই কঠিন। শৈবালের আইস্পট থেকে প্রোটিন আলাদা করলেও এগুলোকে টিকিয়ে রাখা সহজ নয়। জীবন্ত কোষের সহজাত পরিবেশ থেকে বের করে আনলে এগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যেত। ফলে এগুলো নিয়ে পরীক্ষা চালানো দুরূহ হরে পড়ে। নানা বাধা বিপত্তি ঠেলে শেষমেশ উপায় একটা বের হয়। জাপানি গবেষকরা তখন ক্ল্যামাইডোমোনাসের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স পাঠোদ্ধার করেন। হেগেম্যানের দল শৈবালটির জিনোমে দুটি জিনের সন্ধান পান— এদের সঙ্গে অন্যান্য আলোক শোষণকারী প্রোটিনের জিনের মিল আছে। হেগেম্যানের মাথায় চিন্তা খেলে যায় যে, তবে কি এই দুটোই তাঁর সেই কাঙ্ক্ষিত প্রোটিনের জিন?
প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হেগেম্যান যোগাযোগ করলেন ফ্রাঙ্কফুর্টের ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর বায়োফিজিক্সের সহকর্মী গেয়র্গ নাগেলের সাথে।
কোনো জিনের কাজ কি কিংবা সেটি যে প্রোটিনকে কোড করে তার কাজই বা কি সেটা বুঝতে বিজ্ঞানীরা ঐ জিনকে জীবন্ত কোনো মডেলে স্টাডি করেন। নাগেল প্রোটিন পর্যবেক্ষণের কাজে ব্যাঙের ডিম্বাণু ব্যবহার করতেন। এরই মধ্যে ক্ল্যামাইডোমোনাসের এই বিশেষ জিন দুটি নাগালের হাতে আসে। হাতে পাবার পর তিনি জিন দুটোকে দুটো আলাদা ব্যাঙের ডিম্বাণুতে প্রবেশ করান। ব্যাঙের ডিম্বাণুর কোষপর্দায় উভয় জিনই সফলভাবে প্রকাশিত হয়। বিপুল পরিমাণে তৈরি হয় অজানা সেই প্রোটিন। এবারে এই প্রোটিনগুলোর কার্যক্রম পরখ করার পালা। অল্প সময়ের ব্যবধানেই নাগেল বুঝতে পারেন, এগুলোই হেগেম্যানের কাঙ্ক্ষিত সেই প্রোটিন— যা একইসঙ্গে আয়ন চ্যানেল হিসেবে ভূমিকা রাখে আবার আলোক সংবেদনশীল। আলোর স্পর্শ পেলেই এগুলো খুলে যায়। প্রোটিন দুটোর নাম দেওয়া হলো ‘চ্যানেলরোডপসিন-১’ ও ‘চ্যানেলরোডপসিন-২’।
তবে অপটোজেনেটিক্সের দুয়ার খুলে দিয়েছিল দ্বিতীয় প্রোটিনটা— চ্যানেলরোডপসিন-২।
হেগেম্যানের মতো, নাগেলও খেয়াল করলে চ্যানেলরোডপসিন-২ আলোর প্রতি বেশ দ্রুত সাড়া দেয়। আলো পড়বার মাত্র ০.২ মিলিসেকেন্ডে ব্যাঙের ডিম্বাণুর পর্দায় এই চ্যানেলের মুখ খুলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে ধনাত্মক চার্জযুক্ত আয়ন এই চ্যানেল দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে এবং তড়িৎ সংকেতের সৃষ্টি করে। এই দুই বিজ্ঞানী বুঝতে পারলেন তাঁরা এক ব্রেকথ্রু আবিষ্কারের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন। পরবর্তীতে তাঁরা চ্যানেলরোডপসিন-২ এর জিন মানব ভ্রূণ এবং হ্যামস্টারের কিডনি কোষে প্রবেশ করান। এবারেও একই ফলাফল পাওয়া গেলো। কোষগুলো আলোর প্রতি সাড়া দিচ্ছে।

২০০৩ সালে হেগেম্যান ও নাগেল তাঁদের এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করলেন। তাঁরা প্রস্তাব করেন যে, আলোর সাহায্যে সজীব কোষে তড়িৎ উদ্দীপনা বা পালস তৈরির একটা মোক্ষম হাতিয়ার হতে পারে চ্যানেলরোডপসিন-২। জীবন বিজ্ঞানীদের মধ্যে সাড়া ফেলে এই গবেষণা। এরপর এই বৈপ্লবিক গবেষণার ব্যাটনটি তুলে নেন স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির এক তরুণ বিজ্ঞানী—কার্ল ডেইসারোথ।
নব্বই এর দশকে ডেইসারোথ চিকিৎসাশাস্ত্রে পাঠ শুরু করেন। ইচ্ছে ছিল একজন নিউরোসার্জন হওয়ার। প্রশিক্ষণের জন্য তাঁকে কিছুদিন কাজ করতে হয়েছিল একটি মানসিক রোগ নিরাময় কেন্দ্রে। সেখানে রোগীদের অবর্ণনীয় কষ্ট তাঁদের সাহায্যের আকুল প্রয়োজনীয়তা তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। একই সঙ্গে তাঁর মনে প্রশ্নের উঁকি দেয়—ভিন্ন ভিন্ন মানুষের মস্তিষ্ক কেন এত ভিন্নভাবে কাজ করে? বিষণ্ণতায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য পুলকিত অনুভব করাটা কেন কঠিন হয়ে দাঁড়ায়? অটিজম কিংবা সিজোফ্রেনিয়ায় বিভ্রমের পেছনে আসল কারণটাই-বা কী? এই প্রশ্নগুলোই তাঁকে স্নায়ুবিজ্ঞানে পিএইচডি করতে চালিত করে। গবেষণাগারে তিনি মানব মস্তিষ্কের অতি সূক্ষ্ম খণ্ডাংশ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতেন। এসব গবেষণা থেকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ কিছু অন্তর্দৃষ্টি পান। পরে বুঝতে পারেন এসব দুরূহ রোগের প্রকৃত কারণ বুঝতে হলে জীবন্ত মস্তিষ্কের ভেতরে স্নায়ুকোষ কীভাবে কাজ করে, তা নিখুঁতভাবে বোঝা প্রয়োজন।
তখন অনেকেই ফ্রান্সিস ক্রিকের প্রস্তাবিত ধারণার ওপর ভিত্তি করে স্নায়ুকোষের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের কৌশল উদ্ভাবনের চেষ্টা করছিলেন। তবে তাঁদের অনেকেই অবাস্তব কল্পনা ভেবে হাল ছেড়ে দেন। কিন্তু ডেইসারোথ উপলব্ধি করেন যে ব্যর্থতার এই ঝুঁকি তাঁকে নিতেই হবে; কারণ রোগীদের জন্য তখন যেসব চিকিৎসা দিতে পারতেন, তা খুব কমই কার্যকর হতো এবং উল্টো নানা ধরনের মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করত। রোগীদের সত্যিকারের সাহায্য করার মতো কোনো ভালো পথ খুঁজে পেতে হলে মস্তিষ্ক সম্পর্কে আরও গভীর ও মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা ছিল অপরিহার্য।
ডেইসারোথ এর গবেষণা দল এমন এক প্রোটিনের সন্ধান করছিলেন যা দিয়ে স্নায়ুকোষের ভেতর তড়িৎ উদ্দীপনা তৈরি করা সম্ভব। তাঁরা বহু সম্ভাব্য উপাদান নিয়ে পরীক্ষা চালান। পরবর্তীতে চ্যানেলরোডপসিন-২ আবিষ্কারের কথা জানতে পেরে তিনি গেয়র্গ নাগেলকে চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি প্রোটিনটি তৈরির জন্য এর ডিএনএ অনুক্রম ব্যবহারের অনুমতি চান।
নাগেল জিনটি পাঠিয়ে দিলেন ডেইসারোথের ল্যাবরেটরিতে। পৌঁছানোর পর এই জিন প্রবেশ করানো হলো কালচার করা ইঁদুরের স্নায়ুকোষে। একই সঙ্গে শঙ্কা কাজ করছিল যে, বাইরের এই জিন প্রবেশ করানোতে হয়তো মারা পড়বে স্নায়ুকোষগুলো। কিন্তু দেখা গেল কোনো ধরনের সমস্যা ছাড়াই কোষগুলো অনায়াসে চ্যানেলরোডপসিন-২ প্রোটিন তৈরি করতে শুরু করেছে। এরপর যখন স্নায়ুকোষগুলোর ওপর নীল আলো ফেলা হলো, কোষগুলো সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিল। সেই আলো স্নায়ুর ভেতর এক বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করল, যা অনায়াসেই ছড়িয়ে পড়তে পারত পার্শ্ববর্তী অন্যান্য স্নায়ুকোষেও।
২০০৫ সালে ডেইসারোথের গবেষণা দল তাঁদের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের ফলাফল প্রকাশ করেন। তাঁরা নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছিলেন; তবে ডেইসারোথ এ-ও জানতেন যে মূল গন্তব্যে পৌঁছাতে—অর্থাৎ জীবন্ত প্রাণীর ভেতরে স্নায়ুকোষের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতে হলে এখনো অনেকটা পথ পাড়ি দেওয়া বাকী।

ডেইসারোথ এবার অনেকের সঙ্গে যৌথ গবেষণা শুরু করেন, যার মধ্যে ছিলেন পিটার হেগেম্যান এবং গেয়র্গ নাগেলও। এর বিশাল সম্ভাবনা অনুধাবন করতে পেরেছেন এমন অন্য বিজ্ঞানীদের সঙ্গেও তিনি নিজের আবিষ্কার ভাগ করে নেন। ডেইসারোথের গবেষণাগারকে অগ্রভাগে রেখে বিজ্ঞানীরা দ্রুতই আরও কিছু প্রোটিন খুঁজে পান যা স্নায়ুকোষকে চালু বা বন্ধ করতে পারে এবং যেগুলো আলোর ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে সক্রিয় হয়।
২০০৬ সালে এই নতুন পদ্ধতির নামকরণ করা হয় ‘অপটোজেনেটিক্স’। বছরখানেক পর ডেইসারোথ ইঁদুরের মস্তিষ্কে স্নায়ুকোষ সফলভাবে সক্রিয় করতে সক্ষম হন। তাঁরা মস্তিষ্কের মোটর কর্টেক্সের একটি স্নায়ুতে চ্যানেলরোডপসিন-২-এর জিনটি প্রবেশ করান। মস্তিষ্কের এই অংশটি নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে। এরপর ইঁদুররে মাথার খুলিতে ছোট্ট একটি ছিদ্র করে তার মধ্য দিয়ে প্রবেশ করানো হয় পাতলা অপটিক ফাইবার। এই ফাইবার দিয়ে আলো ফেলা হয় স্নায়ুকোষগুলোতে। এভাবে সফলভাবে তাঁরা ইঁদুরের গোঁফের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হন।

একই বছর অন্যান্য গবেষকদের সঙ্গে কাজ করে ডেইসারোথ অপটোজেনেটিক্স ব্যবহার করে ঘুমন্ত ইঁদুরকে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে জাগিয়ে তোলেন। সম্প্রতি এক ধরনের স্নায়ুকোষ আবিষ্কৃত হয়—যা জেগে থাকা নিয়ন্ত্রণ করে। বিজ্ঞানীরা এই স্নায়ুকোষে চ্যানেলরোডপসিন-২ প্রবেশ করান। দেখা যায় এই কোষগুলোতে আলো ফেলা মাত্রই ইঁদুর জেগে ওঠে। অপটোজেনেটিক্সের প্রথমদিককার আরেকটি বিখ্যাত গবেষণা প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে।ডেইসারোথের গবেষণা দল জীবন্ত ইঁদুরের মস্তিষ্কে চ্যানেলরোডপসিন-২ সঙ্কেতকারী জিনটি প্রবেশ করান। এরপর তাঁরা মস্তিষ্কের ভেতর একটি সরু অপটিক্যাল ফাইবার স্থাপন করেন। অপটিক্যাল ফাইবারের মধ্য দিয়ে স্নায়ুকোষগুলোর ওপর আলো ফেলতেই একটি স্নায়ু সংকেত উৎপন্ন হয়, যা ইঁদুরটির গোঁফে নড়াচড়ার সৃষ্টি করে।
এই গবেষণায় ডেইসারোথের সঙ্গে যোগ দেন ১৯৮৭ সালে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী সুসুমু তোনেগাওয়া। তাঁরা সফলভাবে একটি ‘এনগ্রাম’ সক্রিয় করেন—যা মূলত স্মৃতি তৈরির সময় গঠিত নিউরাল পাথওয়ের একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন। গবেষকরা ইঁদুরের ভীতি পাওয়ার মুহূর্তগুলো পর্যবেক্ষণ করেন এবং কোন কোন স্নায়ুকোষ সেই ভীতির স্মৃতি তৈরি করছে তা চিহ্নিত করেন। পরবর্তীতে যখন এই স্নায়ুকোষগুলোকে আবার সক্রিয় করা হয়, তখন কোনো তাৎক্ষণিক বিপদ না থাকা সত্ত্বেও ইঁদুরগুলোর মধ্যে ভয়ের লক্ষণ প্রকাশ পায়। এটিই ছিল প্রথম পরীক্ষা যার মাধ্যমে গবেষকরা নির্দিষ্ট কোনো স্মৃতির জন্য ঠিক কোন স্নায়ুকোষগুলো কাজ করে তা সরাসরি চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন।
মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষকে সক্রিয় করার এই ক্ষমতা আমাদের এই বিস্ময়কর অঙ্গটি সম্পর্কে বোঝার দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। আগেই বলেছি একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মস্তিষ্কে প্রায় ৯ হাজার কোটি স্নায়ুকোষ থাকে, যার প্রতিটি আবার অন্যান্য স্নায়ুকোষের সঙ্গে হাজার হাজার সংযোগ তৈরি করে।
অপটোজেনেটিক্সকে ধন্যবাদ, জটিল একটি স্নায়ুগুচ্ছের কোন স্নায়ুকোষটি মস্তিষ্কের কোন কাজটি নিয়ন্ত্রণ করে বিজ্ঞানীরা এখন তা নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করতে পারেন।
বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে ব্যথার অনুভূতি, সামাজিক আচরণ, তৃষ্ণা, খাদ্য গ্রহণ, প্রাপ্তি বা পুরস্কারের অনুভূতি (রিওয়ার্ড) এবং মনোযোগ নিয়ন্ত্রণকারী নিউরাল সার্কিটগুলো শনাক্ত করেছেন। এছাড়া তাঁরা সার্কাডিয়ান ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করা থেকে শুরু করে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় হলে কেন দেহের তাপমত্রা বেড়ে যায়— এর পেছনে দায়ী স্নায়ুকোষগুলোকেও খুঁজে পেয়েছেন। গবেষকরা যখন আরও জটিল আচরণ নিয়ে কাজ করেছেন—যেমন ইঁদুর কীভাবে ছানাদের যত্ন নেয়—তখন তাঁরা দেখতে পান যে একটি আচরণের বিভিন্ন অংশ আলাদা আলাদা নিউরাল সার্কিট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে।
একটি সার্কিট হয়তো নিয়ন্ত্রণ করে ইঁদুর কীভাবে ছানাদের বাসায় জড়ো করবে, আবার অন্য একটি সার্কিট নিয়ন্ত্রণ করে কীভাবে সেগুলোকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখবে। অপটোজেনেটিক্স স্নায়ুতন্ত্র ও দেহের অন্যান্য কোষের যোগাযোগ বুঝতেও সাহায্য করবে। ডেইসারোথের গবেষণাদল দেখিয়েছেন যে হৃদস্পন্দন আমাদের আবেগকে প্রভাবিত করতে পারে; হৃৎপিণ্ডকে যদি অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য করা হয়, তবে তা উদ্বিগ্নতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। অসংখ্য উদাহরণের মধ্যে আরেকটি হলো, গবেষকরা অন্ত্রে কিছু কোষ শনাক্ত করেছেন যা ব্যাখ্যা করে কেন কিছু মানুষ কৃত্রিম মিষ্টির চেয়ে চিনি খেতেই বেশি পছন্দ করে।
অপটোজেনেটিক্স চিকিৎসাক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাবে। বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, সিজোফ্রেনিয়া, অ্যালঝেইমার ও পারকিনসন্স রোগের মতো মানসিক ও স্নায়বিক ব্যাধিগুলোকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করবে। এমনকি অপটোজেনেটিক্সকে চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহারের লক্ষ্যে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। চলমান ট্রায়ালে রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা—যা চোখের রড ও কোন কোষগুলোকে ধ্বংস করে দেয়—রোগে অন্ধ হয়ে যাওয়া মানুষদের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছেন। দৃষ্টিহীন ব্যক্তির রেটিনায় চ্যানেলরোডপসিনের মতো একটি প্রোটিন প্রবেশ করিয়ে দেখা গেছে তিনি আংশিক দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছেন। আলো নিঃসরণকারী বিশেষ চশমা ব্যবহার করে তিনি টেবিলের ওপর রাখা জিনিসপত্র চিনতে ও ধরতে সক্ষম হয়েছেন। অপটোজেনেটিক্স কানের ককলিয়ার ইমপ্লান্টের কার্যকারিতা আরও উন্নত করতে পারে বলেও আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে এই ইমপ্লান্টগুলো বিদ্যুতের সাহায্যে শ্রবণস্নায়ুকে উদ্দীপিত করে। এর বদলে যদি অপটোজেনেটিক্স ব্যবহার করা যায়, তবে হয়তো আরও নিখুঁতভাবে শ্রবণস্নায়ুকে সক্রিয় করা সম্ভব হবে।
তথ্য ও ছবি কৃতজ্ঞতা: দ্য নোবেল প্রাইজ










মতামত জানান