একটা জটলা দেখে এগিয়ে গেলেন। গিয়ে দেখলেন সে জটলার মাঝে বিশেষ আলোকবাজির খেলা হচ্ছে। দেখতে নিশ্চয়ই বেশ চমৎকার কিছু হবে, এতো মানুষ কি আর স্বাদে এখানে দাঁড়িয়ে? কিন্তু সমস্যা হলো, এই জটলা ঠেলে আর ভেতরে যেতে পারছেন না। আপনার সামনে ইয়া বড় বড় লোক এসে দাঁড়াচ্ছে, দেখার জো-টি নেই। এমন পরিস্থিতিতে ইচ্ছা হতেই পারে যে, তখন মনে হতেই পারে, ইশ! এমন একটা দৃষ্টিশক্তি যদি থাকত, যার সাহায্যে যেকোনো কঠিন বস্তুর ভেতর দিয়েও দেখা যেত!
কেন এসব বকছি? এর আগে আপনাকে একটা খবর দেয়া যাক, এ বছরের, মানে ২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উইসকন্সিল-ম্যাডিসনের পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হ্যালজেন (Francis Halzen)। গত ৬ অক্টোবর ২০২৬ এ ঘোষিত এই পুরস্কার তাঁকে দেওয়া হয়েছে ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অভজারভেটরি’ প্রতিষ্ঠায় তাঁর অগ্রগামী অবদান এবং মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কারের জন্য। গত ৩৪ বছরে ফ্রান্সিস হ্যালজেনই একমাত্র পদার্থবিদ হিসেবে এককভাবে নোবেল পেয়েছেন ফিজিক্সে। আমার এই পুরো লেখাটার একমাত্র উদ্দেশ্য হবে আপনাকে বুঝানো যে, কেন এ বছরের ফিজিক্সের নোবেল পেলেন ফ্রান্সিস হ্যালজেন। এটুকুর জন্য যতোদূর যেতে হয়, আমরা যাবো।
তো, আমরা যেখানে ছিলাম! আলোকবাজির ওই জমজমাট খেলাটা দেখতে গিয়ে ভিড়ের মাঝখানে বিশাল বড় সব মানুষ সামনে এসে দাঁড়ালো, আর আপনি খেলা দেখা থেকে বঞ্চিত হলেন। আমাদের এই মহাবিশ্বকে জানতে বুঝতেও ঠিক একই রকমের একটা সমস্যায় পড়তে হয়। ধরুন, বহু দূরের কোনো গ্যালাক্সির কেন্দ্রে একটা সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের আশপাশে চলছে ভয়ংকর সব কাণ্ডকারখানা। বিপুল শক্তিতে ছিটকে বেরিয়ে যাচ্ছে কণা, উত্তপ্ত হচ্ছে পদার্থ, তৈরি হচ্ছে মহাজাগতিক রশ্মি। আমরা জানতে চাই, সেখানে ঠিক কী ঘটছে। কিন্তু সব তথ্য আমাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
কারণ, মোটাদাগে বলতে গেলে এই মহাবিশ্বকে আমরা দেখি ফোটন দিয়ে (কসমিক ওয়েভও আরেকটা মাধ্যম, তবে এটা এখানে অপ্রাসঙ্গিক)। সমস্যা হচ্ছে, দৃশ্যমান আলো থেকে শুরু করে রেডিও ওয়েভ, এক্সরে আর গামা রশ্মি, তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণের বিভিন্ন রূপ আমাদের মহাবিশ্বের বিচিত্র সব ঘটনার খবর দেয়, তা সত্যি। কিন্তু এতসব মাধ্যম থাকা সত্ত্বেও মহাবিশ্বের সব রহস্য উন্মোচন করা যায় না। কোথাও ঘন গ্যাস আর ধূলিকণা আলোকে শোষণ বা বিক্ষিপ্ত করে, কোথাও অত্যন্ত শক্তিশালী পরিবেশে আলো তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াই আমাদের কাঙ্ক্ষিত তথ্য সরাসরি জানাতে পারে না। আবার কোনো কোনো মহাজাগতিক ঘটনার ভেতরের পরিবেশ সম্পর্কে আলোর সংকেত বিশ্লেষণ করেও সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন।
তাহলে এতোসব বাঁধা পেরিয়ে মহাবিশ্বকে আরও ভালো করে কীভাবে দেখা যাবে? ফোটন ছাড়া আর কে এতো যত্ন নিয়ে সহস্র কোটি আলোকবর্ষ পাড়ি দিয়ে মহাবিশ্বের কোণে কোণে ঘটা বিস্ময়কর সব ঘটনা নিয়ে আসবে? যে মহাবিশ্বের পথে পথে ঘুরে বেড়াবে, অথচ সাধারণ পদার্থের বাধায় প্রায় থামবেই না। যে ছায়াপথের ভয়ংকর পরিবেশ থেকে বেরিয়ে কোটি কোটি আলোকবর্ষ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারবে, পথে প্রায় কোনো কিছুর সঙ্গেই মিথস্ক্রিয়া না করে।
সেক্ষেত্রে, এমন একজনকে আমাদের পছন্দ করতে হবে, যে মানে না কোনো বাঁধা। সিঁধ কাটা চোরের মতো প্রায় যেকোনো কিছুর থ্রু দিয়ে চোখের পলকেই চলে আসতে পারবে। এবং আমাদের মহাবিশ্বে তেমন পিওন আছে বইকি। কে সে?
সে আমাদের পরম আদরের নিউট্রিনো।
নিউট্রিনো আবার কী?
তার গল্পটা একটু সংক্ষিপ্ত করে বলি। নিউট্রিনো হলো এক ধরনের মৌলিক কণা, যার বৈদ্যুতিক চার্জ নেই এবং ভরও অত্যন্ত সামান্য। তবে এর সবচেয়ে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো, সাধারণ পদার্থের সঙ্গে এর মিথস্ক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা অবিশ্বাস্য রকম কম। এর কারণ, নিউট্রিনো তড়িৎচুম্বকীয় বলের সঙ্গে সরাসরি মিথস্ক্রিয়া করে না। এটি মূলত দুর্বল নিউক্লীয় বলের মাধ্যমে অন্য কণার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় জড়ায়, যে বলের প্রভাব খুবই স্বল্পপাল্লার। ফলে প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য নিউট্রিনো আমাদের শরীরের ভেতর দিয়ে চলে গেলেও, তাদের প্রায় কেউই শরীরের কোনো কণার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় জড়ায় না। যেই মুহুর্তে আপনি এই লেখাটা পড়ছেন, সেই মুহুর্তেই আপনার শরীর ভেদ করে চলে যাচ্ছে কোটি কোটি নিউট্রিনো। এমনকি পৃথিবীর মতো বিশাল একটা গ্রহও বেশির ভাগ নিউট্রিনোকে আটকে রাখতে পারে না। যে কারণে আমাদের পুরোনো পিয়ন, ফোটনকে আজকাল বেশ অযোগ্য মনে হচ্ছে, সেটা খুলে বলি। যদিও একটু আগেই তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে খোটা দিলাম, এবার একটু বিজ্ঞান মিশিয়ে বুলি করা যাক তাকে।
ফোটন হলো তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রের কোয়ান্টাম। একটা পদার্থের পরমাণুর ভেতরের ইলেকট্রন বা প্রোটনের মতো বৈদ্যুতিক চার্জযুক্ত কণার সঙ্গে ফোটন মিথস্ক্রিয়া করতে পারে। ধরুন, আলো একটা কাচের টুকরোর ওপর পড়লো। আলোর তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্র কাচের ভেতরের চার্জযুক্ত কণাগুলোর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে। এর ফলে কাচের মধ্যে আলোর চলার ধরন বদলে যায়, আর আলো এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে প্রবেশ করলে তার দিকও পরিবর্তিত হতে পারে। এই ঘটনাকেই আমরা বলি প্রতিসরণ। আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ও কাচের বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে কাচ আলোকে শোষণও করতে পারে। অর্থাৎ, আলো সব পদার্থের মধ্য দিয়ে বাধাহীনভাবে চলে যেতে পারে না। তাছাড়া মহাবিশ্বের দূর থেকে দূরতম জায়গার নানান ঘটনা ফোটন বা আলোর মাধ্যমে বুঝতে গিয়েও আমরা দেখেছি, আলো পথে আটকে যায়, মহাজাগতিক ধুলোয় ঢাকা পড়ে। চার্জযুক্ত কণা (কসমিক রে) চৌম্বকক্ষেত্রে বেঁকে যায়, ফলে কোথা থেকে এল বোঝা যায় না।
অন্যদিকে, নিউট্রিনোর সঙ্গে ইলেকট্রনের মতো তড়িৎচুম্বকীয় বলের সরাসরি মিথস্ক্রিয়া নেই। নিউট্রিনো মূলত দুর্বল নিউক্লীয় বলের মাধ্যমে অন্য কণার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে। এবং পরমাণুর অধিকাংশ জায়গা যেহেতু অবিশ্বাস্য রকমের খালি, তারওপর পদার্থের সঙ্গে তার অত্যন্ত দুর্বল মিথস্ক্রিয়া, তাই বেচারা পেয়ে গেছে ফ্রি পাস। তারওপর ফোটন তথা আলোর যাত্রাপথের বেঁকে যাওয়ার যে সমস্যাটা ছিলো, সেটা নিউট্রিনোর নেই। নিউট্রিনো সোজা পথে আসে, তাই যেদিক থেকে এসেছে সেদিকেই তার উৎস। পাঠানো খবর কেউ বিকৃত করতে পারে না।
এ কারণে নিউট্রিনো আমাদের এমন সব ঘটনার তথ্য দিতে পারে, যেগুলো শুধু আলো পর্যবেক্ষণ করে জানা কঠিন। যেমন, দূরবর্তী সক্রিয় ছায়াপথের কেন্দ্রের প্রচণ্ড শক্তিশালী পরিবেশে কী ঘটছে, মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাকৃতিক কণাত্বরকগুলো কোথায় রয়েছে। কিংবা কোথায়ই বা পাওয়া যাবে মহাবিশ্বের কসমিক সব পার্টিকেল এসকেলেটরগুলোকে।
তবে হ্যাঁ, নিউট্রিনো একেবারেই যে মিথস্ক্রিয়া করে না, তা নয়। ‘বিরল কোনো ঘটনায়’ নিউট্রিনো অন্য কণার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করলে সেটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এবং সামনে আমরা দেখব, কীভাবে এই বিরল ঘটনাকেই কাজে লাগিয়ে চতুর এই হোমো স্যাপিয়েন্সরা নিউট্রিনো নামের এই সিঁধেল চোরকে ধরে ফেলে।
সে আর যাইহোক, নিউট্রিনো এক নিঃসঙ্গ কণা। তাও তাকে সিঁধেল চোর বানিয়ে অপরাধবোধ হচ্ছে এখন। তবে ২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল নিয়ে লিখতে বসে আপনাদের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেওয়াটা জরুরি ছিল। এবার সামনে এগিয়ে যাই।

এইযে এতোক্ষণ নিউট্রিনোর সিঁধেল কেটে পরমাণু তথা পদার্থের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়ার এই স্কিলের সাফাই গাইলাম, তাতে একটা প্রশ্ন কিন্তু আপনার মনে জন্মাতেই পারে। তা হচ্ছে, যদি একে ধরা এতোটাই দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে যায়, তাহলে কীভাবে এটাকে মহাবিশ্বকে বুঝতে কাজে লাগাবো?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে ঠিক ওই ‘বিরল ঘটনার’ ভেতরেই। নিউট্রিনো কোটি কোটি বছর অনায়াসে কোনো বাধা না মেনে পার হয়ে গেলেও, ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন নিউট্রিনোর যাত্রাপথে কদাচিৎ দু-একটি কণা কোনো না কোনো পরমাণুর সাথে ধাক্কা খেয়ে বসেই। আর সেই অতি বিরল সুযোগটাকে কাজে লাগিয়েই ১৯৫৬ সালে দুই মার্কিন পদার্থবিদ ক্লায়েড কাওয়ান এবং ফ্রেডরিক রাইনেস পরিচালনা করেন বিখ্যাত Cowan–Reines neutrino experiment। তাঁরা পানির ট্যাঙ্কের মধ্যে অ্যান্টি-নিউট্রিনোর এই বিরল মিথস্ক্রিয়া ঘটিয়ে দেখতে পান, প্রতিবার মিথস্ক্রিয়ার সময় একটি পজিট্রন এবং একটি নিউট্রন তৈরি হচ্ছে, যা পরে নির্দিষ্ট গামা রশ্মির ঝলক বা সিগন্যাল দিচ্ছে। সেই সূক্ষ্ম সংকেতের ব্যবধান মেপেই বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন যে, মানুষের জালে শেষ পর্যন্ত ধরা পড়েছে আমাদের এই অধরা নিউট্রিনো।
এরপর কিন্তু আরও অনেকবারই আমরা নিউট্রিনোকে ধরতে পেরেছি। এরমধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন আরেক মার্কিন বিজ্ঞানী রেমন্ড ডেভিস জুনিয়র, ১৯৬৮ সালে। ভদ্রলোক যুক্তরাষ্ট্রের এক সুগভীর খনিতে একটা ক্ল্রোরিন ডিটেক্টর স্থাপন করে সূর্যের কেন্দ্র থেকে আসা নিউট্রিনোকে সনাক্ত করে ২০০২ সালে অর্জন করেন পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল।
তাহলে ফ্রান্সিস হ্যালজেন আবার কী এমন করলেন?
এই ভদ্রলোক নিউট্রিনোর মতো একটা ভয়াবহ রকমের ভূতুড়ে কণাকে ধরাটাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেলেন। এবং একই সাথে তাঁর অবদান কেবল ‘নিউট্রিনো সনাক্তকরণেই’ থেমে থাকেনি, তাঁর গড়ে তোলা আইসকিউব (IceCube Neutrino Observatory) আমাদেরকে দেখতে সাহায্য করছে মহাবিশ্বের আনাচে কানাচে ঘটা মহাকাব্যিক সব উপাখ্যান। আপনার মনে হতেই পারে, আর্টিকেল যেহেতু উনাকে নিয়ে, তাই এতো অতিরঞ্জিত সব শব্দ চয়ন করছি। কিন্তু না। একটু ঝেরে কাশি।

নিউট্রিনো বরফের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় খুব রেয়ারলিই বরফের কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াস বা ইলেকট্রনের সঙ্গে ইন্টারেক্ট করে। অর্থাৎ নিউট্রিনোর এই ইন্টারেক্ট করার সম্ভাবনা শূন্য নয়। এবং একবার যদি ইন্টারেকশন হয়ে যায়, তাহলে সেটার ফলে অন্য একটি আধানযুক্ত কণা(যেমন মিওন) তৈরি হতে পারে। এবং সে কণা বরফের মধ্য দিয়ে আলোর যতোটা গতি হওয়ার কথা, তারচেয়েও বেশি গতিতে যেতে পারে। এতে করে এক ধরনের ক্ষীণ আলোর ঝলক সৃষ্টি হয়। এই আলোর নাম Cherenkov radiation।
বিজ্ঞানীদের কাজ হলো সেই ক্ষীণ আলোর সংকেত শনাক্ত করা, কোথায় এবং কখন সেটি দেখা দিয়েছে তা মাপা, তারপর সেখান থেকে নিউট্রিনোর আগমনের দিক ও শক্তি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আগেই বলেছি নিউট্রিনোর এমন মিথস্ক্রিয়া অত্যন্ত বিরল। একটি ছোট ঘরে কয়েকটি নিউট্রিনো আটকে রেখে পরীক্ষা চালালে কাজ হবে না। দরকার এমন এক বিশাল পরিমাণ স্বচ্ছ মাধ্যম, যার ভেতর দিয়ে যথেষ্টসংখ্যক নিউট্রিনো যাওয়ার সুযোগ পাবে।
ফ্রান্সিস হ্যালজেনের প্রস্তাব ছিলো, দক্ষিণ মেরুর বিশাল বরফকেই এই কাজে ব্যবহার করা যায়। তিনি বুঝেছিলেন যে দক্ষিণ মেরুর বিশাল বরফকে ব্যবহার করে এমন একটি পর্যবেক্ষণাগার গড়ে তোলা সম্ভব, যা উচ্চশক্তির মহাজাগতিক নিউট্রিনো শনাক্ত করতে পারবে। ১৯৮৮ সালে তিনি দক্ষিণ মেরুতে নিউট্রিনো শনাক্ত করার এই পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এরপর বিভিন্ন গবেষক ও প্রকৌশলীর অংশগ্রহণে পরিকল্পনাটি বাস্তব রূপ পেতে শুরু করে।
নিউট্রিনো ধরার গোয়েন্দা আইসকিউবের গল্প
আইসকিউবের প্ল্যানটা শুনতে আপনার কাছে একটু সায়েন্স ফিকশন টাইপ লাগতে পারে, কিন্তু এটা একটা ইঞ্জিনিয়ারিং মার্ভেল। দক্ষিণ মেরুতে বরফের অনভিপ্রেত ধুলোবালি ও বুদ্বুদ এড়াতে পর্যবেক্ষণাগারটি পৃষ্ঠতলের প্রায় দেড় কিলোমিটার নিচে শুরু হয়ে ২.৪৫ কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। এবং সে স্বচ্ছ বরফের ভেতর ৫,১৬০ টি অপ্টিকাল সেন্সর বসানো হয়। এবং এটা কাজ করে মোটামুটি এভাবে-
(১) কোটিতে একটা নিউট্রিনো বরফের পরমাণুর সাথে ইন্টারেক্ট করে।
(২) তৈরি হয় একটা চার্জযুক্ত কণা, যা বরফের ভেতর দিয়ে ছুটতে ছুটতে ক্ষীণ নীল আলো ছড়ায়, অর্থাৎ চেরেনকভ রেডিয়েশন সৃষ্টি করে।
(৩) আর সেই ক্ষীণ নীল আলো সনাক্ত করতেই ওৎ পেতে বসে থাকে সেই সেন্সরগুলো। এই হাইলি লাইট সেন্সেটিভ সেন্সরগুলো সেই আলোর টাইমিং দেখে হিসাব কষে বলে দেয়, নিউট্রিনো কোন দিক থেকে এল আর কত শক্তি নিয়ে। সেই নিউট্রিনোর মহাজাগতিক উৎস অবধি বের করে ফেলা যায়।

আইসকিউব নিউট্রিনো অভজার্ভেটরির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় ২০১১ সালে। সাউথ পোলের বরফ এখানে বিশেষ সুবিধা দেয়। কারণ এটা বিশাল, স্বচ্ছ এবং আলোর সংকেত পর্যবেক্ষণের জন্য বেশ উপযোগী। বিশাল আয়তনের কারণে বিরল নিউট্রিনো ইন্টারেকশন শনাক্ত করার সম্ভাবনাও বাড়ে। আপনাকে আরেকটা ব্যাপার পরিস্কার করে বলি, আইসকিউব কিন্তু নিউট্রিনোকে বরফের মধ্যে আটকে রাখে না। বরং মহাকাশ থেকে আশা কোটি কোটি নিউট্রিনো সাউথ পোলে থাকা IceCube এর সেই যজ্ঞ দিয়ে যাওয়ার সময় যে বিরল মিথস্ক্রিয়া করে বসে, এবং তার ফলে যেই আলোর সংকেত তৈরি হয়, সেটার তথ্য বের করে। যে নিউট্রিনোর কারণে এই আলোর সংকেত বা চেরেনকভ রেডিয়েশন আসলো, সেটার উৎপত্তিস্থল সহ নানান তথ্য বের করে। ব্যাপারটা অনেকটা ক্রাইমসিন দেখে গোয়েন্দাদের কাজ করার মতো। ঘটনাস্থলে অপরাধীকে না পেলেও তার ফেলে যাওয়া চিহ্ন, নানান আলামত দেখে যেভাবে শার্লক হোমস বেশ এডুকেটেড একটা গেস করতে পারেন, IceCube য়েও অনেকটা এমন কিছুই ঘটে। এখানে আমাদের সিঁধেল চোর নিউট্রিনোর ক্রাইমের আলামত হচ্ছে আলোর সেই ক্ষীণ ঝলক। এতেই আমরাও ধরতে পারি বেচারা মহাজাগতিক কীসব ট্রমা নিয়ে পাড়ি দিচ্ছে এই যাত্রাপথ।
আসলেই তো, কীসব ট্রমা নিয়ে চলেছে এসব মহাজাগতিক তীর্থযাত্রীরা?
মোটাদাগে IceCube কী কী ঘটনা উন্মোচন করতে পেরেছে? কতোটুকুই বা জানতে পেরেছে এই তীর্থযাত্রীদের থেকে?
কয়েকটা জেনে নেয়া যাক।
যেসব রহস্যের জট খুললো
কিছু গ্যালাক্সির কেন্দ্রে লুকিয়ে আছে দানবাকৃতির সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল। এমনকি আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রেও এক দানব লুকিয়ে আছে। এমন সব সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের আশেপাশে থাকা পদার্থ চরম উত্তাপে বিপুল শক্তি নির্গত করে। এবং সেটার প্রভাবে তৈরি হয় আলোর গতির কাছাকাছি বেগে ছুটে চলা কণার বিশাল ধারা।
কিন্তু বিজ্ঞানীদের মনে দীর্ঘদিনের বড় প্রশ্ন ছিল, এই ভয়ংকর পরিবেশগুলোতে ঠিক কীভাবে কণাগুলো এত অবিশ্বাস্য শক্তি পায়? আমরা মানুষেরা নাহয় নিজেদের বানানো পার্টিকেল এক্সেলারেটরে এই সাবএটমিক পার্টিকেলগুলোকে অবিশ্বাস্য গতি দিতে পারি। কিন্তু মহাকাশে ঘুরে বেড়ানো সেসব অতিগতির নিউট্রিনোদের গতির উৎস নিয়ে রহস্য-ই ছিলো।
এই রহস্যের জট খুলতে সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠতে পারে আমাদের সেই উচ্চশক্তির নিউট্রিনো। কারণ, এরা মহাজাগতিক ধুলোবালি বা চৌম্বকক্ষেত্রের বাধায় পথ হারায় না। উৎস থেকে বেরিয়ে সোজা দিশা ধরে আমাদের কাছে চলে আসে, সঙ্গে নিয়ে আসে তার নিখুঁত ঠিকানা।
২০১৭ সালের ২২ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। আইসকিউব ডিটেক্টর সেবার ঠিক তেমনই এক অতি-উচ্চশক্তির নিউট্রিনো ধরে ফেলে। দেখা গেলো এর আসার দিকটা একদম মিলে যাচ্ছে একটি সক্রিয় গ্যালাক্সির কেন্দ্রের অবস্থানের সাথে! ঠিক একই সময়ে নাসার ফার্মি-ল্যাট (Fermi-LAT) স্পেস টেলিস্কোপ পর্যবেক্ষণ করছিল যে, সেই একই উৎস থেকে গামা রশ্মির তীব্রতাও হঠাৎ করে কয়েক গুণ বেড়ে গেছে [১]। এই ঘটনাটি সক্রিয় গ্যালাক্সির কেন্দ্র এবং মহাজাগতিক নিউট্রিনোর মধ্যকার সংযোগের প্রথম শক্ত ও সুস্পষ্ট প্রমাণ দেয় [২]।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে মহাবিশ্বের সমস্ত নিউট্রিনোর উৎস আজ আমাদের নখদর্পণে চলে এসেছে। তবে এতটুকু নিশ্চিত যে, বিজ্ঞান এখন আর অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছে না। বরং আমরা জানতে পারছি কীভাবে প্রাকৃতিক পার্টিকেল একসেলেটরগুলো (বাংলায় একে কণাত্বরক বলা যায়) কাজ করছে। এক্টিভ গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা সেসব দানবীয় ব্ল্যাকহোল আশপাশের বিপুল পরিমাণ গ্যাস ও পদার্থকে নিজের দিকে টেনে নেয়। সব পদার্থ কিন্তু ব্ল্যাকহোলের ভেতরে গিলে যায় না। ব্ল্যাকহোলের প্রবল ঘূর্ণন ও চরম শক্তিশালী মহাজাগতিক ম্যাগনেটিক ফিল্ডের কারণে কিছু কণা ছিটকে বেরিয়ে আসে। ব্ল্যাকহোলের ঘূর্ণন শক্তি ও চৌম্বকক্ষেত্র মিলে একধরণের এক্সেলেটর তৈরি করে। এটা ইলেকট্রন, প্রোটন ও অন্যান্য কণিকাকে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে আলোর গতির প্রায় কাছাকাছি বেগে (৯৯.৯৯%) ত্বরান্বিত করে মহাকাশে এক বিশাল “জেট” (Relativistic Jet) হিসেবে ছুড়ে দেয়।
আলোর কাছাকাছি বেগে ছোটা সেই প্রোটনগুলো যখন আশপাশের আলোর ফোটন বা অন্যান্য কণার সাথে প্রচন্ড জোরে ধাক্কা খায়, তখন সেখানে তৈরি হয় পায়ন নামে কিছু ক্ষণস্থায়ী কণা। এই পাইন কণাগুলো ভেঙে গিয়ে একদিকে তৈরি করে উচ্চশক্তির নিউট্রিনো। এবং এরাই এসে ধরা দিয়েছিলো আইসকিউবের কাছে।
আমাদের নিজস্ব বাড়ির একটা খবর দিই।
এইতো, বছর তিনেক আগে, ২০২৩ সালে আমাদের নিজেদের গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ের ভেতর থেকেও যে উচ্চশক্তির নিউট্রিনো তৈরি হয় এবং তা দিয়ে পুরো গ্যালাক্সির একটি নিউট্রিনো ম্যাপ বা ছবি তৈরি করা সম্ভব, তা প্রমাণিত হয় এই আইসকিউবের মাধ্যমে। এটি প্রমাণ করে যে আমাদের গ্যালাক্সির ভেতরের চঞ্চল পরিবেশেও উচ্চশক্তির কণা তৈরির বিশাল কারখানা সচল রয়েছে। [৩]

IceCube এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব কেন এত গভীর?
বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই বিজ্ঞানীরা দেখছিলেন যে মহাকাশ থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী কিছু কণা (Cosmic Rays) পৃথিবীতে এসে পড়ছে। কিন্তু এগুলো ঠিক কোথা থেকে আসছে, তা একশ বছর ধরে রহস্য ছিল। কারণ চার্জযুক্ত হওয়ায় কসমিক রে’র পথ মহাকাশের চৌম্বকক্ষেত্রে বেঁকে যায়। কিন্তু নিউট্রিনো সোজা পথে আসায় এটিই সেই জন্মস্থানের নিখুঁত ঠিকানা বা সূত্র ধরিয়ে দেয়।
ব্ল্যাকহোলের ইভেন্ট হরাইজনের বাইরে, অর্থাৎ ব্ল্যাকহোলের আশপাশে এমন অনেক অঞ্চল রয়েছে, যেখানে ঘন গ্যাস ও ধূলিকণার কারণে আলো শোষিত বা বিক্ষিপ্ত হয়ে যেতে পারে। সেই পরিবেশে তৈরি হওয়া নিউট্রিনো কিন্তু পদার্থের সঙ্গে খুব দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করে বলে অনেক সহজে বেরিয়ে আসতে পারে। ফলে পৃথিবীতে পৌঁছানো নিউট্রিনো বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাকহোলের আশপাশে ঘটে যাওয়া কিছু উচ্চশক্তির প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পারেন। এমনকী, ভবিষ্যতে ডার্ক ম্যাটার বা আমাদের চেনা পদার্থবিজ্ঞানের সীমানার বাইরে যদি নতুন কোনো কণা বা লুকানো কোয়ান্টাম রহস্য থেকে থাকে, তবে এই চরম শক্তির নিউট্রিনো স্টাডি করার মাধ্যমেই তার সূত্র মিলতে পারে।
শেষকথা
শুরুতে যে জটলার কথা বলেছিলাম, মনে আছে? ভিড়ের কারণে আপনি ঠিকমতো দেখতে পারছিলেন না কী ঘটছে। মহাবিশ্বের ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানীরা বহুদিন এমন কিছু সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছেন। IceCube কিন্তু সেই জটলা সরিয়ে দেয়নি, কিন্তু আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে মহাবিশ্বকে দেখার আরেকটি জানালা। এই জানালা দিয়ে লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূর থেকে নিউট্রিনো আমাদের কাছে মহাবিশ্বের যে গল্প নিয়ে হাজির হচ্ছে, তা শুধু আলো দেখে পাওয়া কঠিন। অবশ্য এমনটা দাবি করছি না যে, নিউট্রিনো সব রহস্যের জট খুলে দিয়েছে। বরং নতুন নতুন সব প্রশ্নের দরজা খুলে দিয়েছে। আর ফ্রান্সিস হ্যালজেনের অবদানের তাৎপর্য এখানেই। তিনি এমন একটি উপায় বাস্তবায়নে নির্ণায়ক ভূমিকা রেখেছেন, যার সাহায্যে প্রায় অধরাই থেকে যাওয়া কণার সূত্র ধরে আমরা দূর মহাবিশ্বের চরম শক্তিশালী সব ঘটনা আমরা বুঝতে শুরু করেছি। হয়তো মহাবিশ্বের সব রহস্যের উত্তর পেতে আমাদের আরও অনেক দূর যেতে হবে। কিন্তু এখন অন্তত আমরা জানি, আলো যেখানে সব কথা বলতে পারে না, বা কসমিক ওয়েভও যেখানে আমাদের কিছু জানাতে পারেনা, সেখানেও মহাবিশ্বের গল্প শোনার আরেকটি উপায় আছে। আর সেই গল্পের এক নীরব বার্তাবাহক হলো নিউট্রিনো। ধন্যবাদ, নিউট্রিনো। ধন্যবাদ, ফ্রান্সিস হ্যালজেন।

তথ্যসূত্রঃ
[১] NASA’s fermi traces source of cosmic neutrino to monster black Hole – NASA. (n.d.). NASA. https://www.nasa.gov/news-release/nasas-fermi-traces-source-of-cosmic-neutrino-to-monster-black-hole/
[২] Tyler, P., Team, P. O. T. C., & Tyler, P. (2026, October 9). Nobel Prize for Astrophysical Neutrino Observations with IceCube – NASA Science. NASA Science. https://science.nasa.gov/astrophysics/programs/physics-of-the-cosmos/community/nobel-prize-for-astrophysical-neutrino-observations-with-icecube/
[৩] Abbasi, R.; et al. (IceCube Collaboration) (29 June 2023). “Observation of high-energy neutrinos from the Galactic plane”. Science. 380 (6652): 1338–1343. arXiv:2307.04427. Bibcode:2023Sci…380.1338I. doi:10.1126/science.adc9818. PMID 37384687. S2CID 259287623.










মতামত জানান